সর্বশেষ

বঙ্গ ভিটা ফেসবুক পাতা নিয়ে কিছু কথা

'বঙ্গ ভিটা' নামক একটি ফেসবুক পাতার লেখা আমি মাঝেমধ্যে পড়ি। 

১৯৪৭ এর আগে ও পরে ভারত বা দেশবিভাগের নামে হিন্দুত্ববাদী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যে মূলত বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজন করা হয় তার মধ্যে বৃহত্তর বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে গিয়েছেন তাদের কেউ কেউ বা কারো পরের প্রজন্ম বাংলাদেশের প্রতি মায়া ও মহব্বত প্রকাশ করেন৷ 

এর মধ্যে বড় একটি অংশ এমন প্রজন্ম যাদের পূর্বপুরুষ পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশে তাদের দারুণ সব স্মৃতি তাদের কাছে ব্যক্ত করেছেন। 

নতুন প্রজন্ম তাদের দাদা, নানা, দাদী, নানী, বাবা ও মা বা চাচা-খালাদের কাছে শোনা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির কথা শুনে সেই সব মানুষ, স্থান ও ভিটামাটির খবর নেন। 

অধিকাংশ স্মৃতিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী স্মৃতিকাতর সেই লোকেদের তাদের বাংলাদেশের মুসলিম বন্ধু ও পড়শীদের ইতিবাচকরূপে স্মরণ করতে দেখি। 

বন্ধু, বান্ধব, শিক্ষক, সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের নানা পরিচয় ও স্মৃতির কথা লেখেন৷ 

সামষ্টিক স্মৃতি কত শক্তিধর তা এই লেখাগুলো পড়লে বোঝা যাবে। 

এই সামষ্টিক স্মৃতি বা Collective Memory এর ভাবনার কারণে আমার মাথায় অন্য চিন্তা এলো। 

দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা৷ ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা ও বিহার প্রভৃতি স্থান থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা পরবর্তীকালের পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশেও অনেক ভারতীয় ভিটা-মাটি ছেড়ে এক কাপড়ে চলে আসেন।

বিশেষ করে বিহারীদের সাথে বাঙ্গালীদের অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক এবং ১৯৭১ এ বিহারীদের বিতর্কিত অবস্থানের পরেও এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নাই যে, বিহারে হিন্দুত্ববাদীদের গণ-হ/ত্যা থেকে মুক্তি পেতে এক কাপড়ে নিজের হাজার বছরের পৈতৃক ভিটামাটি ছেড়ে লাখ লাখ বিহারী বাংলাদেশে চলে আসেন। 

সেই সব বিহারী জনগোষ্ঠীর নিজের ফেলে আসা ভিটামাটির ব্যাপারে আহাজারি ও স্মৃতিকাতরতা কি আছে না? 

থাকার কথা নয়?

নাকি ১৯৭১ এর অনাকাঙ্ক্ষিত ট্রমা তাদের কালেক্টিভ মেমরিকে ১৯৪৭ এর যে বিভীষিকায় তারা নতুন দেশ পেয়েছিল সেই মেমরি ভুলিয়ে দিয়ে তাদের নতুন আবাসস্থলে পরদেশী হয়ে যাওয়াকে প্রাধান্য দিয়েছিল?

১৯৪৭ নিয়ে ঋত্বিক ঘটকেরা চলচ্চিত্র বানিয়েছেন। 

বদর উদ্দিন, হাশিম, রাজ্জাক, আনিস, মতি গং প্রমুখ ঐ বাংলা এই বাংলা নানা আবেগ দিয়ে আমাদের বোঝান দেশ বিভাগ পূর্ববঙ্গ ছেড়ে মানুষের মনে দাগ কেটে দিয়েছে। 

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে প্রথম শ্রেণির নাগরিক থেকে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে যাওয়া মুসলিম, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও বিহার ইত্যাদি স্থান থেকে বাংলাদেশে আসা ভারতীয়দের সামষ্টিক স্মৃতি নিয়ে কোনো গল্প, উপন্যাস, নাটক বা চলচ্চিত্র কেউ বানায় না কেন?

একটা কারণ, এখান থেকে আসা ধূর্ত শ্রেণিটি সমাজের সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে নিজের ভিটেমাটি ভুলেছেন। 

আর অধূর্ত শ্রেণি মজলুম হয়ে ব্যথায় সব ভুলে থাকেন।

একে যোগাযোগের ভাষায় সিলেক্টিভ রিটেনশন বলা হয়। 

আরেকটি কারণ ভারত থেকে আসা মুহাজিরদের বড় অংশ পাকিস্তান ভাঙতে চায়নি এবং এ কারণে ১৯৭১ এর প্যারাডাইমে তারা নিজ দেশেই পরদেশী হয়ে পড়েছেন এবং জাতীয় ইতিহাস বিনির্মাণ প্রকল্প থেকে তারা ছিটকে পড়েছেন৷ 

তারা নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হওয়ায় এই দেশে সার্ভাইভ করাই তাদের জন্য দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। 

এমন অবস্থায় তাদের ভারতে রেখে আসা ভিটা মাটির খবর নেওয়া বা স্মৃতিচারণ করার বিলাসীতা করার সুযোগ আসেনি৷ 

'বঙ্গ ভিটা'য় যারা লেখেন তাদের 'বাঙ্গাল অথবা ঘটিবাটি' ইত্যাদি খেতাব দিয়ে হলেও ভারত নিজের করে নিয়েছে।

কিন্তু ভারত থেকে যারা ভিটেমাটি ছেড়ে এসেছেন তাদের একটা বড় অংশ এই সেদিন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। 

অনেকেই লজ্জায় ও আতঙ্কে নিজের পরিচয় গোপন করে পরের প্রজন্মকে বাঙ্গালী পরিচয়ে পরিচিত করেছেন। 

তাদের কালেক্টিভ মেমরি বিক্ষিপ্ত। 

তাদের ভিটামাটি ভারতে ভোগ দখল করছে যারা তারাও কোনোকালে তাদের খবর আসুক সেটি চায়না। 

আর নতুন যে দেশের নাগরিক তারা সেই দেশের জাতিগত বিভাজনের কারণে একটা দীর্ঘসময় তাদের কালেক্টিভ মেমরি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আত্মপরিচয়কে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে!

কী বেদনাদায়ক স্মৃতিখেলার এই 'ইতিহাসবিভ্রম'!
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments