ডানকার্ক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি চলচ্চিত্র ও বাস্তবতা
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ক্রিস্টোফার নোলানের Dunkirk দেখলে আপনি যুদ্ধে সাধারণ সেনাদের নির্মম ও করুণ পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পাবেন। সিনেমাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকের জার্মান আগ্রাসনের মুখে পড়া ফ্রান্সের ডানকার্ক কমিউনের বন্দর থেকে পলায়নরত ব্রিটিশ সেনাদের ভয়াবহ জীবনযুদ্ধ দেখানো হয়েছে। পরিচালক মনস্তাত্ত্বিক জগত নিয়ে খেলা করা নোলান সংলাপের থেকে শব্দ ও চিত্রায়ণকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আপনার মধ্যে পুরো ৯০ মিনিটের অধিক টেনশন, সংশয়, ভয়ে কাজ করাবে! এটাই নোলানের কাজ! তবে আমার কাছে সিনেমাটোগ্রাফির বাইরে পলিটিক্যাল ন্যারেটিভ নিয়ে ভিন্ন কিছু চোখে পড়েছে যেটি এর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে বানানো চলচ্চিত্রে চোখে পড়েনি। আর সেটি হচ্ছে যুদ্ধের প্রথম দিকে জার্মানির প্রবল আক্রমণে ভীত সন্ত্রস্ত ছিল ব্রিটিশ, ফরাসী, ডাচ সবাই! ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া যুদ্ধের ৩-৫ মাসের মধ্যেই ফ্রান্স দখল করে নেয় হিটলারের বাহিনী! ডানকার্ক বন্দর দিয়ে পালানোই ছিল তখন ব্রিটিশ বাহিনীর করুণ ও অপমানজনক নিয়তি!
২।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে ইতিহাস আমরা পড়ি তা বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদীদের বয়ান। সেখানে আমাদের জানানো হয় যে হিটলার সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে! আসলে জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স একত্রে যুদ্ধ ঘোষণা করে, যখন জার্মানি পোলান্ড অধিগ্রহণ করে। ব্রিটিশ ও ফরাসীরা ভেবেছিল ভার্সাই চুক্তির কারণে জার্মানিতো পঙ্গুই, ওরা আর কী যুদ্ধ করবে! কিন্তু হিটলারের সাম্রাজ্যবাদী বাসনা যে জার্মানিকে ভয়ানক শক্তিশালী করেছে তলে তলে এরা সেটি অনুধাবন করেনি। উইন্সটেন চার্চিলের বাগাড়ম্বর তাই ডানকার্ক-এ ৬৮ হাজার ব্রিটিশ ও এর সহযোগী সেনার অকার্যকর জীবনাবসান হওয়া, যার প্রায় ৪-৫ হাজার ব্রিটিশ, ৬ টি বৃহৎ ডেস্ট্রয়ার, ১৪৫ টি জঙ্গী বিমান এবং প্রায় অর্ধশতাধিক ব্রিটিশ নৌযান ধ্বংসের মাধ্যমে শেষ হয়! নোলান খুব সূক্ষ্মভাবে এই পরিণতিকে চিহ্নিত করেছেন।
এ সিনেমা থেকে এটি আপনি বুঝতে পারবেন যে, হিটলারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে তার প্রতিপক্ষ তৈরি করা। সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে তার শক্তি হ্রাস করানোর কারণেই ইউরোপের বাইরের শক্তির আগমন অনিবার্য হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই হিটলারের অতি উৎসাহী কোনো জেনারেল মার্কিন জাহাজ ডুবিয়ে রুজভেল্টদের যুদ্ধে জড়ানোর উপলক্ষ এনে দেয়। নিজেকে একক সুপার পাওয়ার হিসেবে জাহির করতে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের যে অজুহাত খুঁজতেছিল, পার্ল হার্বার, রাশিয়ার হিটলারের ভয়ে পোড়ামাটি নীতি আর ডানকার্ক- এ ইউরোপীয় মিলিত শক্তির জার্মানির নিকট বশ্যতা শিকার তাকে সহজ করে দেয়।
৩।
এক সময়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ফ্রান্স জার্মান বিমানবাহিনীর বোমার আঘাতে তছনছ হয়ে গেলো। ১৯৪০ এর জুনের শেষ দিকে বাধ্য হয়ে কাপুরুষোচিত যুদ্ধবিরতি বা জার্মানির কাছে ফরাসী ভূখণ্ড তুলে দেয়ার চুক্তি করতে বাধ্য হয়। আর ২৬ মে থেকে জুনের ৪ তারিখের মধ্যে ব্রিটিশরা ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ডোভার পৌঁছে প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করে। এই প্রাণে বাঁচানোকে সিনেমাটিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখানোই নোলানের মুন্সিয়ানা। কীভাবে চার্চিল ও তার বাহিনী ফরাসীদের একা ফেলে 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' নীতি গ্রহণ করেছিল তা দেখা যায় যদিও এক নেভি অফিসারকে 'ফ্রান্সের জন্য থেকে যাওয়ার দৃশ্য ' রেখে নোলান নিজের জাতির বেঈমানীকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছেন। আসলে চার্চিল বুঝেছিল যে, যে হিটলার আজ পোলান্ড, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং ফ্রান্সকে তুড়ি মেরে দখল করেছে, কাল সেই নিশ্চয়ই ব্রিটিশদের মূল ভূখণ্ড দখলে নিতে আক্রমণ করবে, করেছিলোও। এ কারণেই সৈন্যদের ইংলিশ চ্যানেল পার করতে নিয়মিত বাহিনীকে না পাঠিয়ে অনেক বেশি সিভিলিয়ান নৌযান পাঠায় চার্চিল! কী নির্মম ব্রিটিশ এরা! মূল ভূখণ্ডের সেনা না হারাতে জাতীয়তাবাদী আর আবেগকে পুঁজি করে মাছ ধরা ট্রলার, ভ্রমণপিপাসুদের নৌযান, ব্যবসায়ীক নৌযান পাঠিয়ে 'অলৌকিকতার আশায়' উদ্ধার 'অভিযান' চালায় ব্রিটিশ সরকার! এইসব অমানবিক কাজ শৈল্পিক ভাষায় লিখে চার্চিল আবার নোবেল পুরস্কার পায়!
৪।
সিনেমাটি তিনটি ভিন্ন সময়কে নন-লিনিয়ার ধারায় উপস্থাপন করেছেন নোলান। সাধারণ সেনাদের এক সপ্তাহ, সিভিলিয়ান উদ্ধারকারীদের ১ দিন আর ব্রিটিশ রাজকীয় বাহিনীর ১ ঘণ্টা! অনেকটা কুরোসাওয়ার রাশোমনের মত! যার যার পয়েন্ট অব ভিউতে ডানকার্ক ত্যাগ (Dunkirk Evacuation)। এর মধ্যে অস্তিত্ববাদ (Existentialism), জাতীয়তাবাদ (Nationalism) আর মানবিকতা (Human Emotion) চলে আসে! যখন একজন ফরাসী সেনা পালিয়ে ব্রিটিশদের মধ্যে আসে যুদ্ধ হতে বাঁচতে তাকে জার্মান গুপ্তচর বা স্পাই হিসেবে সন্দেহ করে গুলি রক্ষায় তাকেই ব্যবহার করতে পাঠানো হয়! যেন ফরাসীদের রক্ষায় এসে যেভাবে ব্রিটিশরা মরছে তার বদলা একজন ফরাসী সেনাকে জার্মান বন্দুকের নলের সামনে পাঠিয়ে ডুবন্ত নৌযান রক্ষা! সেনাদের বাড়ি ফিরে অপমানিত, লজ্জিত হওয়ার ভয়ও ছিল। সেটিকে চার্চিলের মগজধোলাই দেয়া ছাঁকুনীর মাধ্যমে পত্রিকায় আসা বক্তব্য পাঠ করিয়ে নোলান চাপা দিতে চেষ্টা করেছেন! তারা ফিরে দেখেন ব্রিটিশরা তাদের পলায়নকেও বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে, মিডিয়ার প্রোপাগাণ্ডা এতটা শক্তিশালী তখনো ছিল। ওরা ভেবেছিল জার্মানরা বুঝি ব্রিটেনে আক্রমণ চালাবেনা, কিন্তু মাসখানেক পর লণ্ডনকে তছনছ করতে টানা কয়েক সপ্তাহ বোমা মারলে ব্রিটিশদের বুঝ আসে যে, They are no longer a Superpower! They need Americans, They even need Russians! They need zionists!
৫।
সিনেমাটি দেখে আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন জেগেছে, ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে একটিও আমাদের বাঙালি, ভারতীয় অন্যান্য জাতি বা আফ্রিকানরা ছিলোনা! অথচ এটি ঐতিহাসিক সত্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতই ব্রিটেনের নিজস্ব সেনাদের চেয়ে শতগুণ বেশি সেনা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের বা আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ! অথচ ডানকার্কে একজন ভারতীয় বা আফ্রিকান চরিত্রকে নোলান দেখাননি! এর মাধ্যমে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ব্রিটিশরা জাতি হিসেবে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে আজো উঠতে পারেনি, সে ক্রিস্টোফার নোলান কিংবা বরিস বা টনি যে-ই হোক। যে বাঙালি বা ভারতীয় বিভিন্ন জাতি প্রতিটি ফ্রন্টে সাহসীকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে তারা পুরো চলচ্চিত্রে উপেক্ষিত। একটু ভাবেন, এই পার্শ্ববর্তী বার্মা জাপানের দখলে ছিল। চট্টগ্রামে, কুমিল্লায় আমাদের সৈন্যদের প্রবল প্রতিরোধে ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ সেনা ও চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ জাপানী ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রক্ষা পায়। ডানকার্ক এ নিশ্চয়ই ভারতীয় সেনা ছিল, কৃষ্ণাঙ্গ ছিল। কিন্তু নোলানের শ্বেতাঙ্গ দৃষ্টিতে তা দৃশ্যায়নের প্রয়োজনবোধ হয়নি অথচ পার্শ্ববর্তী শ্বেতাঙ্গ ডাচদের অপ্রাসঙ্গিকভাবে নিয়ে এসেছেন একটি চরিত্রে!
একইভাবে নারী বা সেবিকাদেরও চোখে পড়েনি। পুরো সিনেমায় একজন মাত্র নারী চরিত্র, তাও প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে সৈন্য উদ্ধারে নৌকা নিয়ে আসা! এ ছাড়া কোথাও নারী নেই! এ থেকে নোলানের পুরুষতান্ত্রিকতার প্রতি অঙ্গুলি দেয়া যায়! যুদ্ধে নারীর অনবদ্য অবদান বা ক্ষতগ্রস্ত হওয়াটি তিনি এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন কী না সে প্রশ্ন তোলা যায়!
আবার আক্রমণকারীদের সরাসরি জার্মান বাহিনী হিসেবেও চিহ্নিত করতে চাননি তিনি। বিমানের শটগুলোতে অস্বাভাবিক অস্বচ্ছতা চোখে পড়ে। এ ছাড়া নন-লিনিয়ার স্টোরি টেলিংটা এত দ্রুত পরপর আসছিল যা সংলাপের অভাবে ভীষণ খাপছাড়া মনে হয়েছে! যে কারণে হয়তো অস্কারেও কেবল সাউন্ডের কারণেই পুরস্কৃত হয় Dunkirk! এরিয়েল শট ভালো, কিন্তু যে ডানকার্ক জার্মান হামলায় বিধ্বস্ত তার ভবনগুলো রঙিন ও গোছানো কীভাবে হয় নোলানের কাছে সে প্রশ্ন করাই যায়! আবার যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশ থেকে জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণের যে লিফলেট ফেলেছে তা খুবই ভালো একটি দৃশ্য, কিন্তু তখন পর্যন্ত লিফলেট রঙিন নয়, সাদাকালোই হতো! ছবির শটগুলো প্রাকৃতিক আলোয় নেয়া বলে চোখে অস্বস্তি একদম আসেনা। তবে সমুদ্রের ঢেউয়ের কারণেই হয়তো নোলান এ কারণে সংলাপ রাখেন নি বেশি! তিনি দৃশ্য ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন। বলেছেনও।
নোলানের অন্যান্য সিনেমা দেখে যতটা ভাল লাগছে এইখানে এসে আমার ততটা ভালো লাগেনি নির্মাণের দিক থেকে। কিন্তু ডানকার্কে ব্রিটিশদের অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তুলতে তিনি সততার পরিচয় দিয়েছেন এটি বলতেই হবে। ২০১৭ সালের চলচ্চিত্র হলেও দেখতে পারেন নোলানের প্রথম যুদ্ধকেন্দ্রীক নির্মাণ। আমার কাছে স্পিলবার্গের সেভিং প্রাইভেট রায়ানকে এর চেয়ে বেশি আবেগী ও জীবনবোধসম্পন্ন মনে হয়েছে। তবে এটি সত্য যে, চলচ্চিত্র একেজনের নিকট একেকভাবে অধ্যয়ন হতে পারে! সে কারণেক আপনি ডানকার্ক দেখতে পারেন, দেখে নিজস্ব পাঠ বা বয়ান দাঁড় করাতে পারেন। শুভদর্শন।
0 Comments