সর্বশেষ

অবতার বা এ্যাভাটার চলচ্চিত্র কেন অনন্য সেরা || Why James Cameroon's Avatar is a must watch?

'অবতার' চলচ্চিত্রটি ফের সবার উপরে চলে এসেছে এভাঞ্জার্সকে ছাড়িয়ে। 'অবতার'কে চীনে মুক্তি দেয়া হয়েছে নতুন করে। আমি অবশ্য অপেক্ষায় আছি অবতার-২ এর। ২০২২ এ মুক্তি পাবে সম্ভবত। জেমস ক্যামেরুনের কাজ। ক্যামেরুন টাইটানিক এর পরিচালক। পশ্চিমের আরো অনেক একশন, কল্পকাহিনীতে যেভাবে 'শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা সাদা মুক্তিদাতা' দেখানো হয়, অবতারেও তা আছে, তবে একইভাবে শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের নির্লজ্জ লুটতরাজ, হত্যাযজ্ঞ, সাংস্কৃতিক ও সামরিক আগ্রাসনকেও তুলে ধরা হয়েছে চমৎকারভাবে। সেই চলচ্চিত্রটি চীন বেছে নিলো কেন?

এই ঘটনায় দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। চীন সারা দুনিয়ায় চাইনিজ ভাইরাস ছড়িয়ে নিজে আরামসে চলচ্চিত্র পর্যন্ত মুক্তি দিলো। আর দিলো তো এমন একটি চলচ্চিত্র যেটি পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদীদের সর্বকালের চপেটাঘাত করবে। আগ্রাসনকারী বহিঃশত্রুদের (যারা ব্যবসায়, গবেষণা, বন্ধু ইত্যাদি বেশে আসে সম্পদ লোপাট করতে) থেকে ভূমিপুত্র-কন্যা আদিবাসীদের নিজ সংস্কৃতি ও সম্পদ রক্ষায় এ চলচ্চিত্র চিরায়ত জ্বালানি। চীন এর মাধ্যমে প্রথমত, করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে দুনিয়াকে অনিরাপদ করলেও নিজেরা কতটা নিরাপদ যে হলে সিনেমা দেখছে চাইনিজরা এটা প্রমাণ করলো এবং একই সঙ্গেব মার্কিনসহ পশ্চিমা আগ্রাসন মোকাবেলায় প্রাচ্যের ঐক্যবন্ধনের হয়তো প্রচ্ছন্ন ডাক দিলো (আবার ভারতের ব্যাপারেও হার্ডলাইনের বার্তা হতে পারে, যেহেতু অবতার নাম এসেছে ভারতীয় সনাতন ধর্মীয় ধারণা থেকে)---যদিও চীন নিজেই আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী রূপে আবির্ভূত হচ্ছে শি জিনপিংয়ের আমলে। তারা এমনকি শ্রীলঙ্কার বন্দর আইনগতভাবে দখল করেছে, আফ্রিকার জিবুতিতে সেনাঘাঁটি করেছে এবং নির্লজ্জের মত মিয়ানমারের সামরিক বর্বরদের রোহিঙ্গা নিধনে সমর্থন দিয়েছে, নিজে উইঘুর মুসলমানদের উপর নাৎসি কায়দায় অত্যাচার চালাচ্ছে।
অবতারে ফিরে আসি। এটি ২০১০ দেখি। বলাকা সিনেমা হলে। একবার দেখে মন ভরেনি, বারবার দেখি। একটা সময় সংলাপও অনেক মুখস্ত ছিলো 'জেইক সালি' এর৷ সাম্রাজ্যবাদীদের মুখোশ উন্মোচনের কারণে এই ছবিকে অস্কার না দিয়ে বেছে নেয় মার্কিন আগ্রাসনকে বৈধতা দেয়া ছবি 'হার্ট লকার'কে। হার্ট লকার বন্দি নির্যাতনের বৈধতা দেয়, অপরের ভূমি লোপাটকে জায়েজ করে। 

অন্যদিকে অবতার জ্বালানী 'আনঅবটেনিয়াম' এর জন্য হন্যে হয়ে প্যান্ডোরা গ্রহে আগ্রাসন, তাদের জীবনবৃক্ষকে ধ্বংস করা, তাদের সংস্কৃতিকে বিনাশ করাকে দেখিয়ে ক্ষ্রান্ত হয়নি। সাঁওতালী কায়দায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সব দেশীয় সম্প্রদায় এক হয়ে দেশীয় প্রাণ প্রকৃতির সহায়তায় গেরিলা যুদ্ধের মত 'হিট এন্ড রান' পদ্ধতিতে শ্বেতাঙ্গদের নির্লজ্জ পরাজয় এই সিনেমায় তুলে ধরেন জেমস ক্যামেরুন। 

সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এ যেন ইরাকী-আফগানী-ভিয়েতনাম-আফ্রিকাবাসীর তীব্র প্রতিরোধ মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। এ লড়াইয়ে আদিবাসীদের পাশে দাঁড়ায় অল্পকিছু শ্বেতাঙ্গ আর বেশিরভাগ সাদা চামড়াবাসী গণহত্যায় যুক্ত হয়। যখন ২০০১ এ আফগানিস্তান ও ২০০৩ এ মিথ্যা অজুহাতে ইরাকে আগ্রাসন চালায়, যখন আফ্রিকায় আধুনিকতার দোহাই দিয়ে পশ্চিমারা এর ভাষা, সংস্কৃতিকে 'ছোট করে' তেল-গ্যাস-স্বর্ণ-হীরা লোপাট করে আমেরিকায়-ইউরোপে বিলাসবহুল (অ)সভ্যতা গড়ে তোলে তখন এই চলচ্চিত্র বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমাজগুলোতে পশ্চিমা নব্য সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপ সামনে নিয়ে আসে। যেন, এই তো সেদিন বৃটিশ দখলদার বাটপারপগুলো বাংলার ধান-পাট-গম লুটে লন্ডনে বিল্ডিং বানাচ্ছে। যেন, মসলিনের নির্মাতাদের তাঁতগুলোতে আগুন দিয়ে, হাত কেটে কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করে প্রাচ্যের রক্ত চুষে বেহায়ার দল 'ইউরোপে রেঁনেসা' মারাচ্ছে। অবতারের আনঅবটেনিয়াম এর আড়ালে মগজে ভাসে বাংলার মসলিন, ধান, মধ্যপ্রাচ্যের তেল, গ্যাস আর আফ্রিকার স্বর্ণ- হীরার খনি। 

আবার চাঁদ, কেপলার-২৩ বা মঙ্গলে (নেটফ্লিক্স এর Midnight Sky দেখা যেতে পারে) যে মানুষ উপনিবেশ গড়তে চাচ্ছে এর ভবিষ্যত কেমন হতে পারে এমন একটি ইঙ্গিতও পাবেন। এমন চলচ্চিত্র এ পৃথিবীতে খুব কম আছে৷ এই চলচ্চিত্র সবার জন্য---যারা লড়াই করে নিজের অধিকার রক্ষা করতে চায়। যেভাবে নজরুল, সুভাষ, ফ্রানৎজ ফানো, সাঈদ, মার্ক্স, চে গেভারা দুনিয়ার সর্বকালের বিপ্লবীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য সেভাবে আগামীর পৃথিবীতে অবতারও বিপ্লব-বিদ্রোহ-আন্দোলনের জ্বালানী সরবরাহ করবে ভীণদেশীয় আগ্রাসনকারীদের ব্যাপারে (কিংবা দেশীয় লোপাটকারীদের বিরুদ্ধেও)।

অবতার--এ শব্দটি নেয়া হয়েছে আমাদের প্রাচ্যের সনাতন ধর্মের পুস্তক হয়ে। আমাদের দেশীয় শব্দ। অথচ একে বলার সময় বা লেখার সময় নির্লজ্জের মত 'এভেটার, এভাটার এ্যাভাটার' বলে বা লেখে চলচ্চিত্রটির ভক্ত, বিনোদন সঙবাতিক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষিকা। এদের মগজের ঔপনিবেশিক দাসত্ব এভাবেই ফুটে ওঠে যে, নিজের শব্দটি অন্যে বিকৃত করে উচ্চারণ করে বা উচ্চারণ করতে পারেনা বা তার রীতিতে করে আর যার নিজের শব্দ সে ঐ বিকৃতি বা অপরাগ উচ্চারণকেই শুদ্ধ ভেবে উচ্চারণ করে। এর নাম সাংস্কৃতিক দাসত্ব। মানে আপনার দাস/দাসী মগজে শুদ্ধতার বাটখারা হিসেবে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপকে স্থান দিয়েছেন। এই পদ্ধতিতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'টেগোর' হয়েছেন, হয়ে গর্বিত হয়েছেন এবং সেই সাংস্কৃতিক দাসত্ব বংশানুক্রমিকভাবে এখনো চলছে---বানানে, উচ্চারণে, প্রতিশব্দে এবং সংস্কৃতি চর্চা ও পণ্য ব্যবহারে।

অবতারে ফিরে আসি। ফরহাদ সাফিনিয়ার 'এপোক্যালিপ্টো' চলচ্চিত্র এজটেক বা মায়া সভ্যতার ধ্বংসের কারণ হিসেবে এ সভ্যতার অভ্যন্তরে অত্যাচারী, ধনি ও শোষক শ্রেণিকে দায়ী করে---যার কারণে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা আজকে মেক্সিকো ও লাতিন দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করছে। সেখানে জাগুয়ারের লড়াইটা একলা ছিলো, তার সঙ্গ হিসেবে লড়াই করে নিজের বাপ-দাদার বন-জঙ্গল। আর অবতারে লড়াইটা সম্মিলিত। এ লড়াইয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি (যাকে ইউরোপীয় লুটেরারা কুসংস্কার ইত্যাদি বলে তাদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত চাকরশ্রেণীকে দিয়ে বিনাশ করেছে, যেমন---বাংলার কবিরাজি, মাটির পাত্র, পাটের শাড়ি, শিঙ্গা যা পশ্চিমে আবার হার্বাল বা কাপিং বা পরিবেশবান্ধব দ্রব্য নামে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে) ভূমিকা পালন করে যেমন---মাতৃবৃক্ষে এসে উপাসনা, পারস্পরিক বন্ধন ইত্যাদি। কোনো প্রাণীকে এখানে কেবল ভোগের জন্য হত্যা করা হয়না। প্রাণী ও বৃক্ষের সঙ্গে নাভিদের আত্মার বন্ধন। তাই প্যান্ডোরার সকল জাতি, সম্প্রদায়, প্রাণী ও প্রকৃতি এক হয়ে পশ্চিমা আগ্রাসনকারী শেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়---যদিও হাজারো প্রাণ ধ্বংস হয়, ধ্বংস হয় স্থানীয় বাসস্থান, ফসল, প্রাণী ইত্যাদি।

আপনারা যারা এ চলচ্চিত্রটি দেখেন নি তারা দেখতে পারেন। আমার ছাত্রছাত্রীদের আমি কখনো চলচ্চিত্র দেখতে বললে যে কয়টি চলচ্চিত্র থাকতো এর মধ্যে 'অবতার' এর নাম বলতাম। আপনিও দেখতে পারেন। এটি তৈরি করতে ক্যামেরুন ১২ বছর সময় নিয়েছেন। এতে পশ্চিমের স্বার্থপর মানুষের পৃথিবীর নানা জায়গায় উপনিবেশ গড়ার উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, নিষ্ঠুরতার দেখা পাবেন।  একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মানুষ যে অন্য গ্রহ-উপগ্রহ-সৌরজগতের দখলদারত্ব নিতে বিলিয়ন ডলার খরচ করছে (যখন এ পৃথিবীতে কম করে হলেও ৩০০ কোটি মানুষ তার তিন বেলা খাদ্যের নিশ্চয়তাই পাচ্ছেনা, যখন গোটা দুনিয়ার সম্পদ ও খাদ্য ১% লোপাটকারী শ্বেতাঙ্গদের স্বার্থে ইউরোপে-আমেরিকায় ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ধনকুবের নামের বাটপারদের পিছনে ব্যয় হচ্ছে) এর সম্ভাব্য কর্মফলের দেখা পাবেন। অবতার আমি যতবার দেখি আমার মধ্যে চাঞ্চল্য জেগে ওঠে। আমিও সর্বহারার, ভূমিহীনের জন্য লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ হই। আমার রক্তও টগবগিয়ে উঠে বলে---

"এটা আমার ভূখণ্ড, আমার বাংলাদেশ---এর সম্পদ ও সংস্কৃতি আমার। এর উপর অন্য কারো খবরদারি, মাতুব্বরি ও আগ্রাসন চলবেনা, চলতে পারেনা।"
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments