ধান কাটলে গরীব কৃষকের ধান নষ্ট না করে সাবধানে কেটে দিন। যার বিঘার পর বিঘা ধান আছে তার ধান কেটে দিতে গেলে ঐ গরীবেরই ভাত মারা হয়। কারণ, কোনো গরীব শ্রমিকই হয়তো ধান কাটতে আসতো! বিষয়গুলো সূক্ষ্ম। যারা গ্রামে না থাকেন, জমিজমা না বোঝেন, যারা গণবিচ্ছিন্ন তারা এটি জানবেন না।
এরপর যখন ধান কাটা হবে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কার শুরু। বিগত ৫ বছর আমাদের জমি পড়ে আছে! বিনামূল্যে করতেও কৃষক পাওয়া যায়নি। কারণ? তারা যে উৎপাদন খরচে করে তার চেয়ে অনেক কম দাম পায় এই উৎপাদিত ধানের! গ্রামে যান! কত কত ধানী জমি যে পতিত হচ্ছে তা খোঁজ রাখেন? অথচ এক কালের গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের এই জমিন!
ইশ! মনে হলে কান্না পায় কৃষকের এই চরম দুর্দশার কথা, বড় মিয়ারা পরনির্ভরশীল শিল্প নিয়ে বিশাল ব্যস্ত! যে শিল্প আর মাস কয়েক লকডাউন থাকলেই ধসে পড়বে। অথচ নিজের মাটি ও মানুষের হাতে গড়া ১০ হাজার বছরের কৃষিকে, চাষাবাদকে তারা মূল্য দেয় নাই! আমাদের স্বনির্ভর অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে তারা আমাদের শিল্পের পরনির্ভর গালগল্প শুনিয়ে যায়!
ক্ষেতের ধান কষ্ট নিয়ে ও কষ্ট করে কেটে আনার পর সরকার যখন কিনবে বা কিনতে ঘোষণা দেবে তখন ফড়িয়া ধড়িবাজদের উদ্ভব হবে। যে ধান লাগায় তার কৃষি কার্ড নাই; কার্ড পায় নেতার কাছের ফড়িয়া। এই ফড়িয়া নামমাত্র দরে প্রান্তিক চাষির ধান কিনে সরকারের কাছে বা অন্য কোথাও চড়া দামে বিক্রি করে। প্রান্তিক গরীব চাষীর কাছ থেকে পুষ্ট ধান চাল হয়ে কয়েকশ শতাংশ দাম বেড়ে চাল হয়ে ফিরে আসতে কয়েক স্তরের ফড়িয়ার হাত ঘোরে। এই ফড়িয়াদের সীমাহীন লাভের লোভের ফলে কৃষকের কাছ থেকে ধানের বিক্রয়মূল্য মন প্রতি ৩০০-৪০০ টাকা হলেও ফড়িয়াদের হাত ও চাতাল ঘুরে এসে চালের দাম মন প্রতি ১৫০০-২০০০ টাকা হয়ে যায়! কত বড় অবিচার এ দেশে স্বাভাবিক হয়ে গেলো!
যে কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কষ্টের সোনালী ফসল ফলায় তার কাছ থেকে ৩-৫ টাকা কেজি দরে ধান কিনে সে ধানের চাল কেজি ৩০-৫৫ টাকায় সেই কৃষকের কাছেই বিক্রি করা হলে কত বড় নির্মম প্রহসন হয় তা ভেবেছেন? এই রক্তচোষা অত্যাচারী প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হলে৷
কৃষকের অণুজীব, উপকারী পতঙ্গ, ব্যাঙ ও মাটিকে সর্বগ্রাসী শিল্পের সার নামের বিষ দিয়ে, ভয়াবহ কীটনাশক দিয়ে হত্যা করেছেন সবুজ বিপ্লব নামধারী সবুজ বিধ্বংসী প্রকল্পের মাধ্যমে। বেছন ফসলকে খুন করে কৃষক ও চাষার বীজের মালিকানা তুলে দিয়েছেন কোম্পানি-কর্পোরেশন নামের মুনাফালোভীদের! জেনেটিক্যালি মডিফাইড অর্গানিজম নামের বিকৃতির মাধ্যমে জিএমও ফুডের নামে আদিপ্রাণ ফসল ও প্রকৃতিকে বিনাশ করেছেন বিজ্ঞানের নামে! এখন, এত প্রতিবন্ধকতার পরেও এই আধুনিক সভ্যতা নামের অসভ্যতার প্রাণপুরুষ, শুদ্ধপুরুষ, সব সাধকের বড় সাধক কৃষক-চাষা কষ্ট জর্জরিত হয়ে অনুৎপাদনশীলদের খাওয়াতে উৎপাদন করে চলেছে! অথচ তার কোনো মূল্য নাই, তার কোনো প্রতিদান নাই, তার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের ছিটেফোঁটাও নাই! ধিক এই আধুনিকতা নামের সংকীর্ণ ছোটলোকিপনার প্রতি, ধিক এই মানবিক সত্তাহীন স্বার্থপর পুঁজিবাদী সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি! শত ধিক!
তবু যদি বাঁচতে চান, যদি ইনসাফ করতে চান, তবে ধানসহ উৎপাদিত সবজি-শাক-কৃষিপণ্যের লাভ বা বিক্রয়মূল্যের কম পক্ষে ৮০% উৎপাদনকারী কৃষক-শ্রমিক-চাষাকে দেয়ার জোরালো ব্যবস্থা করতে হবে। বাকি ২০% অনুৎপাদনশীল ফড়িয়া, ধড়িবাজ, কর্পোরেশন, মজুদদার, মহাজন, কোম্পানি, বিপণি বিতান, অনলাইন শপ, শপিং মল, মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ম মেনে নিক! কিন্তু উৎপাদনকারীর কাছ থেকে ১ টাকা, ২ টাকা, ৩ টাকা, ৭ টা বা ১০ টাকা দরে কেজি কিনে তা কেজি প্রতি ২০ টাকা, ৫০ টাকা ১০০ টাকা বা তারও অধিক মূল্যে বিক্রি করা রক্তচোষা বদমায়েশীপূর্ণ অন্যায্য জুলুমে ভরা সিস্টেম আর কত দিন চলবে?
এর শিকড় টেনে উঠানোর জন্য সম্মিলিত আওয়াজ দরকার! কিন্তু ভোগবাদ ও আত্মকেন্দ্রীক সুখে বিভোর কয়জন এই জুলুম নিয়ে ভাবেন? কেউ আছে এই মানুষগুলোর? মজলুম কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে কেউ কি আসবে? কেউ কি তাদের পাশে দাঁড়াবে? তাদের ঐক্যবদ্ধ করবে?
কে করবে? কে আছে আমার মাটির? কে আছে গরীবের? উপরের, মাঝের বা নিচের কেউ কি আওয়াজ দেবেন?
0 Comments