কেন আমি বিশ্বাসী? (১)
~~~
আমাদের বাড়িতে সব ধরনের বই ছিলো। আস্তিক, নাস্তিক, গল্প, উপন্যাস, জীবনী, আরো কত কী! আমি গোগ্রাসে সব পড়তাম। ম্যারাথন পড়া। আমার বয়সীরা সকালে মক্তবে যেতো। আমি ঘুমকাতুরে থাকার কারণে যেতে পারিনি। তবে ঘুম থেকে উঠে পড়তাম। যা পেতাম তাই পড়তাম।
হুমায়নের 'তন্দ্রাবিলাস', তসলিমার 'ফেরা', সুনীলের 'সোনালি দুঃখ' বা এ জাতীয় একটি বই যেটি ত্রিস্তান আর ইসল্ডের কাহিনী ইত্যাদি বই পড়েছি না বুঝেই; তৃতীয় শ্রেণীতে। আর সকাল হলেই পত্রিকা তো ছিলোই। পত্রিকা আমার চিন্তা জগতকে গঠনে ভূমিকা রেখেছিলো।
বিকাল হলেই আমি পড়তাম ভবেশের 'শত মনিষীর জীবনী'। জীবনী পড়তে আমার অনেক ভালো লাগতো। তাই বাড়িতে এলো হার্টের 'দ্যা হান্ড্রেড'। এই বইয়ে আমি মহানবী হযরত মোহাম্মদ (স) এর নাম দেখে অনেক অবাক হলাম। একজন খ্রীস্টান কেন তার বইয়ে আরবের এক বেদুইনকে স্থান দিলো এইটা আমার ছোটকালেই আমাকে প্রবলভাবে ভাবালো।
আমার বাল্যবন্ধু যারা আমার মত স্কুলে না গিয়ে মাদরাসায় গিয়েছে এদের কাছ থেকে ইসলাম শেখার ইচ্ছা আমার কোনোকালে ছিলোনা। বরং এখনো নানা ইস্যুতে অনেক গোঁড়ামো নিয়ে এদের সঙ্গে আমার বিতর্ক হয়। আমার তাদের সে সময়েও মনে হতো অসহিষ্ণু, এখনো কমেনি। যেমন, আমি তাদের বলতাম, তোরা হিন্দু-খ্রীস্টানদের দাওয়াত না দিয়ে জাহান্নামী বানাতে চাস লজ্জা করেনা? আমি তাদের চ্যালেঞ্জ করতাম যে, কোরআন যেমন তোর, তেমনই তা হিন্দু-খ্রীস্টানের। তারাও নবী মুহাম্মদ স এর উম্মত।
আসল কথায় আসি। এরপর বাড়িতে একটা বই পেলাম। অনেক পুরোনো বই। পুঁথি ইত্যাদির সঙ্গে ছিলো। বইটির নাম মনে নাই। সেটির নাম ছিল সম্ভবত "বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থে মুহাম্মদ (স)"। এই বইটি আমি পড়ে সেই ছোটবেলায় অনেক বেশি ভেবেছি, এমনকি ক্লাস সেভেন এইটে, যখন এসব জাকির নায়েক টায়েকের উদ্ভব হয়নি তখন এই বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছি। যাহোক, আমার বিশ্বাসের শুরুতে পরিবারের কারো কোনো চাপ ছিলোনা।
ছোটবেলায় বন্ধুদের সঙ্গে মসজিদে যেতাম, উৎসব বা ভালো লাগার মত করে। ওরা যেত, ফজরে না উঠতে পারলে কাঁদতাম। মাসখানেক এভাবে পড়ে আবার ঘুমের কাছে পরাজিত হতাম।
ছোটবেলায় আমার মনে আছে, নামাজ পড়লে একটি মানসিক প্রশান্তি কাজ করতো। এমন কী আমার মনের মধ্যে চিন্তার ক্ষেত্রে একটি পবিত্র সত্তার উদ্ভব ঘটতো। কোনো আজেবাজে চিন্তা, অন্যের অকল্যাণ করার চিন্তা আসতোনা নামাজ পড়লে।
এই প্রশান্তি, এই ভাবনা এখনো আসে। এটির মনস্তাত্ত্বিক কারণ আমি জানিনা, কিন্তু এই প্রশান্তি আর ছোটবেলায় পড়া কয়েকটি বই আমার বিশ্বাসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। মুন্সী মোল্লাদের কথাবার্তায় আমি জীবনেও প্রভাবিত হইনি। কারণ অধিকাংশ মৌলভীদেরই আমি তথ্য, উপাত্ত, যুক্তির চেয়ে অন্ধ আনুগত্যে বেশি আগ্রহী দেখেছি।
যাহোক, আমি যখন মাধ্যমিকের ছাত্র তখন "বাইবেল, কোরআন ও বিজ্ঞান" এই বইটি পড়ি। বইটি ফরাসী গবেষক ড. মরিস বুকাইলির লেখা। লেখক পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন বলে ব্যাপকভাবে পশ্চিমে আলোচিত হন।
তার বইয়ে একটি ঘটনা ছিলো তার ইসলামে আসার যা আমাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। ড. মরিস মূলত কোরআনকে বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণ করার জন্য গবেষণা করছিলেন। তিনি হয়তো আরব রাজপরিবারের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিশে এদের বিলাসীতার সঙ্গে অপার্থিব ধর্মের মিল না পেয়েই গবেষণায় উদ্বুদ্ধ হন। তুলনামূলক কনটেক্সট হিসেবে বাইবেলকেও পাশাপাশি রাখেন। তিনি আরবী ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
তো একদিন তিনি কোরআনে মিশরের ফিরাউন যাদের পশ্চিমে ফারাও বলা হয় তাদের নিয়ে টেক্সট দেখলেন। মূসা আ এর সঙ্গে ফেরাউনের ঘটনা নিয়ে তিনি পড়লেন এবং সেখানে একটি আয়াত দেখলেন যেখানে আল্লাহ বলছেন, ফেরাউনের লাশ এভাবে রেখে দেয়া হবে যেন তা পৃথিবীর কাছে নিদর্শন হয়ে থাকে (সীমালঙ্ঘন করলে কী হয় সে বিষয়ে)। বুকাইলি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিলেন কোরআন বা বাইবেলকে ভুল প্রমাণ করতে। তিনি মমি দেখতে চাইলেন।
তিনি মিশরের আনোয়ার সাদাতদের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। ফলে সহজেই মূসার সময়ের ফিরাউনের (দ্বিতীয় র্যামিসেস) মমি নিয়ে তাকে গবেষণা করতে দেয়া হলো। তখনকার প্রত্নতাত্ত্বিকদের সঙ্গে মিলে তিনি ফিরাউন নিয়ে অনেক সময় দিলেন এবং দেখলেন সেই মমিটির মধ্যে পানিতে ডুবে যাওয়া লাশের ভালো রকম মিল! এ ঘটনা মরিসকে ভাবালো এবং তিনি পরবর্তী সময়ে আরো অনেক নিদর্শনের পাশাপাশি ধর্মান্তরিত হতে এই ফিরাউনের প্রামাণ্যকে ব্যবহার করেন। চিকিৎসক হিসেবে কোরআনে বিজ্ঞান ও ভ্রূণ ইত্যাদির ব্যাপারে নিখুঁত তথ্য দেখে বুকাইলি অবাক হয়েছিলেন। তিনি অবাক হয়েছিলেন এটা ভেবে যে, যখন মিশরের এইসব মমি ১৩০০ বছর আগে মানুষের ভাবনার বাইরে ছিলো তখন এ নিয়ে কে এমন বিশুদ্ধ তথ্য দিতে পারেন? কে বলতে পারেন, "অবিশ্বাসীরা কি দেখেনা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছিলো একসঙ্গে, আমরা উহাকে পৃথক করে দিলাম"?
আমি সে সময় ছোট ছিলাম। এই ঘটনা পড়ে আমার বিশ্বাসও গাঢ় হয়। এরপর আরো বিশ্বাস-সংশয়-বিশ্বাসের দোলাচলে জীবনে নানা পরিবর্তন এসেছে। আমার বিশ্বাস শক্ত থেকে শক্ততর হয়েছে ধর্ম সম্পর্কে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার ভাঙতে ভাঙতেই। কিন্তু একটা কথা আমাকে বলতেই হবে।
বিশ্বাসী হিসেবে বেঁচে থাকার মধ্যে যে পরিমাণ যুক্তি, উপাত্ত, তথ্য, বিজ্ঞান ও মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তি পেয়েছি তা আর কোনো সময়ে পাইনি।
আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ।
0 Comments