আপনি যদি এমন একটি সাহিত্যকর্মের নাম জানতে চান যেটিতে আবহমান অনার্য
বাঙালির জীবনকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে আমি বলবো আবু ইসহাকের 'সূর্য
দীঘল বাড়ি' উপন্যাসটি পড়ুন। আপনি যদি এমন একটি চলচ্চিত্র দেখতে চান যেটিতে
বাংলাদেশের একটি নির্ভেজাল ও বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে তবে মসিহউদ্দিন শাকের ও
শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত 'সূর্য দীঘল বাড়ি' চলচ্চিত্রটি দেখুন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত আবু ইসহাকের বিখ্যাত উপন্যাসটিকে ১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলেন উপরিউক্ত পরিচালকদ্বয়। আমার জীবনে এতোটা জীবন্ত, এতোটা বাস্তব ও এতোটা নিখুঁতভাবে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, কর্ম, ভাষা, কুসংষ্কার, গোঁড়ামী, দ্বন্দ্ব, ক্ষুধা, কামনা ও ভালবাসাকে কোন চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করতে দেখিনি।
২।
এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পূর্ববাঙলায় ইংরেজ, দেশিয় ভোগবাদী ও বুর্জোয়া সমাজের লোভ ও মজুদের ফলে সৃষ্ট দূর্ভিক্ষর সময়ে একজন জয়গুনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম কাহিনী। প্রথম পক্ষের সন্তান হাসুসহ বিয়ে হয় যার সঙ্গে তার ঘরে আছে কাসু ও মায়মুন। পুত্র কাসুকে রেখে হাসু, মায়মুন ও জয়গুনকে তাড়িয়ে দেয় করিম বখস। কারণ দূর্ভিক্ষে এতগুলো মুখে সে খাবার দিতে পারবেনা। শুরু হয় জয়গুনের প্রতিরোধ। এ সমাজে এক নারীর টিকে থাকার অবিস্মরণীয় সংগ্রাম।
৩।
জয়গুন শহর থেকে ফিরে আসে ননদ শফির মাকে নিয়ে। পৈত্রিক ভিটেয় ছনের ঘর বানায়। ফতুল্লা থেকে নারায়নগঞ্জ গিয়ে চাল বিক্রি করে। মেয়ে মায়মূন হাঁস পালে। হাসু কুলি, নৌকা দিয়ে তাদের চলাচল। খালি পায়ে থাকতে থাকতে হাসুর পা খেয়ে দেয় মাটিতে। স্বামীহারা জয়গুনের দিকে কুদৃষ্টি দেয় গ্রামের ফকির ও মাতব্বর। ফকির এসে ঘরকে জিনের হাত থেকে বাঁচাতে চারপাশে তাবিজ পোঁতে। করিমের ঘরে থাকা সত্ভাই কাসুকে চড়ি ও বাতাসা কিনে দেয় হাসু। করিম দেখে অকথ্য গালি দেয়। বাচ্চা মেয়ে মায়মূনের বিয়ের প্রস্তাব দেয় সোলেমান। উদ্দেশ্য কাজ করানো যাবে। বিয়ের দিন প্রকাশ্যে জয়গুণকে মূর্খ মোল্লা তওবা করায় সে আর যাতে শহরে কাজে না যায়। মেয়ের জন্য তা করতে রাজি হয়। এর আগে এই মোল্লাই মসজিদে জয়গুনের দেয়া ডিম নেয়না সে বাইরে কাজ করে বলে।
সকালে খবর আসে মায়ুমূনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়ায় দিছে। মায়মূন বলে তাকে খেতে না দিয়ে খাটায়, না খেয়ে কাজ করতে না পারায় পাঠায় দিছে। এদিকে কাসুকেও করিম দিয়ে যায় মায়ের কাছে। এতগুলো মুখের ভাত যোগাড় করতে তওবা ভেঙে আবার বাইরে কাজ করতে যায় জয়গুন। রাতের আঁধারে জয়গুনকে পেতে তার বাড়ির চারপাশে তাবিজ পুঁততে আসে করিম বখশ। দেখা হয়ে যায় লম্পট জোতদার প্রধান বাবুর সাথে। দুজনেই জয়গুনকে চায়। শুরু হয় হাতাহাতি। জোতদার প্রধান বাবু গলাটিপে হত্যা করে করিমকে। দূর থেকে দেখে ফেলে জয়গুন। এদিকে চারটি মুখের খাবার যোগাড়ের চিন্তা জয়গুনের। খুনের কথা জয়গুন জানে এটা জেনেই পরের রাতে জয়গুনের 'সূর্য দীঘল বাড়ি' তে আগুন ধরিয়ে দেয় জোতদারের লোকেরা। চিত্কার, কান্না ও হারানোর ব্যথায় পুড়ে যায় জয়গুনের ঘর। ফের তাঁকে সংগ্রাম করতে হবে। সেই সংগ্রাম মূর্খ মোল্লা, লম্পট জোতদার প্রধান, ক্ষুধা, কুসংষ্কার, রাজনীতি ও ভোগবাদী পুরুষ করিম বখশের সাথে।
জয়গুন যেন বাংলাদেশ, চিরন্তন তার সংগ্রাম।
৪।
জয়গুন চরিত্রে অভিনয় করেছে ডলি আনোয়ার। নিখুঁত সে অভিনয়। জয়গুনের ননদ রওশন জামিল। ফকির চরিত্রে এটিএম শামসুজ্জামান। হাসু,কাসু, মায়মূন চরিত্রে অভিনয় করা শিশুদের ধারেকাছে যাওয়ার যোগ্যতা নেই এ যুগের তিশাফিশা, দিঘীফিঘী, অপর্ণা, সাফা, সালমান, মিশু বা জয়াদের।
চলচ্চিত্রটি ফ্যান্স ও পর্তুগালের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব থেকে একাধিক ক্যাটেগরিতে পুরষ্কৃত হয়। আর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার তোর আছেই।
মা কে দেখতে অসুস্থ হয় কাসু। করিম চিকিত্সা করতে ফকির আনে। তাতে আরো অসুস্থ হয়। উপায় না দেখে দ্বিতীয় বউয়ের কথা শুনে করিম জয়গুনকে নিয়ে আসে। জয়গুন ডাক্তার রমেশকে আনে। দুইটা হাঁস বিক্রি করে দেয় ঔষুধ কিনতে। গভীররাতে করিম তাকে আবার বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। জয়গুন না করে তার খাসলাতের কথা ভেবে।
৫।
চলচ্চিত্র একটি সমাজের,একটি দেশের দর্পণ। বাংলাদের বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র যারা নির্মাণ করছেন এরা এই সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। শহরের অল্পসংখ্যক যান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী চরিত্রকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র বানাচ্ছে তারা। অথচ উত্পাদন ব্যবস্থার সাথে জড়িত কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ব্যবসায়িদের নিয়ে কোন চলচ্চিত্র নেই। যারা এ সভ্যতার চাকা সচল রেখেছে তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা নেই।
১৯৭১ এর পর নির্মিত চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় সেসময় গ্রামীণ পটভূমিতে চলচ্চিত্র ও নাটক তৈরিই ছিল মূলধারার শিল্প। সেখানে কৃষকের নির্যাতিত হওয়া, তার বঞ্চনা, নারীর প্রতি সামাজিক অনাচার ফুটে উঠতো। আর এখন যেসব চলচ্চিত্র বানানো হয় তাতে বাঙালি সংষ্কৃতির ছিটেফোঁটাও থাকেনা। মাত্রারিক্ত যৌনতা, সন্ত্রাস, অশ্লীলতা, বিকৃত ভাষা ও আচরণের উপস্থিতি ধ্বংস করেছে আবহমান বাংলাদেশের রূপকে। এটি সাংষ্কৃতিক দীনতার প্রমাণ। কিছু বাজে ও অসৃজনশীল মানুষ আবার চলচ্চিত্র বানাচ্ছে ভারতের কলকাতার অবাস্তব কৃত্রিমতা দেখে, কিছু বাজে পরিচালক খিচুড়ি ভাষা দিয়ে সমাজের অপ্রচলিত নোংরামী (থার্ড পারসন সিংগুলার নাম্বার, ডুব) নিয়ে চলচ্চিত্র বানাচ্ছে যা বাঙালির, বাংলার, বাংলাদেশের নয়।
সংষ্কৃতি একটি জাতির জ্বালানি। এই জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে জাতীয় উন্নয়নের চাকা ঘোরা থেমে যায়। এই যুগে একটি জাতির সংষ্কৃতিকে জীবীত রাখার অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে নিজস্ব সংষ্কৃতির উপস্থাপনই পারে পুরো জাতিকে জীবীত রাখতে। মনপুরা, গাড়িওয়ালা ছাড়া নিজস্ব সংষ্কৃতির উপস্থাপন করা কোন চলচ্চিত্র এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছেনা। সর্বশেষ অজ্ঞাতনামা ভাল করেছে। আয়নাবাজিও প্রশংসার দাবিদার।
আমাদের ভাষা বিকৃতকারী ও লিভটুগেদারপন্থী ফারুকীর দরকার নেই, একজন গিয়াসউদ্দিন সেলিমের প্রয়োজন যে পরী ও সোনাইকে দিয়ে বাংলাদেশকে দেখাবে। আমাদের আরো খিজির হায়াত প্রয়োজন যারা ‘জাগোর’ মত দেশাত্ববোধ জাগানো চলচ্চিত্র বানাবে।
'সূর্য দীঘল বাড়ি' উপন্যাসটি পড়তে পারেন যদি নিজের শিকড়ের সন্ধান চান। আর যদি সাদাকালো পর্দায় পূর্বপুরুষদের দেখতে চান তবে চলচ্চিত্রটিও দেখতে পারেন।
দেশের সাহিত্যাঙ্গনে আবু ইসহাকদের এখন দেখা যায়না। কোন সূর্য দীঘল বাড়িও আর হয়না।
সমাজের আসল রূপটা আমরা দেখতে পাইনা। পুঁজিবাদ, ভোগবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত গর্ভে বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্রকে যারা ঠেলে দিচ্ছে-একদিন তাদের জবাবদিহি করতে হবে ভবিষ্যতের জয়গুন, হাসু, কাসুদের কাছে। এই ভূখন্ড অনার্যদের , ভোগবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে তারা জাগবেই-আজ অথবা কাল।
জীবন ও চিত্রে আবার বাংলাদেশ ফিরে আসবে।
৯ এপ্রিল, ২০১৫।
শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত 'সূর্য দীঘল বাড়ি' চলচ্চিত্রটি দেখুন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত আবু ইসহাকের বিখ্যাত উপন্যাসটিকে ১৯৭৯ সালে চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলেন উপরিউক্ত পরিচালকদ্বয়। আমার জীবনে এতোটা জীবন্ত, এতোটা বাস্তব ও এতোটা নিখুঁতভাবে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, কর্ম, ভাষা, কুসংষ্কার, গোঁড়ামী, দ্বন্দ্ব, ক্ষুধা, কামনা ও ভালবাসাকে কোন চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করতে দেখিনি।
২।
এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পূর্ববাঙলায় ইংরেজ, দেশিয় ভোগবাদী ও বুর্জোয়া সমাজের লোভ ও মজুদের ফলে সৃষ্ট দূর্ভিক্ষর সময়ে একজন জয়গুনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম কাহিনী। প্রথম পক্ষের সন্তান হাসুসহ বিয়ে হয় যার সঙ্গে তার ঘরে আছে কাসু ও মায়মুন। পুত্র কাসুকে রেখে হাসু, মায়মুন ও জয়গুনকে তাড়িয়ে দেয় করিম বখস। কারণ দূর্ভিক্ষে এতগুলো মুখে সে খাবার দিতে পারবেনা। শুরু হয় জয়গুনের প্রতিরোধ। এ সমাজে এক নারীর টিকে থাকার অবিস্মরণীয় সংগ্রাম।
৩।
জয়গুন শহর থেকে ফিরে আসে ননদ শফির মাকে নিয়ে। পৈত্রিক ভিটেয় ছনের ঘর বানায়। ফতুল্লা থেকে নারায়নগঞ্জ গিয়ে চাল বিক্রি করে। মেয়ে মায়মূন হাঁস পালে। হাসু কুলি, নৌকা দিয়ে তাদের চলাচল। খালি পায়ে থাকতে থাকতে হাসুর পা খেয়ে দেয় মাটিতে। স্বামীহারা জয়গুনের দিকে কুদৃষ্টি দেয় গ্রামের ফকির ও মাতব্বর। ফকির এসে ঘরকে জিনের হাত থেকে বাঁচাতে চারপাশে তাবিজ পোঁতে। করিমের ঘরে থাকা সত্ভাই কাসুকে চড়ি ও বাতাসা কিনে দেয় হাসু। করিম দেখে অকথ্য গালি দেয়। বাচ্চা মেয়ে মায়মূনের বিয়ের প্রস্তাব দেয় সোলেমান। উদ্দেশ্য কাজ করানো যাবে। বিয়ের দিন প্রকাশ্যে জয়গুণকে মূর্খ মোল্লা তওবা করায় সে আর যাতে শহরে কাজে না যায়। মেয়ের জন্য তা করতে রাজি হয়। এর আগে এই মোল্লাই মসজিদে জয়গুনের দেয়া ডিম নেয়না সে বাইরে কাজ করে বলে।
সকালে খবর আসে মায়ুমূনকে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়ায় দিছে। মায়মূন বলে তাকে খেতে না দিয়ে খাটায়, না খেয়ে কাজ করতে না পারায় পাঠায় দিছে। এদিকে কাসুকেও করিম দিয়ে যায় মায়ের কাছে। এতগুলো মুখের ভাত যোগাড় করতে তওবা ভেঙে আবার বাইরে কাজ করতে যায় জয়গুন। রাতের আঁধারে জয়গুনকে পেতে তার বাড়ির চারপাশে তাবিজ পুঁততে আসে করিম বখশ। দেখা হয়ে যায় লম্পট জোতদার প্রধান বাবুর সাথে। দুজনেই জয়গুনকে চায়। শুরু হয় হাতাহাতি। জোতদার প্রধান বাবু গলাটিপে হত্যা করে করিমকে। দূর থেকে দেখে ফেলে জয়গুন। এদিকে চারটি মুখের খাবার যোগাড়ের চিন্তা জয়গুনের। খুনের কথা জয়গুন জানে এটা জেনেই পরের রাতে জয়গুনের 'সূর্য দীঘল বাড়ি' তে আগুন ধরিয়ে দেয় জোতদারের লোকেরা। চিত্কার, কান্না ও হারানোর ব্যথায় পুড়ে যায় জয়গুনের ঘর। ফের তাঁকে সংগ্রাম করতে হবে। সেই সংগ্রাম মূর্খ মোল্লা, লম্পট জোতদার প্রধান, ক্ষুধা, কুসংষ্কার, রাজনীতি ও ভোগবাদী পুরুষ করিম বখশের সাথে।
জয়গুন যেন বাংলাদেশ, চিরন্তন তার সংগ্রাম।
৪।
জয়গুন চরিত্রে অভিনয় করেছে ডলি আনোয়ার। নিখুঁত সে অভিনয়। জয়গুনের ননদ রওশন জামিল। ফকির চরিত্রে এটিএম শামসুজ্জামান। হাসু,কাসু, মায়মূন চরিত্রে অভিনয় করা শিশুদের ধারেকাছে যাওয়ার যোগ্যতা নেই এ যুগের তিশাফিশা, দিঘীফিঘী, অপর্ণা, সাফা, সালমান, মিশু বা জয়াদের।
চলচ্চিত্রটি ফ্যান্স ও পর্তুগালের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব থেকে একাধিক ক্যাটেগরিতে পুরষ্কৃত হয়। আর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার তোর আছেই।
মা কে দেখতে অসুস্থ হয় কাসু। করিম চিকিত্সা করতে ফকির আনে। তাতে আরো অসুস্থ হয়। উপায় না দেখে দ্বিতীয় বউয়ের কথা শুনে করিম জয়গুনকে নিয়ে আসে। জয়গুন ডাক্তার রমেশকে আনে। দুইটা হাঁস বিক্রি করে দেয় ঔষুধ কিনতে। গভীররাতে করিম তাকে আবার বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। জয়গুন না করে তার খাসলাতের কথা ভেবে।
৫।
চলচ্চিত্র একটি সমাজের,একটি দেশের দর্পণ। বাংলাদের বর্তমান সময়ের চলচ্চিত্র যারা নির্মাণ করছেন এরা এই সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। শহরের অল্পসংখ্যক যান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী চরিত্রকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র বানাচ্ছে তারা। অথচ উত্পাদন ব্যবস্থার সাথে জড়িত কৃষক, শ্রমিক, মজুর, ব্যবসায়িদের নিয়ে কোন চলচ্চিত্র নেই। যারা এ সভ্যতার চাকা সচল রেখেছে তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা নেই।
১৯৭১ এর পর নির্মিত চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায় সেসময় গ্রামীণ পটভূমিতে চলচ্চিত্র ও নাটক তৈরিই ছিল মূলধারার শিল্প। সেখানে কৃষকের নির্যাতিত হওয়া, তার বঞ্চনা, নারীর প্রতি সামাজিক অনাচার ফুটে উঠতো। আর এখন যেসব চলচ্চিত্র বানানো হয় তাতে বাঙালি সংষ্কৃতির ছিটেফোঁটাও থাকেনা। মাত্রারিক্ত যৌনতা, সন্ত্রাস, অশ্লীলতা, বিকৃত ভাষা ও আচরণের উপস্থিতি ধ্বংস করেছে আবহমান বাংলাদেশের রূপকে। এটি সাংষ্কৃতিক দীনতার প্রমাণ। কিছু বাজে ও অসৃজনশীল মানুষ আবার চলচ্চিত্র বানাচ্ছে ভারতের কলকাতার অবাস্তব কৃত্রিমতা দেখে, কিছু বাজে পরিচালক খিচুড়ি ভাষা দিয়ে সমাজের অপ্রচলিত নোংরামী (থার্ড পারসন সিংগুলার নাম্বার, ডুব) নিয়ে চলচ্চিত্র বানাচ্ছে যা বাঙালির, বাংলার, বাংলাদেশের নয়।
সংষ্কৃতি একটি জাতির জ্বালানি। এই জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে জাতীয় উন্নয়নের চাকা ঘোরা থেমে যায়। এই যুগে একটি জাতির সংষ্কৃতিকে জীবীত রাখার অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে নিজস্ব সংষ্কৃতির উপস্থাপনই পারে পুরো জাতিকে জীবীত রাখতে। মনপুরা, গাড়িওয়ালা ছাড়া নিজস্ব সংষ্কৃতির উপস্থাপন করা কোন চলচ্চিত্র এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছেনা। সর্বশেষ অজ্ঞাতনামা ভাল করেছে। আয়নাবাজিও প্রশংসার দাবিদার।
আমাদের ভাষা বিকৃতকারী ও লিভটুগেদারপন্থী ফারুকীর দরকার নেই, একজন গিয়াসউদ্দিন সেলিমের প্রয়োজন যে পরী ও সোনাইকে দিয়ে বাংলাদেশকে দেখাবে। আমাদের আরো খিজির হায়াত প্রয়োজন যারা ‘জাগোর’ মত দেশাত্ববোধ জাগানো চলচ্চিত্র বানাবে।
'সূর্য দীঘল বাড়ি' উপন্যাসটি পড়তে পারেন যদি নিজের শিকড়ের সন্ধান চান। আর যদি সাদাকালো পর্দায় পূর্বপুরুষদের দেখতে চান তবে চলচ্চিত্রটিও দেখতে পারেন।
দেশের সাহিত্যাঙ্গনে আবু ইসহাকদের এখন দেখা যায়না। কোন সূর্য দীঘল বাড়িও আর হয়না।
সমাজের আসল রূপটা আমরা দেখতে পাইনা। পুঁজিবাদ, ভোগবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত গর্ভে বাংলাদেশের সাহিত্য, চলচ্চিত্রকে যারা ঠেলে দিচ্ছে-একদিন তাদের জবাবদিহি করতে হবে ভবিষ্যতের জয়গুন, হাসু, কাসুদের কাছে। এই ভূখন্ড অনার্যদের , ভোগবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে তারা জাগবেই-আজ অথবা কাল।
জীবন ও চিত্রে আবার বাংলাদেশ ফিরে আসবে।
৯ এপ্রিল, ২০১৫।


