১৪ ফেব্রুয়ারী,১৯৮৩
বাংলাদেশ জুড়ে স্বৈর শাসক এরশাদের মজিদীয় শিক্ষানীতি বাতিল ও তার পতনের দাবিতে ছাত্র,তরুণ ও তরুণীরা রাস্তায় নামে। ভিত কেঁপে ওঠে স্বৈরাচারের।ঢাকার মিছিলে গুলি চালানো হয় আমাদের বিপ্লবী ভাই ও বোনের উপর। অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ দেয় জয়নাল,জাফর,দিপালী,কাঞ্চনসহ কমপক্ষে দশজন। সেই রক্তের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ এ পতন ঘটে এরশাদের। এরশাদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বড় ও রক্তাক্ত আন্দোলনের সুত্রপাত ঘটায় ১৪ ফেব্রুয়ারী। এ কথা বাঙালি ভুলে যায় কিভাবে?
১৪ ফেব্রুয়ারী,২০১৭
কে জয়নাল?জাফর আবার কে?দিপালী,এ নাম তো কখনো শুনিনি...ধুর কি সব আবোল তাবোল কথাবার্তা।
আজ হচ্ছে ভালবাসা দিবস, পশ্চিমা ধাঁচে মজামাস্তি করার উপলক্ষ, আজ হচ্ছে বাঙালি সংষ্কৃতির বারোটা বাজানোর দিবস। আজ হচ্ছে ইউরোপে লিভ টুগেদারে গা ভাসিয়ে মজায় দিন কাটানো শাম্মী ও অনন্য আজাদের প্রকাশ্যে নির্লজ্জ্রের মত চুম্বন খাওযার দিন। এই সব জাফর দিপালী এগুলো মনে রাখার সময় আছে এখন?
জয়নাল,দিপালী,জাফর ও কাঞ্চনের রক্তের উপরে কনভার্স ও হাই হিল পায়ে দিয়ে প্রকাশ্যে ফষ্টিনষ্টি করার জন্যই এখন ১৪ ফেব্রুয়ারী আসে বাংলাদেশে। দিনে উদ্যানেে এবং সন্ধায় ও রাতে লিটনের ফ্ল্যাটে প্রজন্ম দেহতত্ত্বের ষোলকলা পূর্ণ করতে দ্বিধা করেনা।
২।
এই নির্লজ্জ প্রজন্মই না গতকাল পালন করেছে পয়লা বসন্ত?এই জিন্স আর টাইট টিশার্ট পরা তরুণীই না গতকাল হলুদ শাড়ি পরেছে?এই কানে এয়ারফোন আর পশ্চাত্দেশের নিচে প্যান্ট নামিয়ে হাঁটা ফ্রেন্চ কাটিং দাঁড়ি ছেলেটিই তো গতকাল পাঞ্জাবী পায়জামা পরে বাঙালি ছিল,আজ এর এমন ৩৬০ ডিগ্রি পরিবর্তিত অবস্থা কেন?ঐ টিভির সস্তা সাংবাদিক গোষ্ঠী না গতকাল বাঙালী সেজে খবর দিয়েছে, পড়েছে ? আজ ওরা কেন তবে অপসংষ্কৃতিকে প্রচার করছে? এটা কোন ধরনের বাঙালীপনা?এটা কোন প্রকারের বাংলাদেশী আচরণ?
এই প্রজন্মই কী একুশে ফেব্রুয়ারী পালন করতে মুখিয়ে আছে? এরা বাংলা ভাষা ও সংষ্কৃতি রক্ষা করবে?না,কখখোনো না । এরা বাঙলাদেশ, বাঙলা ও বাঙালি সংষ্কৃতির প্রকা্শ্য ধর্ষক। ধর্ষক প্রজন্ম!
৩।
এদেশে এই অশ্লীল ও অপসংষ্কৃতির ডিলার শফিক রেহমান।তিনি বুড়ো বয়সেও যৌবনের ঠেলায় উথলে পড়েন।তার অদম্য অপরুচি সুকৌশলে লাল গোলাপ ও যায় যায় দিনের মাধ্যমে এ জাতির উপর ঢেলে দিয়েছেন তিনি।আর তা অক্ষরে অক্ষরে ধারন করে ভোগবাদী ও শিকড়হীন অপপ্রজন্ম যারা জানেনা নিজেদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংষ্কৃতি।এদেশের মিডিয়ায় জাতীয়তাবোধহীনদের সংখ্যা সর্বাধিক।তারা লাল সবুজকে সম্মান ও এর উপর বিশ্বাস রাখেনা।রাখলে বাঙালির শোকের ফাল্গুনে এমন বাজে একটি ভোগবাদী সংষ্কৃতির অপপ্রচারে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করতোনা।বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর তার নাম পুঁজিবাদ(Capitalism)।এর শক্ত বুনিয়াদ ও ক্রমবিকাশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপে।এই ক্যাপিট্যালিজম সবকিছুকে বেচতে চায়।আপনার আমার আবেগ ও ভালবাসাও এর কাছে পণ্য ছাড়া কিছুনা।তো ক্যাপিট্যালিস্টরা তাদের সাংষ্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদটা ছড়িয়ে দিতে এইসব ডে'ফের ব্যবস্থা করেছে।ফুল,বডি স্প্রে,কার্ড,চকলেট,হোটেল,মুভি দেখা এর সাথে পুঁজি জড়িত।১৪ ফেব্রুয়ারি মোটাদাগে ব্যবসার দিন।এমন ব্যবসা আমাদের সংষ্কৃতির জন্য হুমকি।বাঙালি তার মা,বাবা,ভাই,বোন ও স্ত্রীকে ভালবাসতে কোনদিন কোন দিবসের আশ্রয় নেয়নি।ফালতু Modernization নামের WESTERNIZATION প্রক্রিয়া বাংলাদেশে এই বাংলাদেশবিরোধী বাজে উপলক্ষ এনেছে।আর এতে ঘি ঢালছে পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলসেসিয়ান মিডিয়া ও মিডিয়াকর্মী।
৪।
যে প্রজন্ম জাতীয় ইতিহাস জানেনা,চর্চা করেনা সে প্রজন্ম প্রতিবন্ধী।যে প্রজন্ম তার সংষ্কৃতি ধারন করেনা সেটি অপপ্রজন্ম,আগাছা।যে প্রজন্ম জাতির অতীত ঐতিহ্য,সংগ্রামগাঁথা,সাফল্য,পরাজয় ও অর্জনের কীর্তি জানেনা সে প্রজন্ম শিকড়হীন পরগাছা।এই প্রজন্ম একটি দেশ ও একটি জাতির ধ্বস নামাতে বড়জোর বিশ বছর সময় নেবে অথবা তার আগেই।এদের কাছে মজামাস্তি ও জীবনের যেীনতাপ্রাপ্তিই সবচেযয় বড় কথা। এরা দেশ ও দেশের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি একফোঁটা দায়বদ্ধতা অনুভব করেনা। দেশের প্রান্তিক কৃষক কি এই ভালবাসা দিবস পালন করে?না, উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কোন মহামানব এই দিবস সম্পর্কে জানেনা। হাজার বছরের বাঙালি সংষ্কৃতির ও কোখাও ছিটেফোঁটা নেই এই বাজে কর্পোরেট দিবসটির।এই ফাল্গুনের কোন এক ৮ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য রক্ত ঢেলে দেয় সালাম বরকত জব্বার ও আরো অনেকে।তাঁদের সেই রক্তের উপর অশ্লীল পশ্চিমা সংষ্কৃতি চর্চা করে আমরা নিজেদের শিকড়হীনতাকে ফুটিয়ে তুলছি না তো?যে হৃদয় 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি' বিশ্বাস করে সে হৃদয় ভ্যালেনটাইন ডে পালন করতে পারে?
৫।
১৪ ফেব্রুয়ারী স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস।এই দিন শহীদ হওয়া প্রতিটি আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।কাঞ্চন,দিপালী,জাফর ও জয়নালের প্রবাহিত রক্তধারা মাড়িয়ে যারা ভালবাসা দিবস নামের অশ্লীল অপসংষ্কৃতিতে গা ভাসাবে তারা বাংলাদেশকে ধারন করেনা।প্রকৃতপক্ষে তারা পুঁজিবাদী,পুঁজি পেলে এ দেশে,এ সংষ্কৃতি বিক্রি করে পাশ্চাত্যে চলে যেতে দ্বিধা করবেনা।তারা ভোগবাদী,ভোগের তাড়নায় এরাই নিজ সন্তানকে ফ্রিজের মধ্যে রেখে হত্যা করে,মা বাবাকে জবাই করে।এরা তারাই,হ্যাঁ এই ভ্যালেনটাইনস ডে উদযাপনকারীরাই তারা।এই ভালবাসা দিবস পালনকারী,তার সমর্থনকারী ও প্রচারকারী সকলেই বাংলাদেশ, দেশের সংষ্কৃতি, শ্লীলতা ও সাম্যের শত্রু।
আমার সকল বন্ধু,বড় ভাই,আপু.স্নেহের ও শ্রদ্ধার সকল প্রিয় ও অপ্রিয়জনকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের রক্তিম শুভেচ্ছা।
বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক
পুঁজিবাদ ধ্বংস হোক
ভোগবাদ নিপাত যাক ।
#স্বৈরাচারপ্রতিরোধদিবস
(২০১৫ এর একটি লেখাকে সম্পাদিত করে।)
