সর্বশেষ

ইন-ডেপথ রিপোর্টিং || অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন || In-depth Reporting || Investigative Journalism Bangla || Interpretative Reporting

নিগূঢ় প্রতিবেদন বা ডেপথ রিপোর্টিং
(Depth/In-depth Reporting) 

নিগূঢ় প্রতিবেদন বা ডেপথ রিপোর্টিং
(Depth/In-depth Reporting): অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যামূলক সাংবাদিকতা
~~~~
সচরাচর কাগজের পত্রিকা, অনলাইন পত্রিকা, বেতার বা টেলিভিশনে আমরা যে সংবাদ প্রতিবেদন দেখি তার অধিকাংশই একটি সাধারণ চরিত্রের, আর তা হচ্ছে একটি ঘটনার সাদামাটা সরল উপস্থাপন। এ ধরনের সংবাদকে বলা হয় প্রচলিত বা প্রথাগত প্রতিবেদন বা সংবাদ (Conventional News Report)। যেমন,

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৪৫৯ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অভিযোগ ব্যবসায়িক স্বার্থে তাদের উৎপাদিত কিটের অনুমোদন দিচ্ছেনা।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে দলে দলে ইউরোপে অভিবাসীর ঢল, সীমান্ত বন্ধ গ্রীসের।

এই সব সংবাদগুলো সবার নজরে আসে। সব সংবাদমাধ্যম তা প্রচার করে।

কিন্তু এর গভীরে আরো কিছু রয়েছে যা সব সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক বের করতে পারেনা। এই খবরের পিছনের খবর নানা তদন্ত, অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ করে পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকদের জন্য সংবাদ আকারে উপস্থাপন করলে তা হবে নিগূঢ় বা গভীরতর প্রতিবেদন। আর যে প্রক্রিয়ায় এই নিগূঢ় তথ্যের উদঘাটন করা হয় সেই প্রক্রিয়াটির নাম নিগূঢ় বা গভীর সাংবাদিকতা। এ প্রতিবেদন বা সাংবাদিকতার দুটি প্রকার রয়েছে। যথা-

১। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা/প্রতিবেদন (Investigative Journalism/Reporting) ও

২। ব্যাখ্যামূলক সাংবাদিকতা/প্রতিবেদন (Interpretative Journalism /Reporting)

সিকান্দার ফয়েজ তার সংবাদকোষ গ্রন্থের ৭৩ পৃষ্ঠায় বলেন, গভীর প্রতিবেদনে সংবাদের পিছনের ঘটনা, সামগ্রিক সম্মিলন ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা থাকে। তাঁর মতে, "কোনো একটি ঘটনার গভীরে যা লুকিয়ে আছে, যা ইতোমধ্যে নজরে আসেনি এমন তথ্যসমূহকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাটাই ডেপথ রিপোর্টিং।"

যেমন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত কিট সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য করতে যদি কোনো ঔষধ ব্যবসায়ী সংঘের দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্ত থাকে সেটি অনুসন্ধান করে বের করে আনলেই গভীরতর প্রতিবেদন হবে। কিংবা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী রাজনৈতিক কারণে সরকারকে বিব্রত করতে বিএনপি-জামায়াতের নির্দেশনায় কিট নিয়ে রাজনীতি করছে কী না এটি নানা তদন্তে বের করে আনাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হবে।

আবার, যে সংবাদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে, যা সাধারণের কাছে বোধগম্য নয়, এমন সংবাদ বা ঘটনার সরল ব্যাখ্যাই হতে পারে ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন। যেমন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত র‍্যাপিড টেস্ট কিট কীভাবে কাজ করে এবং কেন এই ডট ব্লট জরুরি অথবা ঝুঁকিপূর্ণ তা নিয়ে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে; যা ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন হবে।

আরেকটি উদাহরণ হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা লাখ লাখ শরণার্থীদের ইউরোপ ও আমেরিকার কেন আশ্রয় দেয়া উচিত তা ব্যাখ্যা করা। যেহেতু, পশ্চিমারা আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, মানুষ হত্যা করেছে, মধ্যপ্রাচ্যকে বসবাসের অনুপযোগী করে তাদের তেল, গ্যাস, স্বর্ণের দখলদারত্বের ঠিকাদারি নিয়েছে; তাই মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া ইউরোপ ও আমেরিকার অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব হয়েছে।

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আরেকটি উত্তম উদাহরণ, আল জাজিরা ইনভেস্টিগেশন টিমের করা Genocide Agenda; যেখানে দেখানো হয়েছে কীভাবে মিয়ানমারের সন্ত্রাসবাদী সরকার, সেনাবাহিনী ও ভীক্ষুরা নীল নকশা করে রোহিঙ্গা জাতিকে বিনাশ করছে, করতে এক হয়ে কাজ করছে। একই দল আইসিসি সংশ্লিষ্টদের ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিং নিয়ে জগৎ কাঁপানো অনুসন্ধান করে, অনুসন্ধান চালায় কীভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যম নিজ নিজ পছন্দের সরকারের পক্ষে গণসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে তা নিয়ে।

বর্তমান সময়ে বুলেটিনের বাইরে আলাদাভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এক সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের "পরিপ্রেক্ষিত" এ ধরনের উপস্থাপন ছিলো। এখন একুশে টিভির "একুশের চোখ",  ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির 'তালাশ' ইত্যাদিকে এই জাতীয় সংবাদ  বলা যায়।

পত্রিকার ক্ষেত্রে, দৈনিক প্রথম আলোর তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে কেজিতে ঘুষ নেয়া দেয়ার প্রতিবেদনটি নিগূঢ় প্রতিবেদন। একইভাবে প্রথম আলোর প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের করা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশীদের দেয়া পদকের স্বর্ণ কেলেঙ্কারিও গভীর অনুসন্ধানের ফসল।

'চীনের উহান ল্যাব থেকে চাইনিজ করোনা ভাইরাস ছড়ানো হয়'- এটি অনুসন্ধান করে বের করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা; আর চীন কীভাবে এই ভাইরাসের কারণে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে সেটি বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা করা ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের অংশ।

কেন এইসব প্রতিবেদন?

মানুষের জানার অভিলাষ সীমাহীন। সে যত জানে তত তার আগ্রহ বাড়ে। যে কোন ঘটনার আদিবিন্দু বা ক্রীড়াণকের কাছে ফিরে যেতে চায় মানুষ। সেই অনুসন্ধিৎসাকে প্রশমিত করতেই সাদামাটা সংবাদের একঘেয়েমি দূর করতে গভীর প্রতিবেদন করে থাকে প্রতিটি সংবাদমাধ্যম। যে সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানী দল যত সুদক্ষ ও করিৎকর্মা, সেই সংবাদমাধ্যম তত বেশি মানুষের কাছে জনপ্রিয় ও বিশ্বস্ত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের The Intercept, Wasgington Post, Vox ইত্যাদি সংবাদমাধ্যম গভীর প্রতিবেদন করে খ্যাত। ব্রিটেনের The Guardian, Telegraph, BBC ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে থাকে। জার্মানির Sudeutsche Zeitung বিশ্বব্যাপী Panama Papers কেলেঙ্কারি প্রকাশ করে পরিচিতি পেয়েছে।

যে সাংবাদিক প্রতিবেদক এ ধরনের (অনুসন্ধানী বা ব্যাখ্যামূলক) প্রতিবেদন করেন তাদের সংবাদমাধ্যম ও এর বাইরে ভীষণ গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। তাদের কারণেই একটি সংবাদমাধ্যম জনমানসে জায়গা করে নেয়। সমাজের বড় বড় অপরাধ ও অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, কেলেঙ্কারি, ষড়যন্ত্রের উদঘাটন ও উন্মোচন ঘটে অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যামূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে। এ কারণে জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রকৃত সাংবাদিকেরা রাঘব বোয়ালদের পিছনে ছোটে; যদিও দুর্নীতিবাজ মালিকপক্ষের কারণে অনেক অনুসন্ধানী ও ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনা। তবুও যতটুকু আস্থা মানুষের সংবাদমাধ্যমের প্রতি তার পিছনে অনবদ্য অবদান এই নিগূঢ় সাংবাদিকতা করা সাহসী ও সৃজনশীল মানুষগুলোর।

তাই, একজন সাংবাদিকের জীবনের পরম ইচ্ছা হওয়া উচিত ডেপথ রিপোর্টিং করা৷ কারণ, ঘটনার আড়ালের ঘটনাই আসলে নেপথ্যকে তুলে আনে। কারণ,
"News is what somebody somewhere wants to suppress, all the rest is advertising"(Lord Northcliffe, Randolph Hearst)।

সবাই সাবধানে থেকো। চাইনিজ করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থেকো। বেঁচে থাকলে আমরা প্রায়োগিক অনুশীলনের মাধ্যমে এটি শিখবো। তোমাদের পাঠাবো ঘটনার আড়ালের ঘটনা ব্যাখ্যা ও অনুসন্ধান করতে।
#Journalism #Reporting #IndepthReport
#অনুসন্ধানী #সাংবাদিকতা #ব্যাখ্যামূলক #প্রতিবেদন #InvestigativeJournalism #InterpretativeReporting

পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments