সর্বশেষ

খালেদ মোশাররফ হত্যায় জাসদের সম্পৃক্ততা, ৭ নভেম্বর ও ইতিহাসের আড়ালের ইতিহাস

মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নং সেক্টর ও গুরুত্ত্বপূর্ণ ”কে” ফোর্সের দায়িত্ত্বে থাকা এ মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার স্থপতি হত্যার পর একটি বিপ্লবের নেতৃত্ত্ব দিয়েছিলেন। ৩ নভেম্বরের সফল সেই বিপ্লবটি বিরোধীদের হাতে ৭ নভেম্বর নিহত হয়। অকালে প্রয়াত হন বাংলাদেশের ৩ দিনের রাষ্ট্রপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম।

১৯৩৭ সালের ১ নভেম্বর জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার মোশাররফগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এ মহান মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে পড়াশোনা করে সরাসরি কমিশনার পদে যোগ দিয়ে তিনি অতি অল্প সময়ে সেনাবাহিনীর চেীকশ অফিসার হন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্ত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৯৭২ সালে ভারতের ত্রিপুরায় সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করেন এবং ৯ মাস যুদ্ধে তিনি কে ফোর্স ও ২ নং সেক্টরের নেতৃত্ত্ব দেন। বর্বর পাকিস্তানীদের থেকে স্বাধীন করেন প্রিয় বাংলাদেশকে।

খালেদ মোশরারফ হত্যার নেপথ্যদের ব্যাপারে গণরব উঠুক
তাঁকে হত্যার পর আজ পর্যন্ত হত্যাকারীদের শাস্তির ব্যাপারে গণরব ওঠেনি। কথিত 'বিপ্লব ও সংহতি দিবস' (যার মাধ্যমে তত্‍কালীন সেনাবাহিনীর সর্বশেষ বাংলাদেশপন্থী ও মুজিবপন্থী সেনাকর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়) এর নির্মাতা ছিলেন কর্ণেল তাহের ও তাঁর ভাইয়েরা,বামপন্থী জাসদ গণবাহিনীর নাম করে। ছিল তত্‍কালীন উপসেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুগামীরা। ছিল ৭৫ এর রক্তাক্ত অপঅভ্যত্থানের সমর্থনকারীরা তো খালেদ মোশাররফ হত্যায় কর্ণেল তাহের ও তাঁর বামপন্থী অনুসারীদের নাম কেন এখনো আসছেনা? সবটুকু সুবিধা জিয়া ভোগ করছে । কিন্তু জিয়াকে স্বার্থের দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সহায়তা করা জাসদ নিয়ে কেন আলোচনা হবেনা? বঙ্গবন্ধু বিরোধীতা ও এদেশের বুকে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতির সুযোগ এনে দেয়ায় জাসদের চেয়ে কার অবদান বেশি? জাতির পিতা হত্যার প্লট তৈরি করে জিয়ার উত্থান ঘটিয়েছে জাসদ ছাড়া আর কে?

৭ নভেম্বরের সুফল ভোগী ও ভোগকামী উভয়ই খালেদ মোশাররফ হত্যাকারী

১৯৭৫ সালের নির্মম হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে সাত নভেম্বরের চূড়ান্ত সুফল ভোগকারীরাই যে শুধু হত্যা করেছে খালেদপন্থী তথা বাংলাদেশপন্থীদদের তা নয়, হত্যার সঙ্গে কথিত বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সকল সুফল ভোগকামীও (ভোগ করতে ইচ্ছুক যে বা যারা) যুক্ত ছিল। এখন সময় এসেছে তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার।

 ৩ দিনের রাষ্ট্রপতি খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম
খালেদ মোশারফ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পরবর্তি একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন,তা ৩ দিনের জন্য হলেও। তাঁকে সে সম্মান দিতে হবে। আদালত কর্ণেল তাহের হত্যার বিচার পূনঃতদন্ত করতে রুল জারি করলে রাষ্ট্রপতি খালেদ মোশারফের হত্যাকারীদের বিচার করতে কেন নির্দেশ দেবেনা? সেসময় খালেদের সঙ্গে শহীদ হওয়া বীর বিক্রম কর্ণেল নাজমুল হুদা ও কর্ণেল হায়দারসহ সকল হত্যার বিচার করতে হবে। কর্ণেল হুদার স্ত্রী নীলুফার হুদার লিখিত বই 'কর্ণেল হুদা ও আমার যুদ্ধ' থেকে হত্যাকারীদের শণাক্ত করা পানির মত সহজ ব্যাপার। সেই সাথে প্রামাণ্য দলিল হতে পারে
*একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ : রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর-কর্ণেল শাফায়েত জামিল
*বাংলাদেশ:রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-১৯৮১-ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন
*তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা-কর্ণেল হামিদ
*অসমাপ্ত বিপ্লব:তাহেরের শেষ কথা-লরেন্স লিফসুলত্‍স
*রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক প্রবন্ধ-আহমদ ছফা ইত্যাদি গ্রন্থ।


 খালেদ মোশাররফকে ভারতীয় চর বলেছিল কেন জাসদ?
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টের ভেতর খালেদ মোশাররফসহ সকল দেশপ্রেমিক অভ্যত্থানকারীদের 'ভারতীয় চর' বলে লিফলেট ছড়ায় কর্ণেল তাহেরের জাসদের সহযোগী সংগঠন গণবাহিনী (বিবিসি বাংলা,৫-১১-২০১৫)। এই প্রোপাগান্ডা কেন করা হলো তখন? জাসদ গণবাহিনীর তত্‍কালীন ঢাকা মহানগর প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হোক। তিনি নতুন ও পুরাতন প্রজন্মকে সত্য বলে দিক।
জনতার মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ ।
কেন জাসদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত জাতীয় নায়কের নামের পাশে 'ভারতীয় চর' এর মত নিকৃষ্ট শব্দযুগল ব্যবহার করলো?
এই জাসদ তো সেই জাসদই যারা জাতির স্থপতিকেও এই অপবাদ দিতে দ্বিধা করেনি। ঐতিহাসিক ও গবেষকদের খালেদ মোশাররফসহ ৭ নভেম্বরের সকল শহীদদের হত্যায় জাসদ ও গণবাহিনীর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে খুব বেশি কষ্ট হবে বলে মনে হয়না।

কর্ণেল হামিদের বই থেকেঃজাসদই হত্যা করে খালেদকে

'তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা' নামক বিখ্যাত বইয়ে কর্ণেল হামিদ জাসদ নেতা মেজর জলিলের সঙ্গে থাকা এক সৈনিক কর্তৃক রাষ্ট্রপতি খালেদ মোশাররফকে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। আমরা জানি,জাসদ তথা গণবাহিনী তথা মেজর জলিল ছিলো কর্ণেল তাহেরের অনুসারী। তাছাড়া জাসদ নিজেই কথিত ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের ক্রেডিট নিতে চায়। যদি সেটিই হয় তবে খালেদ মোশাররফকে হত্যার ডিসক্রেডিটটাও যে নিতে হয়,হে কমরেডবর্গ...। নেবেন না?

এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী বরখাস্ত বর্বর মেজর ডালিম তার বই 'যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি' এ ৭ নভেম্বর খালেদ ও তার অনুসারীদের হত্যার পর কথিত সিপাহী জনতার শ্লোগান লিখেছেন। তার কয়েকটি-
-খন্দোকার মোশতাক জিন্দাবাদ।বাংলাদেশ জিন্দাবাদ
-মেজর ডালিম জিন্দবাদ
কর্ণেল তাহের জিন্দাবাদ
-ডালিম তাহের ভাই ভাই
বাকশালীদের রক্ষা নাই
-সিপাহী জনতা ভাই ভাই
খালেদ চক্রের রক্ত চাই
[৭ নভেম্বর....জনতার অভ্যুত্থান]

এই হচ্ছে জাসদের কথিত বিপ্লব যা নিয়ে তাদের গালগল্পের শেষ নেই। তাহের ও ডালিম ভাই ভাই এখানে। এখানে মৌলবাদী পাকপন্থী ও বামপন্থী কথিত বিপ্লবী এক ঘাটের মাঝি। এটি নিয়ে কেউ টুঁ শব্দ করবেন না। এই ইতিহাস চর্চা ও প্রচারের সাহস ও সততা এদেশের কথিত বামঘরানোর মিডিয়া ও তাদের পালিত বুদ্ধিজীবীদের আছে কি? ফিকশনাল ক্রাচের কর্ণেল পড়ে আপ্লুত হওয়ার আগে বা পরে ননফিকশনাল রাষ্ট্রপতি খালেদ মোশররফ হত্যাকান্ডের চক্রান্ত পড়া উচিত সবার। যারা ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এর হত্যাকান্ডে পুলকিত ছিল সেই বাহিনীই ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বর ক্ষমতার মোহে একঝাঁক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। সেই হত্যার ধারাবাহিকতা চলে ১৯৮১ সালের পর এরশাদের গদিতে আরোহন পর্যন্ত। রক্তের থখথকে মিছিল এ প্রজন্মের জানা নেই....।

জাসদঃবিপ্লবের নামে ক্ষমতার মোহে বাংলাদেশকে ক্ষতবিক্ষত করা দল
কটি নয়া রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর তার প্রথম সরকারকে দীর্ঘ একটি সময় দিতে হয় রাষ্ট্রকে গঠনের। এদেশের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলরা(বাম ও ডান) বাংলাদেশের স্থপতিকে সে সুযোগ দেয়নি। ১৯৭২ এর পর থেকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অযৌক্তিক অবস্থান নেয় জাসদ,ন্যাপ ইত্যাদি বামপন্থী দল। ১৯৭৫ এর সবকটি হত্যাযজ্ঞে এই জাসদের সমর্থন ছিল। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর হত্যার যোগসূত্র রয়েছে বলে লিখেছেন মাহজাবিন খালেদ(বিডিনিউজ২৪,স্মৃতির পাতায়,০৭-১১-২০১৫)। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধীতা করে জাসদ ও বামপন্থীরা এদেশে গোঁড়া ধর্মান্ধ শ্রেণীর উত্থানে ভূমিকা রেখেছে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা গ্রহণের পর বামপন্থী মিডিয়া প্রত্যেকদিন প্রোপাগান্ডা সংবাদ প্রচার করে দেশে কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। এর ফলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের খুনীরা চক্রান্তের সাহস পায়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ এর ১৫ নভেম্বর খুন করা হয় জাতির আরো এক ঝাঁক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

********************************************************************************************
কথা শেষ। দাবি শেষ নয়। মনেপ্রাণে চাই মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রপতি খালেদ মোশাররফ হত্যার বিচার শুরু হোক। বেরিয়ে আসুক ১৯৭৫ এর আগের পরের সকল আড়ালের ঘটনা। নেপথ্য ও কুশীলবরা চিহ্নিত হোক। ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিতে রোধ করা যাবেনা। একজন অবেলার রাষ্ট্রপতি, মুজিব অনুরাগী, একজন বীর উত্তম ও একজন মহানায়ক খালেদ মোশাররফ বেঁচে থাকবেন ইতিহাসের পাতায়-নির্ভীক বিপ্লবী হিসেবে।

তাঁর প্রতি বিনম্র শদ্ধা ও ভালবাসা।
পাঠ অনুভূতি