অজেয় আফগানিস্তান, শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক সংঘর্ষ-সংকট নিয়ে ভিন্নভাবনা
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এদেশের পশ্চিমাপন্থী মিডিয়া ও একাডেমিশিয়ানরা জানতোই না যে প্রাচ্যের তালেবানরা মার্কিন আগ্রাসন, পাকিস্তানী আর্মি, আফগান সরকার ও আইএস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এক সঙ্গে চার চারটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে জনগণের সহায়তা ছাড়া যুদ্ধ করে টিকে থাকা যায়না। আমাদের দেশের অর্ধজানা পশ্চিম তথা ইউরোপ-আমেরিকার মানসিল দাস মগজগুলোর কাছে আইএস জঙ্গীও যা, আফগান জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতাকামী তালেবানরাও তা! এ বয়ান কোথা থেকে এসেছে? ঐ যে এদের প্রভু আমেরিকান ও ব্রিটিশ মিডিয়ায় 'তালেবান মিলিট্যান্ট বা ইনসার্জেন্টস' লিখছে, সেটি অভিধান দেখে অনুবাদ করেছে। এখন পড়েছে বিপাকে। " হে আমেরিকা, আমার প্রগতির ঠিকাদার, ক্যামনে পারলে তালেবান জঙ্গীদের হাতে হাত রাখতে!" এই জিজ্ঞাসা এদের মনে। কী আর করা, এখন এরা জঙ্গীকে যোদ্ধা বলে দায় সারছে। তবু কিন্তু তালেবানকে তালেবান বলছেনা।
তালেবান মানে ছাত্র সম্পর্কিত! বাংলাদেশে একসময় মাদরাসার ছাত্রদের তালবে আলেম বা মুন্সি বলা হতো। এখনকার মত ঢালাওভাবে 'হুজুর' না। তো এই তালেবানদের সঙ্গে এক ধরনের অপানজনক চুক্তি করতে বাধ্য হলো আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যাদের প্রায় ২৪০০ সেনা আফগানিস্তানে নিহত হয়েছে। এই চুক্তিকে আমার মনে হয়, তালেবানের কাছে নিজের দম্ভ-ইজ্জত সমর্পণ করে 'ছেড়ে দে মা কেন্দে বাঁচি' দশা! কিন্তু...
২।
আমেরিকা যে ২০০১ সালে মিথ্যা অজুহাতে এই দেশটায় আক্রমণ চালিয়ে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করলো তার জন্য বুশ আর ব্লেয়ারকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি উঠছেনা কেন? তালেবানরা সে সময়ও দাবি করেছিল, ৯/১১ এর সঙ্গে তাদের কারো সম্পৃক্ততা দেখাতে পারলে তারাই এর কঠিন শাস্তি দেবে, কারণ তারা নিরপরাধ কাউকে হত্যা সমর্থন করেনা। তারা একে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কোনো চাল বলেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, কারণ সদ্য ক্ষমতায় বসে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগানোর মত বোকামী তারা করবেনা। কিন্তু আমেরিকার যুদ্ধবাজ ইহুদীবাদী প্রেসিডেন্ট ইসলামের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের ডাক দেয়। আর এর বলির পাঁঠা হয় আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া, উত্তর কোরিয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষ পাকিস্তান। সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে থাকে। লাভবান হয় ইসরায়েল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যে থাকলে ইহুদীবাদী লবিগুলো বেশি সক্রিয় হয়ে ইসরায়েলের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারে।
৩।
আফগানিস্তানের তালেবানদের বিজয় হিসেবে অনেকে দেখলেও আমার এটিকে বিজয় বলতে যুক্তি খুঁজে পেতে হবে। আমি তেমন যুক্তি পাইনা। লাখ লাখ খুন হয়েছে, চুক্তিতে এর তদন্তের ব্যাপারে একটিও শব্দ নাই। বরং আফগান সরকারি বাহিনী, আর তালেবান নিজেদের মধ্যে বন্দি বিনিময় করবে এই কথা আছে। আছে মার্কিম সেনা প্রত্যাহারের কথা। আক্রান্ত সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতিপূরণ নিয়ে উভয়পক্ষই নীরব! কেন?
৪।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির পক্ষ হিসেবে মোটেই সুবিধাজনক ও বিশ্বস্ত নয়। এর আগে ইরানের সঙ্গে করা JCPOA থেকে নির্লজ্জের মতো এই ডোনাল্ড ট্রাম্প সরে দাঁড়িয়েছে। ইরানের জনতাও আজকের আফগানদের মতো বিজয় উল্লাস করেছিলো চুক্তির পর। কিন্তু কিছুদিন পরই আমেরিকা তার সুবিধামতো ইসরায়েলী স্বার্থে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। এমন কী রাশিয়ার সঙ্গে করা অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তি থেকেও সম্প্রতি ট্রাম্প বেরিয়ে গেছেন। গাদ্দাফিকে চুক্তি করে নিরস্ত্র করে কয়েক বছর ন্যাটোকে সঙ্গে নিয়ে খুন করেছিলো এই আমেরিকা-ই। সুতরাং এই চুক্তিতে যারা বিজয়ের সুঘ্রাণ পাচ্ছেন তাদের ভূরাজনীতির জটিল পাঠে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
৫।
এই চুক্তিকে আমার মনে হয়, আগামী নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের অন্যতম তুরুপের তাস। কারণ দেশে সৈন্য ফিরে আসছে এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনাকে ঢুকিয়ে দেয়া যায়। ট্রাম্প আসলে ইরানের জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করে নির্বাচনে বিজয়ী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু লড়াকু ইরানী জাতি পাল্টা হামলা করে ট্রাম্পের সেই চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেয়। এই অবস্থায় যেহেতু উত্তর কোরিয়ার কিমকেও বাগে আনা যায়নি, তাই আফগান তালেবানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনাকে স্বার্থক করা সহজ ছিলো। এ প্রক্রিয়ায় কাতারের তামিমকে অগ্রগামী মধ্যস্ততাকারী বলা যায়। তো, ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ডেমোক্রেটিক বার্নি স্যান্ডার্সকে থামাতে রিপাবলিকান ব্লকে তালেবানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তির চেয়ে বড় আর কিছুই আসলে অবশিষ্ট ছিলোনা। সেটিই ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন। এখানেও ভোটের রাজনীতি বিদ্যমান আছে।
৬।
আমেরিকার আগেই পুতিনের নির্দেশে রাশিয়ান ফেডারেশন ও খোমেনির নির্দেশে ইরানী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতা ও আলোচনা শুরু করে। সেটিও কাতারের দোহাতেই। ইরানের প্রোপাগাণ্ডা মিডিয়া পার্স টুডে বাংলাতে কাজ করা সিরাজুল ইসলাম ভাই একবার ফেসবুকে একটি মন্তব্যের জবাবে লিখেছিলেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মোকাবেলায় শিগগিরই ইরান, রাশিয়া, তালেবান মিলে একটি নয়াজোট হতে পারে। অর্থাৎ তালেবানদের প্রতিরোধসক্ষমতা ও একতাবদ্ধতার কারণে তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের চুক্তি, সমঝোতার চেষ্টা রাশিয়াও করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা এই বিষয়টিকে আমলে নিয়েই হয়তো অনেকটা অপমানজনক এ চুক্তি করে হলেও তালেবানদের সঙ্গে রাশিয়াকে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দিলোনা। কারণ, শত হলেও এক সময় সোভিয়েত আগ্রাসন প্রতিরোধে তালেবান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সত্তুরের দশক ধরে একসঙ্গে লড়াই করেছে।
৭।
আফগানিস্তানের সঙ্গে আরো দুইটি দেশ জড়িত। একটির নাম পাকিস্তান। যারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের অন্যতম সহযোগী ও একই সঙ্গে আক্রান্ত দেশ। এই দেশটিতে ইমরান খাঁ ক্ষমতায় আসার পর একাধিকবার সামরিকভাবে না এগিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেটিতে পাকিস্তানের ও আফগানিস্তানের উভয়েরই লাভ। এই চুক্তিতে তাই তালেবানদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সন্তোষ প্রকাশ করার কথা। কারণ আফগানিস্তানের কয়েক লাখ শরণার্থীদের বাস পাকিস্তানে, আবার পাকিস্তানের আইএসআইকে সন্ত্রাসের মদদদাতা হিসেবেও অনেকে বলতে চায়, যদিও তারা এটি অস্বীকার করে আসছে।
আরেকটি দেশ ভারত এই আফগানিস্তানের সঙ্গে দহরম মহরম করেছে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে। এক সময়ের ক্ষমতাসীন তালেবানদের বাদ দিয়ে মার্কিন তাবেদার কারজাঈ বা আশরাফ ঘানীদের পিছনে ভারতের মত কৃপণ দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে কেবল পাকিস্তানকে এক ঘরে করে ফেলতে। এমন কী আফগানদের ক্রিকেট ম্যাচগুলো খেলার জন্য ভারত তাদের দুটি স্টেডিয়াম পর্যন্ত দিয়ে দেয়, যেখানে বাংলাদেশ গিয়ে গত বছর খেলে আসলো। আইপিএলেও আফগান ক্রিকেটারদের আনাগোনা বেড়ে যায় যেখানে পাকিস্তানিরা হয় নিষিদ্ধ। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের এই চুক্তি ভারতের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক পরিকল্পনাকে এক অর্থে 'মাঠে মারা' দিয়ে দিয়েছে। চুক্তির সময় পাকিস্তান ও কাতারের সক্রিয়তায় নামমাত্র ভারতের একজন পর্যবেক্ষক রাখা হয়।
অন্যদিকে ভারতের মিত্র আফগানিস্তানের বর্তমান আশরাফ ঘানী সরকারের একজন প্রতিনিধিও ছিলোনা দোহায়, আলোচনার প্রথম থেকেই তালেবান---যাদের হাতে আফগানিস্তানের ৬০ শতাংশ দখলে, আফগান সরকারের ব্যাপারে আগ্রহই দেখায়নি। ভারতের নিকটের এ সরকারকে তালেবানরা 'পুতুল সরকার' বলে তামাশা করে থাকে। আফগানদের মধ্যে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জন্মসূত্রে লড়াকু ও ঐক্যবদ্ধতা থাকার কারণে তালেবানরা ছাড়া আর কেউই আসলে আফগান যুদ্ধ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা লাভ করতে পারেনি। বরং এক সময়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদরাসার ছাত্রদের দ্বারা গড়ে ওঠা বাহিনী আজ দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ দুর্গ। এসব থেকে বলা যায়, আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটোর পাশাপাশি ভারতের যে তাবেদার রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া তাও ভেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
৮।
আফগানরা ঐতিহাসিকভাবে লড়াকু জাতি। এদের পূর্বপুরুষ শেরখাঁ পুরো ভারতবর্ষ শাসন করেছে। যদিও বাংলায় প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে আফগান কররানী বা দুররানীরা, তথাপি এ অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী বা মোগল শক্তিগুলোর মত অত্যাচারী ছিলোনা এরা। রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা এই আফগান এক যুবকের কাহিনী। আফগান আহমদ শাহ আবদালী মারাঠাদের পানিপথে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দিল্লি অধিগ্রহণ করে। আলেকজান্ডার ভারতের বিভিন্ন রাজ্য দখল করলেও পদ্মা তীরবর্তী বাংলা এবং কান্দাহার, হেলমন্দ, কাবুল দখলের সাহস করে উঠতে পারেনি। ব্রিটিশ, সোভিয়েত ইউনিয়নও এখানে পরাজয় বরণ করে। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আফগানদের এক নারী মালালা ইউসুফজাঈয়ের অসামান্য অবদান নিয়ে প্রতিটি আফগান গর্ব করে। এই মায়ের নাম অনুসারে নোবেলবিজয়ী পাকিস্তানী মালালা ইউসুফজাঈয়ের নাম রাখেন তার পিতা।
৯।
সময়ের আবর্তনে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও হয়তো আফগানদের জয় না করতে পেরে শূন্য হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। আমেরিকার ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ব্যাপী এই যুদ্ধ। এ যুদ্ধে আমেরিকার কাছে যে প্রযুক্তি ও অস্ত্র ছিলো তা দিয়ে পুরো পৃথিবীকে কয়েকশবার ধ্বংস করে দিতে পারে আমেরিকা। কিন্তু আফগান তালেবানদের ধ্বংস করা সম্ভব হলোনা। এর কারণ তালেবানদের সাধারণ আফগানদের কাছে অত্যন্ত অধিক গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। এরা ক্ষমতালোভী নয়, অল্পে সন্তুষ্ট এবং সাধারণ জীবনযাপন করে যা সাধারণ আফগানদের কাছে এরা গেরিলা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আর যখন জনতা গেরিলাদের ভালবাসে তখন জনতা হয় পানি, আর গেরিলারা মাছ। আফগান তালেবানরা গেরিলাযুদ্ধের এই সুবিধা পেয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার শক্তিশালী ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধে এতো বছর টিকে থাকতে পেরেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানের দুর্দান্ত ও দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকা, এদের শারিরীক ও মানসিক গঠন এবং লড়াকু জাতিসত্তা। সহস্র বছর ধরে এই পশতুনরা নিজেদের গোত্তভিত্তিক সমাজ, সংস্কৃতি ও লড়াই জারি রেখেছে। এমন কী প্রবল পরাক্রমশালী পারস্য ও তুর্কি সাম্রাজ্যও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করতে পারেনি।
১০।
আফগানিস্তান ও আফগানদের নিয়ে অনেক আকর্ষণীয় কথাকাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটি প্রচলিত সেটি হলো, এদের ব্যাপারে ইসলামধর্মের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স) এর ভবিষৎবাণী। তিনি প্রাচীন খোরাসান যেটির মূল অংশ বর্তমান আফগানিস্তান, সেখান থেকে কালো পতাকাধারী একদল লড়াইকারী বের হবে যারা ইমাম আল মাহদী (আ) কে সবার আগে চিনতে পারবে, বলে একাধিক হাদিসে উল্লেখ করেন। এই সব হাদিস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা অনেকেই তালেবানকে সেই দল বলে হয়তো মনে করেন। ফেসবুকে-অনলাইনে এবং বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিওতে এর স্বপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক দেখতে পাওয়া যায়।
সনাতনধর্ম মতে যে কল্কির আবির্ভাব হবে অধর্মকে উচ্ছেদ করতে মরুভূমির থেকে তাকেও এই খোরাসানের মানুষ সহযোগিতা করবে বলে একটি মত প্রচলিত আছে।
আরেকটি কথা যেটি এদেশের অনেকে জানেইনা যা আফগান পশতুন জাতিকে নিয়ে প্রচলিত তা হচ্ছে, এদের বনি ইসরায়েলের সঙ্গে রক্তের বন্ধন। অর্থাৎ বনি ইসরায়েলের মোট ১২ টি আলাদা গোত্র ছিল। এর মধ্যে দুটি গোত্র হারিয়ে যায়। সেই হারানো ইসরায়েলী জাতিসত্তাই এই আফগান পশতুন তথা তালেবানরা। আর ভারতের একটি প্রদেশে বাকি আরেকটি গোত্রকে পাওয়া গিয়েছে বলেই ইসরায়েল ভারত থেকে তাদের নিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করায় পশতুনদের ব্যাপারে অবৈধ ইসরায়েলীরা মুখ খোলেনা। পশতুন নারী ও পুরুষ, এদের চোখ ফিলিস্তিনের আদিম ইহুদীদের মতই নীল, সুঠাম দেহ, হলুদাভ বর্ণ এদের উপমহাদেশের অন্যান্য সকল জাতি থেকে পৃথক পরিচয় দিয়েছে। এ বিষয়ে Lost Tribes of Israel নামে অনেক আগে আমি একটি নিবন্ধ পড়েছিলাম।
আমার যতটুকু বুঝ তা থেকে মনে হয়, ইহুদীদের যে ধর্মগ্রন্থে তাদের ফের জেরুজালেমে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছে তা মূলত এই আফগান পশতুনদের। এখানেই এসে ইসলাম ও ইহুদী ধর্মতত্ত্বকে যদি পাশাপাশি রাখি তবে দারুন একটি সমন্বয় পাওয়া যাবে। ইসলাম ও খ্রীস্টধর্মে শেষ সময়ের আগে যে মহাসংঘাতের কথা বলা হয়েছে তা হবে দাজ্জাল বা এন্টিক্রাইস্টের সঙ্গে বিশ্বাসীদের। এর নেত্ৃত্ব দেবে ঈসা ইবনে মরিয়ম আ এবং তার সহযোদ্ধা হবে মাহদী, যে মাহদীকে আবার খোরাসান বা আফগানিস্তানের দরিদে একটি যোদ্ধা জাতি প্রাণপণে সমর্থন করবে। ইমরান নজর হোসাইনের জেরুজালেম ইন কোরান বা তার লেকচারগুলো শুনলে দেখবেন তিনি হাদিস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এই বাহিনীর মাহাত্ম বর্ণনা করছেন। খোরাসানের এই দুর্ধর্ষ জাতিটি ফিলিস্তিন ও পৃথিবীর নিপীড়িতদের মুক্ত করতে আল মাহদী ও ঈসা আ কে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে একযোগে অত্যাচারীদের পরাজিত করতে করতে জেরুজালেমের উপকণ্ঠে গিয়ে জলপাই গাছের গোঁড়ায় ঘোড়ার দড়ি বেঁধে বিশ্রাম নেবে, এর আগে তাদের সামনে লড়াইয়ে কেউই টিকতে পারবেনা।
১১।
আমি যুক্তি, তথ্য, উপাত্ত দিয়ে সব সময় বলতে চেষ্টা করেছি, বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধকে আগের মত ব্লক পলিটিক্স, তেল, অস্ত্রবাণিজ্য ইত্যাদি দ্বারা পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যাবেনা।আপনাকে ধর্মকে গুরুত্ব দিয়েই প্রতিটি জাতি, সরকার ও দলের সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করতে হবে। হোয়াইট হাউজের ইভাঞ্জেলিকাল খ্রিস্টানরা কী চায়, রাশিয়ার অর্থডক্স চার্চের পোপ কিরিলের সঙ্গে ভ্যাটিকানের রোমান ক্যাথলিক পোপ ফ্রান্সিসের বিশ্বাসের তফাৎ, সিরিয়ার অর্থডক্স খ্রীস্টানদের রক্ষায় পুতিনের আগমন, আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধকে যুদ্ধাপরাধী জর্জ বুশ কর্তৃক ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা, হিন্দুত্ববাদী আরএসএস ও হিটলারের নাৎসি বাহিনীর বিশ্বাসের মিল, অবৈধ ইসরায়েল কর্তৃক সন্ত্রাসী আইএসকে সমর্থনের কারণ অনুসন্ধান, তুর্কির বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনে হৈচৈ, ইরানের আল কুদস বাহিনীর উদ্দেশ্য ও কেন তারা ইসরায়েলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দিতে চায় ইত্যাদির আদ্যোপান্ত না জেনে বিশ্বের রাজনৈতিক সংকট কাটবেনা। নিশ্চয়ই আমি আমার ব্যাখ্যাকে সর্বোত্তম বলছিনা, সবারই নিজস্ব পাঠ প্রক্রিয়া থাকে। কিন্তু আমার আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ধর্মতাত্ত্বিক জটিলতা অধ্যয়নপূর্বক এটিই অনুসিদ্ধান্ত যে, পৃথিবী আসলেই এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে এবং প্রতিটি জাতির এখানে নির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা রয়েছে। আর আফগানদের ভূমিকাটি এর মধ্যে অন্যতম। এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মহান প্রভু এদের অপরাজেয় রেখেছেন। অন্য জাতির কাছে পরাজিত না হওয়ায় পশতুনদের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক স্বকীয়তাও অনেকটা অটুট। এটাই এদের ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তার মূলমন্ত্র। সকল যুগের সকল পরাশক্তির পতন এখানেই ঘটেছে। আমার তো মনে হয়ে, বিশেষ উদ্দেশ্যেই এদের এভাবে হাজার বছর ধরে অজেয় ও সুরক্ষিত রেখেছেন স্রষ্টা। আমার তো মনে হয়,
The Afghans are the Chosen People...
(অনেক আগের ভাবনা। বর্তমান সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় সংক্ষেপ করে উপস্থাপন।)
0 Comments