সর্বশেষ

বঙ্কিমচন্দ্র সাম্প্রদায়িক সম্রাট ও প্রতিসাম্প্রদায়িক সিরাজীর রায়-নন্দিনী

ইসমাঈল হোসেন সিরাজীর রায়নন্দিনী (১৯১৫) ছিলো বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনীর (১৮৬৫) প্রতিবাদে রচিত। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ভয়াবহ রকমের সাম্প্রদায়িক। ইংরেজ কাঠামোর শিক্ষিত লোকে সাম্প্রদায়িক হলে কী জঘন্য রূপ ধারণ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় ছিলেন তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার "আনন্দমঠ" যদি পড়েন দেখবেন "যবন বা মুসলমানদের কবল থেকে মুক্তির জন্য ইংরেজদের দেবতা হিসেবে তিনি নমঃ নমঃ করছেন" নির্লজ্জভাবে।  

ঔপনিবেশিক এমন একজন দাসলেখক স্বজাতি মুসলমানকে সীমাহীন ঘৃণা করে ও তা বুক ফুলিয়ে লিখে কীভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক মুক্তি দেবেন? দিতে পারেনওনি। 

মুসলমান ভারতবর্ষে লোপাট করতে আসেনি। তাদের আগমন সে সময়ের পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিক ঘটনা। বরং তাদের এতো পরে আগমন হলো আর এ ভারতবর্ষ ও বাংলার ঝাঁকেঝাঁকে নিম্নবিত্ত তাদের স্বাগত জানালো এটি অস্বাভাবিক ছিলো। বখতিয়ার বা শের খাঁ বা শাহজালাল বা খানজাহান কোন যাদুবলে এটি স্বাভাবিক করলো? সাম্য! এক পাতে খাওয়া, এক ঘাটে নাওয়া আর একসঙ্গে বাস সব মানুষ করতে পারে---সব মানুষ সমান, আমির আর ফকির বা রাজা-প্রজা বলে কিছু নাই এই বিশ্বাসের জোরে মুসলমান ভারতবর্ষে ও পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় প্রলেতারিয়েতের মনপ্রাণ পেয়েছে৷ এ সত্য বঙ্কিমেরা এড়িয়ে যান না কেবল ক্ষেত্রবিশেষ অস্বীকার করেন। 
বঙ্কিমের মত সাম্প্রদায়িকদের অত্যাচার থেকে নিম্নবিত্ত বৌদ্ধ, শুদ্রকে মুক্তি দিতে এসেছিলো এবং এই ভূমিপুত্রদের সঙ্গে মুসলমান বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এই ভারতবর্ষে স্থায়ী হয়েছে। ক্রমে সাম্যবাদী মতাদর্শের টানে যদুর মতো উচ্চবর্ণের অনেকেও এসেছে এ ধর্মে। অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র গং যেভাবে মুসলমানদের বহিরাগত বলতে চান এটি মূলত ব্রিটিশ ও আর্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা এই মাটির খেটে খাওয়া সাধারণের সঙ্গে রক্তের বন্ধনে যুক্ত হয়নি। দুয়েকটি ব্যতিক্রম উদাহরণ হবেনা। 

তো বঙ্কিমচন্দ্র দুর্গেশনন্দিনীতে মুসলমানদের দিয়ে হরণ করালেন হিন্দু নারীকে, তারপর স্বাধীন বঙ্গভূমির জন্য যে ভুঁইয়ারা ঈশা খাঁর নেতৃত্বে দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো তাদের থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী দালাল মানসিংহকে মহীয়ান করলেন ইত্যাদি।  যারা এ উপন্যাস পড়বেন তারা দেখবেন প্রেমের কাঁধে বন্দুক রেখে বঙ্কিম মূলত সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে চেয়েছিলেন যদিও দিল্লীশ্বর আকবরের অধীনস্ত থেকে আর কী! এই মানসিংহ যে স্বাধীন বাংলার অস্ত্বিত্বের বিনাশ করতে আকবরের দালাল হিসেবে ঈশা খাঁ, কেদার রায় প্রমুখ জাতীয়তাবোধসম্পন্ন বঙ্গীয় মুসলিম ও হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের তেমন মাথাব্যথা নাই। কারণ আকবার মানসিংহকে দিয়ে যেন তার সর্বভারতীয় ইউটোপীয়ান বর্ণবাদী রাষ্ট্রটি কায়েম করলেন।

সিরাজী সাম্প্রদায়িক উপায়ে এই উপন্যাসের প্রতিবয়ান হাজির করেন রায়নন্দিনী-তে। তিনি মদ্যপ এক ব্রাহ্মণ জমিদার কর্তৃক এক হিন্দু জমিদারকন্যা স্বর্ণকে হরণ করার ঘটনা দিয়ে শুরু করেন এবং ঈশ খাঁকে হিন্দু ও মুসলমানদের মুক্তির দূত হিসেবে হাজির করেন। উপন্যাসে বঙ্কিমের সামপ্রদায়িকতাকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে গিয়ে যেমন প্রখর যুক্তি ও উপমা ব্যবহার করেছেন সিরাজী তেমনই বেশ কিছু ভিত্তিহীন আক্রমণাত্মক কথাও লিখেছেন। যেমন, ঈশা খাঁ এর সঙ্গে স্বর্ণের বিয়ের প্রেমের ব্যাপারে তিনি "হিন্দু নারী যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী নয়, বা ব্রাহ্মণসন্তান ভীত হয় হিন্দু মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের কারণে। " ইত্যাদি বাজে কথা লিখেন অথচ আমরা মালিক মোহাম্মদের ও আলাওলের অমর "পদ্মাবতী" তে সাহসী হিন্দুপত্নীকে দেখি, আমরা দেখি ঝাঁসির রাণীকে আর হিন্দু শক্তিশালী দেবীদের। সে সময়ে ভারতবর্ষের মুসলিম বা হিন্দু উভয়েরই অল্প বয়সে বিয়ে সামাজিক রীতি ছিলো। এমনকি ইউরোপ আমেরিকায়ও ১৩-১৪ বছরের মধ্যে বিয়ে হতো। 

যশোরের রাজা প্রতাপের সেনাপতি মাহাতাব খাঁ ও প্রতাপকন্যার প্রেম দিয়ে বেশ নাটকীয়তা তৈয়ারে পটু দেখলাম সিরাজি। আজ হতে একশ পাঁচ বছর আগে এমন থ্রিলার কেউ লিখেছে ভাবতেই অবাক লাগে! যদিও এর কনটেন্ট-এংগেল নিয়ে আমার বেশ আপত্তি রয়েছে, যেভাবে আপত্তি রয়েছে বঙ্কিমের কনটেন্ট-এংগেল নিয়েও। 

সিরাজী ঘৃণা ও সাম্রদায়িকতা দ্বারা ঘেরা ছিলেন। তখন সাহিত্যকে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা পৈতৃক সম্পত্তি ভেবেছিলো। সাহিত্যের পাতা থেকে মুসলমান, জৈন, শিখ,বৌদ্ধ, সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসীদের পদ্ধতিগতভাবে নির্মূল করা হয়। বাংলা সাহিত্যের বড় বড় মশাইদের বড় বড় চরিত্রে আণুবীক্ষণিক যন্ত্র দিয়ে মুসলিম বৌদ্ধ শিখ জৈন চরিত্র খুব একটা এ কারণে দেখা যায়না। সিরাজি এই সময়ে পাঞ্জেরি হয়ে বঞ্চিত মুসলমানদের ক্ষোভ নিয়ে হাজির হয় তার উপন্যাসে। সে সময়ে এগুলো ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সিরাজীকে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতারাও সমীহ করতেন এ কারণে। 

তো আমি সম্প্রতি এই বঙ্কিম সাম্প্রদায়িক ও সিরাজী প্রতিসাম্প্রদায়িকের দুটি উপন্যাস পাশাপাশি রেখে পড়েছি। আমার কাছে শব্দচয়ন, মাধুর্য, উপমা বা রচনার শিল্পগুণ সব মিলিয়ে রায়নন্দিনীকে অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ মনে হয়েছে। তথাপি আমাদের সাহিত্যসভা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলোতে সিরাজীর এই রায়নন্দিনী কি পাঠ করানো হয়?

একজন সাম্প্রদায়িককে সাহিত্যসম্রাট বলে মহিয়ান করা হচ্ছে আর আরেকজন প্রতিসাম্প্রদায়িককে অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছে কেন এর উত্তর দেয়ার সাহস জন্ম নেয়ার আগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুর সাংস্কৃতিক মুক্তি নাই।

তৎকালীন সমাজব্যবস্থাকে বুঝতে হলে এই দুইজনকে নির্মোহ দৃষ্টিতে পাঠ করতে হবে। বঙ্কিমের ধারাবাহিকতা শিবাজিপূজারীরা রেখে দিয়েছে। আবার প্রতিবঙ্কিমতাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। যেমন, সিরাজী যে মূলধারার বড় ও প্রভাবশালী লেখক এ কথা অনেকেই জানেনা। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির প্রতিকাব্য "প্রেমাঞ্জলি" লিখেছিলেন এই লোক। 

বঙ্কিম ও সিরাজীকে ভালোভাবে পাঠ করতে হবে। রবীন্দ্রবলয় কীভাবে গড়ে উঠলো যা আমাদের পুঁথি বা মঙ্গলকাব্যসাহিত্যের ধারাকে পশ্চিম দিয়ে প্রতিস্থাপিত করলো তা নিয়ে নিগূঢ় অনুসন্ধান ও চাছাছিলা বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অন্যথায় আমরা ইতিহাসকে ফাঁকি দেবো। 

এই দুইজনের লেখা পাঠ করে তৎকালীন সময়ের শিক্ষিতদের মানস অধ্যায়ন করলে আপনি বুঝতে পারবেন ১৯০৫ এ যারা বঙ্গভঙ্গের কারণে গোস্বা হয়ে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন করলো তারাই কেন ১৯৪৭ এ বঙ্গভঙ্গের জন্য উঠেপড়ে লাগলো এবং কেন কলকাতায় সেই ভয়াবহ দাঙ্গা হলো! আজকের সেকুলার সাহিত্যসমাজ জেনে বা না-জেনে বঙ্কিমের সামপ্রদায়িক বিষবাষ্পকে মগজে ধারণ করছে কিনা সেই প্রশ্নও তুলতে হবে। আবার সিরাজীর প্রতিবঙ্কিমতা কেন মূলধারা থেকে দূরে বা আলো আঁধারিতে চলে গেলো সেই প্রশ্ম তুলে গবেষণা করতে হবে।

আমরা আমাদের মনস্তত্ত্ব গঠনের অভিযাত্রায় ইতিহাসের বেশ কিছু অধ্যায়কে চাপা দিয়ে রেখেছি। এগুলোকে খুলে এর মিমাংসা না করে সাংস্কৃতিক মুক্তি সম্ভব নয়। গোটা দুনিয়ায় জাতীয়তাবোধের জয়জয়কার অবস্থায়ও গোটা দুনিয়ার বাঙালি জাতির মধ্যে একাত্মা হওয়ার প্রবণতা নেই কেন সেই প্রশ্নের মধ্যে নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের তথা ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক মুক্তির উত্তর ও পথ।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments