আমরা যে গণমাধ্যম দেখি, বা পুস্তক পড়ি, আর্টিকেল লেখি বা প্রকাশিত আর্টিকেল পড়ি তার অধিকাংশই আসলে পশ্চিমা পুঁজিবাদের চোখে দেখা। এর বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ভাবনার সক্ষমতা ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়া হয়। সমাজতন্ত্রের চমৎকার ভাবনাগুলো আমাদের থেকে আড়াল করর রাখে সর্বগ্রাসী ভোগবাদী পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদনির্ভর সিস্টেম, পুঁজির দাস মিডিয়া। আমি বলছিনা সমাজতন্ত্র আসমানী বাণী, কিন্তু এটি পুঁজিবাদের চেয়ে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ একটি মতাদর্শ। একটু উদাহরণ দিই।
উত্তর কোরিয়া ও এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা। তাদের মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্র নিয়ে আলাপ করতে আমাদের অনাগ্রহ দেখা যায়। মার্কিন ও ইউরোপীয় মিডিয়ায় উত্তর কোরিয়াকে যেভাবে "একনায়কতান্ত্রিক, ডিকটেটর, অথোরিট্যারিয়ান" ইত্যাদি রেটরিকসহ উপস্থাপন করা হয় আমাদের মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকরাও তার বাইরে ভাবতে পারেননা। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি বা কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ বা জাসদ বা বাসদ ইত্যাদির কাউকে উত্তর কোরিয়াকে নিপীড়িত একটি সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পাঠ করতে দেখিনি। কোরিয়ান শ্রমিক পার্টি (Workers' Party of Korea) নিয়ে ইতিবাচক কোনো বয়ান প্রতিবয়ান এদেশে আছে?
এমনকি কথিত বামপন্থী বলে পরিচিত দৈনিক প্রথম আলো বা সংবাদ বা মতিউরের প্রতিচিন্তা বা উমরের সংস্কৃতিতে উত্তর কোরিয়ার লড়াই-সংগ্রাম-বিপ্লব-আদর্শ নিয়ে কোনোদিন ইতিবাচক বা অনুসন্ধানী কোনো আলাপন এসেছে? এমন কি আমাদের সলিমুল্লাহ খাঁকেও পুঁজিবাদী পৃথিবী কর্তৃক উত্তর কোরিয়াকে একঘরে করে রাখার ব্যাপারে কোনো আলাপ দেখিনি। আমার প্রিয়জন বামপন্থী তাত্ত্বিক Azfar Hussain এর সঙ্গে মার্ক্সবাদ নিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলাপে আমি উত্তর কোরিয়া নিয়ে তার ভাবনা জানতে পারিনি। আশা করি, ভবিষ্যতে এ সৌভাগ্য হবে।
তো বাংলাদেশসহ বিশ্বের বামপন্থী নেতা বা তাত্ত্বিকদের কেন পুঁজিবাদের ভিত্তিভূমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেখানো চোখে উত্তর কোরিয়াকে দেখতে হয়? এক কালে মিথ্যা বিপ্লবের নামে বাংলাদেশকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সচেষ্ট সিরাজুল আলম খাঁ এখন মার্কিন মুল্লুকে বসে বিশাল আয়তনের দাঁড়ি রেখে অন্যকে দিয়ে নিজের বই লেখায়! কিন্তু মার্কিন ও তার মিত্র কর্তৃক উত্তর কোরিয়ার উপর অবরোধ নিয়ে কথা নাই। কারণ কী? এসব কমরেডদের শেষ গন্তব্য কি তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র? এরা কি বিপ্লবের বাণী শোনায় মার্কিন দেশে যেতেই? আমি এমন বামপন্থীদের আদর করে "ক্যাপিট্যালিস্ট কমরেট" ডাকি।
জাপানি আগ্রাসনের পর যখন কোরিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে পুনর্গঠন করবে নিজেকে তখনই কোরিয়াকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলা হয়৷ একটি উত্তর ও আরেকটি দক্ষিণ। কিম ইল সাং, যাকে বলা হয় উত্তর কোরিয়ার জনক তিনি পুরো কোরিয়াকে নিয়ে একটি কোরিয়া করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূরপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য কোরিয়া উপদ্বীপ ভীষণ দরকারী ছিলো। এখান থেকেই কোরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটি আর মার্কিনীদের সাথে কোরিয়ার দ্বন্দ্ব। তারপর রক্তাক্ত কোরিয়া যুদ্ধ। এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থ ও অস্ত্র দেয়, চীন ভলান্টিয়ার পাঠায় ১৯৪৯-১৯৫৩ সালে মার্কিন ও পশ্চিমের আরো ১৮ টি মিত্র দেশের আগ্রাসন থেকে উত্তর কোরিয়াকে সুরক্ষা করায় ( Kim Il Sung, Selected Works, 1968 & 1971)।
এত্তসব আলোচনা করছি এ কারণে যে, কোরিয়া যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া দরিদ্র ছিলো, উত্তর কোরিয়ার অবস্থা খারাপ ছিলোনা। এরপর মার্কিনীদের সহায়তায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার সম্প্রসারিত হয় ইউরোপ ও বাকি বিশ্বে৷ দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত কোরিয়া ও জাপান এগিয়ে যায়, আর উত্তর কোরিয়া অবরোধের পর অবরোধে কী অবস্থায় আছে তা আর জানারও উপায় থাকেনা! আফসোস! অথচ বামেরা শ্লোগান দেয়," দুনিয়ার মজদুর"! তো উত্তর কোরিয়ার চেয়ে বড় মজদুর দেশ আর কে আছে এই দুনিয়ায়?
পড়ছি কিম ইল সাংয়ের ভাষণের সংকলন। ইংরেজিতে বইটি বের করেছে Foreign Language Publishing House Pyongyang, Korea। ১৯৬৮ সালে বের হয়। ১৯৭১ সালে Kim Il Sung : Selected Works নামে বের হয়। মোট ৫৯৬ পৃষ্ঠার বই। একজন রাষ্ট্রনায়ক কীভাবে একটি জাতির ভিশন বা গন্তব্য তৈরি করেন পড়ছি সেই ইতিহাস।
কোরিয়া নিয়ে আমার অধ্যয়ন অনেক দিনের। আমি প্রচলিত পশ্চিমা বেইসলেস প্রোপাগাণ্ডাকে বিশ্বাস করিনি। কারণ, তা সত্য হলে কোরিয়ায় এতদিন ধরে একটি পরিবারের শাসন চলতে পারেনা৷ এই শাসকদের নিশ্চয়ই কোনো মন্ত্র আছে---যা এই জাতির ঐক্যবদ্ধ থাকাকে সুনিশ্চিত করে। সেই বিষয়গুলো জানছি।
অনেকেই ভাবতে পারেন যে, উত্তর কোরিয়া মনে হয় চীনের মত মাওবাদী! তা মোটেই নয়। এরা মূলত "মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট" প্রিন্সিপাল অনুসরণ করে বলে এই বইয়ের একাধিক বক্তব্যে কিম ইল বলেছেন। ঠিক এই কারণেই, চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা উত্তর কোরিয়া বিরোধী অবরোধ ইত্যাদি প্রস্তাবে কদাচিৎ ভেটো দেয় অথচ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মিয়ানমারকে সুরক্ষায় আবার বুর্জোয়া ভেটো নিয়ে হাজির হয়! পুতিনের রাশিয়া অবশ্য তাত্ত্বিকভাবে না হলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক রেখেছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে।
তো, সমাজতন্ত্রের বণ্টন প্রক্রিয়া বলতে কিম ইল সাং কী বুঝতেন বা বোঝাতেন তা তার ভাষায় শুনি চলেন---
When you are asked what the socialist principle of distribution is, you answered correctly that it means distribution according to work done. By the socialist principle of distribution is meant distribution according to the quantity and quality of work done. In plain words, it means receiving according to what you have worked and earned. A big share is alloted to a person who has worked hard and earned a lot, and a small share to a person who has worked little and earned little. This is the socialist principle of distribution (Kim Il Sung, 1971)।
অর্থাৎ তিনি কাজ অনুযায়ী, শ্রম অনুযায়ী সম্পদের বণ্টন চেয়েছেন। একজনে সব খাবে তা হবেনা। ১৯৬০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী তিনি For Correct Management of the Socialist Agriculture শীর্ষক ভাষণে এটি বলেন। একই বক্তব্যে তিনি পার্টির নামে যারা পাণ্ডামি করে অতিরিক্ত ভোগ করতে চায় তাদের তিরস্কার করে বিবেক দ্বারা দংশিত (Stung by their consciences) হতে বলেন। তবে এটি আমাদের দেশের ৭৩ এর অধ্যাদেশের মত ধারা। পার্টি মেম্বার অসৎ হলে আরো বড় শাস্তি হওয়া উচিত। এই বিবেক বেচে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আখড়া গড়ে তুলেছেন।
কিম ইল সাং দারুন বুদ্ধিমান ছিলেন। যারা ক্যাপিটালিজম দ্বারা আক্রান্ত কিন্তু সমাজতন্ত্রের আওতায় এসেছে তাদের তিনি বলেন " Survivals of Capitalist Ideas' এবং তাদের মুক্তির জন্য তিনি ভাবেন এবং একই সঙ্গে তাদের নিয়ে ভীত হন। কারণ?
"... The Characteristic feature of capitalist ideas is that a person is only awake to his own advantage, but indifferent to the interest of the society. If equal distribution is introduced for those who have not yet shed such capitalist ideas completely, many people will emerge who seek to live an idle life. This wil cause productivity to fall and make our lives harder. The socialist principle of distribution must therefore be in force until all production is automated and people's minds become totally free from capitalist consciousness."(তথ্যসূত্র, প্রাগুক্ত)
খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারেন কী বলেছেন কিম। তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন ১৯৬০ সালে আজ আমরা পুঁজিবাদী পৃথিবীতে তা দেখছিনা? গোটা পৃথিবীর সম্পদ ১% অনুৎপাদনশীল অলসদের হাতে যারা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নয়। এক বারে উৎপাদন করেছে, কবে কষ্ট করেছে তাও হয়তো ভুলতে বসেছে, কিন্তু বর্তমানে একাই সব ভোগ করছে অলস বসে! আর যারা পরিশ্রম করছে তাদের বেতন একেবারে কম। শ্রমের মূল্য কম, কিন্তু শ্রম দ্বারা উৎপাদিত পণ্যের দাম অনেক অনেক বেশি! এই যে শ্রমমূল্য ও পণ্যমূল্যের মধ্যে বিরাট তফাত এটা মানবতাবিরোধী একটি ব্যাপার। পুঁজিবাদ তার রঙচটা মোড়কে আমাদের তা ভুলিয়ে দিয়েছে আর কী!
যাহোক, আজ সারাদিন এই বইটি পড়লাম। অনেক কিছু লেখার আছে। কিন্তু লিখতে হাত ব্যথা করে। আপনারা বইটি পড়তে পারেন।
আর অনুগ্রহ করে পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে উত্তর কোরিয়াকে স্যাটানিক বা রগ স্টেট (Satanic/Rogue State) হিসেবে দেখায় তার বাইরে এসে একটু উত্তর কোরিয়াকে পাঠ করুন। একটি দেশ পৃথিবীর এই 'সভ্যতম' সময়ে এসেও কেন বাকি বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন আর কেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রটি এই ক্ষুদ্র দেশটির পিছনে লেগে থাকে তা নিয়ে ভাবুন। ভাবলে মানুষ মানবিক হয়, অপরের প্রতি ইতিবাচক হয়...।
দুনিয়ার মজদুর
এক হও...
0 Comments