বাংলাদেশের মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জাতীয় হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক দেখলাম অখণ্ড ভারতের পক্ষে ওকালতি ও সমর্থন জানিয়ে 'ফেস দ্যা পিপল' এ বক্তব্য দিলো। তার বক্তব্যে কিছু গোঁজামিল আছে যা ধরতে না পারলে আমাদের জন্য বিপদ। আমি অল্পকিছু আলোচনা করছি।
১।
গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, ১৯৪৭ এর আগে 'অখণ্ড ভারত' ছিল যা পুরোটাই মিথ্যা। ১৯৪৭ এর আগে এটি ব্রিটিশদের করায়ত্ব একটি 'উপনিবেশ' নামের 'রাজনৈতিক অস্তিত্ব' ছিল যার অভ্যন্তরে আবার সিকিম, হায়দারাবাদ, কাস্মির ইত্যাদি স্বাধীনসত্তার দেশ ছিল। অর্থাৎ যে অর্থে গোবিন্দ প্রামাণিক বা আরএসএস, শিবসেনা বা বিজেপি দিল্লিকে কেন্দ্র করে অখণ্ড ভারতের নকশা আমাদের দেয় তা ব্রিটিশ আমলে ছিলো না। এমন কিছু থাকলে সেটির নাম 'অখণ্ড ব্রিটেন' হতে পারে। আফগানিস্তান, মিয়ানমারের জন্য আলাদা শাসক ছিল।
গোবিন্দ যদি তাদের বৈদিক পুস্তক খুলে দেখে সেখানেও দেখা যাবে এই বঙ্গ তাদের 'হিন্দুত্ববাদী এলাকা' ছিলোনা৷ এখানের মানুষকে অচ্ছুৎ ইত্যাদি বলে বরং অবহেলা করা হয়েছে। ইদানীং শরদিন্দুরা মূলনিবাসী মহিষাসুর নিয়ে যে প্রতিবয়ান হাজির করেছে তা স্বাধীন বঙ্গ ভূখণ্ডের পক্ষে জোরালো যুক্তি। পাশাপাশি, আমাদের বাংলায় প্রাচীন যে জনপদগুলি রয়েছে তাও আলাদা রাষ্ট্র ব্যবস্থাই।
সুতরাং বাংলাদেশ, এ কাল বা সে কাল কোনোকালেই দিল্লির অধীনের কোনো রাজনৈতিক শক্তির তাবেদারী করেনি। আকবরের সময় মুঘলরা কিছুদিন দখল করেছিল, কিন্তু এর ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য পারেনি৷ বাংলাকে বলা হতো 'বুলগাকপুর', 'বিদ্রোহের দেশ'। এমন কী রবীন্দ্রনাথের লেখায়ও দেখবেন হিন্দুস্তান আর বাংলাদেশ আলাদা দুটি অঞ্চল ছিল ব্রিটিশ শোষণামলে।
২।
বাংলাদেশের মুন্সিদের অনেকে 'ভারতে ইসলামের ঝান্ডা' উঠাবে বলে হাঁক দেয় বলে তিনি 'অখণ্ড ভারত'কেও জাস্টিফিকেশান দেন। কিন্তু মুন্সিদের 'গাজওয়াতুল হিন্দ' কিন্তু কোনো রাজনৈতিক মত নয়, ধর্মীয় মত। কেউ কেউ করেন এটি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, এটি হবে। যারাই যেটি মনে করেন এর নেপথ্যে থাকে মূলত জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমকে সহায়তা করার চিন্তা। ভারতবর্ষে মুসলমানদের অত্যাচারিত হতে দেখলেই এই বয়ান সামনে আসে। কিছু উগ্ররা একে আবার পুঁজি করে উত্তেজনাও চালায়। কিন্তু এই গাজওয়াতুল হিন্দওয়ালারাও বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়ে কখনো সৌদি আরবের সঙ্গে মিশতে চায় না। যেমন, 'বাংলা হবে আফগান' স্লোগান দেওয়াদের বাংলাদেশের মুসলিমরা কোনোকালেও মূলধারায় দাম দেয়নি, দেবেওনা। এই আফগান পার্টির মতই গোবিন্দের মত এমন অখণ্ড ভারতে যারা যেতে চায় তারা সমূহ বিপদ বাংলাদেশের জন্য।
৩।
গোবিন্দ আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে এই সরকারের সময় হিন্দুরা ভালো নেই বলে মিথ্যাচার করেন৷ কিন্তু আমরা সবাই জানি, কিছু হাতেগোনা ঘটনা ছাড়া বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় অংশ আওয়ামী লীগের সময়ে শান্তিতে আছে এটি স্বীকার করবে। সেটি সামাজিকভাবে বাস করা থেকে শুরু করে চাকরিপ্রাপ্তি, আইনী সুবিধা ইত্যাদি যেদিক থেকেই দেখুক না কেনো। কিন্তু গোবিন্দ চন্দ্র মিথ্যাচার করতে গিয়ে বলেন, ২০১৫ তে থাকা ১০.৭০% হিন্দু জনগোষ্ঠী ২০২২ সালে এসে ৭.৯% হয়। ধরলাম, এই ডেটা সত্য। তো এই যে ৩% কমলো এরা কি সবাই মুসলমানদের অত্যাচারে কমেছে? একদমই না। গোবিন্দ যেভাবে হিন্দু মুসলিম হিসেবে সব মাপেন সে হিসেবে যদি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের অত্যাচার হওয়াকে ধর্মের ভিত্তিতে করেন? জটিল আলাপ। কিন্তু গোবিন্দের হারের সমস্যা খুঁজি চলেন...।
√ মুসলমানদের জন্মহার অধিক। আপনার চারপাশে দেখেন মুসলমান দম্পতির সন্তান সংখ্যা যেখানে কম করে ৪-১০ টি, হিন্দুদের সেখানে মাত্র ১-৪ টি। কিছু ব্যতিক্রম পাবেন। এই হার সার্বিক পরিসংখ্যানে অবশ্যই ভূমিকা রাখে।
√ হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মের বিপুল সংখ্যক লোক কথিত উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশে যায়। এর মধ্যে ভারতে মুসলমানরা যায় না, বা গেলেও একেবারেই কম। মূল পরিসংখ্যানে মুসলমানরা ইউরোপ আমেরিকাতে 'সেটেলড' হলেও নাম থাকে, কিন্তু হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে যারা জমি বিক্রি করে একেবারে চলে যায় তাদের নাম আসেনা, আসলেও কম। এখন চিন্তা করেন আশেপাশে কী পরিমাণ এ সংখ্যা দেখেছেন?
√ গোবিন্দ বলেছেন, ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১২% মুসলিম ছিলো (এটি সত্য নয় এ জন্য যে, অখণ্ড বাংলায় কলকাতার মেয়র মুসলমানরা বেশি ভোট পেয়েই হয়েছে) যা বর্তমানে ৩৬% এ এসেছে। এ দিয়ে গোবিন্দ বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশে হিন্দুরা কমেছে, আর ওখানে মুসলিম বেড়েছে। এখানে যে বিষয়টি উহ্য রয়েছে তা হচ্ছে গোবিন্দের মতে, যদি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম বাড়ে তো সেখানেও হিন্দু কমেছে। সেই দায়ও কি বাংলাদেশের মুসলমান নেবে? হাহাহা!
আসলে মুসলমানদের জন্মহার এক আরব ছাড়া সমস্ত মুসলিম-অমুসলিম দেশে অধিক। এটিই তাকে আনুপাতিক হারে সংখ্যায় বড় করে।
এর পাশাপাশি একটি বড় অঙ্ক কিন্তু অন্য ধর্ম থেকে প্রতিবছর মুসলমান হয়।
√ বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসী যারা হিন্দু ধর্মের রীতি পালন করতো তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিন্তু স্বেচ্ছায় খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। এই কমে যাওয়া কিন্তু পরিসংখ্যানে থাকে না।
√ গোবিন্দ চন্দ্র যেভাবে অভিযোগ করেছেন তার পিছনে ধর্মের পরিচয়ের চেয়ে 'ক্ষমতাহীনের নিপীড়িত' হওয়া বেশি কাজ করে। ভূমি দখলকারীদের হাতে ক্ষমতাহীন হিন্দুর মতই ক্ষমতাহীন মুসলমান অত্যাচার হয়। তবে অনুষ্ঠানে তালহা কিবরিয়া নামের এক অশিক্ষিত যেভাবে কথা বলেছে আমি তার সঙ্গে একমত নই। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশকে জীবনের গন্তব্য ভাবা হিন্দু ভাই-বোনের সংখ্যাই অধিক।
৪।
বর্তমান আওয়ামী লীগের সমালোচনা করা যাবে নানা কারণে, কিন্তু গোবিন্দ বলেন ১৯৪৭ এর পর অসাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি ধরে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগ নাকি 'সাম্প্রদায়িক'। সে সময়ের ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নাকি মূল লক্ষ্য ছিল 'হিন্দুদেরকে পার্লামেন্ট থেকে বের করে দেওয়া' অথচ আমরা সবাই জানি কেবল অসাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি ধরে গড়ে ওঠার কারণেই আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' এই ধর্মীয় পরিচয়মূলক শব্দটি ফেলে দেওয়া হয়।
৫।
গোবিন্দ বলেছেন, ১৯৭১ সালে হিন্দুরা সবচেয়ে বেশি ত্যাগ করেছে। আমি মনে করি এটি অসত্য। হিন্দু ও মুসলিমরা অত্যাচারিত হয়েছে পাকিস্তানী পিচাশদের হাতে। কিন্তু এই ত্যাগ বাঙালি মুসলিম অবশ্যই বেশি স্বীকার করেছে। ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা বোনদের সংখ্যায় আনুপাতিক হার কোনোদিন সামনে এলে তা দেখা যাবে। এমন কী ভারতে যে কোটি জনতা গিয়েছে তাতেও মুসলমান সংখ্যায় কম ছিলো না। খেতাবপ্রাপ্তিকে আমি ভিত্তি ধরি না, কিন্তু বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড থেকে শহীদ পরিবারের খোঁজ নিন, বাঙালি মুসলমানদের ত্যাগ অনেক অনেক বেশি বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে। এমন কী ১৯৪৭ এর আগের দাঙ্গাগুলোতেও বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রাণহানী ভয়াবহ। ১৯৪৬ এর কলকাতার গণহত্যায় হাজার হাজার মুসলমানকে কচু কাটা করে আজকের কলকাতার বাবুদের পূর্বপুরুষ!
এরকম নানা আলাপ দেখলাম ভিডিওতে। যে কটি মনে আছে তা নিয়ে লিখলাম।
আমি বিশ্বাস করি, ভারত ও পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠন করে 'মুসলমান' ও 'হিন্দু' এ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশী বাঙালি পরিচয় জয়ী হয়। সেই পরিচয়কে আমাদের সবার আগে ধারণ করতে হবে।
বিভাজনের রাজনীতি গুটিকয়েক গোবিন্দ-মামুনুলদের ক্ষমতায়ন ঘটাবে। কিন্তু তাতে হেরে যাবে বাংলাদেশ। তা থেকে মুক্তির জন্যই আমাদের ধর্মের ভিত্তিতে যেকোনো ঘটনাকে দেখার একপাক্ষিক ভাবনা ছাড়তে হবে। নিঃসন্দেহে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সর্বসময়ে ধর্মীয় পরিচয়ের বেড়াজাল আপনাকে কখনো কখনো মুক্ত পৃথিবী থেকে পৃথক করে দেবে।
এ কারণে ধর্মকে ভিত্তি করে যারা রাজনীতি করে তাদের দেখলে আমার আতঙ্ক লাগে। জামাত-হেফাজত- কিংবা বিজেপি-বজরঙ্গী-শিবসেনা বা জাতীয় হিন্দু মহাজোট এই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তফাৎ কম। এরা সবাই 'আমরা বনাম তারা' এর ওপর ভিত্তি করে 'উত্তেজনা বাণিজ্য' করে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করে। স্বাধীন বাংলাদেশ এদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা।
0 Comments