সর্বশেষ

শ্বাসরুদ্ধকর ক্রিকেট ম্যাচে একটি অবিস্মরণীয় বিজয়ের গল্প



একসময় ক্রিকেট ছিল আমার প্রাণ। সকাল নাই সন্ধ্যা নাই ক্রিকেট খেলতাম। বৃষ্টি হলে মোজায় বল বেঁধে ঘরের মধ্যে খেলতাম। রাতে বাড়ির আঙিনায় লাইট জ্বালিয়ে খেলতাম। ক্রিকেট ছিল আমার জীবনের অংশ। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকের আধিপত্যে ব্যাট ও বলের পরাজয় ঘটে। সে অনেক কথা। অন্য একদিন লিখবো। ক্রিকেটার হওয়া তাই হয়নি। তবে একটু আধটু খেলা চালিয়ে গেছি।

ছোটখাটো অনেক স্মরণীয় ইনিংস খেলেছি। তারমধ্যে ম্যাচ উইনিং স্কোরই বেশি। আজ ( ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬) জেএমএস ক্রিকেট লীগে এমন একটি ম্যাচ খেলেছি। ১০ ওভারের খেলা। ৪৫ তম আবর্তন প্রথমে ব্যাট করে ৯৭ রান করে। জবাবে আমাদের শুরুটা আশানুরূপ হয়নি। প্রথম উইকেট পতনের পর আমি যখন ব্যাটে নামি তখন আমাদের দরকার পাঁচ ওভারে ৬৮ রান। অনেকটা নিশ্চিত পরাজয় মাথায় যেন।কারণ ৪৫ তম আবর্তনের টুর্নামেন্টের শ্রেষ্ঠ বোলিং লাইন আপ। তারপরেও রাকিব স্যারের উদ্দীপনায় শেষ ওভার পর্যন্ত লড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।স্যার বললেন,'ম্যাচ জিতি আর হারি তোমাকে ৯ ওভার ৫ বল পর্যন্ত পিচে থাকতে হবে'।স্যারের কথামত মাটি কামড়ে ধৈর্য ধরে মাঠে থাকলাম।স্যার আর আমি ঝড়ো গতিতে রান নিয়ে টার্গেট ৩ ওভারে ৩৯ এবং ২ ওভারে ২৭ রানে নিয়ে এলাম।

তারপর ম্যাচ জয়ের চাপ। হারলে ছিটকে পড়বো টুর্নামেন্ট থেকে। সামনে শুভ, অনুপ, রাফসানের জাত পেসার। বাইরে ৪১ এর প্রত্যাশার চাপ।সব মিলিয়ে পিচে থাকা রাকিব স্যার আর আমার মাথার উপর সাত আসমানের বোঝা। সেই বোঝার ভার হালকা করতে স্যার আর আমি চেষ্টা শুরু করি। নবম ওভারে মূল্যবান ১৫ রান আসে। শেষ ওভারে জেতার জন্য দরকার ১৪ রান।

স্যার বললেন, স্ট্রাইকে তুমি। ছয়টি বলই তুমি খেলো। যা হয় হবে। আমি স্যারের দোয়া নিয়ে ব্যাট হাতে দাঁড়ালাম। জীবনে অনেক ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছি। ওয়ান ডাইন বা ওপেন করার কারণে শেষ ওভারের এই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের সম্মুক্ষিণ কখনো হইনি। যাহোক, সেসময় যে চাপের মধ্যে ছিলাম তা রাকিব স্যার আর আমি ছাড়া আর কাউকে ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব নয।

খেলায় আসি।বোলার রাফসান।প্রথম বলটা লেগ সাইডে করলো। আমি ব্যাট সজোরে চালিয়ে উইকেটের পিছন দিয়ে চার রান করলাম, মানে বাউন্ডারি হাঁকালাম। আর মাত্র ১০ রান। বল আছে পাঁচটি। স্যার বললেন, ২ টা ছক্কাও দরকার নেই। ঠান্ডা মাথায় একটা চার আর একটা ছক্কা মারলেই হবে। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে ব্যাট হাতে নিলাম। দ্বিতীয় বলটা ডট গেল। আবার প্রচণ্ড চাপ। শেষ ওভারে যখন মাথায় রানের বোঝা সেই সময় ডট যাওয়া মানে বুক ধড়ফড় করা। স্যার বললেন, ব্যাপারনা, মঈনুল, তুমি পিচে থেকে দেখে মারো। আমি ফের ব্যাট হাতে প্রস্তুত হলাম কিছু করার। রাফসান দৌড়ে তৃতীয় বলটি ছোঁড়ার জন্য আম্পায়রকে অতিক্রম করলো। তৃতীয় বলটা সজোরে টেনে লেগ সাইডে ছক্কা মারলাম। খেলা এখন আমাদের কনট্রোলে। তিন বলে চার লাগে। পরের বলটা অনেকটা রিলাক্সে মারতে গেলাম। কানায় লেগে বল গালিতে ফিল্ডারের কাছে গেলো।দৌড় দিলাম। অর্ধেক যাওয়ার পর স্যার ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি স্ট্রাইকে থেকেই মারো। Cool... দেখে একটা মারলেই হবে। তুমি চাপ নিওনা।


এখন লাগে দুই বলে চার রান। প্রেসার! ভয়ঙ্কর প্রেসার! মাঠের বিপক্ষ দলের চিত্‍কারের প্রেসার! আমার সতীর্থদের চাওয়ার প্রেসার, অপর প্রান্তে থাকা প্রিয় শিক্ষককে একটি বিজয় উপহার দেয়ার প্রেসার,টুর্নামেন্টে টিকে থাকার প্রেসার এবং অধিনায়ক হিসেবে দলের জয় পরাজয় নির্ধারণ করার প্রচন্ড প্রেসার! এই সব কিছুকে জয় করতে হবে মাত্র ২ টি বলে। বল করতে আসছে রাফসান। আমি স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গীতে সামনে ঝুঁকে মারার জন্য ব্যাট হাতে প্রস্তুত। এবং ছক্কাআআআআ...! ঐ মুহূর্তে নিজেকে মনে হচ্ছিল পৃথিবীকে জয় করা কেউ! দীর্ঘ প্রায় এক ঘন্টা পর প্রাণখুলে নিঃশ্বাস নিলাম!স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিলাম। বন্ধুরা এসে আমাকে জাপটে ধরেছিল! আম্পায়ার রিংকু ও মনির এবং স্কোরার তমাল এনে জানালো, ভাই, আপনার হাফ সেঞ্চুরি হয়েছে। আমি সত্যিই জানতাম না এই অল্প সময়ে এমন ঘটনা ঘটে গেছে।

রাকিব স্যারের মুখে বিজয়ের হাসি! স্যার এই ছোট্র মাঠে কষ্ট করে যেখানে এক রান হয়না সেখানে দেীড়ে দুই নিয়েছেন। ওপেনিংয়ে নেমে পুরো ম্যাচে তিনি একপাশ ধরে রেখেছেন। আমরা নয় উইকেটে জিতেছি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য আমরা ৯ ওভার পাঁচ বলেই জিতি। স্যার বলেছিলেন, জিততে হলে তোমাকে ৯ ওভার পাঁচ বল পর্যন্ত থাকতে হবে! অবিশ্বাস্য! সেটিই ঘটলো! আমাদের স্যারেরা এমন স্বপ্নদ্রষ্টাই। আমরা তা বাস্তবায়ন করি। খেলার মাঠে বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত এটি!

চমত্‍কার খেলেছে আমাদের পরিবারের কনিষ্ট সদস্য ৪৫ তম আবর্তনের ছোটভাইয়েরা। আমি নিশ্চিত করে বলে দিতে পারি, পেস এটাকে ৪৫ তম আবর্তন সেরা এবং এই ছেলেগুলো একদিন জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যাম্পিয়ন করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

পরিশেষে আমাদের ৪১ তম আবর্তনের সকল খেলোয়াড় এবং শুভাকাঙ্খীদের ধন্যবাদ জানাই। সত্যি বলতে, এ বিজয় আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। পরের ম্যাচ দুটোতে এই খেলার ধারাবাহিকতা থাকবে এটাই কামনা।
পাঠ অনুভূতি