বাংলাদেশের একজন বিশ্বমানের কবি রয়েছেন যিনি চরমভাবে প্রাপ্ত সম্মান থেকে বঞ্চিত। তিনি আমাদের জসীম উদদীন। পল্লীকবি নামে পরিচিত। অথচ এই পল্লীই বাংলাদেশের প্রাণ। পশ্চিম থেকে আসা ভোগবাদী ও দায়বদ্ধতাহীন আত্মকেন্দ্রীক কথিত উঁচুতলার নগরায়ণ বাংলাদেশ নয়।
কিন্তু এই পুঁজিবাদী নগরের কথা লিখে বাংলাদেশের মূলধারায় ব্যাপক সমাদৃত অনেকে। অথচ বাংলাদেশের মাটি, ধান, লাঠি, নদী, মহুয়া, শাপলা, নৌকা, মাঝি, রাখাল, আসমানী, লাঙলের কথা লিখে জসীম উদ্দীন জাতীয় চর্চার বাইরে, তাঁর অবমূল্যায়ন চোখে পড়ার মতো।
আচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয় নম্বরের জসীম আছে ? শ্যুট-টাই পরা পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসদের জসীম নিয়ে আলোচনা, সভা ও গবেষণায় একদম আগ্রহী দেখা যায়না। গরীব দুঃখীর জীবনকে যেসব লোক এড়িয়ে গিয়ে ভোগ ও অলস সময়ের রোমান্টিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে লিখছেন, ভাবছেন তাদের আধিক্যে জসীমকে আজ পাওয়া যায়না। জসীম দুঃখ পেয়ে তাই লিখেছেন তার মায়ের কাছে, ‘মাগো জ্বালায়ে রাখিস আলো’।
মাইকেল, বঙ্কিম, সুনীল আর রবীন্দ্র মৌলবাদের আধিক্যে এই মাটির সন্তানকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। জাতীয় কবি হিসেবে নজরুলও চর্চার বাইরে থাকলেও জসীমের চেয়ে বেশি চর্চিত। এভাবে আমরা আমাদের মাটির সন্তানকে অবজ্ঞা করেই যাচ্ছি। অথচ নিজের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সমাজ না টিকলে জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকা হুমকির মুখে পড়বে। কারণ, পশ্চিমা ধাঁচে যারা লিখে তারা আমাদের মানসে পশ্চিমের প্রতি মানসিক দাসত্বের বলয় তৈরি করে। এভাবে আমাদের কাছে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি-সম্পর্ক অচ্ছুৎ করা হয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আমি শান্তিনিকেতনের উপাচার্যকে প্রশ্ন করেছিলাম, এই যে রবীন্দ্রনাথ বা মাইকেল আমাদের রামায়ণ-পুঁথি-চর্যা ধারা থেকে পশ্চিমা ধারায় নিলো এ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী? তিনি বললেন, 'পশ্চিম থেকে নিলে সমস্যা কী?'। আমি বললাম,' সমস্যা হচ্ছে আপনার টা পশ্চিম নিচ্ছেনা। সংস্কৃতির ভারসাম্যপূর্ণ আদান-প্রদান না হলে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন উপস্থিত হয়'। তিনি রেগে গেলেন! আসরের অন্যান্যরা আমাকে বললেন, বসুন বসুন!
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এই পশ্চিমা বয়ানের প্রতিবয়ান হিসেবে আমাদের যাত্রা-পালা-কবিগান ইত্যাদিকে দাঁড় করিয়েছিলেন। আমাদের মাইজভান্ডারি, বাউল, ফকিরদের গান আর কৃষকের গানের সুর এক। মা বোনের গীত আর পালাগানের সুর এক। জসীম উদদীন এসব লিখেছেন সোজন বাদিয়ার ঘাটে, ধানখেতে, রাখালীতে! অথচ আমরা তা ধূলায় জলাঞ্জলি দিচ্ছি! কী নির্মম সাংস্কৃতিক ঔদাসিন্যে আমরা কল্পিত পশ্চিমা শরবত খেয়ে আক্রান্ত স্বজাত্যবিরোধীতায়!
বাংলাদেশে বাংলা ও তাঁর মানুষ নিয়ে লেখা ব্যক্তি অল্পকজন অথচ তাদের নিয়ে উন্মাদনা একদম কম। এটা মেনে নেয়া যায়না। এই বাংলার মাটি ও মানুষ এবং এই বাংলাদেশের সুর ও জীবনকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন জসীম উদদীন। তাঁর নকশী কাঁথার মাঠ থেকে বালুচর কিংবা 'কবর' কিংবা 'হাড় কালার লাইগারেই' এই বাংলাদেশের নিজস্ব সম্পদ। তাঁর উজানতলী, রঙিলা নায়ের মাঝিই আমাদের অতীত।
আজ আমরা সাহিত্যে যাদের অর্চনা করছি তারা আরব অথবা ইউরোপ আমেরিকার প্রতিচ্ছবি। তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ত্ব করেনি, করেনা। তাদের সাহিত্যে চাষা-বেদের জীবন নেই, ও জীবন আমাদের বলে। তারা কোন রূপাইকে আঁকেনি সাহিত্যে, কারণ তারা লাঠিয়াল রূপাইয়ের কেউ ছিলনা। তারা আসমানীদের নিয়ে লেখেনি, কারণ তারা আসমানীদের চেনেনা। ফরিদপুরের সন্তান জসীম চিনতেন, জানতেন। জসীম তাই ডাক দেয় গভীর রাতে, জসীম রূপসী বাংলাদেশের জলজ্যান্ত ছবি। তাঁকে ধীরে ধীরে আবছা করে ফেলছে শিকড়হীন অপপ্রজাতি। তা হতে দেয়া যায়না। বাংলাদেশের সন্তানকে মূল্যায়ন করতে হবে। হবেই। লাল সবুজ পতাকার সম্মান আর জসীম উদদীনের সম্মান এক ও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। সে সূত্র জন্মের, সে সম্পর্ক রক্তের, সে বন্ধন মাটির, সে দায়বোধ শিকড়ের...।
জেগে উঠুক জসীম বাংলাদেশের প্রতি ঘরে, প্রতিটি প্রাণে: হিজল তমাল, নক্সী কাঁথা আর বাঁকা গাঙের জলে।
(২০১৭)
0 Comments