সর্বশেষ

বঙ্গবন্ধু ও ৭ মার্চ ১৯৭১ || ৭ই মার্চের ভাষণ, গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ভুবন কাঁপানো বজ্রকন্ঠ ও বাংলাদেশী বাঙালির মুক্তিবার্তার মহানায়ক
~~~~~~~~~~
সময়: ৩ টা ১৫+; ৭ মার্চ, ১৯৭১। স্থান: রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
ভাইরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।...আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।
২। 
...শুনুন,মনে রাখবেন,শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ত্ব আপনাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।
৩।
...মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনেপত্র নিতে পারে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবেনা। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবেনা।
 ৪।
...আর যদি একটা গুলি চলে,আর যদি আমার লোককের হত্যা করা হয়; তোমাদের (উপর) কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তুমরা বন্ধ করে দেবে। তুমরা (আর্মিরা) আমার ভাই, তুমরার ব্যারাকে থাকো, কেউ তুমাদের কিছু বলবেনা। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করোনা। ভাল হবেনা। সাত কোটি মানুষকে দাবায় রাখতে পারবানা। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের দুমাতে পারবেনা।

৫।
...কিন্তু যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালির বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে,প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্ত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো।এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো-এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইন শা আল্লাহ।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ।
জয় বাংলা
- জাতির পিতা ও স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রেসকোর্স ময়দান, ৭ মার্চ, ১৯৭১, সময় ৩ টা ১৫+, রবিবার।

এই ঐতিহাসিক ও বাঙালি জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ভাষণের পর ময়দান জুড়ে শ্লোগান শুরু হয়:
বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো
বাংলাদেশ স্বাধীন করো

এই একটি ভাষণ সাড়ে সাতকোটি মানুষকে একটি আবর্তে নিয়ে এসেছিল। বেঁধেছিল একটিমাত্র সূতায়। চাই স্বাধীনতা, চাই মুক্তি, চাই সংগ্রাম। ১৯৭১ এর ৭ মার্চের এই ভাষণের প্রভাবের ভয়ে বেতারে সরাসরি চলমান অবস্থায় তা বন্ধ করে দেয় পাকিস্তানী নরপিচাশরা। পরে বাঙালের জোরালো প্রতিবাদের মুখে তা প্রচার করতে বাধ্য হয়। এমন কী ৮ মার্চ সকাল ৯ টায় পুনঃপ্রচারও করা হয়। 

এই ঐতিহাসিক ভাষণটি ছিল মূলত বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের মনের কথা।যার কারণে একেকটি শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সমগ্র জনতা চিত্‍কার করে সমর্থন দিচ্ছিল। সেই চিত্‍কার, সেই সংগ্রাম আর সেই সময়ের আলোড়ন আজো তোলে বাংলাদেশী বাঙালির হৃদয়ে। এ কারণেই ৪৭ বছর পরেও এ দেশের প্রতিটি হৃদয় কান পেতে শোনে স্থপতির বজ্রকন্ঠ:
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম...।

আমি ব্যক্তিগতভাবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশী বাঙালির এখন যে সংকট, অনৈক্য, বিভাজন তার কিছুই থাকতোনা যদিনা ক্ষমতালোভী দুর্বত্ত, অসভ্যরা এ রাষ্ট্রের জন্মদাতা ও স্বপ্নদৃষ্টাকে নির্মমভাবে হত্যা করতো। 

কার্যত লাল-সবুজ বাংলাদেশ যে প্রবল সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে সাম্রাজ্যবাদীদের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে জন্ম নিয়েছিল তাকে পরাজিত করতে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা আজো ওঁৎপেতে রয়েছে। তাদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। দেশের ইতিহাস, দেশের সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে। দেশের পণ্য ক্রয় করতে হবে। দেশ ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। 

৭ মার্চের একটাই শিক্ষা আর তা হচ্ছে:
জনতার শক্তিই সবচেয়ে বেশি। স্রষ্টা ঐক্যবদ্ধতার মধ্যেই মুক্তির জ্বালানি রেখে দিয়েছেন। সেই শক্তি সকল জাতি কাজে লাগাতে পারেনা, কারণ সকল জাতির একজন বঙ্গবন্ধু নেই। জাতিকে এক করতে, ঐক্যবদ্ধ করতে যে নৈতিকতা, যে সততা, যে মানবপ্রেম, যে প্রজ্ঞা ও যে স্রষ্টামনোনীত বজ্রকণ্ঠ লাগে তা সকলের থাকেনা। গলার স্বর দিয়ে একটি জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে ফেলার প্রণোদনা দিতে পারার ক্ষমতা সকলের থাকেনা। সেই কারণে পৃথিবীর সব জাতি স্বাধীনতার অমৃত সুধা লাভ করেনা। কাশ্মীরী, রোহিঙ্গা, উইঘুর, কাতালানদের একজন বঙ্গবন্ধু নাই বলেই হয়তো ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ নাই, জাতিসত্তা নাই। 

বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য নিয়ামত ছিলেন। আর এই কারণেই আজীবন দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষের নিকট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিনম্র শ্রদ্ধার একচ্ছত্র দাবিদার। মুক্তিকামী জনতা ও জাতির বিপ্লব এবং স্বাধীনতার নায়ক আমাদের বঙ্গসন্তান; সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান।
সালাম ও শ্রদ্ধা আপনার প্রতি, হে ইতিহাসের মহানায়ক, বাঙালির মহাঅর্জনের বরপুত্র, স্বাধীনতার মহান স্থপতি।
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments