সর্বশেষ

পথে যেন না থাকে পথশিশু আর

ছবি কথা বলে কথা অনেকেই বলে। কিন্তু সত্যিই কি কথা বলে? নাকি এটি কেবল কথার কথা? ছবি কথা বলেনা এই ধারণা নিয়ে আমি ছবি তুলতে বেরিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, ভেবেছিলাম জাস্ট ক্লাসের প্রকল্পের কাজ, কোনমতে ছবি তুলে পোস্ট করলেই হলো। কিন্তু ভাবনা আর বাস্তবতার বিস্তর ফারাক পেলাম ছবির পৃথিবীতে ডুব দিয়ে। এক অন্যরকম জগৎ! সামান্য স্থিরচিত্র তুলে আনতে পারে সমাজের অপ্রকাশিত চিত্র। তাত্ত্বিকভাবে এতদিন পথশিশুদের সম্পর্কে জেনেছি। কিন্তু তাদের জীবন আসলে কেমন যায়? তারা কি আমাদের মত সাধ-আহ্লাদ পূরণ করতে পারে? আমার হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়া দেয়ার মত কিছু মুহূর্তের সাথে দেখা হলো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে। যেমন, নিচের প্রথম ছবিটা। আমি এটি তুলেছি সন্ধ্যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পিঠাচত্ত্বর থেকে।

ছবি তুলতে না, গিয়েছিলাম পিঠা বা বার্গার খেতে। হঠাৎ আমার চোখ পড়ে দিকে। একটি শিশু অসহায় দৃষ্টিতে খাবারের দিকে চেয়ে আছে। আমি নীরবে স্মার্টফোনটা বের করে ফ্লাশ দিয়ে ক্লোজ আপ এই শটটি নিলাম। ওর নির্মোহ দৃষ্টিপাত সহস্র কথা বলে দিয়েছে আমাকে। সম্পদের অসম বণ্টণ যে সাধারণ মানুষের খাদ্যকে দূর থেকে দূরে সরিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে কি? ছেলেটির চোখের দিকে তাকান। ওর চোখ কি আপনার দিকে না তাকিয়েই আপনার সাথে কথা বলছেনা?

আমি বুঝলামঃ হ্যাঁ, সত্যিই  ছবি কথা বলে পরদিন আমি দ্বিগুণ উদ্যমে আরো ছবি তুলতে বের হলাম। ছবি দিয়ে জীবনের গল্প বলা আমার কাছে কুয়াশাবৃত শীতে লেবু চায়ের নেশার মত মনে হচ্ছিল।

ছবি

ছবি ১ঃ তাদের পথশিশু বলে ডাকি আমরা। কিন্তু পথের খাবারেও তাদের অধিকার নেই। এই  পুঁজিবাদী ভোগনির্ভর সমাজব্যবস্থাকে উপহাস করছে খাবারের দিকে শিশুটির অসহায় দৃষ্টিপাত...

 ছবি

২১ নভেম্বর থেকে শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষা না বলে এটাকে যুদ্ধ বলা যায়। কারণ মাত্র দুই হাজার ৩০ টি আসনের জন্য লড়ছিল লক্ষ ২০ হাজার শিক্ষার্থী। নিচের ছবিটা সেই শিক্ষার্থীদের। দুইটা লাইনে তারা ভর্তি পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়েছে। এই ছবিটায় আমি লাইনের মাধ্যমে ভর্তিযুদ্ধকে দেখাতে চেষ্টা করেছি। আর বুঝাতে চেয়েছি যে, পথ শিশুটাকে যদি যত্ন করা হতো, সঠিক পরিচর্যা করা হতো তবে ছেলেটিও নিশ্চিয়ই এমনভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসতো।

ছবি ২ঃ মাত্র ২০০০ আসন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য। পরীক্ষা দিতে এসেছে প্রায় লাখ শিক্ষার্থী। এর নাম যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে অংশ নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছে ওরা।

 ছবি

ছবি ৩ঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেইটের পাশের একটি বই, গিফট কসমেটিক্সের দোকানের খেলনার দিকে চেয়ে আছে এক হতদরিদ্র শিশু। সে কাগজ টোকায়। কাগজ বিক্রির টাকায় তার পিতৃহীন পরিবার চলে। খেলনাগুলো দুচোখ ভরে দেখে যাওয়া ছাড়া কেনার জন্য অর্থ নেই তার।

এই ছবিটাও আমার একটি ক্যানডিড ক্লিক। আমি প্রান্তিক গেইটে বিকাশ থেকে টাকা তুলতে গিয়েছি। হাঁটছি বন্ধু ইমরান আর আমি। হঠাৎ আমাদের চোখ গেলো এই শিশুটির উপর। সে কি যেন দেখছিল। ওকে আমাদের ঘূণেধরা সামাজিক নিয়মে টোকাই বলা হয়। আমি খুব তীক্ষ্ন নজরে লক্ষ করলাম, ছেলেটি দোকানে সাজিয়ে রাখা খেলনাগুলো মনোযোগ সহকারে দেখছে। ওর ঠিক পিছনে রাখা দামি খেলনাগুলোও যেন ওকে উপহাস করছে! কি নির্মম একটি দৃশ্য! ওর খেলনা কেনার টাকা নেই। শুধু চেয়ে দেখছিল তাই। এই মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে আমি প্রথমে একটি ওয়াইড শট নিলাম। কিন্তু সেটিতে শিশুটির অবয়ব বুঝা কষ্টকর ছিল। পরে মিড শটে শিশু, খেলনা, পুস্তক, পুতুল দোকানটিকে আনি। ততক্ষণে চোখে পানি চলে এসেছে।

ছবি

ছবি ৪ঃ পিছনে বিলাসীদের প্রাইভেট কার, পাশে এক গৃহহীন মা তার সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আমাদের বৈষম্যে ভরা সমাজের করুণ চিত্রটি উপস্থাপন করছেন।

উপরের ছবিটি আমার চার নম্বর ছবি। ঠিক দুপুর বেলার কড়া রেীদ্রে আমি ফ্রেমিংয়ের চিন্তাও করতে পারিনি। যে জাক্সটাপোজিশন এই ছবিতে উঠে এসেছে তা যেন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই দুনিয়াকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ সম্পত্তির মালিক মাত্র শতাংশ মানুষ। আর শতাংশ সম্পত্তির মালিক সংখ্যাগুরু ৯৯ শতাংশ মানুষ। কেউ অট্রালিয়কা বানাচ্ছে , আর কেউ তার পাশেই খোলা আকাশের নিচে গৃহহীন নামে ঘুমাচ্ছে। আবার কেউ দামী গাড়িতে চড়ছে আর কারো পা ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে। এই ছবিটা ভর দুপুরে তোলা। ওয়াইড শট নিয়ে গাড়ি এবং মানুষকে আনা হয়েছে। কোলে রয়েছে এক শিশু। সেও ভবিষ্যতে খাবার খেলনার দিকে তাকিয়ে থাকবে কি?

ছবি

ছবি ৫ঃ জান্নাতুল হাবিব। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক। বাংলাদেশের সকল শিশুর মেীলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তিনি কাজ করছেন।
পথ শিশুদের জীবনের এই চরম অমানবিক অবস্থা কেন ব্যাপারে জানতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক জান্নাতুল হাবিবের কাছে গেলে তিনি বলেন,‘পথশিশু শব্দটি বাংলাদেশ থেকে উঠে যাওয়া উচিত। প্রতিটি শিশুর মেীলিক অধিকারের নিশ্চয়তার ব্যবস্থা সমাজকে করতে হবে। কিভাবে পথশিশুদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া যায় এই প্রশ্নের জবাবে জান্নাতুল হাবিব বলেন,‘অবশ্যই রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিটি শিশুর জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যে বয়সে শিশুদের স্কুলে থাকা দরকার সে বয়সে তাদের রাস্তায় থাকতে দেয়া যাবেনা'।

পাঁচটি ছবিতেই আমি চেষ্টা করেছি ফটোগ্রাফির কম্পোজিশনের প্রাথমিক নিয়মকে আনতে। আমি দুপুরে, সকালে, সন্ধ্যায় এবং বাইরে ভেতরে প্রায় সব জায়গায় ছবি তুলে পাঁচটি এখানে পোস্ট করেছি। এক নম্বর ছবিতে মোমেন্ট ফুটিয়ে তুলেছি রুল অফ থার্ডসের মাধ্যমে, নং ছবিতে ডমিনেন্ট ক্রিয়েটিভ ডিভাইস রেখা বা লাইন। নং ছবিতে ফ্রেমিং করেছি সাজানো কসমেটিক্স দোকানকে দিয়ে পথশিশুকে। নং ছবিতে জাস্কটাপোজিশন করা হয়েছে ধনী ও গরীবকে আর নম্বর ছবি রুল অব থার্ডস এর মাধ্যমে একটি পোর্ট্রেট। তিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। পথশিশুদের বিষয়ে তার মন্তব্য তুলে ধরেছি।


পাঁচটি ছবিতেই ক্যাপশন বা শিরোনাম ব্যবহার করা হয়েছে। স্বল্প শব্দে প্রতিটি ছবিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।

হ্যাঁ, মনে হয় আমার যদি একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা থাকতো তবে আমি ছবিগুলোকে আরো ভিন্নভাবে এবং আরো জীবন্তভাবে তুলে আনতে পারতাম। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আমি বিষয়ের অপ্রস্তুত ছবি তুলতে পছন্দ করি। যদি বিষয়কে অবহিত করে পোজ দেয়ার সুযোগ দিতাম তবে ভিন্নরকম ছবি আসতো।

পরিশেষে বলবো, উপরের যে টি ছবি আমি তুলেছি তা শুধুমাত্র আমার সদ্য জন্মানো ভাল লাগার একটি ছোট্র প্রকাশ। আমার ডিএসএলআর ক্যামেরা নেই অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে। হয়তো অনেক কিছুই পরিপূর্ণরূপে তুলতে পারিনি, তবে আমি সাধ্যের ত্রুটি রাখিনি। জীবনে এই পর্যায়ে এসে আমি এই প্রকল্পটি করতে গিয়ে জীবনের আরেক ধরনের দেখা পেয়েছি। বিশেষ করে যে ছেলেটি খাদ্যের দিকে চেয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে তাঁর জন্য মায়া হচ্ছে এখনো। যদি কখনো সুযোগ হয় তাদের জন্য কিছু করবো। করবোই। এই টি ছবির চারটি ছবি (, , , ) তোলার মুহূর্তগুলো আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে।

ছবি যদি কথাই না বলে তবে কেন আমি আলোড়িত হলাম? তাই আমি বিশ্বাস করলাম যে, ছবি কথা বলে। ছবি হৃদয়ের কথা বলে। হৃদয়হীন কেউ ছবির ভাষা বুঝতে পারেনা। ছবির সাথে কথা বলতে হলে একটি হৃদয় থাকা বাধ্যতামূলক। ছবি পথ শিশুদের অব্যক্ত অপ্রকাশিত যাপিত জীবনকে তুলে ধরেছে নিপুণভাবে। ছবি কথা বললে পৃথিবী নির্বাক দৃষ্টিতে কেবল চেয়েই থাকে, থাকতে হয়।

আমিও অপলক চেয়ে থেকে বলেছি বারবার
ধরার পথে যেন না থাকে-
োন পথশিশু আর...
পাঠ অনুভূতি