সর্বশেষ

ঢাবি ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ও শিক্ষক নিয়োগে অযোগ্যতার দুষ্টচক্র

বাংলাদেশের এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত নাম আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক (১৯৫৩-২০২৫)। পুরো নাম আবু আহসান মোহাম্মদ সামশুল আরেফিন সিদ্দিক৷ 


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এ অধ্যাপক ছিলেন ঢাবির ২৭ তম উপাচার্য। 

গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি ইহজগৎ ত্যাগ করেন৷ তার জানাজার নামাজ শত অভিযোগের পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দেওয়া উচিত ছিল। তাতে স্তুতিকারীদের মতই, তার প্রতি ক্ষুব্ধদের বয়ানও শোনার সুযোগ তৈরি হতো। এখন, ইতিহাসের একটি দৃষ্টিকোণে তার লাশের প্রতি সদাচার না করার একটি বয়ান দাঁড়ালো যদিও এর প্রতিবয়ান: আলাপ-উন্মোচন-বিনির্মাণ হাজির। 

তাঁর প্রস্থানপরবর্তী বিভাজিত প্রতিক্রিয়াসমূহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে দায়িত্বশীল জীবিত উপাচার্যসহ অন্যদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। দায়িত্বে থেকে ন্যায়বিচার করতে না পারলে, যোগ্যদের হক্ব নষ্ট করলে, কম যোগ্য বা অযোগ্যদের পুনর্বাসন করলে সেগুলো মহান স্রষ্টার নিকট ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এরপর যতই পূন্য করেন ঐ হক্ব নষ্টের কারণে দ্বীন ও দুনিয়া দুটোই বরবাদ হয়ে যেতে পারে। 

২।

প্রয়াত ড. আরেফিন সিদ্দিকের দুই ধরনের গুণগ্রাহীকে আমরা পাচ্ছি। প্রথমত, যারা সরাসরি তাঁর ছাত্র বা ছাত্রী। তাঁরা রাজনীতি ও ভিসিগিরিকে দূরে রেখে শিক্ষক হিসেবে ড. আরেফিনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন। মর্যাদা দিচ্ছেন। বোঝা যাচ্ছে, তিনি শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলেন৷ 

দ্বিতীয় শ্রেণির গুণগ্রাহীরা ড. সিদ্দিকের মাধ্যমে ন্যায্য বা অন্যায্যভাবে উপকৃত হয়েছেন। সোজা কথায়, তারা চাকরি পেয়েছেন আরেফিন সিদ্দিকের অবদানে। 

কারো জন্য ফোনে তদবির করেছেন, কারো জন্য নিজে এক্সটার্নাল থেকে সুপারিশ করেছেন, কারো জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খুলে তার জীবিকার ব্যবস্থা করেছেন, কাউকে মিডিয়া বা অন্য কোনো বেসরকারি বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন ইত্যাদি৷ এভাবে একটি বড় উপকারভোগী গোষ্ঠী তৈরি করেছেন ড. সিদ্দিক। এই শ্রেণির কাছে আরেফিন সিদ্দিক ছিলেন সাক্ষাৎ দেবদূত—তাদের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে দেওয়া দীর্ঘদেহী দেবতা! ড. সিদ্দিকের প্রস্থানে তাদের অন্তরে ব্যথা লাগা স্বাভাবিক। 


বিপরীতক্রমে, ড. আরেফিন সিদ্দিকের মৃত্যুতে দুই ধরনের লোকের স্তুতিহীন—ক্ষেত্রবিশেষ নির্দয়—মন্তব্যও লক্ষ্যণীয়। 


এর মধ্যে প্রথম পক্ষ: আরেফিন সিদ্দিকের সুপারিশে যারা শিক্ষক-শিক্ষিকা পদে চাকরি পেয়েছে বা অন্য কোথাও চাকরি বাগিয়েছে তাদের বাইরের লোক। তুলনামূলক অধিক যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদের একজন আরেফিন সিদ্দিকের আশির্বাদ বা লবিং বা তদবির নেই বলে তারা বঞ্চিত। তাদের হক্ব নষ্টের দায় নিশ্চয়ই রয়েছে ড. সিদ্দিকের। একইভাবে আরেফিনের মত অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকা গং একাডেমিক জুলুম করে নম্বর কম দেওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের একাডেমিক ক্রাইম করেছে তাদের ওপর। 


দ্বিতীয় পক্ষ, রাজনৈতিক কারণে তাকে অপছন্দ করেন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন উপাচার্য থাকার পরেও দেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র বা আওয়ামী বয়ানের বাইরের শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন, শিক্ষাব্যবস্থার অধঃপতন ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর নীরবতার কারণে তাকে অভিযোগ করতে চায় এই পক্ষ। গত দেঢ় দশক যে ভোটহীন একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থা ছিল তার ব্যাপারে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মতি আদায়ে ড. সিদ্দিক এন্ড গংয়ের অঢেল অবদান ছিল। 

৩। 

ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে ড. সিদ্দিকের সব মিলিয়ে দুই-তিনবার দেখা হয়েছে৷ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ খোলার মাধ্যমে এখানেও তিনি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রভাবশালী শিক্ষক-শিক্ষিকা গং পছন্দ মোতাবেক নিয়োগ দিয়েছেন। 

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন ও বিদায় অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। দরাজ কণ্ঠ। সুবক্তা বলা যায়। 

বিভাগে আসার সময় যে নিয়োগ দিয়েছিলেন তার প্রতি অনাস্থার কারণেই হয়তো বিদায়ের সময় আমাদের ওপর হওয়া জুলুমের কাহিনী না শুনে তিনি চলে গিয়েছিলেন। 

ঐদিন আমাদের মাস্টার্সের ফল জানা হয়। আমরা শুনি, বিশাল এক কারসাজি করে পছন্দের লোকদের সামনে এনেছে—আরেফিন স্যারের গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রী-কাম-শিক্ষকশিক্ষিকাপাল! 

আমরা ভরা মজলিসে তা ফাঁস করে দিই কী না এ জন্য উনার উপস্থিতিতে আমাকে এবং আমার কমরেডদের বক্তব্য দিতে নির্ধারিত স্লট শেষ মুহূর্তে অন্য সেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। 

৪।

উনার সাথে তৃতীয় ও শেষবার আমার দেখা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডে। 

প্রথমে বলে নিই, আগে থেকে একজনকে নিয়োগ দিয়ে পরে তাকে স্থায়ী করার জন্য পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া একটি জাহেলিয়াতে পূর্ণ জুলুম যা এখনো চলমান৷ নয়া বিজ্ঞপ্তিতে যারা আবেদন করে তাদের কাছ থেকে পূর্ণ টাকা নেওয়ার পরেও এবং তারা তাৎক্ষণিক পরীক্ষা, অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্স এর ওপর ভিত্তি করে আগে থেকে অস্থায়ীভাবে থাকা প্রভাষকের চেয়ে উত্তম হলেও নতুন কাউকে সাধারণত নেওয়া হয়না। এই বেইনসাফ ও জুলুম আরেফিন সিদ্দিক বা তার মত অন্যান্য ভিসি-প্রভিসিরা বাংলাদেশে বন্ধ করতে পারেনি। এর ভুক্তভোগী হই আমি বা আমার মত অনেকেই। 


আমি তো পুরোদস্তুর একটি ফেয়ার নিয়োগের আশায় পরীক্ষা দিতাম এবং বিশ্বাস করতাম, আমার প্রফাইল, এক্সপেরিয়েন্স বা ইনস্ট্যান্ট পারফরম্যান্স তাদের হয়তো সিদ্ধান্ত বদলাবে! বাস্তবে তা হতো না!

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ডে ড. আরেফিন সিদ্দিক আছেন এটি ভেবে গেলাম। ভাবলাম, এতো বড় ব্যক্তি। আমার উপর হওয়া জুলুমের বুঝি অবসান হবে এবার। 

তো, আলহামদুলিল্লাহ ভাইভায় সত্যিই অসাধারণ করলাম! ড. আরেফিন ও তৎকালীন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাদেকুল আরেফিন মতিন তাদের মুগ্ধতা বোর্ডেই উচ্ছ্বসিত হয়ে জানালেন এবং বিভাগের সভাপতিও। আরেফিন সিদ্দিক আমাকে ইনফরমেশন ডিজঅর্ডারসহ যা যা প্রশ্ন করলেন আমি একুরেটলি তা বললাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রতনও ভীষণ অবাক হলেন আমার বোর্ডে ১০০% একুরেট রেস্পন্স দেখে। 

পরে জানলাম, তাদের আগে থেকে ফিক্সড করা অস্থায়ীকে নেওয়ার কারণে আমাকে এবার নেবেনা। কিন্তু পরেরবার সার্কুলার হলে যেন আমি আবেদন করি এটা তারা জানিয়েছেন। পরেরবার আমাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নেওয়া হবে। সেই পরেরবার এইদেশে কয়েক বছর কেটে গেলেও আজো আসেনি! আরেফিন স্যার চলে গেলেন, একদিন সাদেকুল স্যারও যাবেন। আমার হক্ব আর ফেরত দেবেন না। 

অথচ, এতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বোর্ডে—যাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে বিপুল পরিমাণ কম যোগ্য বা একেবারেই যোগ্য নয় এমন লোকদেরও নিয়োগ দেওয়ার ইতিহাস আছে (সাদেকুল আরেফিন নিজের মেয়েকেও নিয়োগ দিয়েছেন বিতর্কিত পদ্ধতিতে) তারা আমার এতো গবেষণা, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও তাৎক্ষণিক পরীক্ষায় মেধা যাচাইয়ের পরেও অন্তত অস্থায়ী বা খণ্ডকালীন নিয়োগও দিতে পারলেন না৷ কারণ, আমার আসলে সত্যিকার অর্থে কোনো লবিং নাই, তদবিরবিহীন আমি। 


কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি এইটুকু ঘোষণা দিতে পারি যে, এ পর্যন্ত আমার সামনে থেকে আমাকে বঞ্চিত করে যাদের তদবিরে নিয়োগ হয়েছে তাদের চেয়ে আলহামদুলিল্লাহ যোগ্যতা, সৃজনশীলতা ও দক্ষতায় এগিয়ে থেকে শিক্ষক হিসেবে এ জাতিকে, এ দুনিয়াকে অধিক দেওয়ার সক্ষমতা আমার ছিল। 

বলয়ের বাইরে আমাকে চাকরি দিলে তাদের হয়তো কোনো প্রাপ্তি নাই—এই ছিল তাদের জাহেলি অঙ্ক! অথচ একটি ইনসাফপূর্ণ নিয়োগ আজীবন সদকায়ে জারিয়াহ হিসেবে তাদের কল্যাণ করতো। এবং পরকালেও হক্ব নষ্টের অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতেন। 


আমি পরীক্ষা দেওয়ার আগে আমার কোনো শুভাকাঙ্ক্ষীকে জানালে শুধু এইটুকু বলতাম যে, নিয়োগটা যেন ফেয়ার হয় এই প্রার্থনা কইরেন বা অন্তত আপনার সুযোগ থাকলে ফেয়ার রিক্রুটমেন্টটা নিশ্চিত কইরেন। 

অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে প্রতিটি ভিসিই কম বেশি আরেফিন সিদ্দিক। নির্মোহ দৃষ্টিকোণে, কেউ একটু কম আরেফিন আর কেউ একটু বেশি আরেফিন—এই আর কী!

৫।

ড. আরেফিনরা আগে থেকে চলে আসা বাংলাদেশের ঘূণে ধরা শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থাকে চূড়ান্ত তদবিরনির্ভর করে গেছেন। অবশ্য বাংলাদেশ ২.০ এর প্রথম নিয়োগ যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলো তাতেও আরেফিন সিদ্দিকিদের পথেই আগাচ্ছে একাডেমিয়া—আওয়ামীপন্থীদের চেয়ে কোনো অংশে কম যাচ্ছেন না জামাতপন্থী বা বিএনপিপন্থীরা। 

এ ক্ষেত্রে দুটি কথা বলি। আওয়ামী লীগ, বাম, বিএনপি এক্সক্লুড করলাম কারণ তাদের রাজনীতি দুনিয়াকেন্দ্রীক। তাদের তদবিরও হক্ব নষ্ট এবং আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরও পাকড়াও করবেন। 

উদাহরণস্বরূপ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক জালেম উপাচার্য ফায়েক। ফায়েক খুলনার গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পরীক্ষায় তাৎক্ষণিক যে ফলাফল দেওয়া হয় তাতে আমি ফার্স্ট হওয়ার পরেও (এবং আমার অভিজ্ঞতা ও গবেষণা উপস্থিত সবার থেকে অধিক হলেও, ভাইভায় উত্তম করলেও) আমাকে নেয়নি কারণ বড় আওয়ামী লীগ নেতাদের বা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার আওয়ামী লীগের জালেমদের সুপারিশ বা তদবির ছিলোনা। রাজনৈতিক বা ভিসি ও এক্সটার্নালদের তদবিরের বাইরে এসে মঈনুল রাকীব নামের এই অচেনা ছেলে শিক্ষক হবে, তা হতে পারেনা।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক কিছুর হয়তো শিক্ষক এই জালেম ফায়েকুজ্জামান অথচ ইসলামে হক্বের গুরুত্ব সে অনুধাবন করতে পারলোনা। নির্লজ্জের মত বোর্ডে বসেই ফায়েক টুঙ্গিপাড়ার নিম্নমানের নেতাদের ফোন করে (এ ঘটনা পরে উপজেলা পরিষদে চাকরি করা একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে জানা এবং আমাদের  একাধিক শিক্ষকও জানেন)। তার মধ্যে একজন হাসিনার মামা শেখ আহম্মেদ হোসেন মির্জা। মির্জা জানায়, ও ছেলে মেধাবী হলেও ওর চাচা জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে যুক্ত ইত্যাদি (অথচ আমার চাচাদের  মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জামাত, ইসলামী আন্দোলন ইত্যাদি দল করা লোক আছে। তারা বিএনপি-জামাত পিক করেছে হক্ব নষ্টের উদ্দেশ্যে। টুঙ্গিপাড়ায় বিশ্বাস বংশের সম্মতি ও সমর্থন ছাড়া রাজনীতিতে গণসম্পৃক্ত হওয়া অসম্ভব ছিল!)! 

আমার কাছে জানতে চায়, গোপালগঞ্জ জেলার আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারির নাম। আমি বললাম, আমি জানিনা! খুবি ভিসি ফায়েক বললেন, আমি শেখ হাসিনা আপাকে জানাবো এটা! এই জুলুমের সাক্ষি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মফিজ স্যার (রাবির অধ্যাপক প্রদীপ৷ আরেক জালেম)। মফিজ স্যার ভদ্রলোক৷ নিঃসন্দেহে কষ্ট পেয়েছিলেন এই জুলুম দেখে। 

আমি আল্লাহর কাছে হক্ব নষ্টের বিচার দিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দুনিয়ায় আমার কাছে ক্ষমা না চাইলে জালেম ফায়েকের এই হক্ব নষ্টের জুলুমের কথা হাশরের মাঠে বলবো। একবার ভাবেন, তিন জনের সার্কুলারে ৫ জন নিয়োগ দিলো অথচ ফার্স্ট হওয়া ছেলেটাকেই নিলোনা! এই জুলুমের বিচার আল্লাহ করবেন না ভেবেছেন? আল্লাহর দরবারে কোনো তদবির বা তাঁবেদারি চলবেনা। ইন শা আল্লাহ বিচার হবে—ইহকালে এবং পরকালে। 


বিপরীতক্রমে, কেউ যদি ইসলামী রাজনীতি করে ভাবে তার দলের কর্মী, সমর্থক, সদস্য, সাথী বা তার দলের সমর্থক পরিবারের কাউকে নিয়োগ দেওয়া উত্তম কাজ সেও জালেম। ঐ বোর্ডে ইসলামী দলের সুপারিশে বা এক্সটার্নালদের পক্ষপাতে বা ভিসি-প্রোভিসি প্রশাসনের ইচ্ছায় তুলনামূলক অধিক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে 'নিজেদের লোক' ভেবে নিয়োগ দিলে সেটি ইসলামের দৃষ্টিকোণেই মহাজুলুম। এটাও হক্ব নষ্ট করা। ন্যূনতম আবেদনের যোগ্যতা আছে বলেই বা কোনো দলের কর্মী-সমর্থক-সাথী ইত্যাদি হলেই একজন যোগ্য হয়ে ওঠেনা—ইসলামে হক্ব ও ইনসাফ ধারণা বাস্তবায়ন না করতে পারলে মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাস আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দেয়। যার কেউ নাই তার জন্য আছেন আল্লাহ—ভুলে যাবেন না৷ 


৬।

ড. সিদ্দিক মানুষ, ফেরেশতা নন। মানুষের ভুল হয়, তওবা করলে ক্ষমাও হয়। কিন্তু শির্কের পরে আরেকটি গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করবেন না৷ সেটি কী? সেটি হচ্ছে হক্ব নষ্টের গুনাহ। 

প্রথমে বলা যে গোষ্ঠী আরেফিন সিদ্দিকির বা তার মত একই ধরনের লোকের সিদ্ধান্ত বা তদবিরের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে তারা যদি নির্ধারিত বোর্ডে সেরা হয় তবে তো ভালো। 


কিন্তু যদি ঐ নিয়োগ বোর্ডে নিয়োগপ্রাপ্তদের চেয়ে তিল পরিমাণ অধিক যোগ্য কোনো প্রার্থীকে বঞ্চিত করা হয় তবে এটিই হক্ব নষ্ট করা, বেইনসাফ করা। আল্লাহ এই গুনাহ ক্ষমা করবেন না যদিনা হক্ব নষ্ট হওয়া ঐ ব্যক্তি ক্ষমা না করেন। 

আবার, আর্থিক লেনদেন বা তদবিরের মাধ্যমে যারা অন্যের হক্ব নষ্ট করে একটি চাকরিতে আসলেন তারা হারামপন্থায় চাকরি বাগিয়ে নিয়ে অপরের হক্ব নষ্ট করেছেন৷ একে তো হারাম টাকা শরীরে গেলে ইবাদত কবুল হবেনা, তার ওপর অন্যের হক্ব নষ্ট করা। 


চাকরিদাতার মত চাকরি করা ব্যক্তিও হক্ব নষ্টের জন্য দায়ী। তবে, ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি যার ফোনে, তদবিরে, অনুরোধের প্রেক্ষাপটে হক্ব নষ্ট করা হয় সে অধিক হক্ব নষ্টকারী জালেম। যারা তদবিরের সুবিধাভোগী তাদের ইনসাফ ও হক্বের এই মৌলিক নীতি সম্পর্কে উদাসীনতাই অযোগ্যতার দুষ্টচক্র সক্রিয় রাখে। এক জালেম আরো জালেম পয়দা দেয়, এক হক্ব নষ্টকারী আরো হক্ব নষ্টকারী জন্ম দেয়। 

৭।

বাংলাদেশের বুকে আর কোনোদিন আরেফিন সিদ্দিক হাঁটবেন না৷ হক্ব নষ্ট ছাড়া উনার বাকিসব গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিন এই দোয়া করি। 


উনার জীবনের ভুল-ত্রুটি এবং ইতিবাচক অংশ থেকে যারা এই মুহূর্তে দায়িত্বশীল জায়গায় আছেন এবং যারা ভবিষ্যতে যাবেন তারা সবাই শিক্ষাগ্রহণ করবেন—এটাই জুমআর দিনের চাওয়া। 

কোনোভাবেই আমাদের কারো দ্বারা যেন অন্যের হক্ব নষ্ট না হয় সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। যারা দায়িত্বশীল জায়গায় আছেন, বিশেষ করে পাবলিক ফান্ডিংয়ে চলা প্রতিষ্ঠানের, তারা ভুলে যাবেন না আপনার বেতন ও ভাতার কর সব বিশ্বাসের, সর্ব আদর্শের মানুষ দেয়। 


দায়িত্বপ্রাপ্তের কাজ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর অধিকারের জিম্মাদারি করা। আপনার কাছে মানুষের সুযোগ ও অধিকারের আমানত রক্ষিত৷ তদবির, অর্থ, স্বজনপ্রীতি, পোষ্যপ্রীতি, রাজনৈতিক আদর্শপ্রীতি, আঞ্চলিকতা প্রীতি বা বিশেষ অঞ্চলকে ঘৃণা ইত্যাদি করে আপনি অর্পিত দায়িত্বকে অবহেলা করে যোগ্যতর কারো হক্ব নষ্ট করলে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করবেন৷ 

কারো উপকার করতে গিয়ে অন্য কারো আমানতের খিয়ানত যেন না হয় সেদিকে নজর রাখাই একজন আদর্শ মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক আমাদের সেই হক্ব ও ইনসাফের আলাপ জারি রাখার আরো একটি মুহূর্ত উপহার দিলেন। 

শিক্ষক হিসেবে আরেফিন সিদ্দিক মৃত্যুর পরেও হক্ব পূরণের গুরুত্ব এবং ইনসাফের আবশ্যকতার শিক্ষা দিচ্ছেন—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। তাই না?

পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments