প্রথম আলো বাংলাদেশের জন্য কতটুকু ভালো?
—®—
প্রথম আলো নিয়ে নানা আলাপ-বিবাদ চলছে। আমি সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ছাত্র হিসেবে এবং প্রথম আলোর একজন প্রথম সারির ক্রিটিক হিসেবে এই গণমাধ্যমের বদলে যাওয়া চরিত্রকে দেখেছি। ২০১৩-১৪ এর পর থেকে আসলেই প্রথম আলো 'বদলে যায়' এবং তার পাঠকদের 'বদলে দেয়'ও। আপনাদের মনে আছে কী না—২০১৪ এর নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়নি তা প্রথম আলো সামনের পাতায় এনেছিল এবং আপসহীন বেগম জিয়া লক্ষ মানুষের সামনে সেই পত্রিকাকে উঁচু করে রেফারেন্স দিয়েছিলেন।
তাই আমি প্রথম আলোকে বন্ধ করা বা এর ওপর হামলা করার পৈচাশিক স ন্ত্রা সবাদী চিন্তার সাথে একমত নই। আইনী কাঠামোর বাইরে কোনো ধরনের বখাটেগিরির সাথে আমরা নাই। গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে চাওয়া ফ্যাসিবাদী খাসলতকে পাত্তা দেওয়া যাবেনা। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ মানে সরাসরি ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িতরা ছাড়া বাকিদের এখানে নির্বিচারে অপরাধী বানিয়ে 'মব ক্রাইম' করা বা 'কালেক্টিভ পানিশমেন্ট' দেওয়ার ভুল চিন্তা করা যাবেনা৷ যারা করে তাদেরও উৎসাহ দেওয়া যাবেনা।
২।
এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে বাংলাদেশে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' এর অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থক ছিলো প্রথম আলো। এ তালিকায় একাত্তর, সময়, ডিবিসি, এটিএন নিউজ, জনকণ্ঠ, ভোরের কাগজ, কালেরকণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, নিউজ২৪সহ প্রায় সব মিডিয়া নাম লিখিয়েছিল। তবে এরা অনেকেই জানতোনা আমি নিশ্চিত যে—War on Terror নামে—দুনিয়ায় কীভাবে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছিল। তাই এরও আগে বা পরে 'শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মারা'কেও খুবই রসালো উপস্থাপন প্রথম আলোসহ এই নিউজমিডিয়াগুলো করেছে।
এমনকি 'জ/ঙ্গী সাংবাদিকতা' করে প্রথম আলো সরকার ও বিশেষত ভারতের বয়ানের পুনরুৎপাদন করেতে নেতৃত্ব দেয়।
কিন্তু এসবের পরেও এটাও সত্য যে, বাংলাদেশে ইসলামের দুশমন উগ্র খারেজিদের উত্থান ঘটেছিল। সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা, জে/এমবি, হোলি আর্টিজানের আই/এস এসব নির্মম বাস্তবতা। প্রথম আলো যদি এর বাইরে কিছু করে তবে তার জন্য দেশে আইন আছে, আদালত আছে। আপনি মবের মুল্লুকের মত প্রথম আলোতে আগুন দিতে চাইলে তা ভয়ঙ্কর মানসিকতার প্রমাণ। আপনি তাইলে আগুন দিয়ে চেয়ে 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চলমান অনন্ত যুদ্ধ'কে বাংলাদেশে আহবান করার ওকালতি করছেন।
সরকারি বা ভারতীয় বয়ান অনুযায়ী খবর প্রচার করে প্রথম আলো অপরাধ করলে সেই অপরাধে প্রথম আলো তুলনামূলক কম অপরাধী বাংলাদেশের অন্যান্য মিডিয়ার চেয়ে।কারণ, প্রথম আলো অন্তত নিজের কণ্ঠস্বর সরকারের কাছে বিক্রি করে দেয়নি৷ বাকি মিডিয়া তাদের মালিক ও সাংবাদিকসহ নিজেদের মেরুদণ্ডগুলো খুলে গণভবনের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস টিম, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি বা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিয়ে এসেছিল।
৩।
আর বিক্রি করেনি বলেই প্রথম আলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সবচেয়ে দুর্দান্ত কাভারেজ দিয়েছে আন্দোলনের। আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম প্রথম আলোর সত্য প্রকাশের হিম্মত দেখে। আমার তখন মনে হছিল যে, প্রথম আলো ভারতের স্বার্থের বাইরে যাওয়া খবর খুব কমই জোর দিয়ে প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে কাছের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ভারতের হাইকমিশনার রীভা গাঙুলী কয়দিন আগে পরিদর্শনে যাওয়া প্রথম আলো এইভাবে জনতার পাশে কেন দাঁড়াচ্ছে?
সত্যি বলতে এর উত্তর আমি পুরোপুরি জানিনা। কারণ, ২০১৩ তে এই প্রথম আলোই 'শাহবাগের প্রেমে' মশগুল ছিল। ট্রাইব্যুনালে মিথ্যাচার করার খবর এ পত্রিকায় আসতোনা। আজ হঠাৎ করে কেন এই বদল?
বিগত ১৫ বছর বিজ্ঞাপন না পাওয়া, বা মতিউর রহমানকে আদালতে নেওয়া কি কারণ হতে পারে? তাতে ভারতের প্রতি এতোটা প্রেম থাকা প্রথম আলো বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্য 'শেখ হাসিনার পতন ভারত হজম করতে পারেনি' লিড করবে? তবে কি প্রথম আলো ভারতবান্ধব নীতি থেকে সরে যেতে চেষ্টা করছে? আমি জানিনা। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে পুরোপুরি ঘটনা বোঝার জন্য৷ কিন্তু যদি প্রথম আলো তার ভারততোষণ নীতি থেকে সরে আসে তবে অবশ্যই একে ইতিবাচকভাবে নিতে হবে। প্রথম আলোর নিজেকে পরিপূর্ণ বাংলাদেশপন্থী করার এই অভিযাত্রায় স্বাগত জানাতে হবে।
৪।
গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে "ফ্যাসিবাদের বয়ান বনাম গণমানুষের গণমাধ্যম" শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আমার পছন্দের নন্দিত শিক্ষক Khorshed Alam স্যার। আমাদের গুরুভাই খ আলম। দুঃসময়ে 'আস্কারা আসে কোত্থেকে' লিখে যিনি সাবেক একটি একাডেমিয়াকেন্দ্রীক গ্যাংকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তো, সে সেমিনারে ডেইলিস্টার বাংলার সম্পাদক গোলাম মর্তুজা ও প্রথম আলো ইংরেজির প্রধান আয়েশা কবিরকে আমি সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম, এ দুটি পত্রিকা ভারতপন্থী কী না?
ধূর্ত গোলাম সাব পুরোপুরি তা অস্বীকার করেন। আর আয়েশা কবির এ নিয়ে উত্তর দেননি৷ প্রথম আলোর সাবেক উপসম্পাদক Faruk Wasif ভাই আমাকে পালটা প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি তো শিক্ষক ছিলেন সাংবাদিকতার, আপনিই বলুন আপনার কী মনে হয়?
আমি তখন বিএসএফ এর হাতে বাংলাদেশের মানুষের হ ত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথম আলোর মৃদু শব্দ ব্যবহার করার কথা বলি। তবে আমার আরো প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নটি করার সুযোগ নেওয়া উচিত ছিল।
আমি যখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়তাম তখন প্রথম আলো সংশ্লিষ্ট অনেকেই আসতেন বিভাগে৷ এদের অধিকাংশকে আমি দেখতাম তীব্র ভারতপন্থী এবং ইসলাম ও মুসলমান প্রশ্নে ভ্রুঁ কুঁচকে যাওয়া অবয়বে।
তবে প্রথম আলোর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা Samsuzzaman Shams ভাইকে মনে হতো সত্য, সাহস ও বিনয়ের একটি সমষ্টি। শামস ভাই দীর্ঘ ১৫ বছরের চেতনা বাণিজ্যকে ভেঙে দিয়েছিলেন স্মৃতিসৌধের সেই দরিদ্র বাচ্চার খবর দিয়ে।
একই কথা ফারুক ওয়াসিফ ভাইয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে থেকে ফারুক ভাই দীর্ঘদিন কীভাবে কাজ করতে পেরেছেন তা নিয়ে চিন্তা করলেও সন্ত্রস্ত লাগে। উনার লেখা একদিকে আর বাকি প্রথিম আলোর বুদ্ধিজীবীদের লেখার ধাঁচ আরেকদিকে।
আমাদের এখনকার প্রথম আলো জাবি প্রতিনিধি Md Abdullah Al Mamun জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে পুলিশের বর্বর আক্রমণের শিকার হয়। সেই খবর প্রথম আলো আরো গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। এতে জনরোষ আরো ক্ষমতার বিপরীতে চলে যায়। আবার ভিন্নভিন্ন জায়গায় থেকে বিভিন্ন জনে প্রথম আলোতে খবর দিয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়। তীব্র বাংলাদেশের প্রতি অনুরাগী এমন আরো অনেক লোক আছে যারা প্রথম আলোতে কাজ করে, পড়ে এবং প্রথম আলোর খবর ও তথ্য অপরের সাথে ভাগ করে নেয়।
৫।
প্রথম আলোর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অম্ল-মধুর। 'অম্ল', তারপর মধুর। আমি এ পত্রিকায় যেমন লিখেছি আবার এ পত্রিকা ভারতের ক্রিটিক থাকায় আমার লেখা প্রকাশের কথা থাকলেও প্রকাশ করেনি। আমি দায়িত্বশীল সেই লোকের নাম বলছিনা কিন্তু 'পিপ্পা' সিনেমার রিভিউ পাঠালে সেখানে আমি মেজর জলিলের লেখা 'অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা' বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের বাংলাদেশ থেকে লুটের কথা লিখি। এ ছাড়া ঐ সিনেমায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের অপপ্রচারকে চ্যালেঞ্জ করে আমি কিছু কথা লিখি। এ কারণে, প্রথম আলো জানায় আমার লেখা প্রকাশ করবেনা। এটা যে প্রথম আলো একা করেছে তা নয়, দেশের একাধিক মিডিয়া 'পিপ্পা' এর রিভিউ প্রকাশ করতে চায়নি! এই হলো প্রথম আলো অথবা আমাদের বাংলাদেশের মিডিয়ার ভারতবান্ধব মুখোশ!
আরেকটা ইন্টারেস্টিং এবং লজ্জাজনক অভিজ্ঞতা প্রথম আলোর সঙ্গে আমার। প্রথম আলোর ফেসবুক পেজ থেকে আমাকে ব্লক করা হয়েছে। কেন জানিনা। হতে পারে, ওদের যৌক্তিক সমালোচনা করি বলে। কিন্তু এত বড় একটা পত্রিকা কিন্তু তাদের কর্মীদের ছোটলোকী ও কুনীতি কোন পর্যায়ে নেমে গেলে একজন ক্ষুদ্র মঈনুল রাকীব কে আলাদা করে বাছাই করে পেজে ব্লক করা যায়? হাসতে হাসতে বিরক্তও লাগবে পরমতসহিষ্ণুতার এই 'কুমতিদশা' দেখে।
৬।
এ সত্ত্বেও আমি প্রথম আলো পত্রিকাকে বাংলাদেশের মধ্যে এখনো গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমি নিজে এক সময় একে 'কাউন্টার পাঞ্চ' করতে মিডিয়া করার কথা ভেবেছিলাম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জালেম শিক্ষকদের দুর্নীতির শিকার হয়ে অন্য চাকরজীবনে প্রবেশের কারণে তা আর হলো কই? আশা কি বেঁচে আছে? ইন শা আল্লাহ।
তো, মিডিয়া তত্ত্ব নিয়ে যারা পড়ছেন তারা জানেন কানাডিয়ান তাত্ত্বিক মার্শাল ম্যাকলুহান 'Medium is the Message' নামে একটি প্রবচনের প্রবক্তা। এর নানা অর্থের একটি হচ্ছে, মানুষ বার্তার চেয়ে মাধ্যমকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারে। প্রথম আলো হচ্ছে 'মাধ্যমই বার্তা' এর টেক্সটবুক এক্সাম্পল।
সমাজে প্রথম আলো এমন একটি অবস্থা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে যেখানে প্রথম আলোতে তথ্য না এলে পরিপূর্ণ বিশ্বাস করেনা অনেকে। আবার প্রথম আলোতে কিছু না এলে তা হারিয়ে যায় মগজ থেকে। প্রথম আলো যা প্রকাশ করে সমাজে তা নিয়ে আলাপ হয়। প্রথম আলো বয়ান তৈরি করতে পারে। আমি হাজারো লোককে দেখেছি, তথ্য জানতে প্রথম আলোতে যায়৷ এই গুজবের গজবের সময় এমন একটি তথ্যের মাপকাঠি থাকা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ইতিবাচক ঘটনা—অস্বীকার করলে অন্যায় হবে। আবার, প্রথম আলোর চিন্তা জটিল হলে মন দখলের লড়াইয়ে আমরা হেরে গিয়ে অন্য কারো দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে যেতে পারি।
প্রথম আলোর সমস্যা এটি পশ্চিমা লিবারেলিজমপন্থী ( সলিমুল্লাহ খান - Salimullah Khan এর পরিভাষায় স্বাধীনতা ব্যবসায়ী)পুঁজিবাদী, ভোগবাদী এবং অতিমাত্রায় ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের উকিল।
এ ছাড়া ক্ষমতাকাঠামোর সাথে প্রথম আলোর যে সম্পর্ক তা অন্ততপক্ষে বাহ্যিক দৃষ্টিতে আদর্শ গণমাধ্যমের বৈশিষ্ট্য। কখনো চমস্কি ও হারম্যানের 'অপপ্রচার মডেল' (Propaganda Model) মেনে চললেও প্রথম আলো বিগত ১৫ বছর সরকারের কোনো বিজ্ঞাপন-পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই লাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়েছে। সেরা করদাতাদের মধ্যে এর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান থেকেছেন।
ক্ষমতা ও আধিপত্যের সাথে গণবান্ধব গণমাধ্যমের পিরিতের সম্পর্ক হতে পারেনা। এই তত্ত্বে অবশ্য বাংলাদেশের সাপেক্ষে জালেম ভারতের সাথে প্রথম আলোর প্রেমের নেপথ্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু যদি ধরা হয় ইলিয়াস ও তার কমরেডরা এখন ক্ষমতাবান তবে প্রথম আলো কিন্তু এখনো ক্ষমতার বিপরীতেই লড়াই করছে।
৭।
'ভোরের কাগজ' ভেঙে বা ছেড়ে তৈরি হওয়া প্রথম আলো ২৬ বছরে পা দিল। এ উপলক্ষ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে অসাধারণ ক্রোড়পত্র করেছে তারা। আজকে ৪ নভেম্বর ২০২৪ ঈশায়ী সালে 'আন্দোলনের মুখ' নামে এটি পেলাম। অনেকেই আছে। দুর্দান্ত হয়েছে, তবে পূর্ণাঙ্গ হতো মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্র, ইশকুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অবদানের স্বীকৃতি এলে। ঢাকা কলেজসহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় এবং সব শ্রেণির ছাত্র-জনতার প্রতিনিধিত্ব পাইনি।
তবে বিজ্ঞাপন প্রচুর পেয়েছি! নারী কীসে আটকায় এ প্রশ্ন আমরা না জানলেও বিজ্ঞাপনের কাছেই মনে হয় কেবল প্রথম আলো আটকায়—বিজ্ঞাপনের মলাট তাদেরই উদ্ভাবন! Fahmidul Haq স্যার একে নাম দিয়েছিলেন 'বাজারমুখী সাংবাদিকতা', তবে আমার মতে এই নামে তীব্রতা কম আসে। এর নাম হওয়া উচিত 'মুনাফাখোরী সাংবাদিকতা'। যদিও 'মুনাফা' এর আক্ষরিক অর্থ বুঝাইনি।
আজকের ক্রোড়পত্রে নাহিদ, আরিফ, উমামা, র্যাপারের বক্তব্য আনছে প্রথম আলো। সামনে আরো ভালো কিছু আসছে। আমার মত গবেষকদের জন্য চমৎকার এই ক্রোড়পত্র। বিশেষ করে নাহিদের লেখাটি অসাধারণ চমকপ্রদ। আমার ভীষণ ভালো লাগছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল ভাই সত্যই বলেছেন যে, প্রথম আলো আমাদের কাছে রেকর্ড। আমি মনে করি, প্রথম আলো তার সীমাবদ্ধতা বা সংকীর্ণতার পরেও ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে স্বীকৃতি পাবে। এটি আমাদের আর্কাইভ। অন্য কোনো পত্রিকায় আপনি দুয়েক বছর আগের খবরও পাবেন না। কিন্তু প্রথম আলোতে আপনি ২৬ বছর আগের খবরও পেয়ে যেতে পারেন। এই অনন্য ইতিহাস সংরক্ষাণাগার হিসেবে প্রথম আলোকে ভালো না বলে উপায় আছে? প্রথম আলো আমাদের ইতিহাস কারখানা, কারণ—Journalism is the first rough draft of history। শুধু ইতিহাস একচোখা হওয়া যাবেনা। কাউকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে ইসলাম ও মুসলমানদের বাদ দিয়ে দেওয়ার চিন্তা বাদ দিতে হবে।
Zia Hassan ভাই তার সাম্প্রতিক স্ট্যাটাসে যা বলেছেন তার অর্থ এমন যে , অতীতে কম-বেশি সবারই ভুল আছে। অর্থাৎ প্রথম আলোও নিশ্চয়ই ভুল করেছে। সেই ভুল নিয়ে পড়ে না থেকে সে কতটা Truth and Reconciliation প্রক্রিয়ায় নিজেকে শুধরে নিয়েছে আমাদের সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। এতে করে গণ-অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর সাথে ঐক্য থাকবে। এই ঐক্যই এখন সবচেয়ে জরুরি।
'বিপ্লব ও সংহতি' শব্দযুগল আমরা শুনেছি। বিপ্লবকে সফল করতে হলে সংহতি জরুরি। সংহতি সরাসরি ঐক্যের সাথে জড়িত। Rakhal Raha বলেছেন, আপনার রাজপথের সংগ্রামী বন্ধুর সাথে বিচ্ছেদ ঘটায় যে কর্ম তা বিপ্লবের জন্য ইতিবাচক নয়। অর্থাৎ প্রথম আলো আপনার বিপ্লবের সঙ্গী, তাকে এই মুহূর্তে পর বানিয়ে দেওয়া মানে আপনি বিপ্লবকে সংহত করতে চাচ্ছেননা।
সচরাচর না দেখলেও গবেষণার স্বার্থে আমি জনাব ইলিয়াস হোসেনের ভিডিও দেখেছি৷ সাংবাদিকতার শিক্ষক ও ছাত্র হিসেবে মোটেই এর ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়না বলেই আমার অভিমত। অধ্যাপক ফাহমিদুল হক্বও দেখলাম লিখছেন এটি নিয়ে। আমি অকপটে স্বীকার করি, জুলকারনাইন সায়ের সামি ও তাসনিম খলিলের সাংবাদিকতার মান আমাদের দেশের অনেকের চেয়ে বহুগুণে উত্তম এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও প্রশংসনীয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে এ পর্যন্ত আনতে অনেকেই ভূমিকা রেখেছেন। এই কারণে, কাউকে একক কৃতিত্ব দেওয়া ঠিক হবেনা। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যম যেভাবে গণবিরোধী হয়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে প্রথম আলো যে লড়াই চালিয়েছে তাতে যদি তার ভুল থেকেও থাকে তবুও সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে নতুন করেশুরু করার অনুপ্রেরণা পেতেই পারে। আজকে মতিউর রহমানও দেখলাম সম্পাদকের বাণীতে 'দলনিরপেক্ষ' সাংবাদিকতা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন। সঙ্গে আমি অনুরোধ করবো— দলের পাশাপাশি দেশ, মত, ধর্ম, বর্ণ নিরপেক্ষ হয়ে সাংবাদিকতা করুন।
বাংলাদেশে তো এই সাংবাদিকতাই অত্যাবশ্যক। নর্থক্লিফ দারুণ একটি কথা বলেছিলেন—News is what somebody somewhere wants to suppress, all the rest is advertising।
বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ফাকেঁ ফাঁকে সংবাদবিজ্ঞপ্তি দেখতে দেখতে যখন আমরা ক্লান্ত বা বিরক্ত সেই মুহূর্তে প্রথম আলো চিন্তার, বিবাদের, প্রতিবয়ানের আলাপ ছুঁড়ে দেয়—'চাপা দেওয়া বা গুম করা তথ্যকে সামনে আনে'! এ প্রক্রিয়ায় প্রথম আলো হয়তো কখনো ভুল করে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কিন্তু বাকিরা তো এই ভুলটুকুও করেনা। তারা ক্ষমতা ও অর্থের কাছে মেরুদণ্ড বন্ধক দিয়ে 'তোতাপাখিনিউজ' প্রচার করে।
প্রথম আলো কেবল একটি পত্রিকা নয়। এটি একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধীদলের মত শক্তিধর বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্ব (Intellectual Entity)। এর পত্রিকা আছে, গবেষণা দল আছে, পালিত বুদ্ধিজীবী আছে, প্রকাশনা সংস্থা আছে, আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা আছে, ভারত বা মার্কিন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের সমর্থন আছে এবং সর্বোপরি এর বিপুল পরিমাণ পাঠক-দর্শক আছে। মেধাবী কিশোরদের নিয়ে আলাদা চিন্তা তাদের৷ অর্থাৎ এর শিকড় গভীরে। একে আপনি চাইলেই গুম করে দিতে পারবেন না। প্রথম আলো গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণপাড়ার নিউইয়র্ক টাইমস।
বাংলাদেশের মানুষের মন দখলের জন্য প্রথম আলোর নানা ধরনের এজেন্ডা থাকতে পারে। একে হুমকি দিয়ে না থামিয়ে বরং বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। যেমন, ২০১৩ সালে কিছু সময়ের জন্য প্রথম আলোকে হারিয়ে দিয়েছিল মাহমুদুর রহমানের 'আমার দেশ'। কোনো কোনো দিন ১০ টাকার 'আমার দেশ' পত্রিকা ৫০-১০০ টাকা দিয়েও মানুষ কিনেছে পড়ার জন্য। 'পেট্রোল বোমাবাহিনী' বুদ্ধিবৃত্তিক সেই দিকে নজর দিলে আমাদের জাতির উন্নয়ন হবে। বিশ্বের ১ নম্বর পত্রিকা বন্ধে তৎপর হলে বৈশ্বিক রাজনীতি বা নানা গঠনমূলক সূচকে বাংলাদেশ তলানীতে জায়গা পাবে। সেটি ৩৬ জুলাই বা ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটের বিরোধী অবস্থান। একটি দেশ কতটা স্বাধীন আর কতটা সে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা বিদ্যমান তা বোঝার জন্য সেই দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন সেটি দেখলেই হবে। বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশ ভৌত নানা উন্নয়ন করেছে, কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে একেবারে গো হারা হেরেছে। তাই গণতান্ত্রিক দেশের মর্যাদা পায়নি, হয়েছে অদ্ভুত স্বৈরতান্ত্রিক দেশ—আমার ডিসিপ্লিনের প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক Ali Riaz যার নাম দিয়েছিলেন Hybrid Regime।
মিশেল ফুকোর একটি আর্টিকেল পড়েছিলাম সেখানে তিনি, প্রচলিত মেথড দিয়ে 'মানুষকে সুস্থ করার পদ্ধতি জানে বলে ডাক্তাররা নিজেদের ঈশ্বরপ্রজাতী ভাবে... ' এইটা প্রমাণ না করতে পারলেও তার আর্গুমেন্ট হাজির করেছিলেন। আমারো মনে হয়, প্রথম আলো অস্বীকার করলেও তার দিল্লি বা কলকাতার প্রতি অনুরাগ ছিল (এখন কমেছে নিশ্চয়ই)— এটা অসত্য হয়ে যাবেনা। একইসাথে বাংলাদেশের আর সকল গণমাধ্যমের চেয়ে প্রথম আলো নানা দিক থেকে এগিয়ে এটিও অস্বীকার করা যাবেনা।
প্রথম আলো ও মতিউর রহমানদের প্রতি অনুরোধ, তাদের প্রতি যেই সব কারণে মানুষ বিক্ষুব্ধ সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা। সেগুলো বিষয়ে 'ফ্যাক্টচেকের আদলে' জবাব দেওয়া। ভুলগুলো শুধরে নিয়ে ১০০% বাংলাদেশমুখী হওয়া। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক যে অভিযোগ তার ঊর্ধ্বে উঠে গণবান্ধব জনকল্যাণমুখী সংবাদ বাণিজ্যে যুক্ত হওয়া। জাতি গঠনে আরো সক্রিয় হতে নিজের সীমাবদ্ধতার ক্রিটিক করা জরুরি।
আর এ কারণেই প্রথম আলোর টিকে থাকাও অতি জরুরি। প্রথম আলো পেশাদারী হয়ে ঠিকঠাক বেতন-ভাতা দেয়৷ প্রথম আলো সাংবাদিকতার ধ্রুপদী কাঠামোকে এখনো চর্চা করে। প্রথম আলো সমাজের পুঁজি ও ক্ষমতাকে তথ্য-জ্ঞান দিয়ে প্রশ্ন করে। আমাদের কারো কারো সামনে প্রথম আলো থাকে বলে একে ছাড়িয়ে যাওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক তাড়না অনুভব হয়। এই তাড়নার বিস্তৃতি হওয়া অত্যাবশ্যক।
একটি জিনিস মনে রাখবেন, জ্ঞানের শক্তিতে যে ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করে তার নিয়ত ঠিকঠাক থাকলে সেই সর্বহারা জনগণের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু। প্রশ্ন করে ও প্রশ্ন তুলে প্রথম আলো সর্বহারা জনতার অধিকারের অনন্য পাহারাদার হয়ে উঠবে—২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই আমার অনিঃশেষ প্রত্যাশা।
'সত্যে তথ্যে প্রথম আলো' ২৬ বছরে এটাই তাদের প্রতিপাদ্য। 'সত্য' ও 'তথ্য' খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুটি শব্দ। মানুষ যদি নির্মোহ থেকে এ দুয়ের প্রতি দায়বদ্ধ হয় তবে সে অদ্বিতীয় হয়ে ওঠে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে হওয়া গণ-অভ্যুত্থানের পর যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রক্রিয়া চলবে সেখানে সত্য ও তথ্যের সম্মিলনে গঠিত 'সত্যতথ্য' সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ এর মত 'সত্য বানানোর কারখানা' তথা 'মিথ্যার কারখানা' যেন সত্য নামে না আসে। একইভাবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য যেন আসে, আধা/অসত্য/আধাসত্য/জাল তথ্য যেন প্রচারিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মানুষ নিজের অনিচ্ছায় যে সত্যের অধীন হয়—লাকাঁর বরাতে উস্তাদ সলিমুল্লাহ খান বলেন—সেটিই ইতিহাস। সত্য ও তথ্যের গণবান্ধব মিশ্রণের মাধ্যমে প্রথম আলো চলমান ইতিহাসের প্রামাণ্য হবে এটিই আমার কাছের ও দূরের আশা।
আর এ দুষ্প্রাপ্য প্রত্যাশার ইতিবাচক প্রকাশ ঘটিয়েও আমি প্রথম আলো নিয়ে প্রথমবার নয়, শেষবার নয়, বারবার প্রশ্ন করবো।
কারণ—আমি বিশ্বাস করি—প্রশ্নই উত্তর।
#৩৬
0 Comments