শ্রমিকের ছেঁড়া কবিতা
~~~~~~~
যতবার আমি লিখতে বসেছি রোমাঞ্চের ছবিটা,
প্রণয়ের বিচিত্রগাঁথা, বিচ্ছেদ ও ভালো লাগা
ততবার তা হয়েছে একেকটি শ্রমিকের ছেঁড়া কবিতা।
এ সভ্যতা কার?
এ অট্রালিকা, গাড়ি, বাড়ি, এসি, ইন্টারনেট ও বিলাসিতা?
এই দেশ কার?
এ নগর, কারখানা, ফ্লাট, ব্রিজ, সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা?
হ্যাঁ, শ্রমিকের।
মনে করোনা তা ক্ষণিকের...।
বন্ধু, খোঁজ রাখোনা কার রক্ত ঘাম হয়ে ঝরে?
মিষ্টি নদী প্রবাহিত হয় তোমার জীবন তরে।
ঐ যে পোশাক শ্রমিকের দল, ওরা তোমাদের বোকা
দিনরাত্রির খাটিয়ে ক টাকা দিয়ে দাও বড় ধোঁকা
আহারে শরীরে মাংশ যে নেই অপুষ্টিতে ভোগা
তোমাদের যে প্রাচুর্য এনে দেয় সেই শ্রমিকেরা রোগা
আমার বোনটি, আমার ভাইটি ফজরের পর বেরিয়ে
ওভারটাইম করে ফিরে আসে রাত্রি দশটা ছাড়িয়ে
তবুও প্রতি ঈদ পেটের জ্বালার দায়
ওরা চিৎকার করে বেতন-ভাতা চায়
ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে ওদের মাথা ফাটায় মালিকচোষক
ওরা মরলে কার কী এসে যায়? কে করে একফোঁটা শোক?
উঁচু বিশাল ভবনে তুমি মস্ত কর্মকর্তা
সেই রাজমিস্ত্রির খবর কে রাখে যে বানিয়েছে তা,
সারাদিন ভর দাঁড়িয়ে থাকা দ্বারওয়ান ছেলেটা
তার যেন নেই জীবন কোন তোমাদের সেবা ছাড়া
ঐ ড্রাইভার, বাসের মামা তোমাদের পার করে
গালি ছাড়া কভু দিয়েছো কি তারে ঘৃণা থেকে মাঝে সরে?
ইট ভাঙছে যে সুফিয়া পরিবারটা চালাতে
তার বুঝি নেই সাধ আহ্লাদ জড়াতে জীবন মালাতে
পথে পথে ঐ কাগজ কুড়ানো ছেলেমেয়েদের ঝোলায়
তোমাদের সব মানবাধিকার উপহাস করে দাপায়
তোমার ঘরের কাজের মেয়েটি সে ও কি নারী নয়?
তার প্রতি যে অবিচার করো নেই কি কোন ভয়?
তার গায়েতে খুন্তির ছ্যাকা দিয়ে সাজো বিশাল নারীবাদী
স্বামী-সন্তানের লালসা না ঠেকিয়ে তারে মারা হারামজাদি-
দিন আসছে ফেরত দিবে ঐ বোনেরা সবই
ভুঁড়ি গেলে দিলে সুঁচ ফুটিয়ে মানুষ তবে হবি?
হায়!
শ্রমিকের জন্য গালগল্প করে ওঠো যার রিকশায়
তার খবর কি নিয়েছো কখনো কি না কি সে খায়?
হোটেলে মোটেলের বাচ্চা কিশোর তোমারে খাবার দেয়
মুরগীর রান সে কি চায়না ভেবেছো কি তার ন্যায়?
যতবার আমি লিখতে বসেছি কথিত প্রেমের কথা
ততবার সব শব্দ হয়েছে কৃষকের ছড়া কবিতা
তোমাদের পেটের অন্নদানা হাড়ভাঙা খাটা খেটে
ঐ যে চাষা ফলাচ্ছে কীভাবে দেখনি কখনো ঘেঁটে
সারের দাম কি তার নাগালে খোঁজ কি তোমরা নিয়েছো?
গোলটেবিলে বৈঠকে বসে সঙ কেন তবে সেজেছো?
তোমাদের যে মে দিবস আর যত বিচিত্র বাণী
সবই যে বিরাট ধান্ধাবাজি, জানি আমি সব জানি।
লাঙল কাঁধে, কোদাল হাতে বেরোলে শ্রমিকের দল
পার্টি ধসাবে, না খেয়ে মরবি, বন্ধ হবে কল
হাতুড়ি হাতে যদি চলে আসে তোদের মুখোমুখি
কোন মুখে তোরা অস্ত্র হাতে করবি চোখাচোখি?
তোদের গায়ের ইউনিফর্ম থেকে অস্ত্র কেনার টাকা
সব কিছুতো শ্রমিকের দান, তাকাস কেন বাঁকা?
ঐ নীলাকাশ, ধূলির ধরা, বৃক্ষরাজি মরায়
সাম্যের গান গাইলেই শ্রমিক স্বর্গ নামাবে ধরায়।
ওরে অধ্যাপক, লবিং প্রভাষক, কেমন লেজুড়বৃত্তি?
শ্রমিকের টাকা খেয়ে পরে চলছে তো দলবাজি?
চামচিকারাও লজ্জা পাবে তোদের চাটা দেখে
বিচার একদিন হবেই দেখিস মেরুদণ্ড বেঁকে!
ওহে কবি,
তোমার নারীবাজী আর কতকাল চলবে?
শ্রমিকের তরে কাব্য কি এবার বইমেলাতে আসবে?
ওরে মিথ্যুক রাজনীতিজীবী,
নিয়ে শ্রমিকের প্রতীক
নির্বাচনে জিতেই তুই উড়াল দিলি সঠিক
ওরে ব্যবসায়ি,
কত বড় গাড়ি বাড়ির মালিক তুমি
কতবার তুমি ভুলে যাও শ্রমিকই তোমার জ্বালানি
সেই জ্বালানিরে জ্বালাইছো খুব এবার দাওনা ক্ষ্রান্ত
ভেঙেচুরে নইলে শ্মশানের মত করে দেবে উদভ্রান্ত।
ওহে আমলা, কর্মচারী, জমিদার ব্যাটা বেটি
কার টাকায় ফটফটানি, ভেবেছ কখনো সেটি?
তোমার পদ, তোমার গদি
তোমার ভাব, বৌ বৌদি
গরীবের ট্যাক্স-কর-ভ্যাটে আসে
ক্ষমতাহীন আর অর্থহীনরে অবহেলায় নিয়তি বিদ্রুপে হাসে
সেই হাসি তোর জীবন ভাসাবে দুঃখের স্রোতধারায়
সময় থাকতে মাটিতে নাম, বদলাবে তবে রায়!
যারে বেচে তোরা বেঁচে আছিস, ওরে পুঁজিবাদির দল
তারে না বাঁচালে মরবি তোরাও ইতিহাসে হবি খল
এখনো সময় আছে ফিরে আয় শ্রমিকের আঙিনায়
পৃথিবী টিকবে, মানুষ বাঁচবে,
শান্তি ও সমতায়
লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ খাই খাই যত স্বভাব
মানুষ হতে দেখা দিতে হবে এই সবেরই অভাব
তা না হলে জ্বলবে আগুন,
পুড়বে নগর সভ্যতা
সময় গেলে বুক চাপড়িয়েও
সাধন কিন্তু হবেনা!!
(২০১৫ এর কবিতা)
0 Comments