নব্য সাম্রাজ্যবাদ(Neo Imperialism), পুঁজিবাদ (Capitalism), নারীবাদ (Feminism) ও বর্ণবাদ (Racism) এই চারটি তত্ত্ব ও তার ধারক ও বাহক একে অপরের সঙ্গে ওত্প্রোতভাবে জড়িত।একই সাথে এরা হাঁটছে,যুগপত্ একে অপরের প্রয়োজন মেটাচ্ছে অথবা এরা একে অপরের সৃষ্টি।
১।
রাতে চ্যানেলের পর চ্যানেল ঘুরিয়ে কোন নাটক পাচ্ছিনা যখন তখন এসম্পর্কের চিন্তাটা আসছে।একটা দুইটা চ্যানেলে সংবাদ পেয়েছি।উপায়ান্তর না দেখে বিজ্ঞাপন দেখছি।'বন্ধুরা থাকলে জিতবে সবাই'ভাল লাগছে বেশ,যদিও অতিরঞ্জন আছে।'তোমার জামা থেকে এমন সুগন্ধ?'এই বিজ্ঞাপনটা অসৌজন্যতার প্রকাশ।বারবার 'রং ফর্সা করা ফেয়ার এন্ড লাভলী আর লাক্স'এর বিজ্ঞাপন দেয়া যে চরম বর্ণবাদী আচরণের প্রকাশ এটা কি নারীবাদী দৃষ্টিতে ধরা পড়েনা?তারা যে 'ফর্সাকে' অযৌক্তিক সুপিরিওরিটি হিসেবে দেখাচ্ছে এটা ভাবা উচিত এখন।কর্পোরেট সিস্টেম আপনার মেধা ও শ্রমের চেয়ে গায়ের রংকে প্রায়োরিটি দিচ্ছে যা কারো অর্জিত কিছু না।এ নিয়ে সাম্যবাদী থেকে মানববাদী কারো টুঁ শব্দটি নেই।পারফিউম ও বডিস্প্রে এর বিজ্ঞাপনে নারীকে যে জৈবিক উন্মাদ দেখানো হচ্ছে তাতে নারীর অমর্যাদা হচ্ছেনা?নারীবাদ চুপ কেন?
২।
আসল ব্যাপার পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের চমত্কার সংমিশ্রণটা আমরা ধরতে পারছিনা।এই 'আমরার' মধ্যে বিরাট বিরাট জ্ঞানী,পন্ডিত,দিকবিদিক সাংবাদিক,বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপকও রয়েছেন।গ্লোবালাইজেশান (Globalization) নামের চটকদার তত্ত্ব যে আসলে পশ্চিমা পণ্য (Products),তত্ত্ব (Theories) ও সংষ্কৃতির (Cultures) অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া এটি এখনো বোধগম্য না অনেকের।ফলে গ্রামসীর হিজিমনি(Hegemony) বয়ান মুখস্ত করার পরও স্ববিরোধী হয়ে সাংষ্কৃতিক আগ্রাসন (Cultural Aggression) অস্বীকার করতে পারেন অনেকে।আবার চমস্কির প্রোপাগান্ডা (Propaganda) মডেল পড়েও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে বিশ্বাস করে যাচ্ছে অনেকে,অনেকটা অন্ধের মত।
৩।
এই ধরুন কথিত নারীবাদ।এটি যে সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের ফসল এবং এখনো যা ফল দিয়ে যাচ্ছে তা মৌলবাদী নারীবাদীরা স্বীকার করবেন না অথবা এ পর্যন্ত চিন্তা করার সক্ষমতা তাদের নেই।'কর্পোরেট ফেমিনিজম'(Corporate Feminism)-আমি বলি।নারীবাদ দাবি করে যে সে নারী নিয়ে কথা বলে।নারীর বঞ্চনা ও অসুবিধা দেখে।তবে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির চেয়ে কথিত যৌনস্বাধীনতা দেয়াই যেন এর অভিলক্ষ।এই জায়গায় এসে নারীবাদ পুঁজিবাদের গর্ভে বিলীন হয়।নারীর স্বাধীনতা বলতে জগত সংসারকে ভুলিয়ে 'মুখের একটি পিম্পলকে'বড় করে দেখায়।ক্যাপিটালিস্টিক নারীবাদ নারীর রূপের পূজারি।নারীর চোখ,নাক,কান,দেহ ও চুলের সৌন্দর্যকে নারীর গুণ হিসেবে দেখায়।তার কর্মক্ষমতা ও মেধার চেয়ে তার শরীরের সৌন্দর্যকে গুরুত্ত্ব দেয়া হয়।কারণ কসমেটিক্স শিল্পে পশ্চিমারা মূল ব্যবসায়ী।তাই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছড়ানো হয় বর্ণবাদ।কৃষ্ণবর্ণ নারীদের প্রান্তীকরণের মাধ্যমে কর্পোরেট ফেমিনিজম তার পরিণতি অর্জন করে।আর ধীরে ধীরে এ প্রক্রিয়ায় নারীকে পণ্য করা হয়।পুরুষের যাবতীয় পণ্য থেকে শিক্ষার বিজ্ঞাপনে পুঁজিবাদ নারীকে পুঁজি করে।নারী এটা বোঝেনা অথবা তাকে বুঝতে দেয়া হয়না।
৪।
তাহলে ফেমিনিজম কিভাবে সাম্রাজ্যবাদের সহায়ক?এই প্রশ্নের উত্তর জানতে ফেমিনিজমের উত্পত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস ঘাটতে হবে।দেখা যাবে নারীবাদের ইতিহাসের 'দ্বিতীয় ঢেউ'(Second Wave)টা আসে শিল্পবিপ্লবের পর।শিল্পবিপ্লব আসলে কোন বিপ্লব নয়,এটি বিশ্বে ক্যাপিটালিজমের উদ্ভবকাল।ঠিক এই সময়টায় পুঁজিবাদীর দল নিজেদের পুঁজির স্বার্থে নারীকে পণ্য করা শুরু করে।নারী ও পুরুষের সহযোগিতামূলক সম্পর্কটি হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার।এরপর নব্য সাম্রাজ্যবাদীরা পুঁজিবাদকে নিয়ন্ত্রণ করে।পুঁজিবাদীরাও ব্যবসায়িক স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদকে সহায়তা করে।এই সহায়তা বুদ্ধিবৃত্তিক,অর্থনৈতিক, মিডিয়াজাত ও সামরিক।এভাবে পুঁজিবাদ,সাম্রাজ্যবাদ,বর্ণবাদ ও নারীবাদ পরস্পরের হাত ধরে চলছে।আমরা চোখ থাকতেও অন্ধ হয়ে তা দেখে যাচ্ছি।
৫।
সাম্রাজ্যবাদী কোন শক্তি যখন অন্য দেশ বা জাতির উপর আক্রমণ ও আগ্রাসন চালায় তখন নারীবাদ ও নারীবাদী কি করে?উত্তর সোজা।মুখে কুলুপ আঁটে।এই ধরুন,যখন সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদীরা আফগানিস্তানে আক্রমণ করে তখন কত মানুষ মরেছে?লাখ লাখ।তাদের মধ্যে কি পুরুষ ছিল শুধু?না,নারীও ছিল।
এই যে ২০০১ ও ২০০৩ এ যখন আমেরিকা ও তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা যথাক্রমে আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন চালালো তখন কত মানুষ মারা যায় বা এখনো যাচ্ছে?কমপক্ষে এক কোটি?এরমধ্যে কি সব পুরুষ?না,মিনিমাম ৩০ লাখ নারী।স্পষ্ট দেখা যায় এই নারীদের খুন হওয়ার ব্যাপারে পশ্চিমা নারীবাদ নিরব।কারণ কি?
যখন আমেরিকা ড্রোন হামলা করে তখন সেই হামলায় নারী মরেনা?মরে।তবে কেন নারীবাদ আগ্রাসনের ব্যাপারে কোন কথা বলেনা?কেন যে নারীবাদ সমকামী বিয়ের জন্য শোভাযাত্রা করতে পারে সেই নারীবাদ বিশ্বে যুদ্ধের বিরুদ্ধে শোভাযাত্রা করেনা?
কারণ আসলে সর্ষের মধ্যে ভূত অথবা ভূতের মধ্যেই সর্ষে।
***********************************************************************
নারীবাদ এক ধরনের বর্ণবাদ।কারণ এটি পুরুষ ও তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার নিয়ে আলোচনা করেনা।একদম সত্য কথা হচ্ছে লিঙ্গভিত্তিক আন্দোলন অযৌক্তিক এবং এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সুযোগ তৈরি হয়।যদি অর্থনৈতিক বঞ্চনা মানদন্ড হয় তবে 'বঞ্চিত,দরিদ্র,নিপীড়িত ও নির্যাতিত'প্রভৃতি শ্রেণীতে মানব বিভক্তি করা যেত পারে।এ সমাজে শুধু নারীই বঞ্চিত নয়,অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে রিকশা চালাচ্ছে বা হোটেলে কাজ করছে এমন ছেলে নেই?পরিবারে টাকা দিতে যৌতুক নিয়ে বিয়ে করছে এমন ছেলে নেই?আছে।সেটা নারীবাদ আলোচনা করেনা।সেটি শিশুবাদ আলোচনা করে,তবে তা অপ্রতুল।যদি নারীবাদ নামের বর্ণবাদ এভাবে গ্রহনযোগ্যতা পায় তবে তা আসলে সামাজিক সংহতি নষ্ট করবে এবং অদূরভবিষ্যতে পুরুষবাদ নামের আরেকটি বর্ণবাদের উদ্ভব ঘটাবে।সেটি আমরা কামনা করিনা।আমরা চাই মানুষের বিজয়,পুরুষ বা নারীর নয়।
পুরুষ বা নারী বা পুঁজিবাদী বা সাম্রাজ্যবাদীর না,এ পৃথিবী হোক শুধুই মানুষের।

