মুহাম্মদ (স) এর কোয়ারেন্টাইন ও আমাদের মানসিক দাসত্ব
~~~~~~~~~~~~
ইত্তেফাকের বরাতে এক মার্কিন গবেষক ক্রেইগের বয়ান ছোঁয়াচে মহামারী থেকে বাঁচতে মুহাম্মদ (স) ১৩০০ বছর আগে কোয়ারেন্টাইন ধারণা দিয়েছিলেন ( https://bit.ly/2WJ69Wy) এ বিষয়টি এখন ফেসবুকে খুব চলছে। এই যে চলন এটি কিন্তু পশ্চিমা গবেষক বলার আগেই ছিলো। ইসলাম খুবই বিজ্ঞানসম্মত একটি ধর্ম। কুসংস্কার, অযুক্তির স্থান এখানে খুবই কম। কারণ তৎকালীন আরবের, ইহুদীদের সবচেয়ে জ্ঞানীদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক বাহাস করে এই ধর্মটিকে টিকে থাকতে হয়েছিলো। সে কারণে আজ যে মূর্খ মামূন মারূফ মুফতি আর আব্বাসী গাধা জৈনপুরী, ওহাবী আমীর হামযা, রাজ্জাক গোঁয়ার, হাফিজুর-তাহেরী-শিশু বাটপার চিটার মুন্সিদের হাতে ইসলাম, শুরুতে এমন ছিলোনা। শুরুতে ইসলাম শিখে, শিখিয়ে ফতোয়া দিয়ে জীবীকা নির্বাহ করার মত ধৃষ্টতা বাণিজ্য ছিলোনা। এ কারণেই ইসলাম জানতে হলে শুরুতে যেতে হয়। আজকালকার টাকায় কাত মুন্সিদের ফতোয়াকে তাই প্রশ্ন করুন।
যে কথায় ছিলাম। এই যে হাত-মুখ-পা তিনবার করে ধোয়া ওযূর সময় এটি করোনা প্রতিরোধী নিশ্চয়ই। আবার, রোগ হলে ঘরে থাকা বা রোগাক্রান্ত এলাকায় যেতে বারণ করা অবশ্যই কোয়ারেন্টাইন। যেটি পরবর্তী সময়ে আমাদেত ব্যবসায়ী মুন্সিরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলিল দ্বারা বাদ দিতে চায়। কেন চায়? কারণ ছোঁয়াচে রোগের অস্তিত্ব থাকলে ওদের ব্যবসায় মন্দা আসতে পারে। খানকায় লোক কমে যেতে পারে, পানি পড়া নিতে লোক নাও আসতে পারে, সর্বোপরি ইমাম সাহেবের চাকরির বেতন দেয়া লোক মসজিদে আসা বন্ধ হতে পারে কিংবা মাদরাসা এতিম খানা বন্ধ হতে পারে! তবে হ্যাঁ, অনেক বুদ্ধিমান-জ্ঞানী মুন্সীরা কিন্তু ছোঁয়াচে রোগে অবিশ্বাসী মুন্সীদের তুলোধুনা করেছেন।
নারীদের যে পর্দা সেটি যদি নিকাব হয় তাহলে তা করোনা প্রতিরোধী হতে পারে। বোরখা তো স্বল্প খরচে পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট হিসেবেই কাজ করছে নাকি? এসব ইসলামের কল্যাণকামী নীতি করোনার আগে বা পরে বহু আগে থেকেই ছিলো। আপনি আল্লাহতে বিশ্বাসী হলে, ইসলাম মানবকল্যাণের জন্য এটি আপনার নিরবচ্ছিন্ন বিশ্বাস হবে। চাইনিজ ভাইরাস করোনা বা পশ্চিমা কোনো বয়ানে সেই বিশ্বাসকে পোক্ত করতে চাওয়া মানে বিশ্বাসের ঘাটতি ছিলো, নাকি? হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে হয়তো ব্যতিক্রম আছে। যারা অন্যরা তার বিশ্বাসটি গ্রহণ করলে সেটি দেখে মানসিক তৃপ্তি পায়। কিন্তু বিশ্বাস করতে পশ্চিমের স্বীকৃতির আশায় থাকলে তা বিশ্বাসের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
যেখানে ছিলাম, তো নবী মুহাম্মদ স আল্লাহর নির্দেশে বলেছেন, পরিচ্ছন্নতা
ঈমানেত অঙ্গ। মানে হচ্ছে, আপনি পরিছন্ন কী না এটি আপনি বিশ্বাসী কী না সেটিকে প্রভাবিত করে। তাই অপরিছন্নতার কোনো স্থান নাই ইসলামে। সেই ১৪০০ বছর আগে সুগন্ধী মেখে মসজিদে আসাকে সুন্নত করেছেন নবী (স), যাদের একটি কাপড়, ছেঁড়া হলেও তা নিয়মিত ধুইয়ে পরিচ্ছন্ন করতে বলেছেন এবং সেটিকেই উৎসাহিত করেছেন। এগুলো বিজ্ঞানসম্মত। তো এসব আপনি বিশ্বাস করেন?
যদি করেন তবে পশ্চিমা কোনো গবেষক যখন বলে সেটি নিয়ে আপনার পুলকিত হওয়ার কথা না। কারণ, আপনি তা আগেই জানেন ও বিশ্বাস করেন। এই যে পশ্চিম কোনো কিছু স্বীকৃতি দিলেই, তা আমার একান্ত নিজের হলেও, আমি তাতে বিশ্বাস আনি, এটিই পশ্চিমের প্রতি আমাদের দাসত্বকে স্থায়ীত্ব দেয়।
এটি শুধু কি ধর্মের ক্ষেত্রে দেখা যায়? না, মুন্সিদের মত এদেশের শিক্ষক-বিজ্ঞানীরাও পশ্চিমাদের পদলেহন করে, এদেশের রাজনীতিবিদরা আমেরিকা-ইউরোপকে উদাহরণ করে, এদেশের ব্যবসায়ী-আমলা-পুলিশ পশ্চিম কী ভাবছে তাকেই অনুকরণ করে। লিফট কিনতে পশ্চিমে ঘুরতে যায়। কেউ পশ্চিমা দেশে পড়তে গেলে, কারো পরিবারের কেউ থাকলে সে জাতে উঠে যায় দশায় আসে, অথচ পশ্চিমে গিয়ে রাস্তা ঝাড়ু দেয়া, বার্গার হাউজে সেলসম্যান হওয়া, বা পিজা ডেলিভারি দেয়া লোকটাই দেশে ফিরলে সাহেব হয়, স্যুট-টাই পরে! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নির্লজ্জের মত পশ্চিমা বই অনুবাদ করে পড়াচ্ছেন, নিজেদের কোনো মৌলিক জ্ঞান নাই, উদ্ভাবন নাই, শুধু অনুবাদ অথবা সরাসরি ইংরেজি লিংক। নিজেদের পদলেহনকারী মগজ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও দিয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই দাসত্বের শৃঙ্খল চলছে।
এই আমরা যখন ঈশা খাঁর নেতৃত্বে দিল্লির সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি তখন আমেরিকা বলে দুনিয়ায় কিছু আছে তা বাকি বিশ্ব জানতোই না। আমরা যখন পানাম নগর, উয়ারী বটেশ্বর করেছি, আমাদের পাল সাম্রাজ্য যখন শিল্প সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করছে ইউরোপ তখন গুহা যুগে। আমরা যখন টাকায় ৮ মন চাল বিক্রি করেছি, আমাদের ভেষজ চিকিৎসা যখন দুরারোগ্য রোগমুক্তি করছে, আমরা যখন গণিত ও জ্যোতিষশাস্ত্রে এগিয়ে গিয়েছি পশ্চিম ইউরোপ তখন না খেয়ে মরছে, আর আমেরিকা আবিষ্কারই হয়নি বাকি পৃথিবীর কাছে। আমরা যখন স্বর্ণযুগে--বাংলা থেকে দিল্লি, কাবুল থেলে সমরখন্দ, মক্কা-মদিনা থেকে তেহরান-আলেপ্পো থেকে বাগদাদ, ইস্তানবুল হতে নাইজার, কায়রো থেকে জেরুজালেম; ইউরোপ তখন অন্ধকারযুগে, জ্ঞানে বিজ্ঞানে পিছিয়ে থেকে গ্যালিলিওকে গ্রেফতার করছে, জোয়ান অব আর্ককে জীবন্ত পোড়াচ্ছে। ইতিহাস ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ থেকে শুরু কইরেন না। ইতিহাসেরও ইতিহাস আছে।
কেউ পশ্চিমে গিয়ে গাড়ি মুছে দেশে ফিরে হ্যালো বললেই আমাদের শিরদাঁড়া বাঁকা হয়ে যায়। আমরা আরবে কাজ করা হাড়ভাঙ্গা শ্রমিক কিংবা ব্যবসায়ী , যারা অধিকাংশ রেমিট্যান্স দেয়, তাদের চেয়ে ইউরোপের সেলসম্যানকে বেশি দাম দিই। আমাদের দেশের সাহিত্যে পশ্চিমের পিটারকে কাঠখোট্টা অনুবাদেও বাহবা, কিন্তু জসীমে অনাগ্রহ। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে 'ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ডিগ্রিকে' অগ্রাধিকার করার কথা কেন লিখা থাকে যখন এই ইন্টারনেট যুগে জ্ঞানচর্চা একান্ত নিজের প্রচেষ্টার উপর নির্ভর করে? এসবের কারণ কী?
কারণ আমাদের দীর্ঘদিনের দাসত্ব! এই দাসত্বমুক্তি না হলে জাতীয় উন্নতি হচ্ছেনা। এই দাসত্ব ধর্ম থেকে দর্শন, রাজনীতি থেকে আমলাতন্ত্র, শিক্ষা থেকে চাকরী, চাকরিজীবী থেকে ব্যবসায়ী, ছাত্র থেকে ছাত্রী, শিক্ষক থেকে মুন্সি সবার মধ্যেই রয়েছে। সবার দাসত্বের মুক্তি এতো সহজে হবে?
কী জানি!
0 Comments