সর্বশেষ

মহালোক শেরে বাংলা একে ফজলুল হক: সর্বহারা গরীব-দুঃখী কৃষক-শ্রমিকের দরদী নেতা

আগামী ২৬ অক্টোবর ২০২৪ দুনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে জনদরদী মেধাবী নেতাদের একজন শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের জন্মবার্ষিকী। আমাদের হক্বের বাতিঘর হক সাহেব৷ 

১৮৭৩ ঈশায়ী সনে তিনি বরিশালের ঝালোকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

এ হিসেবে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ শেরেবাংলার ১৫১তম আবির্ভাব দিবস।

বাংলাদেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—ইশকুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা—শেরে বাংলার এবারের জন্মবার্ষিকী বিশাল গুরুত্ব দিয়ে উদযাপন জরুরি। বাংলা একাডেমিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বেশি করে শেরে বাংলার জীবনী আলোচনার আয়োজন করতে পারে।

কারণ, শেরে বাংলা অর্থাৎ আমাদের বাংলার বাঘ এ কে ফজলুল হকের অশেষ অবদানে আজকের বাঙ্গালী জাতি এ পর্যায়ে এসেছে৷ 

আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে যত মণিষীর জীবনী পড়েছি তার মধ্যে শেরে বাংলার মত এতো বেশি হক্বপন্থী, অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানে পূর্ণ মেধাবী, অদ্বিতীয় সততাসম্পন্ন, অসীম সাহসী ও প্রবল ব্যক্তিত্ববান অসহায়, গরীব-দুঃখী, সর্বহারার জনদরদী নেতা একজনকেও পাইনি৷ 

শেরে বাংলা কোন মানের মেধাবী সেটি জানাতে আমার আব্বা কিংবদন্তিতুল্য কিছু গল্প বলতেন। তাঁরা শুনেছেন, ফজলুল হক এক বইয়ের পাতা দ্বিতীয়বার পড়তেন না এবং যখন পাবলিক পরীক্ষা দিতেন তিনি ঘোষণা দিতেন যে, কারো ফার্স্ট হওয়ার ইচ্ছে থাকলে এবার যেন সে পরীক্ষা না দেয় কারণ ফজলুল হক এবার পরীক্ষা দেবে। 

এর সত্যতা মেলে তার আশ্চর্যান্বিত প্রতিভা দেখে। তিনি একই সাথে রসায়ন, পদার্থ আর গণিতে অনার্সসহ পাশ করেন। আবার, ইংরেজি পরীক্ষার মধ্যে এক কাঠহিন্দু তাকে 'মুসলমান অঙ্কে কাঁচা বা গণিত ভয় পায়' জাতীয় কিছু বললে তিনি মাত্র কয়েক মাস পড়ে ইংরেজি বাদ দিয়ে গণিতে ঐবারের সেরা রেজাল্ট করেন। গণিতে তিনি বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে সর্বপ্রথম এমএস—তাও হাইস্ট নম্বর তুলে। তারপর আবার আইন বিষয়েও উচ্চতর ডিগ্রি নেন! বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, আরবী ভাষায় তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন। সুবাহানআল্লাহ বলা ছাড়া এই মহালোকের মেধা ও বুদ্ধির বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশের আর কোনো মাধ্যম আমাদের হাতে নাই!

তিনি তৎকালীন জমিদার-তালুকদার আর ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে 'কৃষক-প্রজা পার্টি' করে বিপ্লব করেছিলেন। এই বিপ্লবের যাত্রায় ফজলুল হক এতো বেশি গরীব মুসলিম আর দলিত শ্রেণির হিন্দুর ভালোবাসা পেলেন যে ব্রাহ্মণ্যবাদী বর্বরদের তৎকালীন আস্তানা কলকাতার প্রথম মুসলিম মেয়র হয়ে গেলেন! এরপর পুরো অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রীও হয়ে গেলেন কৃষক-শ্রমিকদের বিপুল ভালোবাসার সমর্থনে!   

তারপর তিনি যা করেছিলেন তা দুনিয়ায় অনন্য। আইন করে সুদখোরদের দাঁত ভেঙে দেন। বুর্জোয়াদের এমনভাবে শায়েস্তা করেন যেখানে দোকান কর্মচারীদের ছুটির জন্যও আইন হয়। মানে সেই কালে দোকানে কাজ করলে তার কোনো ছুটি ছিলোনা! দেখা যাচ্ছে ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস ডিক্লারেশনের বহু আগেই আমাদের শেরে বাংলা মানবাধিকারের চূড়ান্ত রূপের চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেন। 

তিনি পাটের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে আইন করেন এবং জমিদারি নামের অত্যাচারীকে সমূলে উচ্ছেদ করেন। এসব করেন—একবার গভীরভাবে চিন্তা করেন—সেই ব্রিটিশ দালাল জমিদারশ্রেণির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে শোষিত কৃষক-শ্রমিকদের নিয়ে।

ফজলুল হক দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে একবার সভাপতিত্ব করেন৷ এ সভায় তাঁর দরাজ কণ্ঠের দুর্দান্ত ভাষণ হৃদয় কেড়ে নেয়। তিনি একই সাথে কংগ্রেসেরও নেতা ছিলেন। তাঁর একক চেষ্টায় লক্ষ্ণৌতে কংগ্রেসের সাথে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক বোঝাপড়া হয়। 

১৯১৮-১৯১৯ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই সময়ে ভারতের রাজনীতির প্রভাবশালী মুখ এবং স্বাধীন ভার‍তের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত একজন সচিব ছিলেন। নেহরুর রাজনৈতিক পরিপক্ব হয়ে উঠার অভিযাত্রায় শেরে বাংলার অবদান আছে। এ ইতিহাস কোনোদিন আপনার সামনে আলোচিত হয়েছে? না তা ভারত বলে, না বাংলাদেশের মুখস্ত বিদ্যানির্ভর ভারত-পাকিস্তানপন্থী ইতিহাসবিদরা এ আলোচনা করে!

১৯৪০ এ লাহোরে ফজলুল হক যে প্রস্তাব দেন তার খণ্ডিত রূপের নাম ''ভারত ভাগ বা দেশভাগ"। পূর্ণাঙ্গ লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হলে আজকের দক্ষিণ এশিয়ার জাতিগত সমস্যার নিরসন হতো। তবু পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার যে সংগ্রামটি আমরা করেছি তার বীজ বপন করেছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক—এ কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। 
আপনি জানেন কলকাতার বেকার হোস্টেলে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন, কিন্তু এই বেকার হোস্টেলসহ টেইলর, কারমাইকেল ও গার্লস হোস্টেল ছাড়াও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন আমাদের শেরে বাংলা। মৌলানা আজাদ কলেজও তাঁরই নির্মাণ। 

আমাদের এই মহান নেতা, সত্যিকার জননেতা, বাংলাদেশের আকাশের সূর্যপ্রদীপ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে আমাদের সামনে বড় করে দেখাতে কি কার্পণ্য হয়েছে না? 

এ প্রজন্মের Ariful Islam  Arif Sohel রুদ্র মুহাম্মদ সফিউল্লাহ Mahfuj Alam সহ সবার প্রতি অনুরোধ শেরে বাংলাকে মূল্যায়নের শুরু করতে হবে। আলোচনা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গণমাধ্যমসহ সর্বত্র শেরে বাংলার আলো জ্বালতে হবে। 

আমরা যে Founding Fathers আলোচনা করি তার মধ্যে শেরে বাংলা সবচেয়ে জ্বলজ্বলে মহাবিপ্লবী। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা শেরে বাংলাকে ভোলেনি। সেখানে ভূমিপুত্র উন্নয়ন মোর্চা নামের একটি সংগঠন শেরে বাংলাকে বিপুল আবেগে চর্চা করে 'শেরে বাংলার আলো/ঘরে ঘরে জ্বালো' বলে! তাঁরা জানে, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচার থেকে তাঁদের মুক্তির জন্য লড়াইটা মূলত শেরে বাংলার হাত ধরেই শুরু হয়। 

এক সময় শিক্ষায় দীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া বর্ণহিন্দুরা চাকরির ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার খাতায় নাম দেখে নম্বর দিয়ে মুসলমান আর দলিত শ্রেণির হিন্দুদের ওপর বুদ্ধিবৃত্তিক জুলুম করতো। এটা যেন না করতে পারে সে জন্য শেরে বাংলা ক্ষমতায় আসীন হয়েই পরীক্ষার খাতায় নাম লেখা নিষিদ্ধ করে শুধু রোল রাখার পক্ষে আইন করলেন। 

এই যে বিপ্লব,  সেই সময়ে কী বড় যে বিপ্লব সেটি জসিমউদদীনের 'ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়' পড়লে বুঝবেন। জসীমউদ্দিন মুসলমান এই কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য সুপারিশপত্র দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন৷ অথচ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে বর্ণহিন্দুরা বিরোধিতা করেছিল তারা ঠিকই সেখানে কাজ বাকিয়ে নিয়েছিল!
তাই, জেন-জি এবং অন্য প্রজন্মের শ্রদ্ধাভাজনদের প্রতিও রইলো অনুরোধ বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শেরে বাংলাকে নিয়ে কিছু করার।  
দেখেন, শেরে বাংলার হাত ধরে 'নবযুগের' মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার ডাক দেওয়া কাজী নজরুল ইসলামের বিকাশ। শেরে বাংলার ছোঁয়া পেয়ে নেহরু জাতীয় নেতা। শেরে বাংলার উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাবকে বিকৃত করে পাকিস্তান আন্দোলন কেন্দ্র করে জিন্নাহও নেতা। মুজিব 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থে বলেছেন যে তিনি শেরে বাংলাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বললে তাঁর পিতা কঠোর নিষেধ করে মানুষের কল্যাণে শেরে বাংলার অমূল্য খ্যাতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন৷ 

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে শেরে বাংলার আলোচনা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। শেরে বাংলা, আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, আমাদের একজন বিশ্বনেতা। তাঁকে এবারের ২৬ অক্টোবর বিপুল প্রয়াসে স্মরণ করা হোক। 

সর্বহারার সর্বশেষ নেতা শেরে বাংলার জয় হোক। 

ছবি: শেরে বাংলার পাশে বসা জিন্নাহ। কেন নিখিল ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হওয়ার পরেও জিন্নাহ-নেহরু-গান্ধী গংয়ের কাছে ফজলুল হক পরে এক অর্থে কোণঠাসা হলেন সেটি ইতিহাসে আলোচিত হয়না। হিন্দুত্ববাদীদের মতই সোহরাওয়ার্দী গং এবং মুসলিম লীগের বহু জমিদার-তালুকদার ও তাদের পাইক-পেয়াদারা বাংলার বাঘের ভয়ে ভীত ছিল। 

এ কারণে তারা জিন্নাহ-নেহরু-গান্ধীদের কাছে মেরুদণ্ড বন্ধক দিলেও এই মাটির সন্তান মহাত্মা মহাবিপ্লবী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে আগ্রহী ছিলোনা...!
এ নিয়ে পরে একদিন আলাপ করবো এবং নিশ্চয়ই লিখবোও—মহান আল্লাহ চাইলে। 
#৩৬
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments