বিশ্বব্যাপী আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার একটি কারণ ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ।
সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের দখলে থাকা ফকল্যান্ড ও এর আশেপাশের কয়েকটি দ্বীপ পুনর্দখল করে নেয় আর্জেন্টিনার সেনা শাসকরা। শুরু হয় ব্রিটেন বনাম আর্জেন্টিনার তুমুল যুদ্ধ।
এ কারণে বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ বা পশ্চিমের আধিপত্যবাদবিরোধী জনতা আর্জেন্টিনার সমর্থন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের সব রাষ্ট্র ব্রিটেনের পাশে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ন্যামভুক্ত দেশগুলো সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে ব্রিটেনের পরাজয় চাচ্ছিল।
যুদ্ধে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। যুদ্ধের এই পরাজয় ১৯৭৮ সালের চ্যাম্পিয়নদের ১৯৮২ বিশ্বকাপে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনা। এ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের নক-আউট ম্যাচে ব্রিটিশদের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। পুরো বিশ্বের ব্রিটিশ, ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মানুষ আর্জেন্টিনার সমর্থন করে। মাত্র চার বছর আগের দগদগে যুদ্ধের ক্ষত আর্জেন্টিনাকে প্রতিশোধের সুযোগ দেয় খেলার মাঠে। ম্যারাডোনার বিখ্যাত 'সৃষ্টিকর্তার হাতের গোল' তুমুল উত্তেজনাকর সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে জয়ী করে। আর্জেন্টিনা ম্যারাডোনার নেতৃত্বে সেই দ্বিতীয় ও শেষবারের মত বিশ্বকাপ নেয়।
এ জয়কে আর্জেন্টাইন ও বিশ্বের বহুদেশের মানুষ ফকল্যান্ড যুদ্ধের 'সফট রিভেঞ্জ' বলে পাঠ করে। এর ফলেই আর্জেন্টিনার সমর্থক রাতারাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়।
সে সময় সংবাদপত্র বা বেতারে মানুষ একসঙ্গে সংবাদ শুনতে উঠোনে পাটি বিছিয়ে। একসঙ্গে অনেক মানুষকে এ কারণেই আর্জেন্টিনা অনুরণিত করেছিল।
পরবর্তীকালে দিয়েগো ম্যারাডোনার সাম্যবাদী অবস্থান, পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের জন্য তার আবেগ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের ত্রাস ফিদেল কাস্ত্রোদের নিকটবর্তী হওয়ায় ম্যারাডোনা জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। এমন কী হাত দিয়ে দেওয়া তার 'ফাউল গোল'কেও গ্লোরিফাই করা শুরু হয়। এটাই জনপ্রিয়তা। এটাই ভক্তি। এখানে যুক্তি কাজ করে না, আবেগই সিদ্ধান্তের উৎস।
আমি বলছিনা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সচেতনভাবে বা রাজনীতিসক্রিয় হয়ে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়েছে। একটি বড় অংশ কেবল পারিবারিক কারণে অথবা অপছন্দের মানুষের বিপরীত দল সমর্থন করতে আর্জেন্টিনা করে।
কিন্তু এর আগে আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়ার পিছনের ইতিহাস রয়েছে। সে ইতিহাস জালিম ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিরোধের ইতিহাস।
আমি চাই আজ আর্জেন্টিনা জিতে যাক। টিকে থাকুক খেলার উত্তেজনা। আমি চাই জিতে যাক ম্যারাডোনার সেই আর্জেন্টিনা। যদিও মেক্সিকোকে সমর্থন কেউ করলে তার প্রতিও আমার শ্রদ্ধা থাকবে।
0 Comments