সর্বশেষ

বিজ্ঞান বনাম ধর্ম? বিজ্ঞানবাদী গোঁড়ামীর স্বরূপ

বিজ্ঞান, বিশ্বাস ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানবাদ
~~~~~~~~~
বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানবাদ দুইটি পৃথক বিষয়। বিজ্ঞানবাদ আসলে বিজ্ঞানকে চরম ধরা গোঁড়ামীর সুশীল পরিভাষা যার সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক নাই। কারণ বিজ্ঞান পরমে এখনো বিশ্বাস করেনি। বিজ্ঞান নিয়ত পরিবর্তনকে স্বাগত জানায়৷ কিন্তু বিজ্ঞানবাদীদের দেখবেন তাদের কাউন্টারপার্ট গোঁড়া ধর্মবাদীদের মতই পীর মাশায়েখে বিশ্বাস করতে। তাদের পীর ডারউইন, মার্ক্স, ভলতেয়ার, রুশো, এরিস্টটল ও সাম্প্রতিক সময়ে যুভাল নোয়া হারারি প্রমুখ! যেমন, ধর্মকানারা জাকির নায়েক, মুফতি ইবরাহীম, আল্লামা শফির সমালোচনা নিন্দা করলে খেপে ওঠে তদ্রুপ বিজ্ঞানকানারা হারারি, ডারউইন, মার্ক্সের সমালোচনা করলে একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে! একেবারে পরীক্ষিত সত্য। 

এর মধ্যে বিজ্ঞানবাদী নামে পরিচিত নারীবাদী, বামপন্থী, প্রগতিশীল ইত্যাদি নামের লোকগুলো আবার একটি ধর্মের ব্যাপারেই নাক সিঁটকায়! দুনিয়ার তাবৎ ধর্ম তাদের কাছে উৎসব, সংস্কৃতি, শুধু ইসলাম ধর্মে তাদের ভ্রুকুটি!

অথচ আস্তিক আর নাস্তিকের দ্বন্দ্বটা হওয়ার নিয়ম ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে না, নাই তা নিয়ে! কিন্তু তা এ যুগের বিজ্ঞানবাদী নামের সাম্প্রদায়িকগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল নয়। এরা বিশ্বাস করে বিজ্ঞান আর বস্তুবাদই সব; কিন্তু অন্য কেউ যদি বিশ্বাস করে বিজ্ঞান সব নয় তাহলেই এদের গাত্রদাহ! ভীষণ অবৈজ্ঞানিক এই আচরণ, ভীষণ দ্বিচারিতা! 

এই যে করোনায় লাখ মানুষ মরছে, মানুষ ভয়ে ঘর ছাড়ছেনা এর জন্য বিজ্ঞান লড়াই করেছে বলে কিছু আধামগজের মানুষজন বেশ লাফাচ্ছে! বিজ্ঞান লড়ছে এতে সমস্যা নাই তারা আবার জুড়ে দিয়েছে 'মসজিদ মন্দির নয়'। এখানেই আমার আপত্তি! এই যে মসজিদ আর মন্দিরকে তথা বিশ্বাসকে খারিজ করে দেয়া এটি মোটেই বিজ্ঞানের আচরণ নয়, এটি বিজ্ঞানকানা আচরণ। কারণ বিজ্ঞান নিজেই অনুমান-অনুসিদ্ধান্তকে ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, যা বিশ্বাসই। এমন কী বিশ্বাস ছাড়া ভ্যাক্সিনও মানবদেহে দেয়া যেতোনা! আর ভ্যাক্সিনের রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে বিজ্ঞানবাদী প্রগতিশীল গোঁড়াদের জানাশোনার পরিধি অনেক সীমাবদ্ধ এটি তাদের ওষুধ ও ভ্যাক্সিনকে ঈশ্বর মনে করা থেকেই অনুধাবন করা যায়!

ভ্যাক্সিন এখনো আসেনি চাইনিজ ভাইরাসের। তাহলে বিজ্ঞানের এই অসহায় মুহূর্তে কে মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখছে?

বিশ্বাস! হ্যাঁ, বিশ্বাস।

আপনাকে যে চিকিৎসক হাসিখুশি থাকতে বলছে, মন ভালো রাখতে বলছে,  বলছে মন শক্ত করতে, বলছে এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, এগুলো কথিত হার্ডলাইন বিজ্ঞান নয়, এগুলো বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের কারণেই এখন পর্যন্ত মানুষ লড়াই করছে। আপনার বিজ্ঞানবাদী গোঁড়ামী দিয়ে বিজ্ঞান চলেনা, বিজ্ঞান চলার পথে যা দিয়ে কাজ চলে তাকেই গ্রহণ করে! ফলে আপনি দুই দিন নব্য বিবর্তনের ছোঁয়ায় ধর্ম বা বিশ্বাসকে খারিজ করলেও এখনো চিকিৎসাবিদ্যা ও নানা বিজ্ঞানের প্রবাদপ্রতিম মানুষগুলো বিশ্বাসকে বহু উঁচুতেই স্থান দিচ্ছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে একটি চমকপ্রদ প্রামাণ্যচিত্র দেখেছিলাম বছরখানেক আগে। সেখানে একজন চিকিৎসক বলছিলেন, প্রকৃতি ও মানুষের দেহেই আসলে সকল রোগের প্রতিষেধক রয়েছে। এর মধ্যে মানুষের মানসিকতা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রোগ সারাতে। অর্থাৎ আপনি যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন নিমপাতা-থানকুনি পাতা কিংবা পানিপড়ায় আপনার রোগ মুক্তি হবে, তাহলে আপনার দেহ মস্তিষ্কের এই সিগন্যাল বা নির্দেশনায় সাড়া দেবে ও দেহের নানা ক্ষুদ্রযোদ্ধাকে বিদ্যমান রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করতে প্রণোদনা দেবে! এই হচ্ছে বিশ্বাসের শক্তি! মায়ের 'মন' সন্তানের বিপদে চিনচিন করে কেন এই প্রশ্নের উত্তর আজো দিতে পারেনা বস্তুবাদী বিজ্ঞান সেটি কিন্তু আমাদের বিজ্ঞানবাদীরা জানেন না!

অকাজের কথায় আসি। এতো যে বিজ্ঞান বিজ্ঞান করে এরা বিজ্ঞানের সবই কি কল্যাণের? এই দুনিয়ায় অবিজ্ঞান অথবা বিশ্বাসের চেয়ে কোটিগুণ ক্ষতি করেছে বিজ্ঞান! এর দায় অবশ্য বিজ্ঞানের নয়, বিজ্ঞানের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজ নিজ ফায়দা তোলা বিজ্ঞানবাদীদের।

লাখো মানুষ হত্যাকারী হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমাদ্বয় বিজ্ঞান; চেরনোবিলের পারমাণবিক দুর্ঘটনাও বিজ্ঞান; আফগানিস্তান-ভিয়েতনাম, সিরিয়া-ইরাক-ইয়েমেন-আফ্রিকায় বোমা মেরে, গুলি করে, ড্রোন হামলা চালিয়ে কোটি মানুষ হত্যা করাও বিজ্ঞান; শিল্পের নামে পৃথিবীর প্রাণ বৈচিত্র্য হত্যা করা ব্যবসা-পুঁজিবাদও বিজ্ঞান; না খেয়ে মরা পৃথিবীতে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে মহাকাশে বিলাসীতাও বিজ্ঞান; সমকামী জিন না পাওয়া গেলেও সমকামীতাকে বায়োলজিকাল বলাও 'বিজ্ঞান' বলে চালাতে চাচ্ছে কেউ কেউ; এমন কী জীবাণু অস্ত্র বানিয়ে মানুষ হত্যার নকশা করাও বিজ্ঞান! অতএব বিজ্ঞান নিয়ে অতোটা সেইফ জোনে আছেন তা ভাইবেন না! খুঁত খুঁজলে সূর্যেরও কলঙ্ক পাওয়া যাবে!

যাহোক! এই ছিল কথা। কাল থেকে রমজান। আজ সেহরি খেয়ে রোজা রাখবো। আমি বিশ্বাসী মানুষ, তবু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমার রোজা রাখা বিষয়টি সত্যায়িত বলে আমার মানসিক তৃপ্তি আসে। আমি রোজার সময় আশেপাশের মানুষগুলোর খোঁজ নিই, আমাদের বাড়ি থেকে স্বল্পপরিসরে খাবার ইত্যাদি দিই। এগুলো আমাদের বিশ্বাস! বিজ্ঞানবাদীরা এমন কল্যাণকামী কোনো উৎসব দেখাতে পারবেনা! 

হে বিজ্ঞানবাদী প্রগতিশীল গোঁয়ারপাল, এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের সবচেয়ে উত্তম চিকিৎসাটি ঐ বিশ্বাসই দিয়েছে। কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশন তো ১৪০০ বছর আগের এক বিশ্বাসী মহামানবেরই উদ্ভাবন।

এসব নিয়ে ওরা অনুসন্ধান করতে পারবেনা। ইউরোপীয় বিজ্ঞানের অন্ধকার যুগে কোন বিশ্বাসের বলে মধ্যপ্রাচ্য বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ নির্মাণ করলো তা ওরা বের করতে পারবেনা! ওরা পারবে নিজেদের অসারতাকে হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করতে।

সেদিকে আমাদের চাওয়ার দরকার নাই। আমরা সকলকে নিয়ে বিশ্বাসের সুমধুর মালাটি সম্পূর্ণ করতে চাই শান্তি ও সমৃদ্ধির আহবানে। 
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments