সর্বশেষ

আলী (রা) বনাম মুয়াবিয়া: হক্বপন্থী কে? ইমাম হোসেন বনাম এজিদ | সিফফিন থেকে কারবালা

কারবালা নিয়ে কথা বলায় ফেসবুকের এলগরিদম কারবালা, আলী রা, হোসাইন রা ও এজিদ ইবনে মুয়াবিয়া নিয়ে নানা পোস্ট-ভিডিও সামনে আনছে। অবাক করা ব্যাপার কী জানেন? বেশিরভাগ হোসাইনের বিপ্লবের শিক্ষা বাদ দিয়ে ব্যস্ত এজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ও তার পিতার সু(কু)কীর্তি বর্ণনায়। 
আল্লাহপাক চোখ , বিবেক , তথ্যভাণ্ডার ও চিন্তার সক্ষমতা দিয়েছেন। তবু অন্ধত্বের পূজা চারদিকে। হক্বের সঙ্গে না-হক্বের তুলনা দেদারছে চলমান! 

অথচ আল্লাহর রাসূল (স) সুবিখ্যাত গাদির খুমে স্পষ্ট করে বলেছেন,'মান কুনতু মওলা ফা হাযা আলিউন মওলা' অর্থাৎ 'আমি যার প্রভু আলিও তার প্রভু'। 

এ হাদিসটি সুন্নি, শিয়া এর সমস্ত মুহাদ্দিস ও আধুনিক গবেষকদের নিকট সহিহ। এ হাদিসের পরে আরো অংশ আছে যার সারমর্ম আল্লাহর রাসূল (স) বলছেন,'আলী (রা) এর সঙ্গে শত্রুতা হযরত মোহাম্মদ (স) এর সঙ্গে শত্রুতা, আর আলী (রা) এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হযরত মোহাম্মদ (স) এর সঙ্গে বন্ধুত্বের সমপর্যায়ের।'

এরপরও এসব স্পষ্ট নির্দেশ জেনেশুনে ইসলামের পূণ্যবান রাশেদিন খলিফা হযরত আলী মওলা (রা) এর বিরুদ্ধে যারা অস্ত্র ধারণ করে, আলী (রা) এবং অন্যান্য আহলে বাইত (রা) এর প্রতি মিথ্যাচার আরোপ করে, তাদের  সম্পদ জবরদখল করে, তাদের সঙ্গে কটু কথা বলে তারা এবং আলী (রা), ফাতেমা (রা), হাসান রা ও হোসেন (রা) এক হতে পারেন? 

এজিদ ইবনে মুয়াবিয়া ও তৎপরবর্তীকালের উমাইয়া জাহেলরা খুব সূক্ষ্মভাবে তাদের বর্বরতার সাপেক্ষে দরবারি মুন্সি ও তরবারির ভয় দেখিয়ে 'বয়ান' তৈরি করে গেছে। এ বয়ানে সরাসরি মুহাম্মদ (স) ও তাঁর রক্তধারার নিন্দা করে পার পাওয়া যাবে না ওরা সেটি জানতো। কিন্তু সত্যকে চাপা দিয়ে মিথ্যাকে ওরা সত্য বলে চালাতে চেয়েছে।

এ জন্য অনেক ভেবেচিন্তে জাহেল-বাতিলরা 'ভারসাম্যপূর্ণ বয়ান' তৈরি করছে। এর সারমর্ম, হযরত আলী (রা) ও ইমাম হোসাইন (রা) এর বিরোধিতাকারী 'সমস্ত উমাইয়া সাহাবি' এর ওপর 'আল্লাহতায়ালা রাজি ও খুশি' এটি প্রচার করতে হবে। 

তাহলেই জঙ্গে জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে আলী মওলা (রা) এর বৈধ খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করারা নিরাপদ নিষ্পাপ থাকবে, জায়েজ ক্রিটিক থেকে ইনডেমনিটি পাবে উমাইয়া ও তাদের সহযোগীরা। আর কারবালার গণহত্যায় জড়িতরাও হেফাজতে থাকবে। 

মক্কা ও মদিনায় ধর্ষণ, গণহত্যায় সরাসরি জড়িত এজিদ উমাইয়া ও তাদের সঙ্গীরা পরবর্তী যুগের মানুষের দোয়ায় আল্লাহর লা'নত কামনার কবল থেকে রক্ষা পাবে--এটাই উমাইয়া ন্যারেটিভ এর মূল। 

ধর্ম ও ইতিহাসের অনেক অংশ আমাদের সামনে উন্মোচন করেনা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া জাহেলের এ যুগের অনুসারী ওবায়দুল্লা বিন যিয়াদ, উমর ইবনে সাদ, শিমর, হাজ্জাজ প্রমুখ। সিফফিনের বেঈমানদের ছায়া এ যুগের কূটবুদ্ধির অনেকের গলাবাজিতেও দেখা যায়।

একটা খুব প্রসিদ্ধ হাদিসের কথা বলি। তাহলে বুঝবেন আমাদের যুগের পর যুগ 'ভারসাম্যের ছলে' কী পরিমাণ অসত্যের দীক্ষা দেওয়া হয়েছে! 

হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) মহানবী স এর একজন নামকরা সাহাবী (রা)। উনার মা ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা) এবং বাবা শহীদ ইয়াসির (রা)। দুইজনেই দুঃসময়ে ইসলাম কবুল করেন এবং জীবন দিয়ে দেন। আল্লাহর রাসূল (স) তাঁদের বেহেশতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আম্মার এই দুই শহীদের পুত্র। আম্মারের ব্যাপারেও হযরত মুহাম্মদ (স) অনেক উচ্চমানের কথা বলেছেন।

মুহাম্মদ (স) কোথাও বসে সাহাবী (রা) দের গুরুত্বপূর্ণ দীক্ষা দিলেও সেখানে যদি আম্মার ইবনে ইয়াসির উপস্থিত হতো মুহাম্মদ (স) সেদিকে দৃষ্টি দিতেন এবং বলতেন 'মোবারকবাদ! সুসংবাদপ্রাপ্ত আম্মারকে অভিবাদন'। এতে সাহাবীদের মধ্যে আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) এর পৃথক সুমহান মর্যাদা তৈরি হয়েছিল। 

নবীজী (স) আম্মার সম্পর্কে বলেন,' আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) একদল সীমালঙ্ঘনকারী বিপথগামীর হাতে শহীদ হবে। আম্মার (রা) তাদের জান্নাতের দিকে ডাকবে, আর ঐ বিচ্যুতরা তাকে জাহান্নামের দিকে ডাকবে। আম্মার (রা) এদের হাতে শহীদ হবে।' এ হাদিস একেবারে সহিহ এর ওপর সহিহ এবং আমাদের সুন্নিদের বিশুদ্ধ বলে পরিচিত অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে এটি বর্ণিত।

এ হাদিসের পর আম্মারের চলাফেরা, কথাবার্তা ও অবস্থান সাহাবী (রা) এর অনেকেই অনুসরণ করতেন। আম্মার (রা) ছিলেন তাঁদের নিকট হক্বের মাপকাঠি। মানদণ্ড। সংকটে আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) কোন পক্ষে যান এটি দেখে অনেক সাহাবী (রা) হক্ব ও বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতেন। 

এই আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) জঙ্গে জামাল যুদ্ধে বৈধ খলিফা হযরত আলী (রা) এর পক্ষে ছিলেন। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (আল্লাহ তাকে মাফ করুন) যখন ইসলামের সর্বশেষ সত্য ও ন্যায়পন্থী খলিফা আলী (রা) এর বিরুদ্ধে অন্যায় ও না-হক্ব বিদ্রোহ করছিলেন তখনও এই সত্যের মাপকাঠি আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা) কী করেন সেটি দেখে হক্বপন্থী সাহাবী (রা) ও তাঁদের অনুসারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আম্মার যার পক্ষে যায় সে হক্ব আর যে আম্মারের বিরুদ্ধে সে 'বিপথগামী'--এ কথাটা নবী মুহাম্মদ (স) বলে গেছেন। 

আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) কার পক্ষে ছিলেন জানেন? তিনি আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (রা) এর পক্ষে একজন কমান্ডার ছিলেন। ৯৩ বছর বয়সে আম্মার আলী (রা) এর খিলাফত সুরক্ষায় জান দেন। 

সিফফিনের ভয়াবহ ফিৎনার যুদ্ধে আম্মারকে দেখে অনেকেই মুয়াবিয়ার পক্ষ ত্যাগ করেন। কারণ আম্মার হক্ব ও বাতিলের পার্থক্যকারী।

নবীজী (স) এর প্রিয়তম চাচা হামজা (রা)এর মৃতদেহ কেটে কলিজা বের করে খাওয়া ঘৃণ্য হিন্দা ও উমাইয়া নেতা আবু সুফিয়ানের পুত্র মুয়াবিয়া যুদ্ধে হেরে যাওয়ার সময় 'বর্শার অগ্রে কোরান বেঁধে' বিভ্রান্ত করে সহস্র মানুষকে।

আলী (রা) এত মানুষ হতাহত হতে দেখে বেদনাকাতর হয়ে (কারণ প্রাথমিক যুগে ঈমান আনার পর আলী রা কয়জন মুসলিম হলো তা গুণে রাখতেন। একজন মানুষও ছিল গুরুত্বপূর্ণ) মুয়াবিয়াকে বলেন, এতোই ক্ষমতার যদি লালসা থাকে তবে এত প্রাণহানি না ঘটিয়ে আমার সঙ্গে মল্লযুদ্ধ লাগো। যে জিতবে তার কথা অপরজন শুনবে। কাপুরুষ  মুয়াবিয়া প্রথমেই এতে অস্বীকার করে। কারণ তাঁর মামা ও নানার ভবলীলা এই আলী ও হামজার হাতেই হয়েছিল। তবু মুয়াবিয়ার উকিল আমর ইবনে আস তাকে মল্লযুদ্ধে যেতে বললে মুয়াবিয়া বলে, আলীর সঙ্গে মল্লযুদ্ধ  করে আমি মরি আর তুমি ফাঁকা মাঠে সিরিয়ার শাসক হও, না? এই হলো মুয়াবিয়ার নীতি!
 
উসমান (রা) হত্যার বিচারকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে মুয়াবিয়া কীভাবে নিজেই খলিফার দাবিদার হলো তা পড়লে অনেক ব্যথা লাগে! যাহোক, সিফফিনের যুদ্ধে এমন কী আম্মারকে মুয়াবিয়ার নরপিচাশ বাহিনী শহীদ করে। 

আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) এর শহীদ হওয়া আরো স্পষ্ট করে যে, আলী (রা) ছিলেন প্রকৃত সত্য তথা হক্বপন্থী। কারণ, মহানবী (স) বলেছেন, আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) বিপথগামী একটি উগ্র দলের হাতে প্রাণ বিসর্জন দেবেন।

তো আম্মার শহীদ হলে মুয়াবিয়া বাহিনীর তো আর কিছু বলার থাকে না, তাইনা? হ্যাঁ,তাই। কিন্তু তারপরও মুয়াবিয়ার প্রোপাগাণ্ডা সেল সে সময় সত্যের বরখেলাপ করে উমাইয়া কূটবয়ান দিল ,'আম্মারকে যে যুদ্ধে আনছে সেই আলীই তার হত্যাকারী (নাউজুবিল্লাহ'। 

হযরত  আলী (রা) এই নির্লজ্জ ন্যারেটিভ শুনে খুবই কষ্ট পেলেন এবং বললেন,'এরা তো তবে আমার চাচা শহীদ হামজা (রা) এর মৃত্যুর দায় রাসুলুল্লাহ (স) কে দিতে দ্বিধা করবে না'! 

এই বয়ান আমাদের আজকের যুগের এজিদ ইবনে মুয়াবিয়াদের মধ্যেও দেখা যায়। ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষতা বা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে গিয়ে যে হক্বপন্থীর উপর জুলুম করা হয় সেটি এরা ভুলেই গেছে। আর ভুলে যায়, ক্ষমতায় গিয়ে উসমান (রা) হত্যার বিচার নিয়ে টুঁ শব্দটিও যে মুয়াবিয়া বা তার উমাইয়া রক্তের কেউ করেনি সেই কথা!

এ কারণে, ইন শা আল্লাহ হাশরের মাঠে আমরা মুহাম্মদ (স), মাওলা আলী (রা) এবং আহলে বাইতদের সামনে গিয়ে এজিদ ইবনে মুয়াবিয়াদের অনুসারীদের সঙ্গে ফয়সালার আশা করি। সেই কারবালায়ও আমরা সংখ্যায় কম ছিলাম, আজো কম। তাতে কী? চিরকাল এই অল্পসংখ্যক মানুষকেও ভয় পেয়েছে নব্য এজিদবাহিনী। 

আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূল আল্লাহ। আসসালামু আলাইকা ইয়া আহলে বাইত।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments