বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) এর চাকরি অনন্য নানা কারণে। বর্তমান সময়ে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সুবিধা, মর্যাদা ও ক্ষমতার পাশাপাশি এর রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়াও একে অন্য অনেক চাকরি বা পেশার চেয়ে আলাদা করেছে। সে কারণে বিসিএস এর যেকোনো স্তরের পরীক্ষায় পাশ করলেও অভিনন্দন এর বন্যা বয়ে যায়!
এই "সোস্যাল স্ট্যাটাসকো" মূলত এ পরীক্ষার তীব্র স্বচ্ছতার কারণে তৈরি হয়েছে। পরীক্ষার সিলেবাস, প্রশ্ন ও বিষয় নিয়ে আলাপ ভিন্ন আলাপ, কিন্তু বিদ্যমান পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বর্তমান সময়ের বিপিএসসি'র অধীনে বিসিএস অন্য সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। এর কাছাকাছি রয়েছে কেবল বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএডিসি, জুডিশিয়ারির মত হাতেগোনা কিছু পরীক্ষা।
যে কথায় ছিলাম। কেন বিসিএস সবার আশার কেন্দ্র হচ্ছে? কারণ এখানে স্বচ্ছ একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া আছে। যার মামা নাই, চাচা নাই, ভাই/আপু নাই, যার টাকা নাই, ক্ষমতা নাই সেও এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাছাই হতে পারে বলে একটি গণবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে এই সময়ে। অর্থাৎ কেবল এবং কেবল মেধাই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ড। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ঘটনা অনন্য।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোন কৌশলে দীর্ঘতম সময়ে বাংলাদেশ শাসন করছেন সেটি নিয়ে আমি ও আমার সহকর্মী গবেষণা করেছিলাম। সে গবেষণায় আমরা মূল্যায়ন করেছিলাম, তরুণ-যুবাদের শতভাগ নিরপেক্ষ চাকরির নিশ্চয়তা দেয়ার পরিবেশ তৈরি তাঁর শাসনকালের দীর্ঘমেয়াদের অন্যতম একটি কারণ। রাজনৈতিক মিছিলের চেয়ে গ্রন্থাগারকে বেশি ভালোবাসে এ সময়ের তারুণ্য। কারণ, পড়লে পড়ার ফল এই প্রথম এদেশে এভাবে স্পষ্টরূপে ফুটে উঠছে। পড়াশোনা করে কারো সুপারিশ ছাড়া সত্যিই গাড়িঘোড়া চড়ার ক্ষেত্র এদেশে বিপিএসসিসহ উল্লিখিত সরকারি সংস্থাগুলো তৈরি করেছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ এখন আর কেবল মেধাতে সীমাবদ্ধ নেই। এক সময় শিক্ষকতাকে মহান পেশা ভাবা হতো, কারণ মহৎ ও সবচেয়ে মেধাবীরা এখানে আসতো। কিন্তু নিয়োগে অস্বচ্ছতার কারণে সবচেয়ে স্বল্প মাহাত্ম বা সংকীর্ণ মেধা বা সবচেয়ে অথর্ব লোকপাল এখানে ঢুকে শিক্ষকতাকে আর দশটা চাকরির কাতারে নিয়ে এসেছে। ফলে যা হবার তা হয়েছে। সমাজের সর্বস্তরের মূল্যায়ন ও মর্যাদার তালিকা থেকে ধীরে ধীরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পতন ঘটছে। এ অধঃপতন তাদেরই অস্বচ্ছতা ও অযোগ্যতার দুষ্টুচক্র খুলে বসা কৃতকর্মের ফসল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেবল নিয়োগে অস্বচ্ছতা করেন তা নয়---তারা খাতা মূল্যায়নে একচোখা নীতি অনুসরণ-অনুকরণ করেন। নিজের পছন্দমত শিক্ষার্থীকে বেশি নাম্বার দিয়ে সামনে আনেন। যে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সক্ষমতা নাই তাদের ভালো লেখার পরেও কম নম্বর দেন আর ভাইভায় নিজের পছন্দের ছেলে বা মেয়েদের অধিক নম্বর দেন, অপছন্দের শিক্ষার্থীদের দেন কম। আবার, যে অযোগ্য শিক্ষার্থীরা আসছে পোষ্য কোটায়, তাদের তেলের ডিব্বায় আসক্ত হয়ে তাদের অতিরিক্ত নাম্বার দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষক বা কর্মচারী/কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগও দেন নির্লজ্জভাবে। আগে থেকে ঠিকও করে রাখেন অনেক সময় কাকে ফার্স্ট ইত্যাদি বানাবেন। খাতা নয়, নাম দেখে নাম্বারপ্রদানও চলমান!
এই বিবেকপঁচা দশা দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় কমবেশি রয়েছে। সে কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছেলে ও মেয়েরা আগে থেকেই সরকারি চাকরি বিশেষ করে বিসিএস ইত্যাদির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কারণ, তারা বিশ্বাস করে তাদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন করতে তাদের বিভাগের শিক্ষক নামের বিবেকহীন/বিবেকহীনারা ব্যর্থ হয়েছে। তাই তাদের বিসিএস ক্যাডার বা সমমানের অন্য পেশায় গিয়েই উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।
সেই জবাবই হচ্ছে বিসিএস ইত্যাদির সারাদেশব্যপী শিক্ষকতার চেয়ে অধিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা। এটি স্বচ্ছতার শক্তি। আমার এই মতের সঙ্গে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৎ শিক্ষক নিশ্চয়ই এক হবেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক ধরনের অভিমান দেখা যায় কেন তাদের "উপযুক্ত মূল্যায়ন" করা হয়না---বেতন ও পদমর্যাদার দিক দিয়ে ইত্যাদি। তারা এর জন্য দেশব্যাপী আন্দোলনও করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে বলতে শুনেছি "আমাদেরই ছাত্রছাত্রীরা আমলা হয়ে, প্রশাসক হয়ে, রাজনীতিক হয়ে আমাদের সুবিধা সীমীত করে দিচ্ছে" এ জাতীয় কথা। আমার প্রশ্ন ছিলো এমন কেন করলো? তারা এর উত্তর দিতে পারেননা।
এর উত্তর আমি দীর্ঘদিন বাংলাদেশের চাকরির পরীক্ষা ও শত শত ছেলেমেয়েদের মন্তব্য এবং পরীক্ষা পদ্ধতি, মূল্যায়ন ও মূল্যায়নপরবর্তী শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে বের করেছি। আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আপনার বিবেক সবচেয়ে নিরপেক্ষ হওয়ার কথা ছিলো অথচ আপনি ক্ষমতা পেয়ে নিয়োগ বোর্ডে বসে, এক্সটার্নাল হয়ে, সভাপতি-ডীন হয়ে বা শিক্ষক সমিতির সভাপতি-সম্পাদক হয়ে, উপাচার্য-উপউপাচার্য হয়ে বোর্ডের সবচেয়ে অযোগ্য প্রার্থী বা অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে শিক্ষক/শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ প্রদান করছেন। এই পক্ষপাতিত্ব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও নিয়ে এসেছেন। এখানেও নিজেদের বলয়ের ছাত্রছাত্রী ঢোকাতে তাদের ঐক্যবদ্ধ ব্রাহ্মণ্যবাদী অপচেষ্টা লক্ষ্যণীয়।
এই হচ্ছে আপনাদের অধিকাংশের ৭৩ এর অধ্যাদেশের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধতার দরিদ্রঅবস্থা! খুব খুব সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এবং ছাত্রছাত্রীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পঁচা দশা আপনাদের।
বিপরীতক্রমে বাংলাদেশ কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) তার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সহস্র মেধাবীদের মধ্য থেকে কঠিন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে মেধাবীদের বাছাই করে নিয়ে আসে (ভেরিফিকেশন এর বিষয়টি অন্য আলোচনা)।
এখন বলেন, একজন কষ্ঠি পাথরে যাচাই করে প্রাপ্ত ফল থেকে সবচেয়ে উত্তম ফসলকে তার কর্মী হিসেবে নিয়োগ দিলো আর আপনি ধান ঝেড়ে চিটা কয়টা বাছাই করলেন। আপনার বাছাই আর বিপিএসসির বাছাই সমান হবে? নিশ্চয়ই হবেনা।
আর এখানেই মর্যাদার বিষয়টি চলে আসে। তাদের এই স্বচ্ছতাই একটি প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আবহাওয়া তৈরি করে। আমি বলছিনা সব বিসিএস ক্যাডার বা আলোচ্য সরকারি চাকরিজীবী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীগণ সর্বক্ষেত্রে ভীষণ মেধাবী। আমি বলতে চাচ্ছি, তারা সকলেই (পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপেক্ষে) ভীষণ স্বচ্ছ একটি প্রক্রিয়ায় নিয়োগপ্রাপ্ত। এই স্বচ্ছতাই তাদের শক্তি। এই স্বচ্ছতার কারণেই তাদের জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। আরো কিছু কারণের পাশাপাশি এই স্বচ্ছতার কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে বিসিএস ক্যাডারের স্ট্যাটাস এই সমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্যই বিপিএসসির একটি পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর "আলহামদুলিল্লাহ" লেখার পরও একরাশ আনন্দ ও অভিনন্দনবার্তা দেখা যায়।
আমি বিসিএস ক্যাডার নই। একজন সমাজ অধ্যয়নকারী হিসেবে এ সত্য আমাকে বলতে হয়। আমি বিসিএস এর জন্য মাসখানেক কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম হলে থাকতে। কিন্তু বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি হয়ে যাওয়ার জন্য পড়াশোনা করতে পারিনি। ফলে আমি প্রিলিতেই উত্তীর্ণ হতে পারিনি। আমি যদি আমার শিক্ষার্থীদের জোড়াতালি দিয়ে ফাঁকিবাজি করে পড়াতাম, পরের দিনের ক্লাসের জন্য মনপ্রাণ দিয়ে পড়ে প্রস্তুতি না নিতাম তবে হয়তো ভিন্ন ফল আসতো। আমি নিজের কাছে সৎ থাকার জন্য সারাজীবন চেষ্টা করেছি। আমার ছাত্রছাত্রী বা আমাকে যারা চেনেন তারা জানেন।
এ কারণে, আমি শিক্ষকতা করেও সত্যটি বলতে সংকোচবোধ করছিনা যে, কেন এদেশে "বিসিএস বা সরকারি চাকরি প্রাপ্তির ট্রেন্ড" চলছে। জাতির জন্য উৎপাদনশীলতা প্রয়োজন। এই চাকরিগুলো উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত না হলেও এদের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের জন্য টেকসই মঙ্গলজনক নয়। এ নিয়ে গণবয়ান তৈরির দায়িত্ব ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। তারা স্বচ্ছতার শক্তি না থাকায় এ প্রশ্ন তুলতে পারছেন না।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড এটা আমরা সবাই জানি। আমার মতে, এই শিক্ষার মেরুদণ্ড আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ। কিন্তু সেই মেরুদণ্ড যখন অমেরুদণ্ডে রূপান্তরিত হয় ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ, সংকীর্ণতা, পক্ষপাতদুষ্টতা, লেজুড়বৃত্তি ইত্যাদি কারণে তখন দেশব্যাপী মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়। আর সেটিই ঘটছে বাংলাদেশে। এ বিষয়টি যত দ্রুত দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনুধাবন করবেন ততই শিক্ষকসমাজের জন্য মঙ্গল।
একটি সময় সবচেয়ে মেধাবীদের প্রথম পছন্দ ছিলো শিক্ষক হওয়ার। আর এখন সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা হয় বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে আসছে, আর না হয় দেশ ছাড়ছে। এখন শিক্ষকতার স্বর্ণযুগের সে অবস্থা কেন নেই তা অনুসন্ধানে কোনো গবেষণা পরিচালনা করলে শিক্ষকরা নিজেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে পাবেন শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার মারাত্মক অভাব---স্বেচ্ছাচারীতা, স্বজনপ্রীতি, তেলাসক্তি, প্রতিষ্ঠানপ্রীতি, পোষ্যকোটা, লেজুড়বৃত্তি, এমনকি অর্থপ্রীতিও পাবেন। এই অযোগ্যতার দুষ্টুচক্র বন্ধ না হলে সামাজিক বা পেশাগত মর্যাদা ফিরে পাবেন না আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ---এটিই অপ্রিয় সত্য। এ সত্য মানতে আপনি চান বা না চান।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা, স্বচ্ছতা, সততা ও আত্মবিশ্বাস অস্বচ্ছতা, অমেধা ও অযোগ্যতার কাছে হার মানার কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ হেরে যাচ্ছেন। পরাজয়ের কারণ না খুঁজে অহেতুক চিৎকার করে জয়ী হওয়ার দিন অনেক আগে শেষ হয়েছে। এটা ওপেন সোর্সের যুগ। সবাই সবার হাঁড়ি কলসের খবর জানে---খালি কলসি অতিরিক্ত যতই বাজুক ভরা কলসি সে হতে পারবেনা।
'প্রিয়' শিক্ষকবৃন্দ,
মেধা, স্বচ্ছতা, সততা, পরিশ্রম, গবেষণা, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীন আত্মমর্যাদাবোধ, প্রজ্ঞা, নিরলস অধ্যয়ন এবং ন্যায়বোধসম্পন্ন বিবেক দিয়ে নিজ নিজ কলসি ভরায় মনোনিবেশ করুন। তাতে দেশ, জাতির পাশাপাশি আপনারাও উপকৃত হবেন, হারানো অমূল্য মর্যাদা ফিরে পাবেন...।
0 Comments