শিয়াদের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি ফতোয়া জারি করে সালমান রুশদিকে হত্যার নির্দেশ দেন। এখন আরব মিডিয়াও এ নিয়ে আয়াতুল্লার নাম লিখছে। অথচ এই উগ্র ওহাবি-সৌদিরাই কিন্তু শিয়ারা ‘আয়েশা (রা)’কে গালি দেয় এই মিথ্যাচার করে! এখানেই ভূরাজনৈতিক মারপ্যাঁচ।
১৯৮৮ সালের ঘটনা। সে সময় আরবদেশসহ ইউরোপ আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ইরাকের যুদ্ধে আগ্রাসনকারী সাদ্দাম হোসেনের পক্ষ নেয়। এর মধ্যেেই সালমান রুশদির ‘দ্যা স্যাটেনিক ভার্সেস’ প্রকাশ পায়। এতে ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি নামেও চরিত্র ছিল। পাশাপাশি রুশদি চরম ইসলামবিদ্বেষী ইউরোপীয়দের থেকে ধার করে আনা নানা রেটরিক দিয়ে ধর্মীয় অনেক বিষয়ে বিতর্কিত লেখা লেখেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটেনসহ ইউরোপে তার বিশাল জনপ্রিয়তা আসে।
সেই প্রেক্ষাপটে মারগারেট থ্যাচারসহ ইউরোপীয়দের আরবমিত্রদের পরাজিত করতেই আয়াতুল্লাহ রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়ার সম্ভাবনা অধিক।
এতো বছর পরে ২৪ বছরের এক যুবকের রুশদির ওপর হামলা করা তাই আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। দেখেন প্রত্যেকটি সংবাদে আয়াতুল্লাহ আর ইসলামী বিপ্লবী গার্ড এর কথা বলছে অথচ সে সময় সব মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ,এমন কি ওআইসি এই ফতোয়াকে এন্ডোর্স করে। আমার মনে হয়, এখানে পর্দার আড়ালে কোন পরিকল্পনা আছে যা আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। ইরানের অভ্যন্তরে গিয়ে তাদের হত্যা করে নিরাপদে চলে আসে মোসাদ। রুশদির হামলাকারীর ব্যাপারে অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।
২। সুরা আন নজমের যে আয়াতগুলোর ব্যাপার রুশদি বেছে নেয় তার কল্পিত ঘৃণার বীজ বপণ করতে তার ঐতিহাসিক সত্যতা একেবারেই নেই। রাসুলুল্লাহ (স) সুরা আন নজম তেলাওয়াত করলে তাতে মুগ্ধ হয় মুশরিকরা। রাসূল (স) সিজদা দিলে তারাও দেয়। এতে ইসলামবিদ্বেষী পৌত্তলিকরা তাদের অনুসারীদের তীব্র নিন্দার ভয়ে প্রোপাগান্ডা চালায় ‘মুহাম্মদ আমাদের দেবী লাত-উজ্জা-মানাত’ এর নামও বলেছে আমরা এমনটিই শুনেছি। অথচ সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মুসলমানই আন নজমই শুনেছে। রুশদি পশ্চিমের বাহবা পেতে মিথ্যাচারকে ভিত্তি করে লেখেন। যারা স্যাটেনিক ভার্সেস পড়েনি, তাদের সঙ্গে আলাপে না যাই। না পড়ে যারা ভক্ত বা অভক্ত উভয়শ্রেণি বিপজ্জনক।
৩। সে সময় খ্যাতি ও পশ্চিমে আশ্রয় পাওয়ার জন্য ইসলামবিদ্বেষ সহজপন্থা ছিল। এখনো আছে। বাংলাদেশের তসলিমার মত কম বুদ্ধির লেখকও এই পদ্ধতিতেই খ্যাতি পেয়েছে। পশ্চিমের ইসলাম ও প্রাচ্যবিদ্বেষী চেরাগিপনা অনুবাদ করে ফেরি করে হুমায়ূন আজাদ বিশাল জনপ্রিয়। রুশদিও সেই পথেই এগিয়ে ছিলেন। তার উপন্যাসের চরিত্র যদিও প্রাচ্যকে অপছন্দ করে সেখানে গিয়ে আশ্রয় খুঁজে ফের দেশে আসে, রুশদি ইউরোপের আরামকেদারার লোভ সামলাতে পারেননি। এমন কী বিয়ে কম করে তিন চারখান করে ফেলেছেন!
৪। রুশদি ঘৃণাচাষী। এ বই বের হওয়ার পর প্রায় অর্ধশত মানুষ এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে। তারপরও আমি মনে করি, লেখার জবাব লেখা দিয়ে দেওয়া উচিত। ইসলামের চেয়ে যুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত দর্শন কোথাও নেই। মুহাম্মদ (স) বিতর্ক বা বাহাস করেছেন, মান্তেক বা যুক্তি দিয়ে জয়ী হয়েছেন। কথার জবাব তিনি কখনো অস্ত্র দিয়ে দেননি। বয়ানের জবাব বয়ানে। এমনকি আগে আক্রান্ত না হলে ইসলাম কোনো যুদ্ধে আক্রমণ করেনি। ভয়াবহ অত্যাচার করা মক্কাবাসীদের মাফ করে দিয়েছেন। এমন কী মুশরিক সর্দার আবু সুফিয়ান ও ইসলামের নবী (স) এর ব্যাপারে ঘৃণা ছড়ানো হিন্দা পর্যন্ত ক্ষমা পায়। ইসলাম এভাবেই শান্তিকে, মধ্যস্থতাকে গুরুত্ব দেয়। ইসলামকে ব্যবহার করে জমিনে ফ্যাসাদ-ফিৎনা তৈরি করার কোনে উপায় নাই।
৫। মহান আল্লাহর চেয়ে বড় তো কেউ নাই, না? এমন কী মুহাম্মদ (স) আল্লাহর সৃষ্টি। সেই আল্লাহ বলেছেন পবিত্র কোরানের সুরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে,‘ অবিশ্বাসীরা যাদের উপাসনা করে তাদের গালি দিওনা, কারণ অজ্ঞতাবশত তারাও আল্লাহকে গালি দেবে।’ এ আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার করেছেন আমাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে। আল্লাহ বলেননি, আমাকে গালি দিলে জবাব দাও কল্লা কেটে! তাইলে আল্লাহর রাসূলও নিশ্চয়ই এমন নির্দেশ দেননি।
ইসলাম সরল-সোজা ধর্ম। এটা এসেছে শান্তি আনয়ন করতে। একে ব্যবহার করে কোন ধরনের অশান্তি তৈরি করলে সেটি এই ধর্মের ওপর জুলুম করা হয়। এক সময় মহানবী (স)কে প্রচণ্ড অপমান করা মুয়াবিয়ার মা হিন্দা নবীর চাচা হামজার (রা) কলিজা চিবিয়েছিল। তবু নবী হিন্দার মুসলমান হতে চাওয়াকে না করেননি। শুধু বলতেন, হিন্দা যেন আমার সামনে বেশিক্ষণ না থাকে, আমার কষ্ট হয় চাচার কথা মনে হলে।
এমন শান্তিপূর্ণ ধর্মটির প্রতি ইসলামবিদ্বেষীদের মিথ্যাচার তো আছেই। আর ইসলামের ভেতর থেকে এ ধর্মের ওপর কট্টরপন্থী একটি অংশ প্রতিনিয়ত জুলুম করছে। ভারতে দর্জি হত্যাকারী আর রুশদির ওপর আক্রমণকারী সেই জালিমদের একাংশ। এর আগে ইরাকে সিরিয়ায় উদ্ভব হওয়া আইএস সন্ত্রাসীরাও ইসলামের সাপেক্ষে জালিম। তাকফির করে মানুষ হত্যাকে যারাই জায়েজ করবে মনে রাখবেন এরা শান্তির ধর্মের শত্রু।
ইসলামে ‘চিন্তা’ অপরাধ নয়, সে চিন্তা ভুল হলেও তার সাজা ইসলামে দেয়নি। চিন্তাকে কার্যকর করলে তখনই সেটি কিরামান কাতিবিন লেখে। সেটিই মিজানে মাপা হবে। আল্লাহর সঙ্গে শিরক ছাড়া সব গুনাহ আল্লাহ মাফ করেন। ইসলামে এক্সিকিউশনের রায় কেবল দিতে পারেন খলিফা। খলিফা নেই । এরা কার কথায় এভাবে ধর্মকে কাটছাট করে সম্মানহানি ও ক্ষতি করছে?
আল্লাহ আমাদের হেদায়েত দিক।
0 Comments