ইতিহাসকে পশ্চিমের দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আমাদের মগজে পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ হয়ে যায়। আমরা পশ্চিমের বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে আর সংবাদ গলধঃকরণ করে আমাদের মগজকে ইউরোপ ও আমেরিকার ফরেন মিনিস্ট্রি করে ফেলি! তাই পৃথিবীর ইতিহাস নির্মোহভাবে অধ্যয়নের সুযোগ আমাদের আসেনা। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমা মানসিক দাসদাসী শিক্ষকরা ইউরোপ ও আমেরিকার বয়ান মুখস্ত করে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেয়, তারা তাদের চারপাশে ছড়ায় এই বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের বলয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রচলিত পশ্চিমা বয়ানের বাইরেও যে বয়ান আছে তা আমরা ভুলে যাই। এক চোখে ইতিহাস পাঠ আমাদের বিশ্বকে ভুলভাবে পাঠ করায়। "অপর" মত না জানায় অপর হয়ে যায় আমাদের পশ্চিমাক্রান্ত চোখে খল, ভিলেন, দরিদ্র, কমিউনিস্ট সন্ত্রাসী ইত্যাদি।
গ্রিগোরি দেবোরিন (Grigory Deborin) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। তার লিখিত Secrets of the Second World War এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু গোপন বিষয় তুলে এনেছেন। এ বইটি ১৯৭১ সালের। কীভাবে হিটলারকে এই ব্রিটেন, এই ফ্রান্স আর এই আমেরিকাই মদদ দিয়ে উপরে তুলেছে তার অনেকগুলো প্রমাণ এ বইয়ে আছে। পশ্চিম চেয়েছিলো হিটলারকে দিয়ে কমিউনিস্ট রাশিয়া ও সমাজতন্ত্রকে স্তব্ধ করে দিতে। হিটলার অস্ত্র বানাচ্ছিলো আর এরা হিটলারের পিঠে চাপড় দিচ্ছিলো! হিটলারের মত জঘন্য সন্ত্রাসী ঘৃণাবাদী ১৯৩৯ সালে পশ্চিমাদের চোখে "শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য মনোনীত পর্যন্ত হয়েছিলো"। ভাবা যায়?
বইটি পড়ে আমার মনে হলো, রাশিয়াও আসলে হিটলারকে উঠাতে ভূমিকা রেখেছিলো। হিটলার রাশিয়াকে বলতো যে, সে মূলত ফরাসী আর ব্রিটিশদের নাক কেটে জার্মানকেন্দ্রীক ইউরোপ গঠন করবে। এমন কী রাশিয়ার সঙ্গে " অনাক্রমণ চুক্তিও" করলো যেটি গ্রিগোরি বলছেন রাশিয়ায় প্রকাশ্য ছিলো আর পশ্চিমা বয়ান বলে এটি তারা গোপনে করেছে! প্রকৃতপক্ষে হিটলারের সঙ্গে গোপনে একাধিকবার ধনতান্ত্রিক ইউরোপের ক্ষমতাশালীরা দেখা পর্যন্ত করেছে।
এই বইয়ে গ্রিগোরি একটি নয়া তর্ক উত্থাপন করেন। তিনি বলতে চান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়েছিলো ধনতান্ত্রিক তথা পুঁজিবাদীরা। হিটলারের মত সংকীর্ণ জার্মান আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদীর মগজ ধোলাই দিয়ে মূলত পুঁজিবাদীরা এ যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করে৷ হিটলারের মাথায় সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা প্রবেশ করায় ধনতান্ত্রিক পুঁজিবাদীরা। তারা চেয়েছিলো রাশিয়াকে যে করে হোক থামাতে, কারণ উসমানীয় তুর্কিদের বিশাল সাম্রাজ্য ভাগাভাগি করে রাশিয়াও ককেশাশের বিশাল ভূমি পেয়ে বৃহত্তম দেশ গঠনের দ্বারপ্রান্তে! আর এদিকে ইউরোপ ছোট একটু জায়গা! অন্যদিকে প্রবল পুঁজিপতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রণাঙ্গনে আসার উপলক্ষও প্রয়োজন ছিলো। জাপান কর্তৃক পার্ল হারবারে আক্রান্ত হওয়ার আগে মার্কিন নীতি ছিলো "জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে সংঘাত জিইয়ে রাখা। যে জিততে যাবে তাকে আমেরিকা প্রতিপক্ষ ধরে নেবে", দেবোরিনের বয়ান।
১৯৪১ এর পার্ল হারবারে আক্রমণের প্রতিশোধ ১৯৪৫ এসে কীভাবে ও কেন নিলো এই প্রশ্ন তিনিও করেন। এই বইয়ে তিনি তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন, আমেরিকা জাপানের সম্ভাব্য আক্রমণের ব্যাপারে জানতো, তবু ইহুদীবাদী পেন্টাগনের নিস্ক্রিয়তা গ্রিগোরির কাছে তখন এক বিশাল প্রশ্ন!
এই বইটি আপনি পড়তে পারেন। রেয়ার কালেকশন! খুব রিচড লাইব্রেরি ছাড়া পাওয়া মুশকিল।
0 Comments