সর্বশেষ

ভারতের স্বার্থপরতা: পেঁয়াজ বন্ধ, অথচ কলকাতায় গেলো বাংলাদেশের ১২ টন ইলিশ!


স্বাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো ধরনের আগাম ঘোষণা ছাড়াই এটি করেছে ভারত। এর কারণ কথিত "মহারাষ্ট্র করোনাক্রান্ত" (সময় টিভি, ১৪ সেপ্টেম্বর) তত্ত্ব আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়না। এর পিছনে আরো বড় রাজনীতি থাকার সম্ভাবনা আছে। ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে নিয়মিত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, আমাদের ন্যায্য পানির হিস্যা দেয়নি, ভরা মৌসুমে পানি ছেড়ে বন্যা ঘটাচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারকে পর্যাপ্ত চাপও দেয়নি, পেঁয়াজ না দেয়া ইত্যাদি। এমন পরিস্থিতিতেই চীন ৯৭% বাংলাদেশী পণ্যকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়।

তো ভারত কোনো বার্তা দিতে চাচ্ছে মনে হয়।

ভার‍ত দেখেছে, চীনের উদার বাণিজ্যনীতিকে শেখ হাসিনা সরকার সাদরে গ্রহণ করেছে। হর্ষবর্ধন শ্রীংলা ঘোষণা দিয়ে এসেও দেখা পাননি প্রধানমন্ত্রীর। এরমধ্যে প্রকাশ্যে ভারত যে তিস্তাকে হত্যা করেছে সেই তিস্তার নাব্যতা ফিরিয়ে দিতে প্রায় ৯৮ কোটি মার্কিন ডলারের প্রকল্পের অনুমোদন পায় চীন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্প পদ্মা সেতু করছে চীন। এমন নানা ঘটনায় ভারতের "নিজে খাওয়া" সর্বগ্রাসী নীতি বাংলাদেশে বেশ অকার্যকর হয়েছে। সেটিকে ফিরিয়ে আনতেই পেঁয়াজ রপ্তানি কোনো রকম আগাম ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করতে পারে ভারত।

তবে যে কারণেই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানী বন্ধ করুক তা ভারতেরই নিজের পায়ে কুড়াল মারার আরো একটি উদাহরণ হবে। কারণ?

২।
বাংলাদেশের বিকল্প রয়েছে। আজ তুরস্কে নতুন একটি দূতাবাস ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তুর্কিকে রোহিঙ্গা সংকটে পাশে থাকার জন্য আহবান জানিয়েছেন। এই আহবান জানানোর প্রক্রিয়া আরো আগে সূচনা করার দরকার ছিলো। কারণ, বিশ্ব রাজনীতিতে তুর্কির এরদোয়ান এক পাগলা বলা যায়। তারে একটু পাম-পট্রি দিলেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগতো। এটা আমরা নানা প্লাটফর্মে দেখেছি। আমার মনে হয়, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক পদক্ষেপ দ্বিপাক্ষিক শৃঙ্খল ভাঙতে পারে। 

তো যে কথায় ছিলাম। ভার‍ত পেঁয়াজ না দিলে তুর্কির পেঁয়াজ আছে কম দামে। আছে মিশর, পাকিস্তান, মিয়ানমার বা চীনের পেঁয়াজও। যাদের আস্তো একটি বঙ্গোপসাগর আছে তাদের সঙ্গে যে অবরোধ দিয়ে কূটনীতি  হয়না এইটা চাণক্যের স্বার্থপর নীতিধারণকারীদের বুঝতে হবে। সৌদি আরবের উপর যেভাবে কাতার স্থলনির্ভর, বাংলাদেশ মোটেই তা নয়। ঐ নির্ভরতার কথা আসলে বাংলাদেশের উপরই বরং ভারত নির্ভর---সেভেন সিস্টার্স, মুরগীর গলা, আরো কত কী!

৩। 
তো এখন যে পরিস্থিতিতে আমাদের কূটনীতি আছে তাতে করে বলা যায়না কখন কী হয়ে যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির প্রচলিত মুখস্ত যুগ যে শেষ হচ্ছে এটি নেপাল ও ভুটান কর্তৃক ভারতের আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার পর ভালো করেই বোঝা গিয়েছে। এর ষোলয়ানা পূর্ণ হয় বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক স্থায়িত্ব দীর্ঘ হওয়ায়। 

ভারত হিন্দুত্ববাদী গোঁড়ামোতে ব্যস্ত থাকায় আশেপাশে কী ঘটে যাচ্ছে তাতে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। গরু খাওয়ার অপরাধে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা, মসজিদ দখল, দিল্লিতে দাঙ্গায় মুসলিম হত্যা, এনআরসির নামে বাংলাদেশে ভারতীয় মুসলমানদের জোর করে প্রবেশ করাতে চাওয়া, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত, কাশ্মীরকে অধিগ্রহণ করা, বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি আয় রোজগার করে নিয়েও বাংলাদেশকে ছোট করে দেখা ইত্যাদি কারণে ভারত চারপাশে বেশ একা হয়ে যাচ্ছিলো---তা বুঝতে দেরি করে ফেলে বিজেপী-শিবসেনা সরকার।

তাই বাংলাদেশ ''বঙ্গবন্ধুর নয়া চীন ভ্রমণের'' বই পুস্তক করলেও আমাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত চুক্তি-কূটনীতিতে দেরি করে ফেলে। এমন কী চীনা সীমান্তে ২০ জন সৈন্য হারানোর পরের দিন বাংলাদেশ সীমান্তে এক বাংলাদেশীকে ঠিকই হত্যা করে ফেলে প্রিয় বন্ধুর বিএসএফ বাহিনী।

অথচ বাংলাদেশ কেবল ভারতের স্বার্থের কথা ভেবেই বাংলাদেশের হাতে গড়ে উঠা শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংগঠন সার্ক সম্মেলন বয়কট করে এবং কার্যত তারপর থেকে সার্ক এখনও অকার্যকরই রয়েছে। তারপরেও ভারতের আমন্ত্রণেই সার্ক জরুরি তহবিলে বেশ বড় অঙ্কের চাঁদা দেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ফেনী নদীর পানি দিয়ে দেয় একদম ফ্রিতে, প্রায় ফ্রিতে আমাদের বন্দর ব্যবহার করছে ভারত। তবু পানি দেয়নি বন্ধু, তবু সীমান্ত হত্যা বন্ধ করেনি বন্ধু, তবু বাণিজ্য ঘাটতি বন্ধ করেনি বন্ধু---আজ আবার সে বন্ধ করে দিলো পেঁয়াজ দেয়া।

আজো সে যে কোনো বিভীষণ---।

অন্যদিকে আজ থেকেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রায় দেড় হাজার টন ইলিশ উপহার হিসেবে পাঠানো শুরু করেছে বাংলাদেশ (সুব্রত আচার্য, সময়টিভি, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০, রাত ৯ টার সংবাদ)। এই পরিমাণটি গত বছরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি! এই যে আমাদের পেয়ার দেয়া বন্ধ করার দিনেও কোন কূটনৈতিক নিয়মে ভার‍তে উপহার হিসেবে ইলিশ গেলো? 

আমাদের নীতিনির্ধারকদের আরো বেশি ভাবতে হবে। পৃথিবীর যেকোনো দেশ ঘোষণা ছাড়া তাদের আমদানি অন্য কোনো দেশ বন্ধ করলে সে দেশও রপ্তানি বন্ধ করবে, দিতে হয়। কদিন পর শারদীয় দুর্গাপূজা ইত্যাদি। আর ইলিশ ছাড়া পূজার আয়োজন প্রায় মলিন, যেভাবে গরু ছাড়া ঈদ! অতএব, বাংলাদেশেরও ট্রাম্পকার্ড আছে। যেখানে বাংলাদেশের মানুষ, মাটি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের হানি ঘটছে অন্য দেশের সিদ্ধান্তে সেখানে আদিখ্যেতা করে হুটহাট কিছু করা দুর্বল করে দেবে আমাদের বার্গেইনিং অপরচুনিটি বা ক্যাপাবিলিটি-কে।

এসব ট্রাম্পকার্ড সঠিক সময়ে যদি ব্যবহার না করা হয় তখন কিন্তু আর কাজে লাগবেনা। বাংলাদেশকে চোখে চোখ রেখে যেকোনো বিষয় ডিল করতে হবে। তাহলে এ অঞ্চলে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বা বাংলাদেশের স্বার্থে আঘাত করে কোনো শক্তিই সুবিধা করতে পারবেনা--- আমেরিকা হোক আর ইউরোপ হোক; সে চীন হোক আর ভারত হোক!
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments