ফেনী নদীর উপর হওয়া বাংলাদেশ ভারত 'মৈত্রী সেতু' থেকে বাংলাদেশের ষোলআনা জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে হবে। আপাতদৃষ্টিতে অন্ধ ভারতবিদ্বেষ থেকে এ সেতুতে ভারতের লাভ দেখছে অনেকে, অথচ আমি প্রকৃতপক্ষে এখানে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাময় জাতীয় স্বার্থ দেখছি। ত্রিপুরার মানুষ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রভাববলয়ের কারণে ত্রিপুরায় যে মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রশিক্ষণ শিবির ছিলো সে আলোচনা খুবই কম দেখা যায়। বেনাপোলের পাশাপাশি সাব্রুমেও আমাদের সম্ভাবনা যুক্ত হলে বাংলাদেশের পণ্য ভারতে পাঠানো যাবে। কিন্তু খুবই সাবধানে আমাদের নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
যদি আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবোধের সঙ্গে এই সেতুর বিষয়কে দেখা হয় তবে ২ কি.মি. দীর্ঘ এ সেতু থেকে বিশাল প্রাপ্তি আসবে বাংলাদেশের। কারণ, এর মাধ্যমে ত্রিপুরাসহ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ আসলো বাংলাদেশের। এসব অঞ্চলের মানুষের ভাষা বাংলা, অসমীয়া বা বাংলার কাছাকাছি। এবং এসব রাজ্যের সংস্কৃতিও বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতির মতই। আমাদের টেলিভিশন, আমাদের গান, নাটক, এমনকি আমাদের মুন্সিদের ওয়াজও সীমান্তবর্তী ভারতীয়দের কাছে জনপ্রিয়। একে আরো জনপ্রিয় করে তুলতে হবে। সংস্কৃতি মাধ্যমে বন্ধন তৈরি করতে হবে। ভাষা ও সংস্কৃতির এই মিলনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশী পণ্য ব্যাপক পরিমাণে শুল্কমুক্তভাবে ভারতের বাজারে প্রবেশ করাতে হবে। আবার, এখান থেকে মিজোরাম, নেপালকে লক্ষ্য করেও আমাদের রপ্তানী নীতি তৈরি করতে হবে।
ভারত থেকে আমদানিনির্ভর ফড়িয়াদের চেয়ে ভারতে রপ্তানিতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পাশাপাশি এই ফেনী নদীটি ৯০% বাংলাদেশের হওয়ায়, ভারত নিজস্বার্থে এ সেতু করলেও এ সেতুর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনীর হাতেই রাখতে হবে। এতে করে মাদক বা ক্ষতিকর দ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশের জায়গা সংকুচিত হবে। ফেনসিডিল ইয়াবা যে ভারত বা মিয়ানমার থেকে আসে এ কথা তো প্রতিষ্ঠিত সত্য। এ কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও সতর্ক হতে হবে ভারতীয় চোরাচালানকারীদের ব্যাপারে। মনে রাখতে হবে, এক হাতে তালি বাজেনা।
সুতরাং এ সেতুটি যেন আমাদের বন্ধুপ্রতীম দেশের সঙ্গে তিক্ততা নয়, বন্ধুত্ব বৃদ্ধি করে সেদিকে দুদেশকেই নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশের চট্রগ্রাম বন্দর থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দূরত্ব এ সেতুর কারণে ৮০ কি.মি. এর কম হয়ে গেলো। এটা যে ভারতের জন্য কতবড় উপকার সেটি ভূ-রাজনীতি, সমরনীতি, আন্তঃবাণিজ্য, আন্তঃসম্পর্ক, আন্তঃদেশীয় বা মহাদেশীয় যোগাযোগ নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা বুঝিবেন। বাংলাদেশ ভারতের যে উপকার করলো এ ঋণ কিছুতেই শোধ করা যাবেনা। এ জন্য চট্রগ্রাম বন্দরে যত বেশি ভারতীয় পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়বে তত বেশি শুল্ক বা করারোপ করতে হবে। এ খাত থেকে বিপুল আয় সম্ভব।
এটা গেলো বন্দরের আয়। এরপর এই পণ্য ভারত খালাস করবে, সেই খালাস মালামাল দেশীয় ট্রাক ইত্যাদি পরিবহন দিয়ে বহন করার কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। এই খাত থেকেও তবে আয় করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে, আমার ভূমি ও বন্দর ব্যবহার করে সে কিন্তু কোটি কোটি টাকা লাভ করছে৷ দিল্লি ইত্যাদি থেকে তার পণ্য আসতে যে খরচ তা কমে যাচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশকে সেই প্রাপ্য লভ্যাংশ দিতেই হবে। এখানে কূটনীতিকভাবে আমাদের দক্ষতার প্রমাণ রাখতে হবে। ভারত কিন্তু চাণক্য নীতি অনুযায়ী মিষ্টি কথা বলে শুল্কমুক্তভাবে, নামমাত্র পরিবহন খরচে পণ্য পরিবহন করে সেতু পার হতে চাইবে। এটা কিছুতেই চলমান হতে দেয়া যাবেনা। দৃঢ়ভাবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি চমৎকার নীতি প্রয়োগ করে বাংলাদেশের স্বার্থকে সুরক্ষা দিতে হবে।
আবার ত্রিপুরা বা উত্তর ভারতীয় বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ আন্তর্জাতিক চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে খুব দ্রুত বাড়ি ফিরতে পারবে বা বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম এসে খুব সহজে সারাবিশ্বে যেতে হবে। এই খাত থেকেও আমাদের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সীমান্তে কড়া নজরদারি রাখতে হবে যেন বাংলাদেশের মধ্যে অন্য দেশ থেকে কোনো অনুপ্রবেশকারী প্রবেশ না করতে পারে, কিংবা বাংলাদেশ থেকে কেউ ওপারের দুর্বৃত্তদের সঙ্গে যোগাযোগ না করতে পারে।
একইভাবে বন্দরে অতিরিক্ত মালবাহী জাহাজ এসে যেন বাংলাদেশের জাহাজ ও পণ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সে কারণে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে নিয়ে আসা যেতে পারে পণ্য-পরিবহন। মানে, অন্তত বাংলাদেশের হাতে যেন 'বার্গেইনিং টুল' থাকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের কর্তৃপক্ষের।
বাংলাদেশের এখন সরাসরি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য কূটনীতিক তৎপরতা চালাতে হবে। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় এ দুই দেশের বন্দর নেই। এ দুই দেশ ভারত ও মিয়ানমারের উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশকে এই দু দেশের বাজার ধরার চিন্তা করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একসময় এই বাংলাদেশ ছিলো এই পৃথিবীর বাণিজ্যের কেন্দ্র। প্রাচীন বাংলাদেশ ছিলো তৎকালীন পৃথিবীর 'ইউরোপ' কিংবা 'সিলিকন ভ্যালি'। এ কারণে, ইউরোপীয়ানরা (পর্তুগীজ, ব্রিটিশ, ফরাসী, আরমেনীয়) পেটের দায়ে এই বাংলাদেশে এসেছিলো। চীনারা এখানে এসেছে, আরব-তুর্কি-আফগান-পার্সিরা এসেছে---এ বাংলার দ্বারা সমৃদ্ধ হয়নি তৎকালীন পৃথিবীর কোনো জাতি ছিলোনা। আমাদের ভুলে, অজ্ঞতায়, অন্তঃদ্বন্দ্বে, সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থে আমাদের অদূরদর্শীতায় আমরা পরাধীন হয়েছি। সে কারণে আমাদের ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুধাবন করে নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।
আমাদের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন আছে, বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, দারুন পর্যটন খাত আছে, শ্রেষ্ঠ কাপড় নির্মাণ কারিগর আছে, আমাদের পৃথিবীর সবচেয়ে কর্মঠ বৃহৎ জনগোষ্ঠী আছে, আমাদের উর্বর ভূখণ্ড আছে এবং আমাদের আছে আস্তো একটি বঙ্গোপসাগর এবং দ্রুততম সময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতা। আমাদের এখন এগিয়ে যাওয়ার সময়। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মৈত্রী সেতু সেই এগিয়ে যাওয়ার অভিযাত্রায় হবে সর্বশেষ চমকপ্রদ সংযোজন---এই প্রত্যাশা হোক দিবালোকের মত উজ্জ্বল। জয় হোক বাংলাদেশের, বাংলার সর্বস্তরের জনতার।
ছবি/জাগোনিউজ
0 Comments