সুখনিদ্রা ও ভরপুর খাওয়ার পর গলা উঁচু করে হে সভ্যতা,
কাকে তুমি কোন সাহসে বেশ্যা বলছো ?
যার শরীরের বিনিময়ে সাত সদস্যের পরিবারে দুবেলা ভাত জোটে,
তিন মাস পর দরিদ্র বাবা কফের ঔষুধ কেনার কিছু টাকা পায়,
ছোট বোন ও ভাই যার জন্য বই হাতে নেয়,
বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা দাদা-দাদু কিংবা নানা-নানী যাকে কাছে নিয়ে পান খেতে চায়
তাকে তুমি, তোমার অজাতেরা বেশ্যা বলছে কোন অধিকারে?
হে সভ্যতা, তুমি সময় করে তোমার তুলসী পাতাদের দিকে চেয়েছো কখনো?
তারাও শরীর ব্যবহার করে, একটার পর একটা পাল্টায় ব্রেকাপের সস্তা অজুহাতে,
তারপর বিদেশী পারফিউম দিয়ে ঢেকে ফেলে পুরোনো খেলার চিহ্ন;
তারা হয়তো প্রকাশ্যে টাকা নেয়না, তারা প্রচুর গিফট নেয়-রেস্টুরেন্টে যায়, খায়,
কিংবা ঘোরে বা শপিং করে। বিনিময় তোমার বয়ফ্রেন্ড নামধারী প্রেমিককে দেহপ্রদান করতেই হয়
তবু হে সভ্যতা, তোমার কামবাদী জংলী পুরুষ রোমান্টিক প্রেমিক বলে পরিচিতি পায়, কোনো অমানুষ খদ্দের না
তোমার গুছিয়ে সং সেজে ইংরেজি-হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলতে পারা স্মার্ট নারী বেশ্যা নয়: এক জ্বলজ্যান্ত প্রেমিকা
বেশ্যা তো বিত্তহীন, শিক্ষাহীন চন্দ্রিমা, রমনা, অভিসার-আনন্দ, সোহরাওয়ার্দীতে গাঢ় লিপিস্টিক মেখে দাড়িয়ে থাকারা
বাহ! কি চমৎতকা থিওরিটিক্যাল জাস্টিফিকেশন ঘূণে ধরা ইকোনমিক সিস্টেম ও সর্বগ্রাসী রক্তচোষা, ক্যৗাপিট্যালিস্টিক বিশ্বায়নকে ইতিবাচক রেখে!
হে সভ্যতা, শরীর দিয়ে জীবীকা নির্বাহই কি তোমার ব্রিটিশ, ইউরোপ ও মার্কিন দাসত্ত্বের একাডেমিক শিক্ষায় বেশ্যার সংজ্ঞায়ন?
তবে কেন শরীর দেখিয়ে, হেলিয়ে দুলিয়ে অর্জন বেশ্যাবৃত্তি হয়না?
তোমার সভ্য জগত্ কি জানে দৌলতদিয়ার সতের বছরের মেয়েটির করুণগাঁথা, জীবনের কথা,
তাঁর অল্প দামের কাঁচের চুড়ি ভাঙার শব্দের, তাঁর জীবনে আসা বেওয়ারিশ কুকুরজাতীয় নষ্ট প্রেমিকের কথা-
বেড়ানোর অথবা কর্মের আশা দিয়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া বেশ্যার কান্না কি সভ্যসন্তানদের কানে পৌঁছে?
না, কিভাবে পৌঁছাবে-? সভ্যতার দর্পণ, টিভি-পত্রিকা ভরা অবেশ্যাদের প্রাচুর্য,
পুরুষের মুখোশে দেহলোভী শূকরের দুর্দান্ত দাপটে
সস্তা মেকাপের খদ্দের প্রত্যাশী ঝুমকা বা মায়াদের অস্তিত্ত্ব বিপন্ন হয়
দৈনিক,সাপ্তাহিক,মাসিক বা সাড়ে সাতটার বুলেটিনে ওরা পরাজিত, শঙ্কায়।
সভ্যতা, তোমার উপরে দাবড়ে বেড়ানো অশিক্ষিত ধর্মান্ধরা কি বলে এসব শুনেছো তা?
এই মেয়েটি বিপদে পড়ে এখানে এসেছে, ও তো ইচ্ছায় আসে নি
আর ঐ মেয়েটি, হিজাব কিংবা ফ্যাশনেবল বোরখাওয়ালী আসক্ত কামনা মেটাতে নিজেকে বিলাচ্ছে; ও আর এ এক হতে পারেনা
অথচ মোল্লা থেকে প্রগতিশীল, মধ্যপন্থী থেকে সাম্যবাদী সব শালা ভন্ডের চোখে ও মগজে
প্রান্তিক, দরিদ্র ও দিনমজুর আমার বোনটিই কেবল বেশ্যার বেশে আসে,
ওর দোষ ও অর্থ নেয়, ওর দোষ ও বাবা মাকে ভুলে যায়না-
এমন কি এক রাতে অর্ধশত কুত্তার পাল্লায় পড়েও ।
ওহে সভ্যতা,কাকে তুমি বেশ্যা বলছো তা কি ভেবেছো?
কাকে তুমি কোন সাহসে বেশ্যা বলছো?
কাকে তোমরা ঘৃণা করছো?
কাকে তোমরা গালি বানিয়েছো?
ও তো স্বেচ্ছায় শরীর দেখিয়ে বেড়ায় না, ও তো দৈহিক বিলাস কি তা চেনেনা
ও-ই তো একদিন বা এখনো পুরুষের নষ্ট চোখের ভয়ে ওড়নাবূহ্য, কিংবা শাড়ীর প্যাঁচ শক্ত করে,
ও কেন এখানে? কে এনেছে? কারা এনেছে?
হে সভ্যতা, তোমার গুণধর পুরুষ শূকর শাবকেরা ওকে শেষ করতে এনেছে তীলে তীলে
তবু ও মানুষ
-ও-ই প্রকৃত মানবী, চোখে আঙুল দিয়ে অমানুষ চেনায় প্রতিদিনই,
প্রতিনিয়ত, নিয়তিবাদী ও সংশয়বাদীদের তাত্ত্বিক ভন্ডামীকে ও কষে থাপ্পড় মারে।
বেশ্যাকে নিয়ে গল্প পাতে গল্পকার, লেখে সংবাদিক, বানায় ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র কোন স্যাক্রিফাইসভোগী অসুস্থ পরিচালক
কানের লাল গালিচা মাড়িয়ে উপরে ওঠে বুর্জোয়ার দল, সেখানেও বিক্রি হয় আমাদের বোনেরা,
এই সমাজের অসম বণ্টণকে নিয়ে তুব তারা কিছু বলেনা, সিস্টেম ভেঙে সম্পদের সুষম ভাগ করলে আর কোন বেশ্যা তো থাকবেনা
এই গরীব দেীলতদিয়া, টাঙাইলের পাউডার মাখা বেশ্যাদের নিয়ে হওয়া কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্র, শর্টফিল্ম, এনজিওবাদ তখন মূল্যহীন হবে
তা হতে দেবেনা এই বেশ্যার পলিটিক্যাল ইকোনমি ভোগ করা বাজেপাল, ওদের দল খুব ভারী।
কাকে তুমি বেশ্যা বলছো, হে অ যুক্ত সভ্যতা?
এই জীবন ওঁর না, এই জীবন তোমাদের সবার তৈরি বৈষম্যের ফল, ভোগবাদীতার ফল, নীতিহীনতার ফল, অনিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের কুৎসিত কুফল
ওঁ তোমাদের এই সমাজের আসল চেহারা
তীব্র অসাম্য ও বঞ্চনার করুণতম বর্ণনা
ও তোমাদের নিকৃষ্ট সভ্য জগ
ওঁ যে তোমাদেরই অমানবিক অবহেলা,ও যে মানবতার নিষ্ঠুর, নৃশংস কান্না।
যদি পারো, একদিন খুলে রেখে ঐ শ্যুট টাই, লেহেঙ্গা আর মিনি স্কার্ট, ফ্যাশনেবল বোরখা, জুব্বা আর থ্রি কোয়ার্টার্স
মানুষের মন নিয়ে দেখে এসো ওঁর পরিবারের চাকা কিভাবে ঘোরে
তারপর বদলে দিও বেশ্যার সংজ্ঞা অথবা উঠিয়ে দিও পৃথিবী থেকে সব ধরনের বেশ্যাবৃত্তি
বলো, সৎ সাহস আছে কি তোমার, বলো তোমরা তাদের জীবনের সমাধান খুঁজতে যাবে কি?
(৭ ফেব্রুয়াপরী ২০১৫ ও সংযুক্তি ও পরিবর্ধন ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৭)
