'গাহি সাম্যের গান'এই বাক্যটি যার বহু কবিতায় মানবতার জয় গান গেয়েছে সেই
সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথা আজ মনে পড়ছে। কেন পড়লো হঠাত্? অন্যায়
করছি না তো?
পৃথিবীতে শোষকের দালালী ও স্তুতি করার কবির অভাব
ছিলনা,নেই।অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী,শোষণের পতনের ধ্বনি দ্রোহের
শব্দমালায় ফুটিয়ে তোলা কবিদের সংখ্যা হাতে গোনা।নজরুল ইসলাম তাদের মধ্যে
অন্যতম।
একাধারে
কবি,সুরকার,গীতিকার,গায়ক,ঔপন্যাসিক,ছড়াকার,গল্পকার,অভিনেতা ও সাংবাদিক
ছিলেন নজরুল।তত্কালীন সময়ে রবীন্দ্রনাথসহ অন্যান্য সাহিত্যিকরা যখন
ব্রিটিশ দখলদারদের তেলবাজি করছিল তখন নজরুলের আবির্ভাব।ধূমকেতুর মত এসেই
অপশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিলেন।অগ্নিবীণা কাব্যের বিদ্রোহী কবিতা ব্রিটিশদের
ভীত করে দেয়,এ কবিতা লিখে জেলে যান নজরুল।রবীন্দ্রনাথ তখন কি ভূমিকা
রেখেছিল এ প্রশ্ন কেউ করেনা।
নজরুলের কবিতা ও গানে প্রেম
ভরপুর।বুলবুল,সিন্ধু হিন্দোল,ছায়ানট,অগ্নিবীণা প্রভৃতি কাব্যে প্রেমের
সমারোহ ঘটেছে।ইরানী বালিকা থেকে পল্লীবধূ সবাইকে প্রেমের দৃষ্টিতে এঁকেছেন।
নজরুল সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক কবি।আজকে এক শ্রেণীর উঁটকো
বুদ্ধিব্যবসায়ী নজরুলের কাব্যে সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া পায়।আমি নিশ্চিত এরা
'সাম্যবাদী'কাব্যটি ধরে দেখেনি।এই কাব্যের 'মানুষ' কবিতাটি নজরুলকে
পৃথিবীতে অমর করে রাখতে যথেষ্ট।দুইটা লাইন দিই।পড়ুন মন দিয়ে।
'হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন
কান্ডারী বল মানুষ তাহারা সন্তান মোর মার।'ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মিছিল করে গর্জে উঠলো নারীরা
আমার ছোট্র জীবনে পড়া অজস্র লাইনের মধ্যে এমন অসাম্প্রদায়িক ও
ধর্মনিরপেক্ষ লেখা দ্বিতীয়টি পাইনি।আপনি কি পেয়েছেন?এই কবিকে কারা তবে
সাম্প্রদায়িক বলে?
নজরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ইসলামকে সাহিত্যে এনেছেন।অথচ এই অভিযোগ ধোঁপে টেকেনা।কারণ নজরুল হিন্দু দেবদেবীদের নিয়েও লিখেছেন।তিনি তাঁর ও বাংলার সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে ইসলাম ধর্ম থেকে উপাদান নিয়েছেন।এটা অন্যায় হতে পারেনা।বরং এর মধ্যে যারা সাম্প্রদায়িকতা খোঁজেন তারাই সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতা হৃদয়ে ধারন করছেন জান্তে বা অজান্তে।
এসব সমালোচক মধুসূদনের মেঘনাদবধ কে কিছু
বলেনা। রবীন্দ্রনাথের শিবাজী বা কথায় কথায় 'মা' লেখায়ও এরা কোন দোষ
পায়না।নজরুলের লেখায় সাম্প্রদায়িকতা খুঁজে পাওয়া এসব জ্ঞান বা অজ্ঞানপাপী
বুদ্ধিসন্ত্রাসীরা এমনকি বঙ্কিমচন্দ্রকে সাহিত্য সম্রাট বলে আবেগে আপ্লুত
হয়ে পড়ে অথচ 'আনন্দমঠের'দ্বারা সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে এই বঙ্কিম।
শিশুদের প্রিয় কবি নজরুল।ঝিঙে ফুল নামের কাব্যটি শিশুদের জন্য।কাঠবেড়ালী,লিচু চোর,মা ইত্যাদি তার বিখ্যাত শিশুতোষ রচনা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে এনে
নাগরিকত্ব প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।পরে তাঁকে জাতীয় কবি
বানানো হয় ১৯৭৬ সালে।
নজরুল পৃথিবীর সেই একমাত্র হতভাগা কবি যে একটি
দেশের জাতীয় কবি হয়েও সেদেশে চরমভাবে অবহেলিত। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতকে এক
কোনায় ফেলে রাখা হয় জাতীয় কবি হওয়ার পরেও। অথচ রবীন্দ্রনাথকে পূজা করা হয়
সে দেশে । অপ্রিয় সত্য যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির তীব্র বিরোধীতা করে
রবী বাবু সেখানেই এখন তীব্র নন্দিত।
আর নজরুল?বেচারা খাতা কলমে
জাতীয় কবি হয়েছে এটাও যেন অন্যায়। তাঁকে সরালে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও
সাহিত্যিকরা হয়তো পুলকিত হবেন । দেশের নির্লজ্জ ও জাতীয়তাবোধহীন
গণমাধ্যমগুলো রবীন্দ্রনাথের জন্ম বা মৃত্যুর এক মাস আগে থেকে ঢাকা ঢোল
পেটাতে থাকে,আর নজরুলের জন্মদিন নিরবে নিভৃতে চলে যায়। জাতীয়তাবোধ তখন
ডুকরে কাঁদে,অট্রহাসি দেয় ভন্ডরা,পদতলে পৃষ্ঠা হয় যোগ্যতা!
আজ নজরুলের কথা মনে পড়েছে কারণ আজ ১১ জৈষ্ঠ্য। ১৩০৬ বঙ্গাব্দের এইদিন নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ১১৫ তম জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন, হে বিদ্রোহ,প্রেম, সাম্যের কবি ।শুভ জন্মদিন,জাতীয় কবি।
কারো কি কোথাও কোন উত্সব চোখে পড়ে ?
মৃত্যুর পরও তুমি দুঃখই পেয়ে গেলে হে দুখু মিয়া !!
(২৫ মে ২০১৪ লিখিত)
২।
সর্বহারার জন্মদিনে
..........................
'ওর রে চাষী জগদ্বাসী ধর্ ক'ষে লাঙল
আমরা মরতে আছি-ভাল ক'রেই মরব এবার চল ।।'
[কৃষাণের গান,সর্বহারা]
ওরে ধ্বংস-পথের যাত্রীদল
ধর হাতুড়ি,তোল কাঁধে শাবল।
আমরা হাতের সুখে গড়েছি ভাই,
পায়ের সুখে ভাঙব চল
ধর হাতুড়ি,তোল কাঁধে শাবল।
[শ্রমিকের গান,সর্বহারা]
আমরা নিচে পড়ে রইব না আর
শোন রে ও ভাই জেলে,
এবার উঠব রে সব ঠেলে!
[ধীবরদের গান,সর্বহারা]
আহারে কৃষক-শ্রমিক-ধীবর ভাইয়েরা ,তোদের কথা বলার আর কেউ নেই। কবি মরে
গেছে। এখন নারীজীবী বেঁচে আছে কবিরূপে। বেঁচে থাকতে বঞ্চিতের কথা বলে যাওয়া
এক বিপ্লবীর আজ জন্মবার্ষিকী।সারাজীবন সর্বহারার পাশে থাকা এই কবি আজ
সবচেয়ে বড় সর্বহারা,হতভাগা।জাতীয় কবি হয়েও অবমূল্যায়িত। বিশ্ববিদ্যালয়ের
পাঠ্যসূচিতে একটুখানি জায়গা পেতে তাঁর সংগ্রাম করতে হয় বড় বড় অধ্যাপকদের
সাথে। শ্রমিকদের বঞ্চনা আর কেউ ফুটিয়ে তোলেনা। সাহিত্য জগতে বিপ্লবী স্বর
বিলুপ্তপ্রায়। নজরুল মরে গেছে।তার জন্মদিন আসার আগে আমাদের
গণমাধ্যম,টিভি,পত্রিকা,বেতার এক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়না। চাষাভুষার
কবিকে কর্পোরেটদের মাঝে স্থান দিতে চাওয়া অন্যায়।কেউ এই অন্যায় করতে চায়না।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আত্মার প্রতি
বিনম্র শ্রদ্ধা।অসাম্প্রদায়িক,ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী এ কবির ছায়া ফিরে
আসুক আবার বাংলায়,গর্জে উঠুক সর্বহারা।
(২০১৫)
৩।
২০১৬। ২৫ মে। ১১ জৈষ্ঠ্য। আজ যখন এই লেখা লিখছি তখন বাজে রাত ১২ টা ৫৬। দেশের নামকরা পত্রিকা প্রথম আলোর কোথা্ও নজরুলকে নিয়ে কিছু লেখা দেখলাম না। এ গোষ্ঠীর এবং এদেশের পশ্চিমবঙ্গর পাচাটা সাহিত্যিক সমাজের দৃষ্টিতে নজরুলের কোন মূল্য নেই। তারা দুনিয়ার সব কিছু খুঁজে পায় ভোগবাদী রবীন্দ্রনাথে। কারণ তারা পুঁজিবাদী। নজরুল পুঁজিবাদবিরোধী। নজরুল সাম্যবাদবিরোধী নয়,নজরুল চায় সকলের সমান অধিকার। আর এখন যারা মিডিয়া ও সাহিত্যের নিয়ন্ত্রক তারা শুধু নিজেরটাই বোঝে। সেই সাথে সাম্প্রদায়িকতা ধারন করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মাতেে আর জাতীয় কবি হওয়া স্বত্ত্বেও নজরুল থাকে অবহেলিত।নজরুলের ১১৭ তম জন্মবার্ষিকীও তাই নিরবে বাংলাদেশে এসে আবার চলে যায়।এক শতাংশ ভোগবাদী নষ্টদের হাতে জিম্মি থাকা মিডিয়া ও সাহিত্যপাতায় নজরুলের জায়গা পেতে যেন আরো একটি বিদ্রোহী কবিতার জন্ম হওয়া লাগবে।
হায় দুখু মিয়া, মরেও তোমার দু:খ গেলোনা...।
[পুনশ্চ: এটা সত্য যে নজরুলই প্রথম রবীন্দ্রনাথের পুঁজিবাদী বলয় ভেঙে সাহিত্যে স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেন।তিনি রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই রবীন্দ্রনাথকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন ধাঁচের লেখা শুরু করেন।ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক অপশাসকদের যখন রবীন্দ্রনাথ ও সাঙ্গপাঙ্গরা তেল দিয়ে সুনাম কুড়াচ্ছিলেন ঠিক তখন আমাদের বিদ্রোহী দুখু মিয়ার আবির্ভাব।ধূমকেতুর মত,ঝড়ের মত।তিনিই প্রলেতারিয়েতের মানানসই শব্দ সর্বহারাকে পরিচিত করান।আর জিব্রাইলের ডানা জাপটে ধরে ব্রিটিশ ভারত নামের জাহান্নামে বসে বিপ্লবমিশ্রিত পুষ্পের হাসি হাসেন।
একটা অপ্রিয় সত্য আমাদের কলকাতাপন্থী সাহিত্যিক ,গবেষক ,অধ্যাপক ,সম্পাদকরা স্বীকার করেন না বা এড়িয়ে যান।তা হচ্ছে,রবীন্দ্রনাথের ওয়েস্টার্ণ রোমান্টিসিজমকে সে বেঁচে থাকতেই নজরুল নাকচ করেছেন।নজরুল রবীন্দ্রনাথের পশ্চিমা স্কেলকে ভেঙে চূরমার করে দিয়েছেন।রবীন্দ্রনাথের বুঁজোয়াগিরি ও আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজকে 'ভারতভাগ্যবিধাতা'মার্কা তোষণ নীতিকে নজরুল 'লাথি মার ভেঙে ফেল'দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছেন।আর একজন সাহিত্যিকের রাজনৈতিক অবস্থান তার সাহিত্যের আলোচনায় আসা উচিত। কেন এটা আলোচনায় আসেনা যে রবীন্দ্রনাথ আগাগোঁড়া একজন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মেনে নেয়া লেখক।আর নজরুল শিখিয়েছেন প্রতিবাদ। নজরুলই ব্রিটিশ দখলদার কবলিত জাহান্নামে বসে পুষ্পের হাসি হেসেছেন।আর কোন সাহিত্যিক ভোগ আর তোষামুদী ছেড়ে এই মাটির জন্য লড়েননি।নজরুল এই সভ্যতার নির্মাতা কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি। সম্ভবত একারণেই হালের শ্যুট টাই পরা পশ্চিমা ও কলকাতা ধারার পুঁজিবাদী কথিত শিক্ষিত গোষ্ঠী তাকে অমর্যাদা করে।এদের প্রোপাগান্ডা নজরুলবিরোধী নয়,মানুষ ও মানবতা এবং শোষিত মানবের বিপ্লববিরোধী।নজরুল ত্যাগের প্রতীক , নজরুল বিরোধীতা ভোগের উদাহরণ।নজরুলকে স্বীকার করলে ভোগবাদী সাহিত্যিকদের অস্তিত্ত্বের বিনাশ হবে-এটা জেনেই ওরা প্রেমের,দ্রোহের,বিপ্লবের,মানবতার,অসাম্প্রদায়িকতার নজরুলকে মেইনস্ট্রিম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে উঠেপড়ে লাগে।তবে নজরুল অমর।যতদিন ভোগবাদ,পুঁজিবাদ ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই থাকবে ততকাল নজরুল এ পৃথিবীতে বেঁচে রইবেন।এবং অবশ্যই সত্যের সঙ্গে...।]
