সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে কীভাবে ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা অন্যান্য জাতিকে দখল করেছে সেটি নিয়ে ফ্রানৎস ফানোঁ'র (১৯২৫-১৯৬১) The Wretched of the Earth এর ভূমিকায় ফরাসী খাঁটি দার্শনিক জ্যা-পল সার্ত্রে (১৯০৫-১৯৮০) লিখেছেন৷
আমাদের বাংলা শব্দ থাকতেও অপ্রয়োজনে ইংরেজি বলে পণ্ডিত হওয়া বা জাতে উঠার চেষ্টা বা ইউরোপ-আমেরিকার পোশাক পরাকে দাপ্তরিক পোশাক বানিয়ে ফেলার সঙ্গে মিল পাওয়া যাবে মহামতি সার্ত্রের চিন্তার।
নিজের ভাষার শব্দ বাদ দিয়ে ভীণদেশী ক্ষমতাধর দেশের ভাষার শব্দ ব্যবহার বা অপ্রচলিত-জটিল শব্দ বলে স্বজাতির থেকে পৃথক হয়ে বিজাতির প্রতিনিধি হয়ে উঠাও সার্ত্রের আলাপ থেকে পাওয়া যাবে৷
সার্ত্রে যা লিখেছেন একটু জানাই:
The European elite undertook to manufacture a native elite. They picked out promising adolescents; they branded them, as with a red-hot iron, with the principles of Western culture; they stuffed their mouths full with high-sounding phrases, grand glutinous words that stuck to the teeth.
After a short stay in the mother country they were sent home, whitewashed. These walking lies had nothing left to say to their brothers; they only echoed. From Paris, from London, from Amsterdam we would utter the words "Parthenon! Brotherhood!" and some- where in Africa or Asia lips would open "... thenon! ... therhood!" It was the golden age.
[The Wretched of the Earth (translated by Constance Farrington), Page-7, Grove Press, New York, 1963]
অর্থাৎ আমাদের সমাজের শিক্ষিত, অভিজাত বা পয়সাওয়ালা যে শ্রেণি ইউরোপে (বা আমেরিকা-কানাডা-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড অথবা কদাচিৎ ক্রমবর্ধমান ভারতবর্ষ) যায় তাদের কেবল ভাষা ও পোশাকই ক্ষমতাধর ঔপনিবেশিক শক্তি বদলে দেয় না, তাদের চিন্তাকাঠামোই বদলে দেয়! তারা এসে আর আমাদের স্বনির্ভর করতে চায়না বা চায়না ইউরোপ-আমেরিকার (বা সমজাতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির) আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
সার্ত্রে আগ্রাসী বিদেশকে বলছেন মাতৃদেশ (Mother country), আর যে দেশে জন্ম, যে দেশ তার জাতিসত্তার মালিক তাকে বলছেন স্বদেশ (native home)! সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে পড়াকে সহজে বোঝাতে সার্ত্রে সেই যুগে ব্যবহার করেছেন শ্বেতধোলাই (whitewashed)!
আজো কি তা চলছেনা? প্রধানত পোল্যান্ড থেকে গিয়ে ফিলিস্তিনের মালিক সেজে বসে আছে যারা তারা আবার ইইরোপে এসে ভালো সেজে কাঁদছে না?
যেই ব্যাটা বা বেটি বাংলাদেশ ছেড়ে বৈদেশে যায় সেই ব্যাটা-বেটি কথায় কথিত স্মার্ট হয়, দন্ত কিলবিল করে প্রভুদেশের প্রধান উচ্চারণের মত করে 'বিশুদ্ধ' উচ্চারণ করে বা ল্যাখে সে কেবল চোখে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের মানুষের খারাপই দ্যাখে, কোনো ভালো খুঁজে পায় না! ভালো পরিবর্তন আনতে কোনো উদ্যোগও নেয় না। তাতে যদি তার প্রভুর সন্নিকটে যাওয়ার মত অন্যরাও চলে আসে!
এই তাত্ত্বিক কাঠামো আরো নানা জায়গায় প্রয়োগ করা যায়। দেশের অভ্যন্তরের প্রেক্ষাপটে যে একবার কথিত ভালো চাকর হয় সে যে 'জনগণের চাকর' এটা ভুলে জনগণকে দোষী করে তার প্রভু হতে চায়! তার ভাষা, অপরকে সম্বোধন, পোশাক, কথা বলার স্বর সব প্রভুসুলভ হয়ে যায় যা তাকে এলসেশিয়ান বা তোতাপাখির মত ঝাড়তে শিখিয়েছে স্ট্যাটাস কো! সুবিধাবাদী সর্ব শ্রেণির মধ্যে এই স্ববিরোধী শোষকশ্রেণির প্রতিনিধি রয়েছে। এরা—গ্রামসীর মতে—ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার বয়ান উৎপাদন ও ফেরি করে।
ফ্রানৎস ফানোঁ এ শ্রেণিকে বলেছেন উপনিবেশপন্থী বুদ্ধিজীবী (Colonized Intellectual)।
কার্ল মার্ক্স কম শিক্ষিত, কম খোঁজ-খবর রাখা হতদরিদ্র সর্বহারা (Lumpenproletariat) এর মধ্যে নৈরাশ্য দেখেছিলেন। কিন্তু আলজেরিয়ার বিপ্লব নিয়ে গবেষণা করা বিপ্লবী ফ্রানৎস ফানোঁ সেই সর্বহারাদের মধ্যে দেখেছিলেন বিপ্লবী আশার আলো!
ফাঁনোর মতে, শিক্ষিত জানলেওয়ালারা মগজ ধোলাই খাইছে। কিন্তু কম জানা, কথিত নিরক্ষর শ্রেণি, বা কর্মহীন, কৃষক, মজদুর যারা নগরের আত্মকেন্দ্রীক জীবনসত্তাকে পরিত্যাগ করেছে তাদের সহজে আধিপত্যের পক্ষে মগজ ধোলাই করা যায় না।
এই শ্রেণি বরং উপনিবেশ বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জানবাজি রেখে লড়াই করে।
এ যুগের গণমাধ্যম যেহেতু মানুষের মগজের দখল নেওয়ার লড়াইয়ে যুক্ত সেহেতু মন দখলের এই লড়াইয়ে সেই মন দখল করা কঠিন যে বয়ান উৎপাদনকারী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাপেক্ষে (বই, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ফেসবুক পোস্ট, ইংরেজি আর্টিকেল) নিরক্ষর । এলগোরিদমে বাইরে থাকলেই আপনি প্রোপাগাণ্ডার টার্গেট থেকে প্রাথমিক টোপে রক্ষা পাবেন। কিন্তু কতক্ষণ?
এই 'মাধ্যম নিরক্ষরতা' আবার জনতার মধ্যে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের বদ্ধমূল শিকড় গাড়তে পারে। উত্তর-সত্য যুগের লক্ষণ।
এ কারণে যত সহজে ফানোঁ বা মার্ক্স বা সার্ত্রে সেই যুগের লোকের মনোবিশ্লেষণ করেছেন এখন তত সহজ নয়৷
এখন, শুধু এইটুকু আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে, তাৎক্ষণিক কোনো কিছুকেই বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা যাবে না। যাচাই ছাড়া নিজের আপন জনের দেওয়া তথ্যও বিশ্বাস করা এখন বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হবে না। তবে যে পরীক্ষিত বিশ্বাসযোগ্য তার তথ্য বিশ্বাস করা যাবে। কিন্তু সেই বিশ্বাসী বার্তাপ্রচারকের সংখ্যা তো একেবারেই কম। তাই না?
আমি এ ক্ষেত্রে পবিত্র কোরানের সুরা হুজুরাতের ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে যাচাই-বাছাই-নিরীক্ষা বা ক্রশচেকের কথা বলেছেন সেটি মেনে চলি।
এখানে আল্লাহ যা বলেছেন তার সারাংশ: কেউ তোমাদের নিকট কোনো খবর-বার্তা আনলে তা যাচাই-বাছাই-পরীক্ষা করে দেখবে যেন সরবরাহকৃত যাচাই-বাছাই না করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গৃহীত সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কারো জন্য পরে তোমাদের অনুশোচনা বা অনুতপ্ত হতে না হয়।
(২০২৪)
0 Comments