প্রচন্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে বন্ধু হাশেমের চায়ের দোকানে বসে একাত্তরের দিনগুলি ও স্বাধীনতা পরবর্তী অবস্থা নিয়ে কথা বলছিলেন নুরুল হক।পেশায় নুরুল হক একজন স্কুল শিক্ষক।হাশেমের মুখে স্বাধীনতা শব্দটি শুনে সে উত্তেজিত হয়ে বলল,
'আরে থামো,কী পেয়েছো তুমি স্বাধীন হয়ে?'
মুক্তিযোদ্ধা হাশেম মিয়া নির্বাক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকায়।আকাশের কাছে সেই তাকিয়ে থাকার কোন জবাব ছিলনা!
হাশেম মিয়া একজন নিভৃতচারী মুক্তিসৈনিক।যুদ্ধে গুলি লেগে তার একটি পা পঙ্গু হয়ে গেছে।নুরুল হক হাশেম মিয়ার বাল্যবন্ধু।তারা এক ই সাথে পাঠশালায় পড়েছেন।অর্থাভাবে হাশেম পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও নুরূল হক মেট্টিক পাস করেছেন।তাঁর পিতা মুসলিম লীগের সমর্থক হওয়ায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় তাকে আলবদর কমিটিতে যোগ দিতে হয়েছিল।কিন্তু মনে প্রাণে নুরূল হক পাকিস্তানী অত্যাচারকে ঘৃণা করতেন।
হাশেম মিয়া স্থানীয় বাজারের চায়ের দোকানদার।দোকানে আরো আছে তাঁর ছোট ছেলে রফিক।নুরূল হকের উত্সাহে রফিক এ বছর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবে।বড় ছেলের বয়স যখন ১৫ তখনই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।বাবার সাথে যুদ্ধে যেতে চায় সফিক।হাশেম মিয়ার বউয়ের তীব্র আপত্তিতে সে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেনা!
তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে...
হাশেম মিয়া গোপনে নুরূল হককে বলল,'তুমিতো তাদের সাথেই থাকো।আমার সফিককে একটু দেখে রেখো!'
নুরুল হক অভয় দিয়ে বললেন,'...শত হলেও তারাওতো মুসলমান;আমাদের ভাই,এতো নিষ্ঠুর মনে হয় হবেনা-তুমি দেখে নিও !'কী মনে করে নুরূল হক বলে ওঠে,''কেন তুমি জীবনের এতো ঝুঁকি নিচ্ছো ?আমার সাথে এসো,একসাথে বদর বাহিনীতে কাজ করি।'
হাশেম মিয়া ক্ষীপ্রকন্ঠে প্রতিবাদ করে বলেন,'তোমার কাছে ছেলেটাকে রাখছি বলে ভেবোনা আমি দূর্বল।আমি ওদের ঘৃণা করি।অত্যাচারীর আশ্রয় আমার দরকার নেই।'
নুরূল হক কোন কথা না বলে চলে যান।
কিছুদিন পর এলাকায় নুরূল হকের'মুসলমান ভাইদের'বাঙালি নিধন অভিযান শুরু হয়।
নুরূল হক বিস্ময়াবিভূত হয়ে দেখেন তার পাকিস্তানী মুসলিম ভাইয়েরা সফিককে একদমই ভাই মনে করছেনা!বরং'ছালে নাফরমানকা বাচ্চা'বলে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সফিককে হত্যা করে।
তখন নুরূল হকের চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনা জল ঝরেছিল!সেই জল নুরূল হক গোপনে মুছে ফেলেছিলেন,কেনোনা এ চোখের জল হয়ত মুহূর্তের মধ্যেই নাফরমান অথবা কাফের বানিয়ে দিতে পারে!
তবুও চোখের সামনে এই পৈচাশিক নির্মমতা নুরূল হককে নাফরমানদের দলে যোগ দিতে প্রবলভাবে উত্সাহিত করল।
হাশেম মিয়া ও নুরূল হক একত্রে দেশ স্বাধীন করলেন।
তবে আজো তাঁরা পরাধীন!!!
পাকিস্তানী বর্বরদের কাছে নাফরমান হয়ে তারা যে বাংলাদেশ এনেছে,আজ সেখানেই তারা চা বিক্রি করে,রিক্সা চালায়,দিনমজুরের কাজ করে।তবু তাঁরা ভিক্ষে করেনা।
বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যাঁরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে তাঁরা কারো অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকেনা।
আজ প্রায় একচল্লিশ বছর পর চায়ের দোকানদার হাশেম মিয়া ও স্কুল শিক্ষক নুরূল হক স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়না।
'হাশেম,তুমি কী দেখেছো ৭১এর মত ক্ষমতা লোভীরা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে?এ ক্যামন স্বাধীনতা আনলাম আমরা?'নুরূল হক বলেন,
'স্বাধীনতা এনে কেন তুমি চা বিক্রি করছো?সামান্য একটা লাঠি কিনে হারানো পায়ের অবলম্বন বানাতেও কেন তুমি অক্ষম?কেন আজ আসাদ রিক্সা চালায়?
কেন রাজ্জাককে মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্রের জন্য স্বাধীনতাবিরোধী দুর্নীতিবাজদের কাছে যেতে হয়?'
হাশেম মিয়া চা বানানো থামিয়ে দোকানের বিপরীত পাশে টানানো ব্যানারের দিকে তাকায়।সেখান মোটা অক্ষরে এক জননেতার ছবির নিচে লেখা আছে:
''গরীবের বন্ধু,দেশপ্রেমিক...ভাইকে ভোট দিন'
হাশেমরা এখনো সব কিছু বোঝেনা।তারা কেবল জানে,এই গরীবের বন্ধুর কাছেই গরীবের সব সম্পত্তি রয়েছে।
তাঁরা এখনো জানেনা যে,এই দেশপ্রেমিকই আজ দেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।হাশেমদের ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতা স্বঘোষিত প্রেমিকেরা আর রক্ষা করছেনা।
স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে ব্যক্তিস্বার্থ ও গদীর মূল্য অনেক বেশি কীনা!!
নুরূল হক বলতেই থাকেন...
'কেন সীমান্তের কথিত প্রতিবেশী আমাদের ভাই,বোন,বাবাকে গুলি করছে?কেন আমাদের সম্পদের উপর লোলুপ দৃষ্টি দেওয়ার ধৃষ্টতা করছে?কেন কেন কেন....?
কেন আমাদের সন্তানেরা রক্ত দিয়ে আনা ভাষাকে অবজ্ঞা করে হিন্দীকে প্রাধান্য দিচ্ছে?কেন বাংলা ভাষাকে বিকৃত করে ক্ষতবিক্ষত করছে এদেশেরই একটি সংকর জাত?'
নুরূল হকরা জেনে ফেলেছেন,নতুন প্রজন্ম তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কতটা উদাসীন!কে বিশ্বাস করাবে এই শিকড়ভোলা প্রজন্মকে যে,
উর্দু ও হিন্দী প্রকৃতপক্ষে একই ভাষার দুইটি ভিন্ন রূপ!'
গ্রামের মিতভাষী শিক্ষকের অপ্রত্যাশিত চিত্কারে সেখানে ছোটখাটো জটলা বেঁধে যায়।
নানা বয়সী মানুষ ভিড় করেছে।নুরুল হকের তরুণ ছাত্ররাই সেখানে বেশি।তাদের একজন বলে ওঠে,
'আমরাই আপনাদের ছিনিয়ে আনা স্বাধীনতা রক্ষা করবো।আমাদের দেশকে স্বনির্ভর ও আত্মমর্যাদাশীল করবো আমরাই.....আমাদের দিকনির্দেশনা দিন !'
নুরূল হক ও হাশেম মিয়ারা জানেনা,তারুণ্যের এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে আজ আর কেউ দেশের প্রয়োজনে ব্যবহার করেনা।এরাই আজ অপশক্তির হাতের খেলনা!অর্থলোভী ও ক্ষমতাপিপাসুদের যোগ্য নেতা মনে করে ভুল করছে এই তরুণরাই।তারপরও রফিক চিত্কার দেয়:
'ফিরিয়ে আনবোই স্বাধীনতা'
উপস্থিত জনতা দৃঢ়চেতা কন্ঠে প্রতিউত্তর দেয়।মনে হয় যেনো সব অনিয়ম অত্যাচার আর পরাধীনতা আবার এই বাংলাদেশ ছেড়ে পালাবে।নুরূল হক ও হাশেম মিয়া তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে প্রবলভাবে উদ্বেলিত হন।কোথা থেকে যেনো প্রচন্ড এক দমকা হাওয়া এসে রাস্তার ওপাশের 'জননেতার'ছবি সংবলিত ব্যানার উড়িয়ে মাটিতে ফেলে দেয়।
লাল-সবুজ পতাকাবাহী তরুণেরা ব্যানারের জননেতাকে পদদলিত করতে দ্বিধা করেনা !!!
[মঈনুল ইসলাম রাকীব
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যায়ন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
মোবাইল: 01555009574 ]
0 Comments