সর্বশেষ

অসুর অনার্য শহীদ | মহিষাসুর বনাম দুর্গা | মহিষমর্দিনী কি আর্য আগ্রাসনের দেবী?


ভারতের দলিতদের একটি বড় অংশ দুর্গা পূজার সময় অসুরবধকে খুবই কষ্ট নিয়ে মেনে নেয়৷ 

তাদের ক্রিটিক হচ্ছে—'আর্য দেবী দুর্গা তাদের আদিরাজা ভূমিপুত্র মহিষাসুরকে খু ন করেছে'। 

মহিষাসুরের গায়ের কৃষ্ণবর্ণ বা তামাটে রঙ, তার হৃষ্টপুষ্ট দেহকে যেভাবে আঁকা হয়—মূলনিবাসী আন্দোলনের নেতা শরদিন্দু বিশ্বাসদের মতে— তা অব্রাহ্মণ্যবাদী অনার্য ভূমিপুত্রদের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। 

বাংলাদেশ ও ভারতের আদিবাসী সাঁওতালদের নিকট মহিষাসুর ভূমিপুত্র এবং প্রজাদরদী সম্রাট। এখনো বীর নারীদের যে 'মহিয়সী বা মহিষী' বলা হয় এর কারণ 'মহিষ' একদা এ ভূমিতে শক্তি ও আভিজাত্যে পূর্ণ শব্দ ছিল। 

ইন্দ্রের নেতৃত্বে আর্যরা এই ভূখণ্ড দখলে ব্যর্থ হয়ে দুর্গাকে দিয়ে ছলনা করে সম্রাট অসুরকে হ ত্যা করে—শরদিন্দুর অভিমত! দুর্গার অপর নাম এ কারণে মহিষমর্দিনী। 

মহিষাসুরকে 'হুদুড় দুর্গা' বলে 'দাসাই নৃত্য' এর সাথে মাতম করে সাঁওতাল, কোল, মুণ্ডা নামের বাঙ্গালী জাতির আদিপুরুষ বা আদি জাতিসমষ্টি। 

ভারতের শরদিন্দু বিশ্বাসরা এ নিয়ে বিগত কয়েক দশক একটি প্রতিবয়ান দাঁড় করাতে চাচ্ছেন৷ তাদের ইউটিউব চ্যানেল Voice of Bahujon বা মূলনিবাসী বার্তায় এসব কাউন্টার ডিস্কোর্স ও ক্রিটিক পাবেন। তারা এমনকি মহিয়স অসুর আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে এই ভূমিরক্ষায় একজন প্রতিরোধযোদ্ধা শহীদ—এ দাবিও করেন। 

ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও ভারতের মতুয়াদের লড়াইটা আগ্রাসী 'জয় শ্রী রাম' এর রাজনৈতিক অভিলাষের কাছে প্রায় বশীভূত হলেও 'অসুর পূজারী'দের প্রতিবয়ানটি শক্তিশালী হচ্ছে। তাদের মতে, এই ভূমিতে মহিষ আদিপ্রাণ। এখানে সিংহ বা সিংহবাহীরা আদিম অধিবাসী কী না সে প্রশ্নও তোলা যায়৷ অনেকটা রাবণ-মেঘনাদকে বা কর্ণ-দুর্যোধনকে দক্ষিণ ভারতের কিছু চলচ্চিত্রে যে প্রতিবয়ানে নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। 
২।
এ আলাপ চললেও আমাদের মতে, যারা দেবী দুর্গাকে অর্চনা করেন তাদের সে অধিকার আছে। বিজয়ীরা ইতিহাস রচনা করে থাকেন অধিকাংশ সময়৷ সেই ইতিহাস যে-ই লেখুক দুর্গা পূজারীদের নিকট 'অসুর' মানে 'সুরহীন' অর্থাৎ 'মন্দ'—মহিষরূপী প্রতিদেবতা। দুর্গা এই মন্দকে তাড়াতে ধরায় আসেন। 

এ বিবেচনায় আমাদের আজকের দেবী দুর্গা কল্যাণেরই বাহক যেহেতু তিনি কালের বিবর্তনে অনার্যদের উত্তরপুরুষের নিকট পূজনীয় হয়েছেন। পূজারি বা পূজারিনি দেবী দুর্গাকে অশুভ ও অকল্যাণ তাড়ানোর দেবী ভাবেন, আর্যদেবী হিসেবে নিশ্চয়ই তার প্রতি দরদ থাকেনা ভক্তদের। তাই সংখ্যাগুরু হিন্দুদের ধর্মীয় এই দৃষ্টিকোণকেও শরদিন্দু বিশ্বাসদের সম্মানের সাথে মোকাবেলা করতে হবে। 

তবে দুর্গা পূজা শরৎকালে হয়ে 'শারদীয় বা সার্বজনীন' দুর্গা পুজো হওয়ার আরেকটি প্রতিইতিহাস আছে। একাধিক হিন্দু লেখকদের লেখায়ই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়ের পর দখলদার ক্লাইভের ছত্রচ্ছায়ায় রাজা কৃষ্ণ বা নবকৃষ্ণ এই পুজোটি ব্যাপকভাবে চালু করেন বলে একটি প্রতিবয়ান উল্লেখ আছে। ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ করছিনা।  
৩।
পূজারিদের মতই যারা দুর্গা পুজোর এই সময় বাংলার আদিকালের এক সম্রাট মহিষাসুরকে প্রতারিত করে বধ করার দুঃখে কাঁদেন তাদেরও কাঁদার অধিকার আছে। দাসাই নৃত্যে মহিষাসুরকে হারানোর ভীষণ কষ্টও শোক-উৎসব করে প্রকাশের অধিকার আছে। তারা যদি মহিষাসুরের বেদনায় আহাজারি করেন, মণ্ডপে অসুরকে নৃশংসভাবে হ ত্যার রক্তাক্ত প্রতিকৃতির ব্যাপারে আপত্তি জানান সেই অধিকার তাদের আধুনিক 'স্বাধীনতা ব্যবসায়ী' রাষ্ট্রব্যবস্থা দেয়। 

ধর্ম এটাই৷ 

নিজ নিজ বিশ্বাসের সাপেক্ষে উৎসব আয়োজন ও নানা রকম আনন্দ-বেদনা উদযাপনই ধর্মের বাহ্যিক প্রকাশ।

এমনিতে বিশ্বাস দেখানোর বিষয় নয়৷ স্রষ্টার সাথে একান্ত সম্পর্কই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে মানুষের মুক্তির বার্তা আনে। কখনো বিশ্বাসে অতিভক্তি বন্দিত্বও আনে। 

কিন্তু ধর্মকে মিথ কিংবা ইতিহাসের সাথে মিশ্রিত করতে গেলে এমন অনেকে আলাপ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয় যা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের ওপর অনেক সময় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়৷ 

এই প্রশ্ন করাটাই ক্রিটিক। অর্থাৎ ঈশ্বর বা দৈববাণীকে প্রশ্নাতীত না ধরে সেগুলোকেও নানাভাবে বিশ্লেষণ করে একটি নির্যাস বের করাই ক্রিটিক। মানুষ মানুষ হিসেবে আজো টিকে আছে—বহু প্রাণকে নিঃশেষ করে দিয়েও— কারণ মানুষ স্রষ্টার অদ্বিতীয় ক্রিটিক্যাল সৃষ্টি৷ এ সৃষ্টি বিরামহীন ক্রিটিক করে, আর ক্রিটিক আবার এ সৃষ্টিকে অবিরাম মানুষ করে।

(বহুজনদের কিছু প্রতিবয়ানের লিংক আমি মন্তব্যে দিলাম। দেখতে পারেন।)
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments