সর্বশেষ

CGPA/GPA এর গুরুত্ব || ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা ও অন্যান্য

বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কিছু অপ্রিয় আলাপ
CGPA/GPA কম দেয়ার বিপত্তি: অন্ধকার ভবিষ্যৎ! 

আমি ৪১ ব্যাচের একজন নিয়মিত শিক্ষার্থী, একজন ধ্রুব ব্যাকবেঞ্চার এবং সর্বশেষ একজন বেকার (এখন আমি বেকার নই আলহামদুলিল্লাহ। ২০১৮ এর ২১ ডিসেম্বরের লেখা)। আলমগীর হোসেনের বার্তা২৪ এর হেড অব ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স হিসেবে যোগ দিয়ে একটা গবেষণার কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে বেকার ঘুরছি আর ঘুমাচ্ছি। 

বেতনের 'উচ্চতা' ও স্বজনপ্রীতির রিক্রুটিং প্রক্রিয়া দেখে অন্যান্য মিডিয়ায় সিভি দিতেও ভয় লাগছে। এ কারণে আমরা অনেকেই সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকর হওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। কিন্তু নিম্নমানের সিজিপিএ/জিপিএ আমাদের অনেকেরই কর্মজীবনে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এখন এই সিজিপিএ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই ২০১৮ এর এই শেষ বেলায়।

২০১১ এর ২১ ডিসেম্বরে আমরা বিভাগের যাত্রাপথের স্বপ্নসারথি ছিলাম। কিন্তু সেই সারথিদের এখন বেকারত্বের ঘানি টানতে হচ্ছে। এর নানা কারণের মধ্যে সিজিপিএ একটি বড় কারণ বলেই অনেকের সাথে কথা বলে জেনেছি। আশানুরূপ সিজিপিএ না পেয়ে অনেকে হতাশাগ্রস্তও দেখা গেছে।

আমাদের অনুজ ৪২ দের অনেকের সাথে কথা বলেও একই ধরনের বয়ান পাওয়া গিয়েছে। ২০১৯ আশার আগে এই কথাগুলো তাই শেষ করে ফেলাই ভাল। এখানে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা জরুরি এ প্রসঙ্গে।

বিব্রত ১ 
আমরা দীপ্ত টেলিভিশনে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিলাম। সেখানে গিয়ে ঢাবি, জগন্নাথ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জনকে পেলাম। সকলের সাথে কথায় কথায় রেজাল্ট জানতে চাইলে তাদের সবার রেজাল্ট আমাদের সবার চেয়ে বেশি বললো। বেশি মানে এক দুই পয়েন্ট না, বেশ ভাল মানের পয়েন্টে বেশি। সেই পরীক্ষার রেজাল্ট আমরা পাইনি। কেন পাইনি? দীপ্ততে ফোন করলাম, বলে আপনাদের চেয়ে তুলনামূলক 'ভাল' ফলের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি! বাহ, বিরাট ব্যাপার!

অপদস্থ  ২
বিভিন্ন বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় আমরা সিভি ড্রপ করি। এর মধ্যে কমিউনিকেশন অফিসার পদও থাকে। কিন্তু ০.১% ও ভাইভার জন্য কল করেনা ওরা। এর একটি কারণ আমাদের বিশ্বাস, আমরা সিজিপিএ তে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এমন কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই আমাদের কম্পিটিটর আইআর, এন্থ্রোপলজি, ল, পলিটিক্যাল সায়েন্সের ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে পিছনে পড়ে আছি। ওদের ছেলেমেয়েরা আমাদের চেয়ে বেশি সিজিপিএ/জিপিএ নিয়ে সিভি ড্রপ করে। ফলে আমরা বাদ পড়ে যাই।

 ব্রাকের একটি প্রোগ্রামে সিভি দিয়ে কেন ডাকা হলোনা জানতে চেয়ে কল করলে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আমরা 3:70 এর নিচে কাউকে ডাকি নাই। আমেরিকান এমবাসিতে এপ্লাই করলাম। সেখান থেকে জানালো, অনেক সিভি পড়ায় কেবল প্রথম দিকের সিজিপিএ এর কয়েক জনকে ডাকা হয়েছে!

সিপিডির রিসার্চ এসোসিয়েট হতে সিভি ড্রপ করার সিজিপিএ-ই নেই আমাদের কারো। টিআইবিতে ভাইভা দিলাম। বোর্ড থেকে বলল, এই যুগেও তোমার সিজিপিএ কম কেন বাবা? পড়াশোনা করোনা? মনে মনে কেন কম তা বললাম। সে খবর ইনারা জানেন না বলেই আজো "পঁচা" বিবেকে ঘাঁ মারছেন না। এই হচ্ছে আমাদের করুন অবস্থা। আপনারা কি শুনতে পান এই ক্ষতিগ্রস্থদের আহাজারি ?

অবমূল্যায়িত ৩

আমরা অনেকেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার জন্য এপ্লাই করি। এমনিতে কেবল নামের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারো কারো ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়, এর মধ্যে আবার ঢাবির ঊর্ধ্বগামী সিজিপিএর জোয়ার। আমাদের সিজিপিএ কেন এতো কম আসে সেই ঢাবিরই মূল্যায়নকারীদের থেকে? এটা কি কম্লেক্সিটি? নাকি ঢাবির কথিত ব্রাহ্মণ্যবাদী শ্রেষ্ঠত্বের পৈতাকে আজীবন টিকিয়ে রাখার সমন্বিত এজেন্ডা?

যাহোক, সিজিপিএ এর করুন দশার কারণে আমরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বিইউপি, এমন কি জগন্নাথেও এপ্লাই করতে পারিনা। ফলে কিছুদিন আগে কুবির ৩ জনই ঢাবি থেকে শিক্ষক নেয়া হয়েছে। তো, আমরা কি জন্য জাবিতে পড়লাম? আমাদের বিভাগ থেকে প্রাপ্তি কি আমাদের? আপনারা বলতে পারেন, তারা আমাদের চেয়ে 'ভাল' তাই বেশি পায়, আমরা খারাপ তাই মন্দ পাই। কিন্তু আপনাদের এই বিপুল ভালোদের সাথে একটা দুইটা পরীক্ষায় মুখোমুখি হয়েছি তো। আল্লাহর রহমাতে ভাল করে বা ফার্স্ট হয়েই টিকে থেকেছি (এখন যে জব করছি তাতে ১ টি পদ ছিলো এবং ঢাবির ৫ জনকে বাদ দিয়েই আমাকে নেয়া হয় আলহামদুলিল্লাহ)। 

আর আমরা যদি খারাপ হই তার দায় আপনাদের নেই? সুতরাং এসব বলে আমাদের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়া জাস্টিফাইড করা যাবেনা।

কথা হচ্ছে, ঢাবি, জাবি, রাবির ওরা আমাদের চেয়ে বেশি সিজিপিএ পেলে আমরা কেন পাইনা?

প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে আমাদের পিছনে ফেলে দেয়া আপনাদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডকে আমরা কি সম্মানের চোখে দেখবো? আমি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইভা দিয়েছি। সেখানে খুবির ভিসি মহোদয় বলেছেন, তোমার অনেক পাবলিকেশনস আছে, অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু তোমার সিজিপিএ ওদের চেয়ে অনেক কম। আমি এক্সটারনালদের তো তাই ফেলে দিতে পারিনা। বলা বাহুল্য, এক্সটার্নাল ঢাবি ও রাবির ২ জন ছিলেন। তো তারা তাদের বিরাট বিরাট সিজিপিএধারীদের অগ্রাধিকার দেবে এটাই স্বাভাবিক। 

কিন্তু আমাদের শিক্ষকগণ আমাদের জন্য কি করবেন এসব জায়গায়?  আপনারা তো এক্সটারনালও থাকেন না, অন্যান্য চাকরির ভাইভা বোর্ডেও থাকেন না। তাহলে আমরা কি নিয়ে লড়াই করতে যাবো ময়দানে? সিজিপিএ CGPA  ই তো সম্বল বা অস্ত্র। তা ভোঁতা করে দিলে কেমনে হবে?

কোন মিডিয়ায় আমাদের সিনিয়র নেই, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পৈতাও নাই (আমি গৌরব করে বলতাম ঢাবি ছেড়ে জাবিতে এসেছি, এখন আমি মনে করি সেটি ভুল সিদ্ধান্ত,  আমি পৈতা ছেড়ে এসেছি), আবার আমাদের কথিত ভাল রেজাল্ট বা সিজিপিএ ও নেই। তাহলে আমরা যাবো কোথায়? আমাদের অনুজদের এই অবমূল্যায়ন ও নিম্নমানের সিজিপিএ/জিপিএ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না করে সে কারণেই এই লেখাটি লিখলাম। 

আপনাদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আর আমাদের কোন প্রজন্মকে যেন এমন অনিশ্চিত জীবনের সামনে পড়তে না হয়। আপনারা আমাদের জীবনগুলো নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চালানো দয়া করে বন্ধ করুন। এই পুঁজিবাদী সমাজে অনেক চাকরি পেতে সিজিপিএ এর মূখ্য ভূমিকা রয়েছে (ব্যাংকে রেজাল্ট ভালো হলে নিয়ে নেয়, বিসিএসেও ভালো ধারণা জন্ম নেয়) সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না। 

ঢাবিসহ নানা জায়গায় ইম্প্রুভমেন্ট দেয়ার সুযোগ আছে। আমাদের তা নেই। খাতা চ্যালেঞ্জের সুযোগ নেই, তবে আমরা যাবো কই? যে জুলুমের শিকার আমরা হয়েছি সেই একই জুলুমের শিকার আর কোন ব্যাচ বা ছাত্রছাত্রী যেন না হয় বিভাগের যাত্রার দিনে সেই প্রত্যাশা রইলো।

বিপত্তি ও প্রতিক্ষেত্রে সর্বনাশের বীণ ৪

আমি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার নিয়োগে পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষায় টিকে আমি ভাইভাও দিলাম। ভাইভায় সবাইকে জিজ্ঞেস করতে ছিল,  গবেষণা আছে কি না। থিসিস আছে কি না ইত্যাদি। না থাকলে বের করে দিচ্ছিল। ভেতরে ছিলেন আমাদের বিভাগে নানা সময়ে পূজনীয় সম্মান পাওয়া ঢাবির অধ্যাপক গীতিয়ারা নাসরিন । তো আমাদের তো কোন থিসিস গ্রুপ ছিলনা, আমরা কি বলবো? থিসিসবিহীন একটি ব্যাচ বা একাধিক ব্যাচ যারা বেরোচ্ছে তাদের অন্তত নজরকাড়া সিজিপিএ থাকলে এই ক্ষত কমে যেত। কিন্তু বিধি জার্নালিজম বিভাগে এসে বাম হয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছেই দিন দিন। 

তো আমি গীতিয়ারা মহোদয়ের মুখোমুখি হয়ে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললাম যে, আমার গবেষণা আছে, পেপার্স আছে, বই আছে। তিনি বেশ অবাক হলেন। যা প্রশ্ন করলেন সবগুলোর সঠিক উত্তর দিলাম এবং তাও উনি ঢাবির একটি মেয়েকেই সুপারিশ করলেন যার কোন গবেষণা ছিলনা এবং আমি চ্যালেন্জ দিয়ে বলতে পারি কোন দিক দিয়ে সে ইম্প্রেসিভ কিছুও করেনি। তার শুধু বিরাট সিজিপিএ ছিল। আর তার ছিল নিজস্ব এক্সটার্নাল ভাণ্ডার!  এই ভাণ্ডার তো আমাদের নাই। 

(পরের বছর ড্যাফোডিলে গিয়ে চারটি ধাপেই সবচেয়ে ভালো করলেও আমাদের ঢাবির স্যারদের মানদণ্ডে ড্যাফোডিল থেকে বের হওয়া ছেলেটিকে অধিক যোগ্য মনে হয়েছিলো। বোর্ডে ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত প্রমুখ। আমার পাবলিকেশন্স তাদের মুখে হাসি ফোটালেও নিয়োগ দিতে বলয়ের বাইরে আসার সংকীর্ণতা ছাড়াতে পারেননি। বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান মহোদয় দুটি ঘটনাই ভালো করে অবহিত। এরপর আমি ক্ষোভে অভিমানে ঢাকা ছেড়ে রাজশাহী ও খুলনায় যথাক্রমে বরেন্দ্র ও নর্দার্ন ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই প্রভাষক হয়ে। আমার সম্পূর্ণ ফোন আর লবিংবিহীন অর্জিত চাকরি আলহামদুলিল্লাহ।)।

তাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দয়া করে তাদের প্রাপ্ত সিজিপিএ দিতে আর সামষ্টিক বা ব্যক্তিগত কোন তৎপরতা চালায়েন না, বিভাগের ৭ বছর পূর্তিতে এ আমাদের ন্যায্য দাবি।

এখন প্রশ্ন, আমরা কি ভাল সিজিপিএ পাওয়ার যোগ্য কি না? আমার পালটা প্রশ্ন আমরা অযোগ্য কেন? আমাদের চেয়ে বেশি সিজিপিএ নিয়ে কিভাবে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যান্যরা বের হয়? তারাও তো আমাদের মতই। 

তবু নৃবিজ্ঞানে ৩.৯৬,  আই আর এ ৩.৯০, সওরা ৩.৯০ পেলে আমাদের কি দোষ? আমাদের খাতাগুলো কি মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়? আমাদের ভবিষ্যত নষ্ট করা বা অনিশ্চিত করা সেই মানদণ্ডের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারেনা? আমরা বড় হয়েছি, অনেক কিছু বুঝতে শিখেছি, আমরা অনেক জুলুম-নির্যাতন, ঝাড়িঝুড়ি দেখেছি। কিন্তু এইভাবে সিজিপিএ কম দিয়ে ছেলেমেয়েদের জীবন নিয়ে খেলতে খুব কম দেখেছি। নতুন বিভাগ হিসেবে যেখানে আমরা একটু ভাল সিজিপিএ নিয়ে যাওয়ার কথা সেখানে আমরাই সবচেয়ে কম। সারাজীবন এই দায় কে নেবে? 

যে ছেলেমেয়েগুলো ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে ভাল করে বিভাগে ভর্তি হলো, যাদের অনেকের মা-বাবা গোল্ড মেডেল পাওয়ার স্বপ্ন দেখতো কেন সেই স্বপ্নগুলোকে পিষে হত্যা করা হল? কী প্রাপ্তি তাতে বিভাগের? ভর্তি পরীক্ষায় গ্রেস নিয়ে এসে বা সুনজরপ্রাপ্ত কারো কারো হঠাৎ বিরাট উচ্চ রেজাল্ট যেভাবে হয় সেভাবে মেধায় আসা সবার গ্রাফ ঊর্ধমুখী হয়না কেন?

 একই সাথে খোলা পাবলিক হেলথ ও ল থেকে প্রধানমন্ত্রী স্বর্নপদক পেয়েছে। আমাদেরই বন্ধুবান্ধব। তাদের আমরা চিনি। আমাদের চেয়ে তারা ভীণ গ্রহের কেউ না। কিন্তু আমরা কেন তাদের থেকে পিছিয়ে গেলাম? আমরা যদি এত খারাপ ফল করি তবে এর দায় তো আমাদের যারা ৬ বছর পাঠদান করেছেন তাদেরও। হয় তারা বোঝাতে ব্যর্থ, না হয় তাদের স্টাডি ম্যাটারিয়েলসে ঘাটতি আর না হলে তাদের মূল্যায়ন ত্রুটিপূর্ণ। 

ছাত্রছাত্রীদের ব্যর্থতার দায় শুধু তারে একা দিয়ে সুশীল-সুশীলা হিসেবে এই যুগে থাকা সম্ভব না। সুতরাং আমাদের বিভাগের ৭ বছর পূর্তিতে অনুরোধ অন্তত আমাদের পরের প্রজন্মের জীবনকে যেন চরম অনিশ্চয়তায় ফেলে না দেয় হয়। কারণ আপনারা সারা দেশে এমন কোন ব্রান্ড ভ্যালু তৈরী করতে পারেননি যে আপনাদের ছাত্রছাত্রী হিসেবে আমাদের দেখেই চাকরিদাতারা আহ্লাদে আটখানা হয়ে চাকরি দেবে।

আমরা ঘরপোড়া গরু, আপনারাও একটু অনুধাবন করুন এবার। ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশের বিবেককে একটু জাগ্রত করুন অনুগ্রহ করে। আমরা চিরকাল আপনাদের ছাত্রছাত্রী, আমাদের যেন প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু মনে না করা হয়। তাহলে জীবনের বাকি অংশে আমাদের তরফ থেকে যেভাবে মূল্যায়িত হওয়ার কথা সেভাবে হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে কি? কারো জীবন কঠিন করে বা ধ্বংস করে, কারো ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে আপনারা চিরকাল সম্মান-শ্রদ্ধা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করেন কি?

এখন প্রশ্ন, বর্তমানে যারা পড়ছে তাদের তো কোন কথা নাই। আমরা সাবেকরা কেন এই বিভাগের পুরো ফল নিয়ে আপত্তি জানাই। কারণ আমাদের হাতে অনেকে এভিডেন্স আছে, ফ্যাক্টস আছে, কেইস স্টাডি আছে এসব ব্যাপারে। আমরা যারা বেরিয়েছি আমরা সার্টিফিকেট পেয়েছি বলে অনেকে এখন বলছে। আমার কথা ভিন্ন, আমি সত্য প্রকাশ করতে কোনকালে পিছুপা হইনি আল্লাহর রহমাতে, হবোওনা। 

কিন্তু এখন যাদের আপনারা চুপ করে থাকতে দেখেন তারা কিন্তু আসলে চুপ না। তারাও প্রতিবাদ করে, কিন্তু তারা লেখেনা বা বলেনা। পাছে তেলের ড্রামসমৃদ্ধ কেউ গিয়ে তাদের কথা বা স্ক্রিনশট দিয়ে প্রিয় হতে চায় কি না এই ভয়ে।  মাস্টার্স রেজাল্ট হয়ে যাওয়ার পরে তাই ছেলেমেয়েদের অন্যরকম অনুভূতি দেখা যায়। 

এখন, কথা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন হবে কেন? এখানে কেন ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে? 

অন্যান্য বিভাগে বাদ দিলাম, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে অধ্যয়ন বিভাগে কেন এই ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠলো? এই বিভাগ নতুন কলায় রাখা, এই ভবন, বরাদ্দ ও ক্যাম্পাসে যতটুকু অবস্থান এর সবটুকু সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের অবদান। এমন কি শিক্ষকদের অনেক ইস্যুতেও আমরাই এগিয়ে গিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফল প্রাপ্তিতে অবদান রেখেছি। তারপরেও কেন আমরা আদর্শ পরিবার হয়ে উঠলাম না? কেন মতপ্রকাশের জন্য সাংবাদিকতা বিভাগে ভয়ে থাকে ছাত্রছাত্রীরা?  কেন এখানে ছাত্র সংসদ নেই? ছাত্রছাত্রীদের মতের ক্ষেত্রে কেন এখানে সংকীর্ণ পথের উদ্ভব হলো? কেন এখানে মত প্রকাশ করলে খড়গ নেমে আসে? এইটা কিসের বাকস্বাধীনতা? যারা ভবিষ্যতের সংবাদকর্মী তাদের যদি শিক্ষাই হয় ভয়ে, বঞ্চনায়, অবমূল্যায়নে তাহলে তারা দেশ গড়বে কিভাবে? ঘরে মুক্তমত, বিতর্ক, পরমত সহিষ্ণুতা চালু না থাকলে অন্যদের কিভাবে আমরা লেকচার দিই? প্রতিষ্ঠার ৭ বছরে এইসব বিষয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। 

সাংবাদিকতা বিভাগ সাম্যবাদের ভিত্তিভূমি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এটি কিভাবে যেন আতঙ্ক, ভয়ের, শঙ্কার জায়গায় পরিণত হলো। 

আমরা কি এমন বিভাগ চেয়েছিলাম ২০১১ এর ২১ ডিসেম্বর?

আমরা দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত হলে সেটিই সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ব্রান্ড ভ্যালু তৈরি করবে। আমরাই বিভাগকে রিপ্রেজেন্ট করবো। আমাদের অমসৃণ ভবিষ্যৎ বিভাগের জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবেনা। সুতরাং আমাদের নম্বর প্রদানের কার্পণ্য পরিহার করা উচিত। 

২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বরের স্বপ্নটি বনসাই না হয়ে বটবৃক্ষ হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশায় বিভাগের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। 

(২০১৮ এর ২১ ডিসেম্বর এর লেখা)
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments