১।
বিশ্বের ১৫৩ টি দেশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ছোট,মাঝারি বা বৃহত্ ট্রুপস রয়েছে । বিশ্বের সবকটি মহাদেশে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে সামরিক ঘাঁটি।পৃথিবীর সবকটি সমুদ্র,সাগর ও উপসাগরে আমেরিকার নৌবহর আছে।উপগ্রহের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমগ্র পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে।পৃথিবীর ১৭০ টির অধিক দেশের সঙ্গে সরাসরি বিমানযোগাযোগ রয়েছে আমেরিকার।পৃথিবীর যেকোন দেশে উদ্ভৃত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মন্তব্য জানায়।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও শাসন মেনে নিলে সে দেশ অর্থনৈতিক সুবিধা পায়,আর কেউ তার বিরোধীতা করলে তার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে শুরু করে সামরিক হামলা বা আগ্রাসন চালিয়ে প্রতিরোধ শক্তিকে দুর্বল করে বা ভেঙে দেয়।মার্কিন এজেন্ডা পৃথিবীর সবকটি রাষ্ট্রে পৌঁছে দিতে তাদের শক্তিশালী মিডিয়া ও চলচ্চিত্র প্রপাগান্ডা যুদ্ধ চালিয়ে যায় অনবরত।হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোয় দেখবেন পৃথিবীর যেকোন মহাদুর্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বা সিআইএ বা এফবিআইকে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে । বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে দেখবেন 'যুক্তরাষ্ট্র চায়...আমরা মনে করি...যুক্তরাষ্ট্র অমুক নীতির প্রতিফলন চায় 'ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয় যা একটি কেন্দ্রিয় শক্তির ইঙ্গিত ও আজ্ঞাবহ অবস্থাকে প্রকাশ করে ।
এসবের পরেও আপনি কি মনে করেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র শুধু একটি 'দেশ' বা 'রাষ্ট্র'?
না, প্রকৃতপক্ষে এটি একটি সাম্রাজ্য(Empire) ! আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র একটি সাম্রাজ্যের নাম-আমেরিকান সাম্রাজ্য(American Empire)ই এখন United States of America তথা USA পরিচয়ে চলছে।
২।
পারস্য সাম্রাজ্যের (Persian Empire)পর আমেরিকান সাম্রাজ্যের মতো এতোটা শক্তিশালী দ্বিতীয় কোন সাম্রাজ্যের উত্থান পৃথিবীতে হয়নি।আপনাকে আমাকে সেই সাম্রাজ্যের সেবাদাস বানিয়ে রাখা হচ্ছে অথচ আমরা তা টের পাচ্ছিনা।বরং এই অপসাম্রাজ্যের ছুঁড়ে দেয়া ডেমোক্রেসি (Democracy),ফেমিনিজম(Feminism),মডার্নিজম (Modernism),পোস্টমডার্নিজম(Post-modernism) ,নিওলিবারেলিজম(Neuliberalism),গ্লোবালাইজেশান(Globalization)ইত্যাদির অপূর্ণাঙ্গ রূপ গলধঃকরণ করানোর মাধ্যমে দেশে দেশে জাতীয়তাবাদ (Nationalism) বা 'দেশাত্মবোধ'(Patriotism)কে কবর দেয়া হচ্ছে।আর এর ফলাফল খুবই বিপজ্জনক।আর তা হচ্ছে-আমেরিকান সাম্রাজ্যের সুপিরিওরিটি(Superiority) ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বকে শাসন(আসলে শোষণ)করার একক কর্তৃত্ত্ব বা ম্যান্ডেট (Mandate)প্রদান ।
৩।
সত্যি বলতে বিশ্ব মানবতার মুক্তির পথে এখন সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন এই অপসাম্রাজ্য ও সম্প্রসারণবাদ(Expansionism) । Survival For the fittest এর মত জঘন্য ও বৈষম্যমূলক খুনী তত্ত্বকে ধারন করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (US Imperialism)ছড়ানো হয় বিশ্বব্যাপী।তারপর দ্বন্দ্ব,সঙ্ঘাত,যুদ্ধ,গ্রুপ,উপগ্রুপ,হাজারটা দল,বিকৃত গণতন্ত্রের সঙ্গে পুঁজিবাদের(Capitalism) ভয়াবহ বিস্তার ঘটানো হয় । এতে বিশ্বের বিশাল একটা অংশ এপিকিউরিজম(Epicurism) বা ভোগবাদের জালে আটকা পড়ে।সেই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মার্কিনপন্থী (Pro USA)ও বিরোধী দুটি ধারা তৈরি করে।এসবের মূলে কাজ করে আমেরিকান সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখা ।
আমেরিকান এই সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেসিক দাস মানসীকতার (Colonial Slave Mentality) সুযোগে বিভিন্ন জাতির আরো ভেতরে শিকড় গেড়েছে।
৪।
এর সঙ্গে সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন(Cultural Aggression) যে ভয়ঙ্কর ও ধ্বংসাত্মক হিজিমনি(Hegemony) তৈরি করছে তা জাতির পর জাতিকে অদৃশ্য উপনিবেশে (Invisible Colony)আবদ্ধ করেছে।কার্যত মার্কিন সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত এজেন্ডা সেট(Agenda Setting) করেই যাচ্ছে এ সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারকরা।সেই এজেন্ডা চটকদার করে উপস্থাপন করে বারবার শতশত মিডিয়ায় প্রচারণা (Propaganda)চালিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে সেটা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। আমরা ঘূণাক্ষরেও টের পাচ্ছিনা একটি সাম্রাজ্যের বিস্তার ও টিকে থাকার লড়াই সম্পর্কে-তা কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে সে সম্পর্কে। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ(Psychological war) কৌশল অতি সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী। এই কৌশল ব্রিটিশদের মত কূটবুদ্ধিসম্পন্ন জাতিকে পর্যন্ত আমেরিকার পদানত করেছে।
পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত আমেরিকান সাম্রাজ্য ঠিক কবে ভেঙে যাবে বা এর পতন ঘটবে সেটা নির্ভর করছে মানুষ কত দ্রুত দেশ বা রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা একটি বিরাট সাম্রাজ্যকে চিহ্নিত করতে পারবে তার উপর ।
[আমেরিকান সাম্রাজ্য,পর্ব-১, ৩ জানুয়ারী ২০১৫]
