সর্বশেষ

মিডিয়া ট্রায়াল

কাল্পনিক মিডিয়া ট্রায়াল।ছবি/ইন্টারনেট।
শব্দদ্বয় বাংলাদেশে অতোটা পরিচিত না হলেও প্রতিদিন অসংখ্যবার পৃথিবীতে এটি ঘটছে।কে ঘটাচ্ছে জানেন?'মিডিয়া'।
ইংরেজিতে এর নাম Media Trial বা Trial By Media এবং বাংলায় এর অর্থ করা যায় 'গণমাধ্যমীয় বিচার'।আরো নির্দিষ্ট করে বললে একে 'সংবাদমাধ্যমীয় বিচার' বলা যেতে পারে।এই বিচার প্রকৃত অর্থে আদালতের বিচার ব্যবস্থার মত কিছু নয়।যখন সংবাদ মাধ্যম কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ক্রমাগত সংবাদ প্রচার করে জনগণের কাছে তাকে দোষী বা গুনী প্রমাণ করতে চায় তখন একে 'গণমাধ্যমীয় বিচার' বা মিডিয়া ট্রায়াল বলে।অনেক সময় আদালতে চলমান বিষয়ে বা মামলার রায়ের পরে অথবা আগে পত্রিকা,টেলিভিশন বা অনলাইন মিডিয়ায় অভিযুক্তকে 'নির্দোষ' অথবা 'দোষী' প্রমাণের চেষ্টায় সংবাদ প্রচার করতে দেখা যায়।বড় ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালের সাথে Agenda Setting জড়িত থাকতে পারে।পশ্চিমা মিডিয়া ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং ২০১১ তে লিবিয়ার গাদ্দাফি,সিরিয়ার আসাদকে এই ট্রায়ালেই কুপোকাত করে।এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতা পরিপন্থী চর্চা।বর্তমানে নারায়নগঞ্জের শিক্ষকের ঘটনায় সেলিম ওসমান ও তার পরিবারকে জড়িত করে বড়সড় একটি মিডিয়া ট্রায়াল করা হচ্ছে।মিডিয়া ট্রায়াল সব সময় উদ্দেশপ্রণোদিত হয়।এই ট্রায়াল পরবর্তীতে আমাদের মনোজগতকে মিডিয়ার উপনিবেশ করে তোলে।আমাদের নিজস্ব চিন্তাকাঠামোকে পলিটিসাইজড করে প্রভাবশালী গণমাধ্যম তাদের এজেন্ডা অনুয়ায়ী ভাবতে বাধ্য করে।মিডিয়া ট্রায়াল তথ্য সন্ত্রাসবাদের (Information Based Terrorism)একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে।
২।
মিডিয়া ট্রায়াল এর নয়া একটি রূপ Social Media Trial।অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যে ট্রায়াল করা হয়।যেমন ধরুন একটি সংবাদ প্রচার হলো।সেখানে একজন ক জড়িত রয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত হয়েছেন। তো এটি কিন্তু প্রমাণিত না। ভিকটিমের বক্তব্য থাকতে পারে। কিংবা চূড়ান্ত আদালতে অন্য কিছু প্রমাণ হতে পারে।কিন্তু সেসব না ভেবে আমরা সোস্যাল মিডিয়ায় কাউকে দোষী বা নির্দোষী ধরে স্ট্যাটাস দিই। তারপর এটা যদি ভাইরাল হয়ে যায় তখন এই ট্রায়ালে একজনের মানহানী হয়ে যায়। তা অপূরনীয় ক্ষতি। সোস্যাল মিডিয়া ট্রায়াল অধিকাংশ সময় মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার অনুগামী হয়।অর্থাৎ যেকোন একটি বা একাধিক মাদারমিডিয়া প্রাথমিক রসদ সরবরাহ করে। নারায়নগঞ্জ জেলায় যখন মেয়র নির্বাচন হয় তখন সেলিনা হোসেন আইভির পক্ষে প্রথম আলোসহ কিছু মিডিয়া অবস্থান নেয়। এরা মিডিয়া ট্রায়াল করে শামীম ওসমানকে নেগেটিভ করে কাভারেজ দিতে থাকে। নারায়নগঞ্জে সাত খুন মামলায়ও শামীম ওসমানকে ফাঁসাতে মিডিয়া ট্রায়াল করে কিছু পত্রিকা ও টেলিভিশন। মিডিয়া ট্রায়ালের উদ্দেশ্য কারো চরিত্র ডিকনস্ট্র্যাক্ট বা বিনির্মান করা।
টেলিভিশন ও পত্রিকার পিছনের মানুষগুলো তাদের মতকে আমাদের সামনে সংবাদ হিসেবে পরিবেশন করে।ছবি/ইন্টারনেট।

৩।

মিডিয়া ট্রায়াল কখনো মনে হতে পারে ইতিবাচক।তবে এর পরিমাণ কম। সাধারণত ব্যক্তিগত বা আদর্শিক দ্বন্বকে প্রভাবিত করছে এমন ঘটনায় টেলিভিশন, পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যম নিজেদের পক্ষে মিডিয়া ট্রায়াল করে।মিডিয়া ট্রায়াল মুক্ত হওয়ার উপায় সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ। শিরোনাম লেখায় নিরপেক্ষতা অবলম্বন করলে মিডিয়া ট্রায়ালের সম্ভাবনা কমে যায়। আবার সংবাদ করার সময় আক্রান্ত ও আক্রমণকারী উভয়ের বক্তব্য তুলে ধরতে হবে সর্বাধিক নিরপেক্ষতা ও ভারসাম্যতা রক্ষার নিমিত্তে।যতটা সম্ভব প্রতিবেদক, সহ-সম্পাদক ও সম্পাদকের একটি সংবাদ করার সময় একাধিক ক্রশ চেক করতে হবে,ব্যক্তিগত মতাদর্শকে ভুলে যেতে হবে, পেশাদারিত্ত্বকে গুরুত্ত্ব দিতে হবে । আশা করি তাহলে মিডিয়া ট্রায়াল থেকে মিডিয়া ও জনগণ বাঁচবে। আর সোস্যাল মিডিয়া ট্রায়ালের কবল থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় নৈতিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পরমত সহিষ্ণুতা। কেউ আপনার মতের না, দলের না, ধর্মের না বলেই তার বিরুদ্ধে যেতে হবে এই মানসিকতা পরিহার করলেই আমাদের বিবেক সঠিক রায় দিবে। সেই রায়ে কারো সম্পর্কে বা পুরো ঘটনা সম্পর্কে না জেনে কোন মন্তব্য করাতে নিষেধাজ্ঞা জারি হবে। এটা ধ্রুব সত্য যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত বিবেক। সেই বিবেক জাগ্রত হলে মিডিয়া ট্রায়ালের আগ্রাসন থেকে আমাদের সমাজ মুক্তি পাবে। আমরা সবাই ফেয়ার ট্রায়াল দেখতে পাবো।কেউ আর অকারণে আসামী বা পাপ করেও নিষ্পাপ হবেনা।  
পাঠ অনুভূতি