ভাঙিবো এ রবীন্দ্র মৌলবাদ
~~~
রবীন্দ্র আলোচনায় তার সঠিক মূল্যায়ন জরুরী। যুগের পর যুগ মানুষ আংশিক রবীন্দ্রনাথকে জানছে। তার এপাশ ও ওপাশ জেনে তাকে বিচার করতে হবে এখন। তার সমালোচনাকে ব্লাশফেমি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াকে রবীন্দ্র মৌলবাদ হিসেবে পাঠ করার সকল উপাদান বিদ্যমান।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন পশ্চিমাপন্থী সাহিত্যিক যিনি ঢাকাকে রাজধানী করে তৎকালীন সময়ে পৃথক একটি প্রদেশ গড়ার কট্রর বিরোধী ছিলেন। সেসময় বঙ্গভঙ্গ সফল হলে নিশ্চিত আজকের আসামের পুরো অংশ বাংলাদেশের হতো। কলকাতাকেন্দ্রীক যে পুঁজিবাদী অনুৎপাদনশীল সমাজ গড়ে উঠেছিলো তা ভেঙে যেতো এবং পূর্ববঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের অএলিট হিন্দু মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি ঘটতো।
রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ রুখে দিতে গগন হরকরা নামের বাউলের গানের সুরটি তাকে না বলে নিয়ে “আমার সোনার বাংলা”রচনা করেন। এসব আলোচনায় আসতে হবে। তিনি জমিদার বুর্জোয়া ছিলেন। তার প্রজা ছিল নিপীড়িত মুসলিম ও শুদ্র হিন্দুগণ। তাদের জীবনকাহিনী ও দু:খ কতটা চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ? আহমদ শরীফ তো একাধিকবার রবীন্দ্রনাথের এই বুর্জোয়া সুবিধাবাদী এলিট ক্লাসের অমানবিক সত্তার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন।
তাঁকে নিয়ে গড়ে ওঠা #রবীন্দ্র #মৌলবাদ বাংলা সাহিত্যকে পিছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলেই আমার অভিমত। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এগিয়ে নিতে হলে বরং এই বাংলার আলো বাতাসযুক্ত বন্দে আলি মিয়া, জীবনানন্দ, মাইকেল, সুফিয়া বা #জসীম উদ্দিনের সাহিত্যকে আলোচনায় আনতে হবে। আর যদি ক্লাস খোঁজেন লেখায় তবে রবীন্দ্রনাথ প্রায় এলিট ক্লাসের নিজস্ব সম্পত্তি এবং নিজেও তাই। দেখবেন রবীন্দ্র সংগীত বা সাহিত্য শিক্ষিত অনুৎপাদনশীল শ্রেণির কাছে জনপ্রিয়। সার্টিফিকেটহীন মুসলিম বা হিন্দু সাধারণের নিকট রবীন্দ্রনাথ পূজনীয় নয়। বরং ব্রাহ্ম্য ধর্মের হয়েও অনেক সময় সাম্প্রদায়িক মুসলিম বা হিন্দুরা তাকে "হিন্দু" বানায়, যেমন সাম্প্রদায়িক হিন্দু ও মুসলমান নজরুলকে "মুসলিম" বানায়।
বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতাকারী এই কবি কিন্তু সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনের পাশাপাশি বৃটিশ দখলদারত্ব ও সাম্রাজ্যেরও প্রিয়ভাজন ছিলেন। তিনি শিবাজি নামের একটি কট্টর হিন্দুত্ববাদী কবিতা লেখেন, আবার নির্লজ্জের মত ব্রিটিশ রাজাকে স্তুতি করে 'জনগণমন অধিপতি" লেখেন! তার জীবন ও কর্ম আলোচনায় এসব নির্মম সত্য কেন আলোচনায় আসবেনা? সব আসতে হবে।
তিনি পশ্চিমা ধাঁচে লিখেছেন,পশ্চিমকে মানদন্ড ভেবেছেন, তারপর বাংলাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ১৯১১ এর বঙ্গভঙ্গ সমাপ্ত করে ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। নোবেলের রাজনৈতিক অর্থনীতি রবীন্দ্রনাথের প্রতি আরোপিত হবেনা?কেন না? কেন বঙ্গভঙ্গের পরেই রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পেলেন? বঙ্গভঙ্গে ক্ষীপ্ত গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীদের হাতে রাখতে? নাকি সম্ভাব্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা যেকোনো যুদ্ধে ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত বুদ্ধিবৃত্তিক এলিট ক্লাস তৈরি করতে?
মালালা, মো ইয়ান, ড ইউনুসের মত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে কি নেই তা নিয়ে কবে আলোচনা হবে , হে লোক, হে সকল?
২।
আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পের ভক্ত। কিন্তু এর মানে এই না যে তিনি কাহিনী বর্ণনায় শরৎচন্দ্রের চেয়ে সফল। কিংবা তিনি কবি হিসেবে আমার কাছে জীবনানন্দ, রুদ্র, গোস্বামী, খালেদ হোসাইন, জসীম উদ্দিন প্রমুখ থেকে উত্তম নয়। আমি কেন তাঁকে কবিগুরু বলবো? এমন কী মানুষের চরিত্র নিখুঁতভাবে বর্ণনায় এ যুগের হুমায়ুন আহমেদ যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তা কি রবীন্দ্রনাথ যুগের সাপেক্ষে পারেন?
তিনি কি পৃথিবীর তাবৎ কবিরকুলের গুরু?
তিনি কি মাইকেল মধূসুদনেরও গুরু?তিনি কি আব্দুল হাকিমেরও গুরু? তিনি কি হাফিজ, রুমি আর খৈয়ামের গুরু?তিনি কি হোমারের গুরু? কাহ্নপার গুরু? ভারতচন্দ্রের গুরু? চণ্ডিদাসের গুরু তিনি? ইমরুল কায়েসের গুরু? তিনি কি এ যুগের রফিক আজাদ বা হেলাল হাফিজের গুরু? সকলে একবাক্যে তাকে গুরু বলেছেন?
তো সব কবির ভোট ছাড়া কেমনে একটা লোক গুরু হয়ে বসে আছেন তাদের? ইট ইজ কলড মৌলবাদ! কিছু রবীন্দ্র পাঠকের অন্ধভক্তি এই গুরুত্ত্বর জন্মদাত্রী। সাহিত্যে এই গুরুবাদী অন্ধত্ত্ব ও কুসংস্কারের দিন শেষ করে দিতে হবে। এই রবীন্দ্রনাথের প্রতি অন্ধভক্তি কি ধর্মের পর্যায়ে নিয়েছিনা আমরা? "রাবীন্দ্রিক" শব্দটির সঙ্গে ইসলামিক, বৈদিক এর গুণগত তফাৎ তো নাই, না? এই রকম রবীন্দ্রপূজার মাধ্যমে আমরা রবীন্দ্রনাথ ও তার সময়ের কাছে নিজেদের ও এই সময়কে স্বেচ্ছায় পরাজিত করছি না?
৩।
রবীন্দ্রনাথের অন্ধ ইতিবাচকতার দিন শেষ। আমরা তাকে শুদ্ধভাবে চর্চা করবো। কোন ধরনের দেবত্ত্ব আরোপ করে কারো সাহিত্যের সঠিক সমালোচনা পাওয়া যায়না। তাই বছরের পর বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আমরা যে সমালোচনা দেখি তা মূলত তার “স্তুতি”। এমনকি ভাবীর সাথে তার গর্হিত অশ্লীল ও খারাপ ব্যভিচারকেও আমরা শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করি। তার অন্যের সাহিত্য থেকে স্বীকৃতি ছাড়া টুকে নেয়া নিয়ে আমরা মুখে কুলুপ আঁটি! ছি! কত রবীন্দ্রপন্থী আমরা! যেন রবীন্দ্রনাথ একজন রাজা বাদশা সম্রাট আর গবেষক একেকজন তার শাহনামা রচয়িতা।
ঔপনিবেশিকতার ছায়াতলে আরামে বড় হয়ে ওঠা কোন সাহিত্যিককে তার নিম্নবিত্ত ও প্রলেতারিয়েত হিন্দু ও মুসলিম প্রজাকে এড়িয়ে যাওয়ার পরেও এবং সুর ও সংগীত, কবিতার অনুলিপি কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হলেও এতোটা সুরক্ষিত আর কোথাও রাখা হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই...। এ রবীন্দ্র মিথ আর কতদিন চলবে? কে ভাঙিবে এ ঘরের “চাবি” হে মৌলবাদী?
রোমান্টিক পেসিমিজম দিয়ে অর্থনৈতিক বঞ্চনাকে ব্যাখ্যা বা সাহিত্যে মিথ্যাকে আর বেশিদিন ফোটাতে পারবেননা। রবীন্দ্রনাথ সমাজ পরিবর্তনের ধারায় একজন পুঁজিবাদী, একটি আত্মকেন্দ্রীক ভোগবাদী পশ্চিমকানা এলিট ক্লাসের জাতে উঠার সস্তা সিঁড়ি ছাড়া আর কিছুনা। তারে দিয়ে গরীবের কিচ্ছু হবেনা, বিপ্লবীর কিছু হবেনা, শ্রমিকের কিছু হবেনা, আধিপত্যবাদবিরোধীতার কিচ্ছু হবেনা, তারে হৃদয়ে ধারণ করলে অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে কোনকালে হৃদয়ের গভীরে সত্যিকার আগুন জ্বলবেনা।
ফরাসী বিপ্লব, রুশ বিপ্লবে কবি ও লেখকদের অসামান্য অবদান! আমাদের এই ১৫০ বছরে রবীন্দ্রনাথ কোন বিপ্লবের জ্বালানী সরবরাহ করেছে? বরং বেঁচে থাকতে ব্রিটিশরা কেন সুদূর ইউরোপ থেকে আমাদের শোষণ করছে এই প্রশ্নই তিনি তোলেননি। কোনোদিন তিনি জমিদারপ্রথার মত বাজে চোষক সিস্টেমের বিরুদ্ধে বলেন নি। কীভাবে বলবেন? তিনি যে সমাজের সুবিধাবাদী লুটেরা শ্রেণিরই একজন সুশীল প্রতিনিধি ছিলেন।
সুতরাং, তারে ভাঙতে হবে। খান খান করতে হবে তার মৌলবাদী প্রভাববলয়! ভেঙে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে এই মাটি ও মানুষ সম্পৃক্ত কিছুকে, কোন এক বা একাধিক জনকে। সাহিত্যের আধিপত্যবাদী এই বলয়কে ভাঙতে হলে রবীন্দ্র মৌলবাদীদের পরাজিত করতে হবে। তার জন্য রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকর্মের পূর্ণ নিরপেক্ষ আলোচনা করতে হবে। তা আলোচনাটা করবে কারা?
“আমরা”, দেখে নিয়েন। আমরা যুক্তি, তর্ক ও তথ্য না পেলে কোন কিছুতে অন্ধ বিশ্বাস স্থাপন করিনা। আমরা রবীন্দ্রনাথকে অন্তরের চোখ খুলে-ই পড়বো, দেখবো, খুলবো এবং ‘ভাঙিব এ রবীন্দ্র মৌলবাদী পশ্চিমপূজারী অন্ধ মানসিকতা’...।
#রবীন্দ্রনাথ #ঠাকুর #রবীন্দ্রমৌলবাদ
(২০১৩। বয়স কম ছিলো। কত বিপজ্জনক মৌলবাদ নিয়ে ভাবতাম!)
0 Comments