শিক্ষক নিয়োগে অবশ্যই বদল আনতে হবে।
কারণ, শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় তবে সেই শিক্ষার মেরুদণ্ড হচ্ছে শিক্ষক।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা শিক্ষিকা যদি অপরের হক্ব নষ্ট করে তুলনামূলক অযোগ্য বা কম যোগ্য হয়েও শিক্ষকতায় আসে তবে তার বা তাদের মাধ্যমে মজবুত জাতিসত্তা নির্মাণ সম্ভব নয়।
কারণ, তাদের শিক্ষক হিসেবে আসাটাই অনৈতিক উপায়ে। সে কীভাবে নীতির প্রয়োগ করে সততা, পরিশ্রম ও মেধাতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে জাতি তৈরি করবে?
Mohammad Kamrul Ahsan স্যার এই সাক্ষাৎকারটিতে দারুণভাবে বিষয়টি চিহ্নিত করেছেন (বণিকবার্তায় ২৪ জানুয়ারি ২০২৫ এ প্রকাশিত বণিকবার্তা লিংক)। আলোচনা করি চলুন।
২।
কামরুল স্যারের মতে, বিদ্যমান 'সাপ্লাইন চেইন' (পুঁজিবাদী কনসেপ্টে) মানসম্মত শিক্ষক উৎপাদন করতে পারছেনা। কেন পারছেনা?
কারণ, শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষকতায় এসেছেন রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত তদবির, পোষ্য বা আর্থিক লেনদেন ইত্যাদির মাধ্যমে। কিন্তু তাদের তো আবেদন করার যোগ্যতা ছিল। এটাতেই গলদ।
যে পড়ালেখার ব্যবস্থা এবং যে পক্ষপাতমূলক মূল্যায়ন তাতে যাদের আসলে ক্রিটিক্যাল থিংকিং ক্যাপাবিলিটি তুলনামূলক কম বা একেবারেই নাই তারাও মেধাতালিকায় চলে আসছে।
নানা ধরনের পারস্পরিক অন্যায্য লেনদেন, মতাদর্শিক ও অন্যান্য সংকীর্ণতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা তেল-প্রেম ইত্যাদি একজন তুলনামূলক অযোগ্যকে যোগ্যতমদের একজন হিসেবে সামনে নিয়ে আসে।
যে ছাত্র বা ছাত্রী প্রশ্ন করে, সামগ্রিক চিন্তা করে, বিতর্ক করে, ভিন্ন মত পোষণ করে, সরবরাহকৃত নোটের বাইরে গিয়ে অধিক বই, জার্নাল ও অন্যান্য রিসোর্স খুঁজে লেখে এবং যারা নিজস্ব বিবেক খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাদের আগে থেকেই নানাভাবে একাডেমিক জুলুম করে অবদমন করে রাখা হয়।
মেরুদণ্ড খুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা নামের একাডেমিক জালেমদের একটি অংশকে না দিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালো নম্বর পাওয়াও প্রায় অসম্ভব! বিদ্যমান সাপ্লাই চেইন এই কারণে জাতির সেরা ও কার্যকর শিক্ষক বা শিক্ষিকা উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারছেনা।
এই মেধাবীদের একটি অংশকে আমলাতন্ত্র, পুলিশ নিয়ে গিয়েছে! ফলে পেশাগত শ্রেণিসংগ্রামে আমলাতন্ত্র বা পুলিশদের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হেরে যাচ্ছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেস্ট ফাইটার তো অন্য ফ্রন্টে অন্যদের হয়ে লড়াই করছে।
বিপরীতে, তেল-তদবির-মতপথ-পিরিতে নিয়োগ পাওয়া অপেক্ষাকৃত অযোগ্য শিক্ষক বা শিক্ষিকা ৯-৫টা চাকরি করে আত্মকেন্দ্রীক হয়ে কূপমণ্ডূক জীবন যাপন করছে!
যারা শিক্ষক বা শিক্ষিকা হচ্ছে তারা প্রায় বড় একটি অংশ তুলনামূলক তার বিভাগ বা ব্যাচের অধিক হক্বদারের হক্বকে লোপাট করে, ছিনতাই করে, দখল করে শিক্ষক বা শিক্ষিকা হচ্ছে। এটিই অযোগ্যতার দুষ্টচক্র।
আমি সব শিক্ষক বা শিক্ষিকা এমন তা বলছিনা। নিঃসন্দেহে আমাদের সুযোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষিকাবৃন্দ আছেন৷ তাঁদের উদ্দেশ্যেই এই জাতীয় লেখা লিখি যেন তাঁরা বদলে দেন।
যেন তাঁরা নানা অবৈধ উপায়ে কারসাজি করে অযোগ্যদের একাডেমিয়ায় প্রবেশ এবং পরে একে জুলুমের আস্তানা বানানোকে প্রতিরোধ করতে উদ্যোগ নেন।
৩।
দ্বিতীয় বিষয়টিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় 'নিয়োগ অসম্পূর্ণ' নিয়ে কথা বলেছেন৷
স্যারকে ধন্যবাদ এ বিষয়টি সামনে আনার জন্য৷
ধরুন, একজন বিশাল পিএইচডি বা এমফিল বা অনার্স-মাস্টার্স এর ফার্স্ট-সেকেন্ড অথচ ক্লাসে গিয়ে কোনো কনসেপ্ট বই, খাতা বা স্লাইড দেখে ছাড়া বলতেই পারেনা—বোঝানো তো আরো অনেক দূরের কথা!
নিজের এই অযোগ্যতা ঢাকতে প্রশ্ন করতেও উৎসাহিত করেনা। সাপ্লাই চেইনের অযোগ্য বা অসম্পূর্ণ এই নিয়োগ দিয়ে তো আমি যথার্থ শিক্ষক বা শিক্ষিকা পাবোনা, তাই না?
অথচ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিবেকপঁচা অসৎ অসতী অংশের পৃষ্ঠপোষকতায় নোট-শিট কোনোমতে মুখস্ত করে অথবা নির্লজ্জ পক্ষপাতবিদ্যার সৌজন্যে ক্লাসে আবার এরা, এই অমেরুদণ্ডী তেলের ডিব্বাডিব্বিরা প্লেস পেয়ে গেছে, যাচ্ছে বা যাবে!
অসততার নজির এতোই স্পষ্ট যে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আগেই গুঞ্জন চলে কে কার ছাত্র বা ছাত্রী আর কে কত তম হতে যাচ্ছে বা কে কাকে শিক্ষক বানিয়েছে বা বানাবে!
নিয়োগের সময় উত্তম শিক্ষাগুরু পাওয়ার জন্য ভালোভাবে যাচাই করতে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি ডেমো ক্লাস নেওয়া জরুরি।
এক্সপার্ট শিক্ষক-শিক্ষিকাদের র্যান্ডমলি সিলেক্টেড শার্প ব্রেইনের প্রো-একটিভ স্টুডেন্টদের ক্লাসে বসিয়ে তাদের সামনে ক্লাস নিতে বলতে হবে।
সেই ক্লাসে প্রশ্ন হবে। কীভাবে প্রশ্ন ডিল করে বা কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এনগেজ হয়, কীভাবে মুখস্তবিদ্যার বাইরে এসে বোঝায় বা কীভাবে বাস্তবতার নিরিখে উদাহরণ দেয়—এসব যাচাই করতে হবে।
আর SSC ও HSC পরীক্ষার ফলের অদরকারী বাধ্যবাধকতা উচ্ছেদ করতে হবে আবেদনপত্র থেকে। একজন ছাত্র অনার্সে মাস্টার্সে সমস্ত যোগ্যতা দিয়ে প্লেস পাওয়ার পরে এসএসসি ও এইচএসসি এর ফল দিয়ে তার অধিকার হরণ করা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ বুদ্ধিবৃত্তিক জুলুম। দুনিয়ার কোনো উন্নত ও সুসভ্য রাষ্ট্রে এই ব্যবস্থা নাই। এই একাডেমিক বদমায়েশি এই দেশের শিক্ষক-শিক্ষিকা কীভাবে মেনে নেয়? কীভাবে নিয়মইবা করে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো? সিন্ডিকেট তা পাশও করে এবং বছরের পর বছর এই জুলুম প্রাতিষ্ঠানিক অমোচনীয় রূপ ধারণ করে? ভাবুন এবং জুলুমের নিয়ম ভেঙে দিন।
নিয়োগের সময় সব ধরনের পক্ষপাতদোষ—রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আঞ্চলিক, পোষ্যপ্রীতি, এক্সটার্নালদের নিজের পরিচিত ছাত্রছাত্রী বা স্ববিভাগপ্রীতি, ভোটার বানানোর উদ্দেশ্য, তদবির, আর্থিক বাণিজ্য, ব্যক্তিগত প্রেম বা মায়া বা ললিপপ সেলফি ইত্যাদি—সমূলে উচ্ছেদ করতে হবে৷
৪।
নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে যে, একজন তুলনামূলক অধিক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়া মানে হচ্ছে ঐ প্রার্থীর হক্ব নষ্ট করা।
এইটা ভয়াবহ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। আল্লাহ বলেছেন, তিনি সব গুনাহ ক্ষমা করবেন, কেবল শির্ক আর অন্যের হক্ব নষ্ট করার মহাপাপ ছাড়া। আমাদের বিবেকসম্পন্ন শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ কীভাবে এই হক্ব নষ্টের ভীষণ মহাপাপ কারবারকে স্বাভাবিক করে ফেললেন?
অভিজ্ঞতা, গবেষণা পত্র প্রকাশনা, লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস এবং মৌখিক পরীক্ষা—এগুলোর সমন্বয় করতে হবে একজন আদর্শ মেরুদণ্ডসম্পন্ন শিক্ষককে একাডেমিয়ায় যুক্ত করার জন্য।
যদি শিক্ষায় উপযুক্ত মানুষ আসে তবে এই মানুষেরাই দেশের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, জনপ্রতিনিধি প্রমুখ কারিগর তৈরি করবে যারা পরিশ্রম, মেধা ও সততার মাধ্যমে ইনসাফ ও হক্বের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ জাতির আমূল পরিবর্তন করবে।
আমি সেই দিনের স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন বাস্তব হওয়া অসম্ভব হলে এই দেশে আমাদের সমস্ত আশার কবর হবে...!
তখন দেশের যোগ্য মানুষগুলোকে ভিন্ন দেশ বিদেশ নিয়ে যাবে!
আর আমরা তখন বাইরের দেশে গিয়ে আমাদের বঞ্চিত লোকটির ইতিবাচক অবদান দেখে 'বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত' বলে খুশিতে আত্মহারা হবো!
হায় রে আমরা, হায় আমাদের নিয়োগ কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতনরা...!
0 Comments