সর্বশেষ

পরকীয়ার প্রকৃত কারণ || সংসার কেন ভাঙ্গে? তালাক/ ডিভোর্সের কারণ কী?

ঢাকায় প্রতিদিন ৩৯ টি তালাকের ঘটনা ঘটছে বলে টাইমলাইনে সংবাদ-প্রতিক্রিয়া ঘুরছে। নারীবাদী ফোকাস করছে পুরুষের দোষ আর পুরুষবাদী নারীর! এর ফাঁক দিয়ে নির্মম সত্যটা কেউই আলাপ করছেনা বলে দুই চারটি কথা বলতে চাই!

প্রতিদিন ৩৯ টি তালাক বা ডিভোর্সের আরো অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নারী-পুরুষ উভয়পক্ষই এড়িয়ে গিয়েছে অথবা প্রথম আলো প্রকাশ করেনি ইচ্ছা করেই। কী তা?

সেটি হচ্ছে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে উদ্ভূত সর্বগ্রাসী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী আত্মকেন্দ্রীক ভোগবাদ।

টিভি, সিনেমা, সিরিয়াল, নাটক, ইন্টারনেট, পর্নগ্রাফি, ফেসবুক, ইউটিউব এসে আমাদের চমৎকার মানসিকতাকে নষ্ট বা ভেজালযুক্ত করেছে৷ নেটফ্লিক্সে একটি ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম কীভাবে মানুষের ইতিহাসের সর্বকালের গোপনীয় বিষয়টি নির্লজ্জের মত বাণিজ্যিকীকরণ করে নারী ও পুরুষের যৌন সম্পর্কের বন্ধনকে নড়বড়ে করে দেয়া হয়েছে। জার্মানির এক দল গবেষক দেখিয়েছেন পর্ন ও পর্ন আসক্তি দুটোই মানব-মানবীর মনোজগতকে অস্থিতিশীল করে তোলে। 

অন্যদিকে সামাজিক স্বীকৃতির বাইরের সম্পর্ক পপুলার কালচারের মাধ্যমে স্বাভাবিক করা হচ্ছে। বহুগামীতাকে শৈল্পিকভাবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রদান করা হয়েছে। একগামীতা বা একজন সঙ্গীনির্ভরতা নারী ও পুরুষ উভয়ের কাছে "অবিশ্বাস্য" করে উপস্থাপনের পপুলার ক্যাপিটালিস্ট কালচার চলমান। এক্স-গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ডকে একেবারেই ভাত মাছ করে ফেলা হয়েছে। 

ফলে কে যে কার গার্লফ্রেন্ড, কার বয়ফ্রেন্ড এবং কে কার বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে সংসার করছে তার হদিস আছে? শরীরসর্বস্ব প্রেম দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় থাকছেনা। বর্বরভাবে শারিরীক তাড়নায় সম্পর্ক ভাঙা গড়া চলছে "মাই চয়েস" নামের ভোগবাদী আদর্শের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে।

বিয়ের ব্যাপারে যেভাবে জরিপ হয় বিয়ের আগের এই বহুপ্রেমের সম্পর্কগুলো নিয়ে জরিপ হয়না। কেন? আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছেলে ও মেয়েকে দেখেছি ব্রেকাপের পর ব্রেকাপ করতে। ব্রেকাপের এই চেইন রিয়েকশন তাদের নতুনত্বের প্রতি এক ধরনের নেশাগ্রস্ত করেছিলো। এমন কী একই ক্লাসে একাধিক ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে চার-পাঁচ বছর ধরে সম্পর্ক, জুনিয়রের সঙ্গে সম্পর্ক, শিক্ষকের সঙ্গে, ক্ষমতা কাঠামো বা অর্থকাঠামোর সঙ্গে যুক্তদের সঙ্গে সম্পর্ক চলেছে। এই বিবাহপূর্ব অনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিয়ের পরে জীবনকে একদমই প্রভাবিত করেনা? ঠিক কতটি ব্রেকাপ হলে "ওর সঙ্গে মানসিকতায় যাচ্ছিলোনা বা এডজাস্ট হচ্ছিলোনা বা ও ভুল চয়েস/ডিসেশন ছিলো" ইনভ্যালিড/ব্লকড হয়? বিয়ে ভাঙার কারণ যাচাইয়ের আগে নিওলিবারেল এই শারিরীক প্রেমগুলোর ব্যাপারে কেইস স্টাডি করা উচিত।

এই মুহুর্তে সমাজ স্থিতিশীল অবস্থায় আসছেনা৷ সেটি প্রয়োজন। সম্পর্ক এখানে স্রেফ তামাশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রিয়জনের জন্য বরাদ্দ সময় নিয়ে যাচ্ছে থার্ড/ফোর্থ/ফিফথ পারসোন---চ্যাট করে, ফোন করে, গল্প করে...! সম্পর্ক স্থিতিশীল নেই।

এর মধ্যে আবার "জাস্ট ফ্রেন্ড", "বন্ধু"," "ক্লাস মেট"," জাস্ট ফেসবুক ফ্রেন্ড", ও  "জাস্ট কলিগ" নামের ঘৃণ্য ওঁৎপেতে থাকা পশুশ্রেণি তো আছেই। এদের কাজই হচ্ছে বন্ধু/বান্ধবী/কলিগের সংসার/প্রেম/সম্পর্ক তাকে ভালো রাখছেনা চ্যাটিংয়ের সময় বা অফলাইন আলাপে এইটা প্রতিষ্ঠা করে বিদ্যমান সংসারের/সম্পর্কের ব্যাপারে বিষিয়ে তোলা। এরপর রোমান্টিক ডিপ্রেশন আর সস্তা লোনলিনেসের খেজুরে আলাপ দিয়ে শুরু আর তারপর হ্যাং আউট, চা খাওয়া, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, ছবি, একটু আধটু হাতে, পায়ে স্পর্শ...ইত্যাদি! সে সব নোংরা কথা আমরা আলাপ না করি।

যে কারণে বিয়ে একটি বন্ধন তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জৈবিক সম্পর্ক। কিন্তু বিয়ের  আগেই এক বা একাধিক জনের সঙ্গে  এ ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে বিয়ের পরে একক জৈবিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা "বহুগামী নেশায় আসক্তদের" কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এক দুইজন আলাদা, বেশিরভাগ এই সময়ে পরকীয়ায় জড়িত হয়ে পড়ে আর এসব পরকীয়াও শুরু হয় একেবারেই স্বাভাবিক আলাপ-আলোচনা দিয়ে। একটু পর তা "জীবন বোর্ড/ভাল্লাগেনা/ও আমাকে বোঝেনা/ও অনেক ন্যারো/দম বন্ধ হয়ে আসে/ডমিন্যান্ট/কেয়ারলেস/সন্দেহ করে/ফেসবুক পাসওয়ার্ড চায়/আমার প্রাইভেসিতে অবিশ্বাস করে/সময় দেয়না/শুধু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে..." ইত্যাদি রেটরিকে যায়। এরপর ফেসবুক, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ, ফোন, ভাইভার, টিনডার ইত্যাদি এই আজাজীলঅপক্রিয়াকে সহজ করে দেয়। তারপর হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি। 

আমার একটি গবেষণা নিবন্ধ যেটি ২০১৮ তে প্রকাশিত হয় সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষায় সেখানে উঠে এসেছিলো শিক্ষিত শ্রেণির "৯৫% বিশ্বাস করে সম্পর্ক ভাঙা-গড়ায় ফেসবুকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে"।

তো, আগে বিয়ে বিচ্ছেদ বা সম্পর্ক ছেদের ঘটনা কম ছিলো এর একটি কারণ বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, কথাবার্তা বা যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা বা অপ্রতুলতা বা অপ্রাচুর্য। এখন যেটি একেবারেই ভাত-মাছ।

সে কারণে সঙ্গীর সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে "অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে ভ্রমর কইও গিয়া" দশা একেবারেই প্রায় অনুপস্থিত। অর্থাৎ প্রিয়জনের সঙ্গে রাগ-অনুরাগের পর তাঁকে নিয়ে যে একটু ভাববে, দুজনের সম্পর্ককে মিস করবে সেই সময় বা সুযোগই এই ভোগে মত্ত অস্থির সমাজে নাই। এক মুহূর্ত প্রিয়জন রাগ করলে সেই ফাঁকে শতশত ওঁৎপেতে থাকা সিউডো প্রিয়জন (Pseudo Sympathizers) হাজির হয়। জানায় "...আমি আছি। আজ আমি থাকলে এই রকম আপনার সঙ্গে হতোনা, আমার আর আপনার মনের অনেক মিল(অতএব শারিরীক মিল হতেই পারে) ..."ইত্যাদি। 

এই কারণে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভোগের ভবিষ্য অশ্বডিম্বের আশায় চলমান বন্ধনের প্রতি অনীহা আসে। আর এ কারণেই যে সকল নারী ও পুরুষ এক পুরুষ বা নারীতে সন্তুষ্ট নয় তাদের জন্য বিকল্প বাছাই (Alternative Option) একেবারে হাতের মুঠোয় চলে এসেছে৷ এটি শিক্ষিত প্রজন্মের  সংসার ভাঙা গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেই আমার অনুসিদ্ধান্ত (Hypothesis)।  

এই সংবাদ জরিপে যে যৌতুক বা অবাধ্যতা ইত্যাদির কথা বলা হচ্ছে আমি আপনি সবাই জানি এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর একটি ছোট গোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য।

প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষিত বা চাকরিজীবী বা সমাজের মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তের সম্পর্ক ভাঙা গড়ায় "নব্য অধঃপতিত ভোগবাদী বহুগামীতা সংস্কার, নৈতিক অধঃপতন"  অন্যতম কারণ। 

কয়েকজন নারী দেখলাম পুরুষের পুরুষত্বহীনতা ইত্যাদিকেও দায়ী করছে। পুরুষ আবার নারীর নারীত্বহীনতাকে দায়ী করেনি। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের মাধ্যমে আমরা সবাই জানি যৌন অক্ষম পুরুষের মত যৌন অক্ষম যেকোনো নারীও হতে পারে।

সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পন। কিন্তু এই সংবাদটিতে যা বলা হচ্ছে তা পুরো সমাজের চিত্র নয়। এতে অসত্য বার্তা যাবে। লক্ষ্য করে দেখেন, চিত্রে তালাকের পুরুষের অভিযোগ থেকে সচেতনভাবে "নারীর পরকীয়া"কে বাদ দেয়া হয়েছে। মনে হবে সকল সংসারের পরকীয়াগুলো পুরুষ গিয়ে করে দিয়ে আসে। যেন এ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নাই। প্রথম আলো আমাদের সমাজকে ভুলভাবে অধ্যয়ন করাতে চায়। কারণ, প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ ও এর কর্মী ও এর উপর অন্ধভাবে ঈমান আনা পাঠক শ্রেণি এমন একটি পরিমণ্ডলে বাস করে যেখানে সম্পর্ক স্থিতিশীলতা পায়নি বা স্থিতিশীল একগামী সম্পর্ককে যেখানে ইতিবাচক প্রগতিশীল ভাবা হয়না ইত্যাদি। তাদের এই অস্থিতিশীলতা তারা সবার উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। 

প্রকৃতপক্ষে পুরুষ ও নারী উভয়ে এক হয়ে একটি পরিবার বা সংসার গড়ে তোলে। এই সম্পর্কের ভিত্তিটি বিশ্বাস। যারা বিশ্বাসী নয় তাদের কাছে বিয়ে নিরর্থক। তারা সুযোগের জন্য ওঁৎপেতে থাকে সঙ্গী বদলাতে। 

আবার পারিবারিক কারণে অন্য নারী যেমন, শ্বাশুড়ি, জা, ননদ ইত্যাদির কারণে সৃষ্ট জটিলতাও ধীরে ধীরে তালাকের দিকে নেয়। 

সাময়িক মোহে যারা ঝটিকা সিদ্ধান্ত নেয় তারা মোহ কেটে গেলে ভাঙতে অজুহাত খোঁজে। কঠিন প্রেমের সংসার দুই মাসে শেষ হয়, আবার পারিবারিক বিয়ে আজীবন টিকে যায়। 

এসব একটি কনটেক্সটে আলাপ সম্ভব নয়। কিন্তু প্রথম আলো বা সিউডো ফেমিনিস্ট ভোগবাদীদের প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে বিয়ে প্রথার প্রতি অনীহা সৃষ্টি করবেন না। দিন শেষে এই নগরে সুস্থভাবে, পরিচ্ছন্ন জীবন যাপন করে বেঁচে থাকতে আপনার একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী/সঙ্গীনী ভীষণ প্রয়োজন। তাকে বিশ্বাস করুন। তার বিশ্বস্ত হোন। পারস্পরিক বিশ্বাসে এগিয়ে চলুন। বিশ্বাস ভাঙলে পরিত্যাগ করুন। কারণ, যে একবার বিশ্বাস ভাঙে সে আর কোনোদিন বিশ্বস্ত থাকেনা...।

আপনার আমার এই পৃথিবীতে আগমন ঘটেছে সংসারের মাধ্যমে, পরিবারের মাধ্যমে। সহস্র বছর মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের একক পরিবার। তা ভেঙে পরিবারহীন ভোগবাদী শিকড়হীন হয়ে এ পুঁজিবাদীদের পতিত দোসর হওয়ার মধ্যে কল্যাণ নেই। অকল্যাণ আছে, অধঃপতন আছে, মানসিক ও শারিরীক অসুখ আছে...। 

সুতরাং চমৎকার সংসারজীবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ভাবনা শুরু করুন। আপনাকে গড়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পৃথিবীকে সুশোভিত করুন প্রেম, ভালবাসা, আস্থা, সহযোগিতা ও বিশ্বাস দিয়ে। সকলের জীবনে মঙ্গল ও শান্তি ও আসুক।

শুভরাত্রি।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments