প্রেমের নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সিনেমাবৃত্তিক প্রপাগাণ্ডা এটি। দেখার সময় সচেতন থেকে নিছক চলচ্চিত্র হিসেবে দেখবেন। এর সঙ্গে ইতিহাস ও ধর্মীয় মিশাল, কাস্মীর সংকটের মিশ্রণ দিয়ে যে রোমান্টিক গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে তা থেকে অনেক দর্শক বিভ্রান্ত হতেই পারেন। এ চলচ্চিত্র পদ্মাবতী, কাস্মির ফাইলস, আরআরআর ইত্যাদি প্রপাগাণ্ডা চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা। আমি এ জন্যই একটু সাবধানে এটি দেখার অনুরোধ করি।
ছবিটিতে ১৯৬৪ ও ১৯৮৪ সালের দুটি সময় হালকা নন-লিনিয়ার ধাঁচে এগিয়েছে কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। চলুন সংক্ষেপে আলোচনা করি।
১।
কাশ্মিরের মুক্তিকামী মানুষের স্বাধীনতার স্পৃহাকে সম্পূর্ণ ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা। বিশেষ করে কাস্মিরিদের সাপেক্ষে দখলদার ভারতীয় সেনাবাহিনীর চোখে কাহিনী এগিয়েছে। কাশ্মির যেন পাকিস্তানিদের কথায় ওঠে বসে, যেন সেখানে ভারতীয়রা ফেরেশতা। কোনো অত্যাচার তারা করে না, বরং পাকিস্তানের মদদে সেখানে পাকিস্তানীরা এসে অস্থিতিশীল করে! রাম নামের অনাথ লেফটেন্যান্টকে দিয়ে 'ওয়াহিদা' নামের শিশুকে উদ্ধার, যে আবার পরবর্তীকালে "আফরিন'' নামে বড় হয়ে ভারতবিদ্বেষী হয়।
২।
হায়দারাবাদের এক রাজকন্যা নূরজাহানকে অনাথ রামের প্রেমিকা হিসেবে দেখানো হয় (ঐতিহাসিকভাবে অসত্য)। এটি চরম ধৃষ্টতা এ কারণে যে, হায়দারাবাদ ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র।
হায়দারাবাদের শাসক নিজাম সে সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন। ইতিহাস ঘাঁটুন। দেখবেন, হায়দারাবাদের রাজকুমারের সঙ্গে ওসমানী সাম্রাজ্যের রাজকুমারীর বিয়ে হয়। হায়দারাবাদের লেভেল বুঝছেন?
এমন অভিজাত রাজপরিবারের রাজকুমারী একজন নাম পরিচয়হীন ভারতীয় লেফটেন্যান্ট এর সঙ্গে প্রেম, তাও পরিচয় গোপন করে 'সীতালক্ষ্মী' ছদ্মনাম ধারণ করে এ কেবল আরএসএস এর অখণ্ড ভারতীয় গাঁজাখুরি ভাবনায়ই আসতে পারে।
বাস্তবে আকাশ-কুসুম এ কল্পনা করে ঐ আরব বিশ্বে গিয়ে হাতজোড় করেই যেতে হবে, প্রকাশ্যে ফেস করার হিম্মত হবে না।
হায়দারাবাদ রাষ্ট্রটি ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান কোনো পক্ষেই যোগ দেয়নি। এ স্বাধীন রাষ্ট্রটি ভারত ১৯৪৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দখল করে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে গুম করে দেয়।
১৯৬৪ সালে কোথায় ছবির কাহিনী লেখক বা চিত্রনাট্যকর হায়দারাবাদের নিজামের কন্যাকে পায়?
আসলে, ইতিহাসের কোনো একটি কালেও মুসলমান অভিজাত, রূপসী ও গুণবতী রমনীকে না পাওয়ার যে অবদমিত খায়েশ রয়েছে হিন্দুত্ববাদের সেটিরই দুর্বল শৈল্পিক প্রকাশ 'সীতারাম'।
৩।
অপপ্রচার কাজ করে কীভাবে?
প্রথমে, এটির তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়। তারপর, গণ উৎপাদন, সর্বশেষ বিপণন বা প্রচার। হিন্দুত্ববাদীরাও তাদের এজেন্ডা সেট করে। তাদের সাংস্কৃতিক পাণ্ডারা বেশ সক্রিয় ও শক্তিশালী। আর মিডিয়ায় তো রিপাবলিক টিভির অর্ণব ঘৃণাজীবীরা আছেই।
ভারতবর্ষে বিজেপি ও শিবসেনার মত হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় আসার পর মুসলমান ও দলিতদের ব্যাপারে ঘৃণা উৎপাদন শুরু করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও চলচ্চিত্র এ ঘৃণা চাষাবাদে সহযোগিতা করে। মুসলমানরা 'বহিরাগত' এই মিথ্যাচার প্রচার করে।
এরই ধারাবাহিকতায় "লাভ জিহাদ" নামে অপপ্রচার শুরু করে। তারপর অযোধ্যার বাবরি মসজিদ দখল, দিল্লিতে গণহত্যা, এনআরসি, কাশ্নিরের স্পেশাল স্ট্যাটাস বাদ ও আরো কত কী! আপনারা সে ইতিহাস জানেন।
হিন্দুত্ববাদীরা দেখলো বেশ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী, কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ, মুসলিম অথবা দলিত শ্রেণির সঙ্গে সুখে সংসার করছে। বিপরীতক্রমে, মুসলমান ধর্মান্তরিত হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই বিরল। আর অচ্ছুৎ দলিতকে তো ধর্মান্তরিত হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নেবেনা। এ কারণে "লাভ জিহাদ" নাম দিয়ে মুসলমান ও দলিতদের নির্মম নির্যাতন করেছে, করছে।
তো এই যে মুসলমান বা দলিতের সঙ্গে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কন্যারা এটিকেই কাউন্টার দিতে মুসলিম নূরজাহানকে ঘর বাড়ি ছেড়ে এক হিন্দুর সঙ্গে সংসার করতে দেখানো হয়েছে। অথচ নূরজাহানের নামটি 'সীতা' করে দিয়ে। এমন কী রাজকুমারী নূরজাহানকে দিয়ে তার ভাইকে এই বলে অপদস্থ করা যে,' রামকে আমি চাই। তুমি নূরজাহানকে না মেনে নিলে, আমাকে সীতা হিসেবে দেখতে পারো।'
সিনেমায় আছে, নূর জাহানকে বিয়ে করতে চায় ওমানের রাজপুত্র (ঐতিহাসিক অসভ্য অসত্য, কাবুসের বাবা ভারতে কিছুদিন পড়েন বলেই হয়তো মাথায় এসেছে)। হায়দারাবাদ নাকি অর্থকষ্ট মেটাতে এ বিয়ে দিতে চায়৷
আরে মূর্খদা, সে সময়ের পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান হীরা দিয়ে হায়দারাবাদের নিজাম পেপার ওয়েট বানিয়েছিল। হায়দারাবাদের সেই সম্পদ কোথায় সে প্রশ্ন কেউ যেন না তোলে সে জন্যই এই বয়ান?
যাহোক, মুসলিম রাজকুমারী ওমানের রাজপুত্রকে ফিরিয়ে দেয় কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামীদের দমন করতে থাকা এক ভারতীয় আর্মি সামান্য অনাথ লেফটেন্যান্ট এর জন্য! কত বড় ধান্ধাবাজির অপপ্রচার বোঝেন!
সিনেমাটি নিছক বিনোদন এ কারণে আর থাকেনি। রাম আর সীতাকে উদ্ধার করতে 'দুর্জয়'রূপী হনুমান আসে। অপ্রাসঙ্গিকভাবে উচ্চারিত হয় 'কুরুক্ষেত্র'। কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী ইতিহাস মুছে দেওয়ার চেষ্টা আছে। অধুনালুপ্ত স্বাধীন হায়দারাবাদকে আরো একবার বিক্ষত করা হয়।
এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান নারীকে বিয়ে ছাড়াই ব্যভিচার করানো হলো আনন্দচিত্তে! নিটোল প্রেমের দোহাইয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এক মুসলিম নারী চরিত্রকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে গর্হিত অপরাধে লিপ্ত করা হলো। এ কারণে সিনেমাটি আর সরল বয়ান নিয়ে প্রেম শেখাতে আসে নি। এর মধ্যে জটিলতা আছে। এর মধ্যে ঘৃণার বীজ আছে!
এক ছটাক প্রেম, এক ছটাক অখণ্ড ভারত, এক ছটাক হিন্দুত্ববাদ মিলেই 'সীতারাম'। দেখলে নিজ দায়িত্বে রাজনৈতিক ঘটনার ধারাবাহিকতা মাথায় রেখে দেইখেন...।
এর মধ্যে ধুরন্ধর রাজনৈতিক বয়ান সেলাই করে দিয়েছে দাদা বাবুরা। মাত্র ৩০ কোটি খরচ করে দেশব্যাপী ফ্রি প্রচারণা পেয়ে ১০০ কোটি অকারণে আয় হয়নি। আপনার চোখ খোলা রেখে মেঘনাদ বা মালিকের চোখে এই ছবি দেখতে হবে। 'বিভীষণ' হলে ঠকবেন ভীষণ...!?!
0 Comments