সর্বশেষ

আল মাহমুদের চরিত্র হরণ, হাবিবাহ নাসরীন ও প্রাসঙ্গিক সাতটি কথা

এই ছবিটা ব্যবহার করে প্রোপাগাণ্ডা চালিয়েছে বাজে মানসিকতার মানুষেরা।

গতকাল ফেসবুকে একজন ব্যক্তি একটি জঘন্য অপপ্রচার চালিয়েছেন।আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ত্ব আল মাহমুদ ও তার কন্যা সমতুল্য তরুন ছড়াকার ও কবি হাবিবাহ নাসরিনের 'বিয়ের'খবর।ফেসবুকে এই প্রায় সাত বছরের জীবনে এরচেয়ে ডাহা মিথ্যাচার আগে কখনো দেখিনি।বেঁচে থাকা দেশের শ্রেষ্ঠ কবিকে শেষ বয়সে এভাবে কলঙ্ক কোন সুস্থ মস্তিষ্কের ও ভালো পরিবারের কেউ দিতে পারেনা বলেই বিশ্বাস।আমি অবাক হয়েছি এই অসভ্য মিথ্যাচারে কিছু পরিচিতদের গা ভাসিয়ে দিতে দেখে।আল মাহমুদের চরিত্র হরণ করে কি লাভ আমাদের?আমরা কি মৃতপ্রায় এক ব্যক্তির পিতৃত্ত্বকে নোংরা করলাম না?আমরা কি এক নারীর কন্যা পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করলাম না
২।
যে ব্যক্তি এই ঘৃণ্য অপপ্রচারটি চালিয়েছে তার নাম কামাল পাশা চৌধুরী।এমন পৈচাশিক মিথ্যাচার করে সে কি অর্জন করেছে সেটা জানিনা তবে এই প্রোপাগান্ডা তার আসল ব্যক্তিত্ত্বকে ফুটিয়ে তুলেছে এটা বলা যায়।আল মাহমুদ প্রবীণতম কবি ও ঔপন্যাসিক।তিনি যুবক জীবনে কমিউনিস্ট ছিলেন,এই জীবনে আস্তিক হয়েছেন।পরিষ্কার করে বললে তিনি জামায়াতি ঘরানোর হয়েছেন।এগুলো আল মাহমুদ সম্পর্কে অপ্রিয় সত্য।কিন্তু এই সত্য তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ভুলিয়ে দিতে পারেনা,এই সত্য ভাষার জন্য তার অবদান ও ত্যাগও ভুলিয়ে দেয়না,তার জামায়াতি পরিচয় সাহিত্যে তার অবদানকে অস্বীকার করাতে পারেনা।নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে জামায়াত একটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক দল।কিন্তু এই ঘৃণা আল মাহমুদের উপর কেন যাবে?
আমরাই তো তাঁকে প্রান্তীকরণ করে জামায়াতের খোঁয়াড়ে ঢুকিয়েছি।আমরা শামসুর রহমান,গুণকে ফোকাস করে তাকে সরিয়েছি।এই সুযোগ গ্রহণ করেছে ওঁত্‍পেতে থাকা জামায়াত।কবির বিরুদ্ধে কবিকে দাঁড় করিয়ে আল মাহমুদকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ছায়াতলে পাঠিয়ে দিতে আমরাও কি দায়ি নই?অতএব তার চরিত্র হরণের জন্য এতোটা নোংরা পন্থা অবলম্বন না করলেই হতো।প্রয়াত হুমায়ূন আজাদ,আহমদ ছফা,শামসুর রাহমান,হুমায়ূন আহমদ আল মাহমুদকে অস্বীকার করেননি।কামালা পাশা ও তার প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাসীরা কিভাবে করেন?
৩।
এই নোংরা অপপ্রচারটায় যে মেয়েকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে তার নাম হাবিবাহ নাসরিন।তিনি তরুন ছড়াকার,কবি ও সাংবাদিক।সম্প্রতি চালু হওয়া প্রাণ আরএফএল গ্রুপের 'জাগো নিউজ'এর ফিচার এডিটর।হাবিবাহ নাসরিন বিবাহিত এবং তার স্বামী যুগান্তরে কর্মরত সাংবাদিক।একজন বিবাহিত নারীকে নিয়ে এই অপপ্রচার কি বিকৃত মানসীকতার পরিচয় নয়?এই বিকৃত ধারনা বিশ্বাস করে ক্রমাগত আল মাহমুদ ও হাবিবাহ নাসরিনের চরিত্র হরণ করা কি অপরাধ নয়?
৪।
ভদ্রলোক অর্থাত্‍ কামাল পাশা চৌধুরীর প্রফাইলে দেখবেন ধর্মীয় পরিচয় 'Atheism' দেয় অর্থাত্‍ তিনি নাস্তিক।খুবই ভালো।প্রকৃত নাস্তিকদের জ্ঞানের পরিধির কারণে তাদের আমি সম্মান করি।আমার প্রশ্ন নাস্তিক্যবাদের অন্যতম স্পষ্ট দর্শন 'যৌন স্বাধীনতা'।যদি তার প্রচারিত বিয়ের এই মিথ্যাচারটিকে তর্কের খাতিরে নিম্নমানের সত্য ধরে নিই তবে এটি নিয়ে অপপ্রচার চালানো কতটা সুস্থ্যতার প্রমাণ?অন্যের ব্যক্তি জীবনকে প্রকাশ করে দেয়া কি নাস্তিকতার অন্তর্ভুক্ত?
প্রকৃতপক্ষে এই মিথ্যাচার করে কামাল পাশা দুইটি পরিবারের মানহানি করেছেন এবং তাদের জীবনে মিথ্যা কলঙ্ক দিয়েছেন।এই অপরাধবোধে ভুগে কামাল পাশা অচিরেই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।
৫।
আশির ঊর্ধ্ব বয়সী আল মাহমুদকে দেয়া একটি সংবর্ধনায় তার গলায় মালা ছিল।সেই ছবি হাবিবাহ নাসরিনের টাইমলাইন থেকে চুরি করে এভাবে তাকে বেইজ্জতি করা খুব বাজে আচরণ।এর জন্য হাবিবাহ নাসরিন যদি মানহানীর মামলা করেন তবে কামাল পাশার অসহায়ত্ত্বই ফুটে উঠবে।
এই অপপ্রচারের ফলে আমাদের সমাজে নারীর অধিকার বলে চিল্লানো এক ব্যক্তির ভেতরের রূপটা বোঝা গেলো।একজন নারী হাবিবাহ নাসরিনের উপর আরোপিত এমন মিথ্যা অপবাদ এ সমাজের তীব্র নারীবাদী পরিচয়ধারীদের তলের কট্রর পুরুষবাদী মুখোশের উন্মোচনই করেছে এই আর কি।হাবিবাহ নাসরিনকে শারিরীকভাবে নির্যাতন করা এবং শব্দ,ছবি দিয়ে নির্যাতন করার মধ্যে পার্থক্য আছে কি?
৬।
এই অপপ্রচারের ফলে বহুপক্ষের অবতারণ হয়েছে।কামাল পাশার অনুসারীরা বলছে আল মাহমুদ একটি 'চুপা জামাতি' এবং হাবিবাহ নাসরিন 'ছাত্রী সংস্থার'কর্মী।অতএব তাদের চরিত্র হরণ করা,স্ট্যাটাস দিয়ে ধর্ষণ করা একটি বৈধ কাজ।এ ধারনাটি ভুল।আল মাহমুদ মূল্যায়িত হবে ব্যক্তিত্ত্ব ও সাহিত্য দিয়ে,হাবিবাহ নাসরিন নারী ও সাহিত্যিক হিসেবে।তাই বাবা ও মেয়ের সম্পর্কটিকে আর নোংরা করবেন না।
আরেক পক্ষ রয়েছে কামাল পাশার মতের বিরোধী।তারা কামাল পাশার সমালোচনায় 'গণজাগরণ মঞ্চ'সংশ্লিষ্টতা আনেন।এটিও অন্যায়।কামাল পাশার অপরাধ গণজাগরণ মঞ্চে যেতে পারেনা।কিংবা কামাল পাশার অপরাধে কিছুতেই তার পরিবার বা দলের সংশ্লিষ্টতা আনা যায়না।এটি করলে স্ট্যান্ডবাজি করা হবে।কামাল পাশার কাঁধে বন্দুক রেখে গণজাগরণ মঞ্চ,ব্লগার ও নাস্তিকদের গালি দেয়া অসুস্থ মানসীকতার প্রকাশ।
৭।
আশা করি কামাল পাশা চৌধুরী এ ভুল স্বীকার করে অপপ্রচার থেকে সরে আসবেন।মানুষের ব্যক্তিজীবনে মিথ্যা কালিমা লেপন খুব অমানবিক আচরণ।আল মাহমুদের রাজনৈতিক পরিচয়ে আমরা তাকে সম্মান করিনা,তাঁর লেখনীই তাঁর প্রতি সম্মানের উত্‍স।একইভাবে হাবিবাহ নাসরিনের একটি সাজানো সংসার আছে।সেই সংসারটি রক্ষায় কামাল পাশা চৌধুরীর কৃতকর্মটি যে একটি অসত্য সংবাদ ছিল সেটি স্বীকার করা জরুরী।
আমার মনে হয় আমরা জাতীয়ভাবে অপরের চরিত্র হরণের এ স্বভাব পরিহারের যোগ্যতা এখন অর্জন করেছি।আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন অপরকে সম্মান না করলে নিজেরাও সম্মানিত হতে পারবোনা।
আল মাহমুদ তরুন ও তারুণ্যের কবি।মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদের চরিত্রের উপর দাগ বসানোর আগে আমাদের মনে রাখা উচিত-
যে জাতি গুণিজনকে কদর করেনা,সে জাতির মধ্যে গুনিজন জন্ম নেয়না।
সব অপপ্রচারের অবসান হোক।কামাল পাশারা ভুল স্বীকার করে সুস্থ জীবনযাপন করুক।'সোনালী কাবিন' কাঁধে জীবনের জয়গান গেয়ে যাক আমাদের কবি।তাঁর মায়ের হারানো নোলক অনুসন্ধানে আর কোন প্রতিবন্ধকতা একদমই কাম্য নয়...

১২ এপ্রিল, ২০১৫।
পাঠ অনুভূতি