সর্বশেষ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাগ নিয়ে সপ্তকথা এবং একটি পরিচয়পত্র


কয়েকটা কথা বলা দরকার।কথিত র্যাগ নিয়ে ক্যাম্পাসে বেশ কথা হচ্ছে।আমাদের সময়েও ছিল।আমরা এক ধরনের ভয়ে থাকতাম।৩৯ এর ভাইয়েরা আসতো।গল্প করতো,হাসতো,হাসাতো,কিছু সময় কঠিন করে কথা বলতো।ভয়টা ছিল মধুর।সেই গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেটার ভেতরের জড়তা কাটাতে সহায়তা করেছিল সিনিয়ররা।৪০ তম আবর্তনের হাতে গোনা কয়েক জনের বাজে আচরণ ছিল এটা স্বীকার করছি।কিন্তু অধিকাংশই ছিল ভাল।এমন কি যারা খারাপ ব্যবহার করেছিল তাদের সাথেও পরবর্তী সময়ে ভাল সম্পর্ক হয়েছে।এটাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।এটি একটি পরিবার।পরিবারের কারো উপর রাগ করে বেশিদিন থাকা যায়না।কিন্তু এখন যারা র্যাগ দিচ্ছে ও যারা এর স্বীকার এরা উভয় গোত্রই অসহিষ্ণু,আত্মকেন্দ্রিক।দ্বন্দ্বটা এখান থেকেই শুরু।কাটতি বাড়াতে মিডিয়াও এই সুযোগ লুফে নেয়।রঞ্জন ও অতিরঞ্জনে জাহাঙ্গীরনগরের সব ইতিবাচকতা ধুয়ে যায় কথিত সব র্যাগের খবরের স্রোতে।'জাবির জাহানারা হলের সেই মেয়েটি এবছর ভর্তি হয়নি এখনো?সে ভাল আছে তো?'
২।
জাহাঙ্গীরনগর সাধারণ কোন বিশ্ববিদ্যালয় নয়।শিক্ষায় অন্যতম শ্রেষ্ঠত্ত্বের পাশাপাশি এটি বাংলাদেশের সাংষ্কৃতিক রাজধানী।এখানে নিজস্ব একটি সংষ্কৃতি রয়েছে।এটি কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা।এই সংষ্কৃতি তার আপন গতিতে ৪৫ টি বছর চলছে।এই সংষ্কৃতি আত্মার বন্ধননির্ভর।প্রত্যেকটি মুখ প্রত্যেকের পরিচিত থাকার এ সংষ্কৃতি।এই সংষ্কৃতিই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে মধুর কিছু স্মৃতি দেয়।সেই স্মৃতিটুকু পেতে বাকি চারটা বছর হা হুতাশ করে সকলে।আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথম বর্ষ যখন দ্বিতীয় বর্ষে আসে সে ই তখন পরিচিত হতে যায়।প্রথম বর্ষের র্যাগভীত সেই ছেলে,সেই মেয়েরাই ছোট ভাই ও আপুদের সাথে পরিচিত হতে উদগ্রীব হয়।এ এক অদ্ভূত মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া।যারা এই পরিস্থিতির কবলে পড়েছে তারা ছাড়া এটা কেউ বুঝতে পারবেনা।ফলে গণমাধ্যমে জাবির কুত্‍সা প্রচার করে পৈচাশিক সুখ পাওয়া কেউ এই সাইকোলজির অনুসন্ধান করেনা।কেন র্যাগের ভয়ে আতঙ্কিত, শঙ্কিত সেই সব মুখগুলোই এক বছর পরে জুনিয়রদের সঙ্গে কথা বলতে চায়?অনেকে বলতে চায়, এর কারণ আর কিছু না।একটি বন্ধন ও আন্তরিকতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ।
৩।
কথিত র্যাগের নামে কিছু অসুস্থ ছাত্র ও ছাত্রী ছোটদের শারিরীকভাবে নির্যাতন করে।এটি স্পষ্টত নিপীড়ণ।আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় গালিগালাজ করে।এটিও চরম অসভ্য আচরণ।এই গর্হিত অপরাধে এদের বিচার হওয়া উচিত।তবে এইসব ঘটনার সংখ্যা একদম হাতে গোনা।অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত হওয়া শেষ হয় গান গাওয়া এবং হালকা নাস্তার মাধ্যমে।সেসব মিডিয়ায় আসেনা।
৪।
ক্যাম্পাসে যত রাজনৈতিক মিছিল হয় তাতে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৮০ শতাংশই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।এটি আমাদের সবার জানা।সারা ক্যাম্পাসে র্যাগের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সম্প্রসারিত হয়ে এইসব মিছিল পর্যন্ত আনা যেতে পারে।কারণ অনেক সময় এটি বাধ্যতামূলক করা হয়।তবে দ্বিতীয় বর্ষ থেকে অটোমেটিক এই বাধ্যবাধকতা উঠে যায়।
৫।
জাকসু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের ও ভবিষ্যত্‍ নেতৃত্ত্ব গঠনের প্রতিষ্ঠান।এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষীয়ান শিক্ষার্থী ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হওয়া সম্মানিত স্যারদের কাছে শুনেছি,জাকসু কার্যকর থাকা অবস্থায় এই অনাকাঙ্খিত র্যাগিং বা বাজে আচরণ ছিলনা।তখন সব সিনিয়রই জুনিয়রদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্টভাবে মিশতো।ভাল আচরণ করতো।কারণ এই আচরণই জাকসুর প্রতিনিধি হওয়া নির্ধারণ করতো।র্যাগিং বন্ধে জাকসু সচল করা যেতে পারে।
৬।
পরিচিত হওয়া এবং নিপীড়ণ এক নয়।পরিচয়ের নামে যারা মানসিক নির্যাতন করে তাদের বিচার হওয়া উচিত।আবার পরিচিত হওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াকেও নিপীড়ণ বলা যেতে পারেনা।কারণ জাহাঙ্গীরনগর একটি পরিবার।পরিবারের ছোট সদস্যদের জীবনযুদ্ধে ভালভাবে চলার অল্প একটু দীক্ষা,মার্জিত আচরণ,বড়দের সম্মান, শিক্ষকদের মর্যাদার ব্যাপারে জানানো যেতে পারে।তাছাড়া ইন্টারমিডিয়েটের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা একজন শিক্ষার্থীকে নতুন পৃথিবীতে স্বাগতম জানাতে চায় এক বছর আগের সেই নতুনেরাই।
৭।
৩৭ এর পর থেকে ক্যাম্পাসে পুরনো র্যাগ আমলের সমাপ্তি ঘটে।এরপর ছিটেফোটা ছিল।তখন সবাই সবাইকে চিনতো।৪১ তম আবর্তনের পর মিডিয়ার অতিরঞ্জন ও প্রশাসনের কড়াকড়ি আরোপের পরে কথিত র্যাগ আর নেই ক্যাম্পাসে।প্রত্যেক ব্যাচ তার নিচের ব্যাচের প্রতি অভিযোগ দেয় বেয়াদবির।কমন ফেনোমেনা।৪২,৪৩,৪৪ প্রশাসনের নিরবচ্ছিন্ন আশ্রয়ে প্রথম বর্ষ পার করেছে।কিন্তু ঝামেলা তৈরি হয়েছে তখন যখন এরাই যার যার নিচের ব্যাচের কাছে গিয়েছে।এরা নিজেরা যা পায়নি,যা দেখেনি তা যখন অপরের উপর প্রয়োগ করতে গিয়েছে তখন হযবরল হয়েছে।ফলে অজান্তে বা জান্তে মানসিক নিপীড়ণ করে ফেলে বা ফেলছে।এটা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।জাহাঙ্গীরনগরে কোন নিপীড়কের স্থান নেই।৪১ এ নিপীড়ক থাকলে তার বিরুদ্ধেও বিচার হোক।তবে পরিবারের স্বার্থে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচিত হওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।আবার এই সোস্যাল মিডিয়া নির্ভর ভোগবাদী প্রজন্ম নিজেকে ছাড়া কাউকে কেয়ার করেনা।ক্যাম্পাসের সবাইকে চেনেওনা।এই দুই মিলে ক্যাম্পাসে সিনিয়রের প্রতি গায়ে হাত তোলা বেশ বেড়েছে।এসবও বন্ধ হওয়া দরকার।এটা নৈতিক ব্যাপার।
***
নিপীড়ণমূলক র্যাগ বন্ধ হোক।বন্ধুত্ত্ব ও ভ্রাতৃত্ত্বসুলভ পরিবেশ গড়ে উঠুক।জুনিয়র কর্তৃক সিনিয়রের গায়ে হাত তোলা বন্ধ হোক।দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়, সবুজসমুদ্র জাহাঙ্গীরনগর হোক আমাদের সবার আত্মার মিলনবিন্দু।ক্যাম্পাসে সুস্বাগতম হে, ৪৫। আমি-
মঈনুল রাকীব
৪১ তম আবর্তন
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ
আল বেরুনী হল
গোপালগঞ্জ ।
একদিন এই পরিচয়টা শিখেছিলাম এবং চিরদিন এই পরিচয়টা গর্বের সঙ্গে দিয়ে যাবো।এটি কোন প্রচলিত গলায় ঝুলানো নেমপ্লেট নয়,হৃদয়ে গেঁথে থাকা পরিচয়পত্র।এর সঙ্গে গণরুম, চৌরঙ্গী,বটতলা,ডেইরি,প্রান্তিক,মুন্নী,মুরাদ,মহুয়া,মুক্তমঞ্চ,টারজান, লন্ডন ব্রিজ, পুরাতন কলা ভবন, পরিবহন চত্ত্বর,পিঠাচত্ত্বর নিবিড়ভাবে জড়িত।এটি আত্মার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।এই পরিচয়পত্রটার মেয়াদ আজীবন...।

১৪ মার্চ, ২০১৬।
পাঠ অনুভূতি