দেখছি যা করোনাকবলিত পূর্ববঙ্গ দেশে...
~~~~~
গ্রামের বাড়িতে এসে দেখলাম গণমাধ্যম মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে গ্রামবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে। এ কারণে গ্রামে এখন করোনার ভয়াবহতার কারণে পাওয়া কথিত 'সাধারণ ছুটি' ছুটি হিসেবেই উদযাপিত হচ্ছে। একে তো চৈত্রের কাঠফাটা রোদ ও গরম, তারমধ্যে বৈশাখের আগমনী হালকা বাতাস! গ্রামের মানুষ খোশগল্প, আড্ডা, তামাশা, সম্মিলিত প্রার্থনার মধ্যে ডুবে আছে। রাস্তাঘাট আপাতদৃষ্টিতে বন্ধ মনে হলেও বাড়ি থেকে বাড়ি বা গ্রামের অলিগলিতে ঠিকই লোকসমাগম হচ্ছে, বরং আগের চেয়ে অনেক বেশি।
২।
তো এই যে জনমনে করোনার কারণে যে সতর্ক অবস্থান দেয়া গেলোনা এর দায় কার? সরকারের নানা পর্যায়ের সিদ্ধান্তে এটি এ পর্যন্ত আসলেও গণমাধ্যম এই মহামারীতে জনসচেতনতায় মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কীভাবে?
জনমানসে এই রোগ সম্পর্কিত বিদঘুটে ইংরেজি শব্দগুলোর সাধারণ উপযোগী কোনো প্রতিশব্দই প্রথমত গণমাধ্যমকর্মীরা হাজির করতে পারেনি। এরা Social Distancing এর হুবহু বাংলা 'সামাজিক বিচ্ছিন্নতা' করে অন্ধের মত তাই বিলি করছে। আমি শখানেক মানুষকে দূরত্ব রেখেই জানতে চেয়েছি বাইরে কেন? সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বোঝেন না? তাদের সাফ জবাব এসব ডিস্টেন্সিং ফিস্টেন্সিং বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তারা বোঝেন না। অথচ এই শব্দযুগলকে সহজেই 'মেলামেশা বাদ/বন্ধ', 'লোকদূরত্ব', 'দূরে থাকা' ইত্যাদি করা যেতো!
একইভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনকে 'বাধ্যতামূলক ঘরে থাকা', Self Isolation কে 'নিজে ঘরে বাস' ইত্যাদি পরিচিত শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যেতো। গণমাধ্যম তা করেনি।
মানসম্মত কোনো শর্টফিল্ম বা বিজ্ঞপ্তিও প্রচার হয়নি যা জনমনে দাগ কাটবে। ইউএনডিপি বাংলাদেশের জনবিচ্ছিন্নরা একটি গান গাইয়েছে চিরকুটের সুমি গংকে দিয়ে। যে গানে মাটি ও মানুষের কোনো সুর নাই, পটলের ঝোল আর কবিতা নিঝুম মার্কা শব্দ দিয়ে ১% সুবিধাবাদী শ্রেণির উপযোগী করে বার্তা তৈরি করেছে। মানে তেলা মাথায় তেল! বিটিভিসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের জনমানসকে প্রভাবিত করার মত কনটেন্ট দেখা যায়নি। ফেসবুকে বা ইউটিউবে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগেও তেমন কোনো জনসচেতনতামূলক কনটেন্ট দেখা যায়নি। কুদ্দুস বয়াতিকে দিয়ে যে গান গাওয়ানো হয়েছে তাও মোটেই কার্যকর নয় বলেই জানতে পারলাম।
৩।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংবেদনশীল ব্যাপার দেখলাম। এ বিষয়ে এখনই ব্যবস্থা না নিলে এখান থেকেই করোনা তার মহামারী চরিত্র অর্জন করতে পারে। গ্রামের মসজিদে এখন আগের চেয়ে বেশি নামাজি এবং সেখানে ৫ বেলা এই জমায়েত চলছে। এই মুসল্লিদের ঘরে ফেরানো যাদের কাজ সেই ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমরা 'ছোঁয়াচে রোগ বলে কিছু নাই' কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। আমি যতবার এদের বোঝাতে চেষ্টা করেছি ততবার মুন্সীরা মুসল্লিদের ঘরে বসে নামাজ পড়ার চেয়ে মসজিদে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা বিশেষ করে বয়স্ক মানুষকে ধর্মের ভীতি দেখিয়ে ঘর থেকে নামাজ পড়ার কথা না বলে মসজিদে আনছে। এসব ইমামদের ব্যাপারে নীতিনির্ধারণী মহল থেকে ভাবনা নেয়া হয়েছে কি যারা গ্রাম পর্যায়ে মত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরা মতমোড়ল নয়, মতস্রষ্টা। এদের নিয়ে গণমাধ্যমেও তো তেমন কোনো নির্দেশনা, বিজ্ঞপ্তি, ভিডিও নাই।
৪।
গ্রামের যুবক, কিশোর খেলাধুলা পর্যন্ত করছে। ক্রিকেট খেলছে৷ তাও শর্ট পিচ৷ অল্প একটু জায়গায় অনেক বড় জমায়েত। খেলছে আবার টাকা দিয়ে। যে যা দিবে তার দ্বিগুণ পাবে। একটি ব্যাট সবাই ধরছে, একটি বলও। এই তরুণদের মধ্যে অসচেতনতা দেখে আমি ভীষণ অবাক। এদের তাড়া করতে গ্রামে গ্রামে, প্রতিটি উপজেলায় টহল পুলিশ দিলে উত্তম ব্যবস্থা হবে। কিংবা জনসচেতনতার জন্য প্রতিটি গ্রামে থানার নাম্বার দিয়ে দেয়া যেতো যেন জমায়েত দেখলেই থানায় জানায়।
৫।
নারীরা আরো বেশি অসচেতন। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ছাড়া তাদের এ বাড়ি ও বাড়ি, এ খলট ও খলটে ঘোরাঘুরি, বসে চুল বিলি, আড্ডা চলছে। এইসব মানুষকে আমি যতবার বলেছি এভাবে এক সাথে থাকা তাদের ও তাদের পরিবারের জন্য বিপজ্জনক তারা ততবার বলেছে আরে আমাদের দেশে এসব কম হবে! আমরা কি বাড়ির বাইরে যাই?
৬।
মিডিয়া যে ব্যর্থ টিভি খুললেই বোঝা যায়, কঠিন কঠিন বাংলা ইংরেজি মিশায় কি না কি বলে, গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে না। আবার ব্যর্থ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, ব্যর্থ আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বাররা দায়সারা মুখ চেনা কিছু লোককে কিছু দিয়ে ছবি তুলছে।
গ্রামের ধনাঢ্য মানুষেরা কিছুই করছেনা সাধারণ মানুষের জন্য। আঙুল ফুলে কলাগাছ টাকার কুমিরগুলো গা ঢাকা দিয়েছে।
পুলিশ প্রশাসন কঠোর হচ্ছেনা। টহল প্রতিনিয়ত দিচ্ছেনা। এরা যদি সক্রিয় হয় তবে লক ডাউন সফল হবে, না হলে নয়!
গরমে করোনা ভাইরাস কম ছড়ায় এই কথা বিশ্বাস করে অধিকাংশ গ্রামের মানুষ। এই কুসংস্কার থেকে এদের বের করতে বাড়ি বাড়ি লিফলেট দেয়া যেতো। স্টার জলসা বা যেসকল চ্যানেল অধিক দেখা হয় তার মাধ্যমে বার্তা দেয়া যেতো কুসংস্কারগুলো নিয়ে।
৭।
গ্রামের মানুষ সরকারের যে তথ্য এই তথ্যে পূর্ণ বিশ্বাস না রাখলেও এই তথ্যকে ভিত্তি করেই আবার ভাবছে 'দৈবক্রমে সে বা তার গ্রামে এটি আসবেনা', 'তাদের সারা বছর সর্দিকাশি থাকে', কীসের আবার করোনা? তারা কাজে যাচ্ছে কেউ কেউ। কাজে না গেলে খাবো কী এই প্রশ্নের কাছে আমরা অসহায়। যেসব ত্রাণ এসেছে তা ঠিকমতো দৈনিক আয়ের উপরে নির্ভরশীল মানুষগুলো পাচ্ছেনা বলেই সবার অভিযোগ। গ্রামে আঙুল ফুলে কলাগাছ মানুষগুলো শহরের লোপাট করা ভোগবাদীদের মতই খাদ্য গুদামজাত করছে। প্রতিবেশি না খেয়ে আছে কী না কেউ কেউ খোঁজ নিলেও অধিকাংশ বড় মিয়া ঘরের কপাট বন্ধই রাখছে। কিছু তরুণ যুবক টাকা পয়সা উঠিয়ে সাহায্যের চেষ্টা করছে।
৮।
মাস্ক না পরা নিয়ে এলার্জি আছে গ্রামে। স্যানিটাইজার তো এখনো সবাই চেনেনা। সাবান ব্যবহার করছে কেউ কেউ। সবার ঘরে সাবান নাই। তাদের জন্য ছাই বা মাটি কার্যকর কী না এ নির্দেশনা আছে? মাস্ক একটি টানা ৩-৪ দিন ব্যবহার করছে এমন লোকও আছে৷ এসব মাস্কের অধিক দাম এমন ব্যবহারের কারণ।
৯)
সরকারের ছুটি দেয়াকে খুবই ভালোভাবে নিলেও দিনমজুরদের খাদ্যের নিরাপত্তা না বলে ক্ষোভ রয়েছে। আবার বাজার ঘাটে কোন নিষেধ নাই বলে ঠিকই সেখানে লোক সমাগম হচ্ছে। কোনো ফাঁকা জায়গায় দোকানদারদের মধ্যে দূরত্ব রেখে বাজার মিলছেনা। এই সংকট অবশ্য ছোট্ট একটু দেশে ১৭ কোটি মানুষের বসবাস করায় কাটানো কঠিন।
১০।
গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে অসচেতনতা। হিন্দুদের মধ্যেও মণ্ডপে অর্চনা বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমে দিনমজুর বলতে কেবল ভ্যান, রিকশা, ঠেলাওয়ালাকে বোঝালেও বাড়িতে এসে দেখলাম দিনমজুর অজস্র মানুষ। যে লোকটি বড় একটি বাসগাড়ির কাউন্টারে বসে সেও দৈনিক মজুরিভিত্তিকই কাজ করতো। সকল শ্রমিক, রাজমিস্ত্রী, নাপিত, ছুতোর, চামার, প্রমুখ দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল বিশাল একটি অংশ চরম অনিশ্চয়তায় দিনযাপন করছে।
১১।
পরিচিত কয়েকটি ফার্মেসির মালিক রয়েছে। তারা জানালো হাসপাতালে সামান্য গলাব্যথা, সর্দি হলেও চিকিৎসকরা চিকিৎসা করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে এসকল ঔষধের দোকানদাররাও অঘোষিত চিকিৎসকের ভূমিকা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার, সাধারণ রোগীরাও হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন কার থেকে এ রোগ লেগে যায় গায়! ফলে ফার্মাসিতে ভিড় বাড়ছে। এতে করে দোকানদারদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ছে। নিত্যপণ্যের মতো সাবান, স্যানিটাইজার এর দাম বেড়ে গেছে। চিকিৎসাসেবার মান করোনার কারণে একেবারেই নিচে নেমে গেছে।
অবস্থাদৃষ্টে আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আল্লাহ যদি আমাদের রক্ষা না করেন তবে এই মহামারীতে আমাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে এখন থেকেই জনসচেতনতা ও কঠোরতা না বাড়ালে। দিনমজুরদের খাদ্য, চিকিৎসা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে নৈরাজ্য দেখা দিতে পারে। সে কারণে ঘরে ঘরে চিকিৎসা ও খাদ্যপ্রবাহটি নিরবচ্ছিন্ন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদের নিরাপদ রাখুন।
0 Comments