সর্বশেষ

শোনা হলোনা সোনা খালাম্মার কথা

ছোট বেলা থেকে আমাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন সোনা খালাম্মা। আজ তিনিও মারা গেলেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। 

সোনা খালাম্মা ছিলেন আমাদের দ্বিতীয় মা। আমাদের জম্ম নেওয়ার থেকে শুরু করে সমস্ত যত্নে তাঁর অকৃত্রিম মায়া ছিল৷ দাঁত নড়লে ফেলে দিতেন। বাচ্চাদের পালন করার বিষয়ে তিনি আদিগুরু। জানিনা কেউ এ বিদ্যা তার নিকট থেকে শিখে রাখলো কী না।

খালাম্মা আমাকে ডাকতেন 'খালু' বলে। ঢাকা থেকে গেলে যত রাত হোক খালাম্মা টের পেতেন আর ডাক দিতেন 'ও খালু?'। এমন স্নেহমমতার মিশ্রণে কেউ আর কোনোদিন খালু বলে ডাকবে না মনে হলেই বুকটা হাকাকার করে ওঠে। খালাম্মার জন্য আমি কিছু না কিছু সামান্য নিয়ে আসতাম। 

ছোটবেলায় আমাদের কুটিচুলো রান্নার এক নম্বর ডোনার ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন খালাম্মা। আমাদের নিয়ে হাসি-তামাশা করতেন। গল্প করতেন। বাঁশতলায় সকাল, দুপুর ও রাতে খালাম্মাকে কেন্দ্র করে খেজুরের পাটিতে দুনিয়ার গল্প হতো। 

খালাম্মা যে কেবল আমাদের শ্রদ্ধাভাজন তা নয়। মা কেও দেখতাম 'সোনা বু' বলে ডাকতেন। আব্বা তো স্কুল থেকে এসে বা কোনো কারণে কথা বলতে হলেই ডাকতেন ' ও সোনা বু'। খালাম্মার বয়স প্রায় ১০০ ছুঁছুঁই ছিল। কাছাকাছি ফেলু নানা ছাড়া খালাম্মার সমবয়সী খুব কমই আছেন।

সোনা খালাম্মা আমার ইতিহাসজ্ঞানের অন্যতম উৎস। ব্রিটিশ আমলে কী কী ছিল।  'দশ ফাই' নিয়ে বাজারে গিয়ে কীভাবে খালই ভরে বাজার আনার পরেও ৫ ফাই ফেরত থাকতো সেই কাহিনী আমাকে খালাম্মা শোনাতেন। শোনাতেন, কীভাবে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ৭১ এ আমাদের পুরোন বাড়ি ঘেরাও করে তছনছ করে দিয়েছিল আর সবাই আশেপাশের জঙ্গলে অবস্থান করেছিলেন। আরো অনেক না বলা কথা। খালাম্মা বলতেন, আগে যে ধান ছিল তাতে বরকত ছিল। এখন কিছুতেই বরকত নাই, শান্তি নাই।

আগেকার দিনের গীত, সংস্কৃতি, বিয়ে, খাওয়া দাওয়া, নৌকা, শাপলা, কাইজ্যা, রাজনীতি, সামাজিকতাসহ এমন কোনো বিষয় নাই যার জ্ঞান সোনা খালাম্মার ছিলোনা। এ ধরনের মানুষ দুনিয়ার সম্পদ। এ জন্য আমি উনাদের পেলেই কথা বলতাম, শুনতাম।

সোনা খালাম্মা এলাকার সবার পছন্দের ব্যক্তি ছিলেন। সব বাচ্চা কাচ্চা জম্ম হওয়ার সময় তার কমবেশি ভূমিকা ছিল লালনে-পালনে। তাঁর ছেলেরা পালোয়ান। মেয়েরা লক্ষ্মী। খালাম্মার সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল ছোট বড় সবার। সোনা খালাম্মা আমাদের ভালোবাসার বটবৃক্ষ। ছোটবেলায় কান্নাকাটি করলে খালাম্ম এসে বলতেন,' আমার খালু রে কে মারছে?'! আহা রে খালাম্মা! আহা রে আমার সোনা খালাম্মা! আমাদের আরেক মা।

সোনা খালাম্মার একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা ছিল আমার। ভিডিও ইন্টারভিউ। প্রত্যেকবার বাড়িতে গেলে নানা কারণে মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ায় আর সম্ভব হয়নি। সোনা খালাম্মার কত কথা থেকে গেলো না শোনা...!

দূরে থেকে খালাম্মার চলে যাওয়ার শোকবার্তা পেলাম। এ সভ্যতার দাস আমরা। চাইলেই আমরা প্রিয়জন হারালে আসতে পারি না, আমাদের বুকের ভেতরটি ছটফট করে। আমাদের প্রিয় মানুষেরা একে একে চলে যান, আমাদের এতিমের পর এতিম করে!

আল্লাহপাক, আমাদের সোনা খালাম্মাকে জান্নাতুল ফেরদৌসে স্থান দিন। আমিন।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments