কেন ধর্ষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে?
আমার মতে নিচের কারণগুলোয় ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে। সঙ্গে আমার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছি।
১) বিচার না হওয়া।
ধর্ষণ করলেও উকিল ও আইনী কাঠামো ধর্ষক রক্ষায় এগিয়ে আসবে এই ধারণা। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব। এমন কী ধর্ষকদের যে ধরবে সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই থানায় আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
ক্যান্টনমেন্টের মত সুরক্ষিত ও সিসি ক্যামেরায় মোড়ানো জায়গায়ও তনু ধর্ষিত হলো! পয়লা বৈশাখে জাবিতে ধর্ষণের চেষ্টায় আজীবন বহিষ্কৃতরাও এ রাষ্ট্রে উচ্চ আদালত থেকে রায় এনে সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়েছে।
২) নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিলুপ্ত হওয়া
অন্যের মা ও বোন যে নিজের মা ও বোন হতে পারে এই ধারণা সমাজ থেকে উঠে যাওয়া। নারীর প্রতি এই মাতৃসুলভ দৃষ্টিভঙ্গী প্রাচ্যের সামাজিক মূল্যবোধের রক্ষাকবচ ছিলো। এখনো গ্রামে দেখবেন কেউ নারীর প্রতি সহিংস হলে, নিপীড়ন করলে তাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়। শহুরে ভোগবাদী সমাজের ছোঁয়ায় গ্রামেও নারীর প্রতি মাতৃদৃষ্টি লোপ পাচ্ছে।
এক সময় বংশের বা দূরসম্পর্কের চাচাতো মামাতো খালাতো বোন বা,ভাইকে নিজের বোন বা ভাই মনে করা হতো। এখন সর্বগ্রাসী যৌনসর্বস্ব চিন্তায় কেউ নিরাপদ নয়।
আমাদের এই দিকে আপন মামীর সঙ্গে অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার দায়ে সালিশ হয়েছে।
আবার, পরকীয়া, ব্যভিচার এগুলো এতো বেশি হয়ে গেছে যে, সমাজের এই ঘূন ধরা এর নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে!
৩) পর্ণগ্রাফির ঢালাও বিস্তার
পর্ণগ্রাফি চিকিৎসাবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি বাংলাদেশের আইনেও নিষিদ্ধ। তারপরও দেশের এমন কোন স্থান নেই যেখানে এর ভয়াল ছোবল পৌঁছায়নি। এতে করে স্বাভাবিক যৌনতা ছেড়ে বিকৃত আচরণের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে আবালবৃদ্ধবনিতা।
যৌনবিকারগ্রস্থ এই পর্ণ আসক্তদের কাছে জগতের সকল নারী ভোগ্য পণ্য হিসেবেই আসে। তার পাশবিক সত্তার যে লাগাম সেই লাগাম ভেঙে দেয় পর্ণগ্রাফি। ফলে ফ্যান্টাসির জগৎকে বাস্তবে আনতে মরিয়া হয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কারো দিকে পশুসুলভ দৃষ্টি দিতে পারে পর্ণ আসক্ত ব্যক্তি।
৪) মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও অন্যান্য নেশা
পর্ণগ্রাফির সঙ্গে যখন গাঁজা, ইয়াবা, সিগারেট, মদ ইত্যাদি জড়িয়ে পড়ে তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান রিপুর তাড়নার কাছে পরাজিত হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ধর্ষক নেশা ও পর্নে আসক্ত থাকে। এই নেশার বিস্তাররোধেও ব্যর্থ হয়েছি আমরা।
৫) অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন
ধর্মীয় ও প্রাচ্যের শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনের অভাব ধর্ষণকে সহজলভ্য করে তুলতে পারে। যেমন, ধর্ষক সাফাতের পারিবারিক পরিবেশেই সে ধর্ষক হয়ে উঠেছে। এভাবে পরিবার ধর্ষক তৈরি করতে পারে।
ঐশী, সাফাত, সালমান, এরা পরিবারেরই তৈরি। কিছুদিন আগে বামপন্থীদের গাঁজার আড্ডায় এক মেয়েকে গাঁজা খাইয়ে ধর্ষণ করে এক জানোয়ার। এ ধরনের অবাধ মেলামেশা বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ধর্ষকদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে---যেহেতু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের আপনি সব সময় পাবেন এ দেশে তার নিশ্চয়তা নাই।
৬) ক্ষমতা ও ধর্ষণ
ধর্ষক কখন ধর্ষণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে? যখন সে আক্রান্ত নারীর (খুবই কম ক্ষেত্রে পুরুষ) চেয়ে নিজেকে ক্ষমতাধর ও শক্তিশালী মনে করে। এই ক্ষমতা পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো থেকে আসতে পারে যেখানে শেখানো হয়---
√নারী দুর্বল ও অসহায়
√নারী ভোগ্যবস্তু
√নারী নেতৃত্বের অযোগ্য
√নারী কম বোঝে
√স্বামী ছাড়া নারীর অস্তিত্ব নাই
√ প্রেম করতে দেখলে ধরে বিয়ে দাও
ইত্যাদি; আবার রাজনৈতিক কাঠামো থেকেও আসতে পারে যেখানে অনুশীলন বা চর্চা হয়---
√ ক্ষমতা ও টাকার পর নারী থাকা লাগে
√ টাকা থাকলে নারী পাওয়া যায়
√ নারীকে ধর্ষণ করলেও সমস্যা নাই, কারণ আমি ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। বড় ভাই বা বড় আপা মুক্ত করবে
√ প্রেমিক ও প্রেমিকাকে নির্জনে পেলে মাইরপিট করে তাদের অর্থ, অলঙ্কার ও মোবাইল ছিনতাই করে রেখে দেয়া যায়, কারণ এতে সেক্সুয়ালি ফ্রাস্টেড অনেকের সমর্থন আসে
√অর্থ ও ক্ষমতাধরদের নারী সাপ্লাই দেয়া অপসংস্কৃতি। এতে সব নারীর প্রতি সাধারণীকরণ করে বাজে ধারণা জন্ম নেয় ইত্যাদি।
তো এই আর্থসামাজিক নিকৃষ্ট মানসকে পরাজিত করতে এদেশের কোনো সরকার, গণমাধ্যম ইত্যাদি জোরালো ভূমিকা রাখছে? মনে হয়না।
৭) গণবিক্ষোভের অভাব
এদেশে কোনো একটি ধর্ষণের ঘটনায় সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে একসঙ্গে প্রতিবাদ না আসা জানোয়ার ধর্ষকদের সুপ্ত অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখে। দুর্নীতি ও নারীর প্রতি সহিংসতায় আমাদের সমাজ মুখে কুলুপ এঁটে আছে। তাই চোর-বাটপার, চরিত্রহীনরা সমাজপতি, কেউ একাধিক নারীকে (বা পুরুষকে কখনো) শয্যাসঙ্গী করলে সে প্রশংসিত হচ্ছে।
মাদরাসায় শিশুদের বলাৎকার বা ধর্ষণ করছে জানোয়ার কিছু মোল্লা-মুন্সি৷
বিশ্ববিদ্যালয়ের বা স্কুলে ধর্ষণ হচ্ছে, অফিসের ঊর্ধ্বতন ধর্ষণ করছে। এই নৈতিক অধঃপতন নিয়ে দেশে গণবিক্ষোভ বা গণজাগরণ একদমই নেই।
"বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের" মত বিষয় দিয়ে প্রকৃত ধর্ষণবিরোধী মনস্তাত্ত্বিক সমর্থনকে দুর্বল করা হচ্ছে। নারীর প্রতি অবজ্ঞা করে ধর্ষণের দায় তার পোষাক ও চলনকে দেয়া হচ্ছে। অথচ সমাজে বিক্ষোভ নাই।
একজন কৃষ্ণাঙ্গ হত্যায় পুরো বিশ্বের সকল কৃষ্ণাঙ্গ জেগে ওঠে অথচ একের পর এক নারী ধর্ষিত হলেও আমাদের দেশে রাস্তায় নামেনা নারী, পুরুষ, নারীবাদী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রমুখ! অথচ এদেশে পৃথিবীর এই সময়ের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময়ে নারীর শাসন চলেছে, চলছে।
ক্ষমতাসীন, ক্ষমতার বাইরের বিরোধীমহল যারা এদেশের ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক তারা সবাই নারী হলেও দেশে ধর্ষণ বেড়েই যাচ্ছে। কেন?
ব্যভিচারীদের পাথর ছুঁড়ে মারার পক্ষে যারা তাদেরো কোনোদিন ধর্ষণের বিরুদ্ধে জুমআর নামাজের পর বিশাল বিক্ষোভ দেখা যায়না। বরং কিছু মোল্লা-মুন্সী নারীর প্রতি বিষোদগার ছড়ায়৷
গণমাধ্যমে এক ভোগবাদী নৈতিকতাহীন জীবনযাপন দেখানো হয়। প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক মানসিকতা গঠন করতে কিছুই প্রদর্শন করা হয়না। এমন অবস্থায় নারীর জন্য কেউই নাই।
সমাপনী বার্তা
ধর্ষণ মানবতাবিরোধী ভয়াবহ অপরাধ। আমি মৃত্যুদণ্ডকে সব সময় সমর্থন করিনা। কিন্তু সমাজের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, নারী ও শিশুকে নিরাপদে রাখতে সাক্ষি-প্রমাণসহ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ধর্ষকদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যেতে পারে। এতে করে সুপ্ত ধর্ষকদের জানোয়ার সত্তাটি বারবার চপেটাঘাত খেয়ে মানুষ হতে চেষ্টা করবে। অন্যথায় যতই মুখে ধর্ষণবিরোধী বুলি আওড়ান হে সমাজ ও তার পতিপত্নী, ধর্ষক জানোয়ারপাল পরবর্তী শিকারের আশায় ফাঁদ পেতে বসে থেকে পৈচাশিক অট্টহাসি দিচ্ছে...!
সেই অট্টহাসি আপনার ঘরে পৌঁছাচ্ছে---যেখানে আপনার মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যার বসবাস। তারা এই হায়েনাদের চেনে। আপনি চেনেননা কেন? আপনি ক্ষমতা, অর্থ ও মর্যাদায়সিক্ত, আপনার কানে কেন হায়েনাদের রক্তাক্ত উল্লাস যায়না? আপনার চোখে কেন ধর্ষকদের শেষ করে দেয়ার স্পৃহা দেখা যায়না?
কাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? এ সভ্যতার নিকৃষ্ট অসভ্যতার ব্যাপারে প্রতিটি মানুষের মনে জন্ম নিক সমান ঘৃণা, বিচার হোক ধর্ষণসহ প্রতিটি অপরাধের।
ন্যায়বিচার না হলে, না থাকলে, জুলুম বেড়ে গেলে সে সমাজ থেকে প্রাকৃতিক শকুন বিলুপ্ত হয় আর মানুষরূপী শকুন বৃদ্ধি পায়।
আমরা কি আমাদের সমাজ সংস্কারের সময়কে হেলায় উড়িয়ে দিচ্ছি? সংস্কারের সময় চলে গেলে সাধন হবে কি?
0 Comments