সর্বশেষ

ঈদ ও নিখিল বঙ্গীয় সেকুলার ভণ্ডামি

ঈদ ও নিখিল বঙ্গীয় ধর্মনিরপেক্ষতা 
~~~
একটি জিনিস খেয়াল করবেন নিখিল বঙ্গ সেকুলার সমাজকে বুঝতে, সেটি হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে তাদের প্রতিক্রিয়া। তাদের ধর্মনিরপেক্ষতা সুরক্ষায় দুর্গা পূজায় সমস্যা নাই, বৌদ্ধ পূর্ণিমায় সমস্যা নাই, মেরি ক্রিশমাসে সমস্যা নাই, মঙ্গল শোভাযাত্রায় সমস্যা নাই; তাদের যত সমস্যা তার সবকিছু হচ্ছে মুসলমানদের উৎসব নিয়ে। ইসলামের উৎসবের প্রতি এই সমস্যাই তাদের সেকুলার চরিত্রের মধ্যে লুকায়িত ইসলামবিদ্বেষকে ফুটিয়ে তোলে; সেকুলার চরিত্রের অত্যন্ত নিখুঁত ও নিষ্ঠুরতম সত্যতাকে প্রকাশ করে।

অথচ ইসলামের এই সব উৎসব কিন্তু ভীষণ মানবিক। ঈদ উল ফিতরে ফিতরা দেয়া হয়। গরীবের অংশ। আশেপাশের প্রতিবেশিকে নিয়ে এক সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করতে উৎসাহ দেয়া হয় আর ঈদ-উল-আযহাতে জবাই করা পশুর তিন ভাগের দুই ভাগ গরীব-দুঃখী-অনাথ ও আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করতে হয়, ধনীর সম্পত্তিতে যাকাতের মাধ্যমে শ্রমিক ও দরিদ্রের অধিকারকে অত্যাবশ্যক করা হয়; আর তারপরও নিখিল বঙ্গীয় সেকুলার সমাজের মন পায়না ইসলাম। তারা নির্লজ্জের মত মিথ্যাচার করে বলতে চায় ইসলাম আরব থেকে আসছে, তা এই মাটির ও এই বাঙালির নয়। 

অথচ খ্রীস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে ইউরাল পর্বত হতে এখানে দখলদাররূপে আসা আর্যদের বা তাদের উৎসব নিয়ে তাদের মোটেই "এ মাটির নয়" জাতীয় আপত্তি তুলতে দেখা যায়না। এমনকি আরব থেকেই আসা খ্রীস্টান ধর্ম নিয়ে তাদের আপত্তি নাই! যত আপত্তি ইসলামে, যদিও এই দেশের অনার্য ভূমিপুত্র অধিকাংশ ইসলাম গ্রহণ করুক, কিংবা আগত আরব-তুর্কি-পার্সি-হাবশি-আফগানরা যতই এখানে বিয়ে করে এখানেই শিকড় গাড়ুক নিখিল বঙ্গীয় শিবসেনা, আরএসএস প্রভাবিত সেকুলার মাপকাঠিতে তা বাঙালির হবেনা! কী নির্লজ্জ এই মানদণ্ড! 

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে দেখেছি এই সেকুলারকুলের 'বিসমিল্লাহ', 'ইন শা আল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ'-তে যে নাক সিঁটকানো সেটি অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব কিংবা প্রতিশব্দের ক্ষেত্রে মোটেই নেই। 

এরা অন্যান্য ধর্মীয় বলী, পশু হত্যা নিয়ে চুপ থাকলেও কোরবানি মুরগীর রান খেতে খেতে গরুর জন্য সে কী অদ্ভুত মায়াকান্না শুরু করে অথচ গরুর তিনভাগের দুই ভাগ খাবে গরীবে! এ বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশের মুসলিম বংশোদ্ভূত পণ্ডিতজন কোনোকালেই কথা বলেনি, কারণ তাদের বুদ্ধিবৃত্তির মাপকাঠি তৈরি করে দেয় মূলত পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালি পরিচয় ও জাত বিকিয়ে "মহাভারতীয়" বনে যাওয়া সুশীল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংস্থার সিপাহসালারপাল! 

এই সংকট নিয়ে সদ্যপ্রয়াত দেবেশ রায় কিছুটা ভেবেছিলেন। তিনি যা বলেছিলেন তার অর্থ মুসলমানকে সেকুলারের নামে এমন একটি রূপ দেয়া হয় যা তার নয়!

একজন মুসলমানকে সেকুলার হতে হলে যে পরিমাণ কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়, নিজের ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি যে বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন করতে হয় তা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীকে করতে হয়না। এখানে এসেই আমাদের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষতা মারাত্মকভাবে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

বাংলাদেশে বিপুল সম্ভাবনাময় সমাজতন্ত্র অজনপ্রিয়তার কারণ তরিকত হিসেবে তা পশ্চিমবঙ্গকে অনুসরণ করে ধর্মকে প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। অথচ এদেশের যে প্রলেতারিয়েত তার ১০০% ই ধর্মানুরাগী এবং ১০০% এর আবার কম করে হলেও ৮০% ইসলামের অনুসারী। তো এই ইসলামের সংস্কৃতিকে ধারণ না করে, ভালো করে ইসলামের মানবিক রূপকে পাঠ না করে একে সমাজতন্ত্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বামপন্থীরা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই বিচ্ছিন্নতা আজো কাটেনি। 

আমি আজো আমার বন্ধু তালিকার বড় ছোটো বামপন্থী সেকুলারদের টাইমলাইন খুঁজে দেখলাম। ছোটো করে "ঈদ মোবারক" লেখাও প্রায় নাই। যাদের আছে তারা লিখেছে 'ইদ মোবারক'। এই ঈ এর পরিবর্তে ই লেখার মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গের প্রতি মানসিক দাসত্বের একটি উপস্থাপনা থেকে যায় তা এরা বুঝিয়ে দেয়। 

আজ ছিলো আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামলে স্মরণ করার একটি দিন। তিনি ঈদ-উল-ফিতর নিয়ে লিখেছেন অমর সংগীত "ও মোন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ"। সেই নজরুলকে নিয়ে এদেশের সেকুলারদের দখলে থাকা গণমাধ্যমের সাংস্কৃতিক প্রচারণা চোখে পড়েছে? আমার ততোটা পড়েনি। অথচ নজরুলের চেয়ে বড় সেক্যুলার আজো নিখিল ভারতে জন্ম নেয়নি। সেক্যুলারের প্রমাণ দিতে তিনি এক হিন্দু নারীকে বিয়ে করলেন, ছেলের নাম রাখলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ, সব্যসাচী আর লিখলেন হিন্দু ধর্মীয় শ্যামাসংগীত, জীবীত অবস্থায় মোল্লা পুরুতরা তারে মুরতাদ ঘোষণা দিলো ; তবুও বেচারাকে মরার পর মুসলমানের কবি হিসেবেই ধরে নিখিল ভারতীয় রাবিন্দ্রীক সাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা! এর কারণ কী? এর উত্তরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে প্রাচ্যের রাজনৈতিক ও দার্শনিক ভূতভবিষ্যৎ! 

যে বাঙালি, যে মুসলমান তার কাছে ঈদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম, যেভাবে একজন সনাতনধর্মী বা বৌদ্ধধর্মী বা খ্রীস্টানের কাছে যথাক্রমে দুর্গা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা বা ক্রিশমাস গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যেটি প্রয়োজন তা হচ্ছে, প্রত্যেকের ধর্মীয় উৎসবকে সম্মান করা। সবাইকে বাঙ্গালি সংস্কৃতির অংশ বলে মুসলমানদের বাদ দিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন অসম্ভব। এই বিভাজন সৃষ্টি করে দেশের বাইরের প্রভুদের সন্তুষ্টির কারণ হওয়া যায়, ফান্ডিং পাওয়া যায়, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ সুসংগঠিত শক্তিশালী জাতি গঠন করা যায়না।

২০০১ এর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আক্রমণের শিকার হলে মুসলমানদের বলির পাঁঠা করা শুরু হয়। শুধুমাত্র নামের কারণেও অনেকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে, অত্যাচারিত হয়, খুন হয়। সেই রেষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী "ওয়ার অন টেররের" নামে ইহুদীবাদী এজেন্ডায় মুসলিম ও তার উৎসবকে প্রান্তীকরণ করা হয়। মিডিয়া, ফিল্ম, এডুকেশন, ডিবেট, সোস্যাল মিডিয়ায় মুসলমানদের নেতিবাচক অবয়ব তৈরি করে। তারই সম্প্রসারিত রূপ মুসলমানদের উৎসবের প্রতি নেতিবাচক ধারণা। 

এই মুহূর্তে, আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কী। অসাম্প্রদায়িকতা মূলত সকল সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, আচার, প্রথা ও উৎসবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। আপনার কোনো সম্প্রদায়ের উৎসবের প্রতি বিরূপ মনোভাব থাকলে বুঝবেন আপনি নিরপেক্ষ নন, বিদ্বেষী। 

এই বিদ্বেষ বিলুপ্ত হয়ে পৃথিবী ও বাংলাদেশ সুখে থাকুক।

ঈদ মোবারক। ঈদ মোবারক। ঈদ মোবারক।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments