জবাব দিতে হবে কেন মাশরাফিকে বাদ দিলেন
~~~
এই যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নুসহ নির্বাচকরা বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি মাশরাফিকে এক ধরনের অপদস্থ করে ওয়ান ডে দল থেকে বাদ দিলো এর নাম অবিচার। বঙ্গবন্ধু টি-টুয়েন্টি কাপে সেরা ১০ পারফর্মারদের একজন তো মাশরাফি বিন মোর্তজা। একটি ম্যাচে এমনকি ৫ উইকেটও নিয়েছেন। এরপরেও তাঁকে দল থেকে কেন বাদ দেয়া হলো এর কোনো সন্তোষজনক জবাব কোনো সংবাদমাধ্যমেই পেলাম না। বিশ্রি কাণ্ড!
তাদের "পরিকল্পনা ২০২৩ বিশ্বকাপ নিয়ে, তাই মাশরাফি বাদ"---এই অযৌক্তিক উত্তর নান্নুর। অথচ ২৪ সদস্যের দলে এমন অনেকেই আছেন যারা এখনো দ্রুতগতির বল দেখলে "ভয়ে-আতঙ্কে" ব্যাকফুটে গিয়ে খেলে এবং ফাস্ট বলে ৩০ গজের ঐ পাশে উড়িয়ে বল নেয়া যাদের কাছে এখনো স্বপ্ন। আবার এক ওভারে ৩-৪ ছক্কা খাওয়া লোকও আছে দলে৷ আছে একেবারেই নতুন মুখও। তাদের নেয়া অন্যায় নয়। তারা ধীরে ধীরে পাকা হবে। কিন্তু তাদের পাশাপাশি জায়গা পাওয়ার জন্য মাশরাফির দোষ কী?
এদের সঙ্গে নিঃসন্দেহে মাশরাফি জায়গা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। মাঠ ও খেলাধুলার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন ইউটিউব-টিভি দেখে ক্রিকেট বোঝা ক্রীড়া সাংবাদিকদের মধ্যে মাশরাফিকে এইভাবে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়ার ব্যাপারটি নিয়ে নান্নুদের কঠোর সমালোচনার ছিটেফোঁটাও দেখলাম না।
অথচ মাশরাফির বিদায় এভাবে হতে দেয়াটা জাতির সঙ্গেই প্রতারণা। কারণ, মাশরাফি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন সাধারণের ভালোবাসা পেয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে। তাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে আড়ম্বরপূর্ণভাবে মাঠ থেকে অবসর গ্রহণের সুযোগ তো সে ভিক্ষে চাচ্ছেনা। পারফরমেন্স ভালো করেও কেন বাদ যাবেন তিনি?
তিনি বাংলাদেশের জননন্দিত সাংসদ। ক্ষমতার অপব্যবহার কখনোই করেননি। কখনোই নিজের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক "হ্যাডম"ও প্রদর্শন করেননি৷ এটাই কি তাঁর অপরাধ যে নিজের যোগ্যতা দিয়ে দলে থাকতে চেয়েছেন? তাহলে কেন পারফর্মেন্স উত্তম হলেও তাঁকে বাদ দেয়া হলো?
আমার এই প্রতিবাদের বিপক্ষে যারা অবস্থান করবেন তারা বেশিরভাগ মাশরাফির রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে প্রেজুডিস সিদ্ধান্তে যাবেন। একজন ক্রিকেটার মাশরাফির অবয়ব মাথায় নিয়ে, দেশের ক্রিকেটের জোয়ার ও জয়ে তাঁর অবদানকে স্মরণ করে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করলে মাশরাফির প্রতি যে জুলুম করা হয়েছে তা অনুধাবন করতে পারবেন।
ভাবতে পারেন? ২৪ সদস্যের প্রাথমিক স্কোয়াডেই নেই দেশের ইতিহাসের এ সময় পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ মিডিয়াম পেসারকাম অলরাউন্ডার সাবেক এ অধিনায়ক। আমাদের প্রিয় "নড়াইল এক্সপ্রেস" মাশরাফি বিন মোর্তজা। একের পর এক অপারেশন, কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে দিন শেষে নান্নু গং তাঁকে এভাবে প্রতিদান দিলেন! এটা স্রেফ অবিচার---বড় ধরনের অবিচার!
আমি মনে করিনা সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ আমাদের কামনা করা উচিত। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে আমি চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেকশন বোর্ডকে তলব করে যেন জানতে চান কেন ১১ নয়, ২৪ জনেও মাশরাফির জায়গা হলোনা? কী অপরাধ তাঁর?
যদি বোর্ড সন্তোষজনক জবাব না দিতে পারে তবে আমাদের নেত্রীর প্রতি অনুরোধ রইলো, তিনি যেন নির্দেশ দেন মাশরাফিকে তাঁর পারফর্মেন্স-এর কারণে বাংলাদেশ জাতীয় ওয়ানডে দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে অন্তত অন্তর্ভুক্ত করতে। এখান থেকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে এবং যোগ্যতা দিয়েই মাশরাফি একাদশে সুযোগ পাবেন৷ এ ধরনের চ্যালেঞ্জ ও লড়াইয়ের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা মাশরাফির রয়েছে।
এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সাধারণ মানুষ ভীষণ আপ্লুত হবে! আমি গতকাল থেকে সাধারন মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখছি। তাঁরা মাশরাফি ভালো খেলেও দলে না থাকায় একই সঙ্গে আশাহত, আহত ও সংক্ষুব্ধ!
ক্রিকেট খেলা দেখি একেবারে শৈশব থেকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করেছি। যারা আমার খেলা দেখেছেন মাঠে তারা জানেন আমি মাশরাফিকে এইভাবে বিচারবিবেচনাহীনভাবে দল থেকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে মতামত প্রদান করার নৈতিক ও প্রায়োগিক অধিকার রাখি। এইসব প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদিন নান্নুদের খেলা আমি দেখেছি। এই দেশের জন্য, দেশের ক্রিকেটের জন্য মাশরাফি যা করেছেন তা নান্নুরা করতে পারেননি। আমি নান্নুদের অবদানকে খাটো করছিনা, কিন্তু তুলনামূলক বিচারে মাশরাফি অনেক অনেক বেশি দিয়েছেন।
মাশরাফি অবলীলায় বলে দেন,... খেলে ১০ লাখ টাকা পেলে পরিবারের জন্য অর্ধেক আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অর্ধেক খরচ করতে পারেন। তাঁর সততা এখানেই।
এই সততার কারণে তিনি মাঠে থেকে জীবীকা নির্বাহ করতে চান। মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। লাল-সবুজের পতাকা বুকে নিয়ে ১৮ কোটি বাংলাদেশীকে উদ্বেলিত করতে চান। এসব কি বয়োজ্যেষ্ঠ নান্নুরা জানেননা?
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার এবং নন্দিত সাংসদ বলে কি মাশরাফি নান্নুদের ঈর্ষার বলী?
মাশরাফি ভদ্রলোক। আবেগতাড়িত হওয়ার তার বয়স নেই৷ তাই হয়তো অল্প কথায় তিনি জানিয়েছেন,
"এটা পেশাদার জগৎ। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমি পেশাদারীভাবে নিচ্ছি এটাকে। আর কিছু বলার নেই। আগেই বলেছিলাম, জাতীয় দলে সুযোগ না পেলেও খেলা চালিয়ে যাবো। এখনো সেটিই বলছি। আপাতত আর কিছু ভাবছিনা।" (বিডিনিউজ২৪, ৪ জানুয়ারি, ২০২১)।
অথচ তাদের সিদ্ধান্ত মোটেই পেশাদারি ছিলোনা। পেশাদারি হলে নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর নামে হওয়া টুর্নামেন্টে মাশরাফির পারফর্মেন্স বিবেচিত হতো। স্কোর মিলান, দলে চান্স পাওয়া অনেকের চেয়ে মাশরাফির পারফর্মেন্স অনেক ভালো!
তবে মাশরাফি বিন মোর্তজা নিছক একজন ক্রিকেটার নয়। তিনি আমাদের বহু বিজয়ের নেপথ্যের নায়ক। আমাদের গণআনন্দের বিপুল এক উপলক্ষ। তাঁকে জাতীয় দল থেকে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়ার নিন্দা জানাই।
জনরোষের আগে সিলেকশন বোর্ডের সবার প্রতি অনুরোধ রইলো, মাশরাফি বিন মোর্তজাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে বাংলাদেশে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দলে জায়গা দেয়ার জন্য।
আমি বাস্তববাদী৷ তাঁর পারফর্মেন্স খারাপ হলে তাঁকে বাদ দিলে আমার কিছু বলার ছিলোনা। কিন্তু দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নন্দিত ক্রিকেটারকে উত্তম পারফর্মেন্স করার পরও ২৪ সদস্যের দলে রাখা হবেনা কেন সেটি বলেন। আমরা ক্রিকেট বুঝি। গোঁজামিল দিয়ে পার পাবেননা।
এই তামিম ইকবালকে দুঃসময়ে দল থেকে বাদ দিতে চেয়েছিলো অনেকে। সারা দেশে গণসম্মতিও ছিলো। তামিমের দলে থাকাকে অনেকে কটাক্ষ করে "চাচা কোটা" লিখতেও দ্বিধা করেনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, যদিও আমি এর সঙ্গে একমত ছিলাম না। তো, সেই তামিমকে মাশরাফি একক প্রচেষ্টায় দলে রেখেছেন। আজ মাশরাফি ভালো খেলেও দলে না থাকা, তাও তামিমের অধিনায়কত্ব-এর সময়ে নিশ্চয়ই মাশরাফিকে কষ্ট দেবে, যদিও তিনি তা কখনোই প্রকাশ করবেন না।
এভাবে গুণীদের অপমান করে ছুঁড়ে দেয়া হলে ক্রিকেটাঙ্গনে গুণী জন্ম নেবে আর অপমানিত হওয়ার ভয়ে?
এখন, আমাদের এই ক্ষোভ-অভিমানে তাঁকে দলে হয়তো নেয়া হবে। কিন্তু একজন লিজেন্ডকে লিজেন্ড হিসেবে মাঠ থেকে বীরের মত অবসরে সুযোগ দেয়ায় আমাদের কার্পণ্য চোখে পড়বে কেন?
এ বিষয়গুলো ভাবনার দায় তো নান্নু-আকরাম-বাশার প্রমুখদের কাঁধেই পড়ে। এ দায় পালনে অনীহা বা অবহেলা যেটিই হোক---তা দেশের ক্রিকেটের জন্য উত্তম দৃষ্টান্ত নয়।
ভালোবাসা নড়াইল এক্সপ্রেসের প্রতি। ভালোবাসা একজন উত্তাল সমুদ্রে আশার ভেলা ভাসানো সাবেক অধিনায়কের প্রতি। সেই ভালোবাসাকে বুকে নিয়ে মাশরাফির ফিরে আসার তীব্র আশায় বাংলাদেশের একজন আজন্ম ক্রিকেটপ্রেমী
-- মঈনুল রাকীব।
0 Comments